ঢাকা, সোমবার 26 February 2018, ১৪ ফাল্গুন ১৪২৪, ৯ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঝিনাইগাতী মালিঝি নদীর ওপর সেতু না থাকায় দশ গ্রামের মানুষের চরম দুর্ভোগ

ঝিনাইগাতী উপজেলার হাতীবান্ধা ইউনিয়নের হাতীবান্ধা গ্রামে মালিঝি নদীর ওপর পাকা সেতুর অভাবে কাঠ ও বাঁশের সংমিশ্রণে তৈরি নড়বড়ে ও জরাজীর্ণ সাঁকোর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হচ্ছে শিশু শিক্ষার্থীরা -সংগ্রাম

শেরপুর সংবাদদাতা : স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার হাতীবান্ধা ইউনিয়নের হাতীবান্ধা গ্রামে খরস্রোতা মালিঝি নদীর ওপর কোন পাকা সেতু নির্মিত হয়নি। ফলে ওই ইউনিয়নের নদীসংলগ্ন দশ গ্রামের মানুষ যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। পাকা সেতুর অভাবে বর্তমানে তিন দশক আগে বিধ্বস্ত একটি জল কপাটের (স্লুইস গেট) পাশ দিয়ে কাঠ ও বাঁশের সংমিশ্রণে নির্মিত নড়বড়ে ও জরাজীর্ণ সাঁকোর ওপর দিয়ে দশ গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। গত বর্ষা মৌসুমে এ সাঁকো পার হওয়ার সময় নদীতে পড়ে গিয়ে দুইজন নিহত ও অনেকেই আহত হয়েছেন। এলাকাবাসী অনতিবিলম্বে মালিঝি নদীর ওপর একটি পাকা সেতু নির্মাণের জন্য সরকারের নিকট দাবি জানিয়েছেন।  সরেজমিন হাতীবান্ধা গ্রামের মালিঝি নদী এলাকায় গিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৮৬ সালে এ নদীর ওপর একটি জল কপাট (স্লুইস গেট) নির্মাণ করা হয়। জল কপাটের পাশ দিয়ে নির্মাণ করা হয় সংযোগ সেতু। নির্মাণের এক বছর পর্যন্ত এলাকাবাসী এ সেতুর ওপর দিয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ভয়াবহ পাহাড়ি ঢলে জল কপাট ও সংযোগ সেতুটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। পরে গ্রামবাসী বিধ্বস্ত সংযোগ সেতুর সঙ্গে কাঠ ও বাঁশ দিয়ে সাঁকো তৈরি করে কোন রকমে যাতায়াত ব্যবস্থা চালু রাখেন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সরকারিভাবে সাঁকোটির কোন সংস্কার না হওয়ায় বর্তমানে এটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে এ ইউনিয়নের হাতীবান্ধা, চকপাড়া, খামারপাড়া, কানিপাড়া, মাতারবাড়ী, পাগলারপাড়, মিরপাড়া, ঘাগড়া প্রধানপাড়া, কামারপাড়া ও জিগাতলা গ্রামের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ প্রায় দশ হাজার মানুষ জরাজীর্ণ ও নড়বড়ে সাঁকোর ওপর দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন। গত বর্ষা মৌসুমে সাঁকো পার হওয়ার সময় নদীতে পড়ে গিয়ে হাতীবান্ধা গ্রামের ব্যবসায়ী আলী আকবর নিহত ও এক স্কুল শিক্ষার্থীসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। চলতি বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের পানির প্রবল চাপে বা ¯্রােতের টানে যে কোন সময় সাঁকোটি ভেঙে গিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে এলাকাবাসী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, তিন দশক আগে বিধ্বস্ত জল কপাটের সংযোগ সেতুর সঙ্গে নির্মিত সাঁকোটির বিভিন্ন স্থানে বাঁকা হয়ে ঝুলে আছে। সাঁকোর বাঁশ ও কাঠগুলো দুর্বল হয়ে গেছে। মেরামত বা সংস্কার না করায় সাঁকোতে স্থাপিত কাঠগুলো ভেঙে গিয়ে বেশ ফাঁক হয়ে গেছে। একটু অসাবধান হলে ছোট শিশুরা কাঠের ফাঁক দিয়ে নদীতে পড়ে যেতে পারে। এ সাঁকোর ওপর দিয়ে কোন রিকশা বা ভ্যান চলাচল করতে পারে না। সরেজমিনে সাঁকোটি পরিদর্শনকালে হাতিবান্ধা গ্রামের মনিহারি ব্যবসায়ী আব্দুর রহিম বলেন, হাতিবান্ধাসহ এই ইউনিয়নের দশটি গ্রাম উপজেলার শেষপ্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় এলাকাটি খুবই অবহেলিত। এ সাঁকো পারাপার ছাড়া এসব গ্রামের মানুষের উপজেলা সদরে যাতায়াতের আর কোন পথ নেই। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা মালিঝি নদীর ওপর পাকা সেতু করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও আজ পর্যন্ত কোন জনপ্রতিনিধি তা বাস্তবায়ন করেননি। ফলে প্রায় দশ হাজার গ্রামবাসীর দুঃখ দূর হয়নি। সাঁকোটির স্থলে নদীতে একটি পাকা সেতু তৈরি করে দেওয়া হলে এলাকাবাসীর চলাচলে দুর্ভোগের অবসান হবে। মালিঝিকান্দা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নূসরাত জাহান ও হাতীবান্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী শারমিন বেগম প্রায় একই ভাষায় বলে, ‘বর্ষা মওসুমে নদীতে প্রচণ্ড স্রোত থাকে। তখন আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁকোর ওপর দিয়ে স্কুলে যাতায়াত করি। বর্ষাকালে নদীতে পড়ে যাওয়ার ভয়ে আমাদের বাবা-মা স্কুলে পাঠাতে চান না। এতে আমাদের লেখাপড়ার ক্ষতি হয়। সাঁকোটি এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। তাই এ নদীর ওপর একটি পাকা সেতু করে দেওয়ার জন্য আমরা সরকারের কাছে  আবেদন জানাই। যাতে আমরা সারা বছর নিরাপদে স্কুলে যাতায়াত করতে পারি।’ হাতিবান্ধা গ্রামের মৎস্য ব্যবসায়ী মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, মালিঝি নদীর উত্তর প্রান্তে কয়েকটি মৎস্য খামারে উৎপাদিত মাছসহ কৃষকদের উৎপাদিত ফসল ও কৃষিপণ্য বাজারজাত করার জন্য এ সাঁকো পার হওয়া ছাড়া বিকল্প কোন ব্যবস্থা নেই। তাই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে উৎপাদিত ফসল ও পণ্য বাজারজাত করা হয়। এ ছাড়া ভাঙ্গা সাঁকোর কারণে কোন যান্ত্রিক যান চলাচল না করায় অসুস্থ রোগীদের যথাসময়ে হাসপাতালে স্থানান্তর করাও কঠিন হয়ে পড়ে। হাতিবান্ধা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হওয়ার পরই গ্রামবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে মালিঝি নদীর ওপর একটি পাকা সেতু নির্মাণের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের নিকট আবেদন জানিয়েছি। গ্রামবাসীর দুর্ভোগ লাঘবে এখানে জরুরী ভিত্তিতে একটি সেতু নির্মাণ করা প্রয়োজন।’ ঝিনাইগাতীর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ফজলুল হক বলেন, মালিঝি নদীর ওপর পাকা সেতু নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে সেখানে সেতু নির্মাণ করা হবে। শেরপুর-৩ (ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী) আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম ফজলুল হক বলেন, মালিঝি নদীর ওপর সেতু নির্মাণের জন্য তিনি ময়মনসিংহ বিভাগীয় উন্নয়ন বোর্ডের নিকট একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ