ঢাকা, শুক্রবার 2 March 2018, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৩ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

তিন নোবেল বিজয়ী নারীর আহ্বান

গণহত্যা ও ধর্ষণসহ প্রচন্ড নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ও আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিঃশর্তভাবে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিন নোবেল বিজয়ী নারী। গত বুধবার ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন ইয়েমেনের তাওয়াক্কল কারমান, ইরানের শিরিন এবাদী এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ম্যারেইড ম্যাগুয়ার। তারা প্রত্যেকেই নোবেল বিজয়ী। সোমবার ও মঙ্গলবার কক্সবাজারের উখিয়া সফরকালে বিশেষ করে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের দুরবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তারা আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। রোহিঙ্গারা যে মানবেতর ভয়ংকর সংকটের মধ্য দিয়ে জীবন কাটাচ্ছে সে সংকটের সমাধান করতে এগিয়ে আসার ও পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছেন তিন নোবেল বিজয়ী নারী। 

তারা একই সঙ্গে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির উদ্দেশেও কঠোর বক্তব্য রেখেছেন। বলেছেন, অং সান সু চি নিজে যখন মিয়ানমারের সামরিক জান্তার হাতে গৃহ্বন্দী অবস্থায় নির্যাতিত হয়েছিলেন তখনও তারাই তার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি নির্যাতন বন্ধ করার এবং বন্দী নোবেল বিজয়ী নেত্রীকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সে একই নেত্রী সু চিই এখন মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার মানবতাবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিন নোবেল বিজয়ী বলেছেন, অং সান সু চির মনে রাখা উচিত, তার নিজের যেমন রয়েছে তেমনি রোহিঙ্গাদেরও রয়েছে মানবাধিকার ভোগ করার অধিকার। উল্লেখ্য, বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালেও তিন নোবেল বিজয়ী একই বক্তব্য রেখেছেন এবং রোহিঙ্গাদের তাদের নিজেদের ভূমি ও বসতবাড়িতে ফিরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

আমরা সংবাদ সম্মেলনে রাখা তিন নোবেল বিজয়ী নারীর বক্তব্য ও আহ্বানকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কারণ, এই তিন নারী মোটেও সাধারণ ব্যক্তি নন। তাছাড়া নোবেল বিজয়ী হিসেবে বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জাতিসংঘসহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে। সুতরাং তাদের বক্তব্যকে হালকাভাবে নেয়ার সুযোগ নেই।  একই কারণে তিন নোবেল বিজয়ী নারীর বক্তব্য ও আহ্বানকে আমরা মিয়ানমারের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বলে মনে করতে চাই। কারণ, গত বছর ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন রাষ্ট্রের পাশাপাশি জাতিসংঘও বহুবার মিয়ানমারের প্রতি সংকটের সমাধান করার জন্য আহ্বান জানিয়েছে। দেশটিকে কূটনৈতিক পন্থায় চাপও যথেষ্টই দেয়া হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত ইতিবাচক সাড়া দেয়া হয়নি।

মাঝখানে দেশটির এক মন্ত্রী স্টিন্ট সোয়ে একাধিকবার ঢাকা সফর করেছেন। ফিরতি সফরে ইয়াঙ্গুন গেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এই সফরের মধ্য দিয়ে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন এবং বিস্তারিত যাচাই-বাছাইশেষে শয়ের অংকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে সমঝোতা ও চুক্তি হলেও সমগ্র বিষয়টিকে মিয়ানমারের চাতুরিপূর্ণ কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কারণ, বাংলাদেশে যেখানে প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমার সেখানে প্রত্যাবর্তনের এমন এক ফর্মুলা দিয়েছে যার ফলে কয়েক দশকেও সকল রোহিঙ্গাকে ফেরৎ পাঠানো সম্ভব হবে না। তাছাড়া মিয়ানমারের চাপে যে যৌথ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করতে হয়েছে সেখানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্র বা জাতিসংঘের প্রতিনিধিকে রাখা যায়নি। 

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কৌশল হিসেবে মিয়ানমার বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে সত্য, কিন্তু সকলকে নয়, সাম্প্রতিক সংকটের সময়ে আশ্রয় গ্রহণকারীদের মধ্য থেকে দেশটি শুধু সেই সব রোহিঙ্গাকে ফেরৎ নেয়ার কথা বলেছে, যাদের কাছে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। মিয়ানমার সেই সাথে বলেছে, এসব রোহিঙ্গাকেও ‘যাচাই-বাছাই ও প্রমাণ সাপেক্ষে’ ফিরিয়ে নেয়া হবে। তাদের প্রমাণ করতে হবে, তারা মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের ‘প্রকৃত’ নাগরিক। 

মিয়ানমারের এই প্রস্তাব ও কৌশল আশ্বস্ত করার পরিবর্তে বরং গভীর সংশয়েরই সৃষ্টি করেছে। কারণ, ১৯৮০-র দশকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকরা কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ রোহিঙ্গাদের অবার্মিজ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করেছিল। সেই থেকে পর্যায়ক্রমে রোহিঙ্গাদের ওপর নানামুখী নির্যাতন বেড়েছে এবং হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। 

পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে গত বছরের ২৫ আগস্টের পর। এ সময় থেকে শুরু হয়েছে নতুন পর্যায়ের নির্যাতন ও হত্যাকান্ড। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা একে জাতিগত নির্মূল অভিযান হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এমন অবস্থায় হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মুখে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে তাদের কারো পক্ষেই পরিচয়পত্র ধরনের কোনো কিছু আনা সম্ভব হয়নি, যা দিয়ে প্রমাণ করা যাবে যে, তারা রাখাইন প্রদেশের ‘প্রকৃত’ নাগরিক। অর্থাৎ মিয়ানমার যদি ‘যাচাই-বাছাই ও প্রমাণ সাপেক্ষে’ ফেরৎ নেয়ও তাহলেও নেবে খুব স্বল্প সংখ্যক রোহিঙ্গাকে। অন্যদিকে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যাবে। তাদের আর কখনো ফেরৎ পাঠানো যাবে না। 

এমন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যেই তিন নোবেল বিজয়ী নারী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিঃশর্তভাবে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তারা সেই সাথে আরেক নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির প্রতি এমন ভাষায় অনুরোধ করেছেন যা যে কোনো বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে আন্দোলিত করবে। আমরা তিন নোবেল বিজয়ী নারীর আহ্বানের সঙ্গে সর্বান্তকরণে একাত্মতা প্রকাশ করি এবং সমস্যার সমাধানে দ্রুত এগিয়ে আসার জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই। আমাদের বিশ্বাস, মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি নিজেও এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে উঠবেন এবং নির্যাতিত রোহিঙ্গারা স্বল্প সময়ের মধ্যে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে সক্ষম হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ