ঢাকা, শুক্রবার 2 March 2018, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৩ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ৯ শূন্য পদে ৭৮ হাজার আবেদন

 

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের চাকরি মিলানোটাই যেন সোনার খনি । কোনভাবে চাকরি একটা পেলেই রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার মওকা । এ ধারণা থেকেই ওই অধিদফতরের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ওপর নজর থাকে বছরের পর বছর । কোনমতে একটা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলেই হুমড়ি খেয়ে পড়া । চাকরি একটা চাই-ই চাই । এ জন্য দৌড়ঝাপ যা করার দরকার সবই করা হয় । এর পেছনের কারণও স্পষ্ট ।

সম্প্রতি ওই অধিদফতরের উপপরিদর্শকের (এসআই) নয়টি শূন্য পদে নিয়োগ পেতে আবেদন করেছেন ৭৮ হাজার ৮২ জন। প্রতি পদের বিপরীতে আবেদনের সংখ্যা আট হাজার ৬৭২টি। এসআই পদে সব মিলিয়ে বেতন প্রায় ২৬ হাজার টাকা। এই আবেদন পেয়ে সংশ্লিষ্টদের চোখ কপালে ওঠার মত হলেও তারা ভাবছেন  নেপথ্যের কথা ।

গত ডিসেম্বরে ১২ ধরনের ২৪২টি পদে কর্মকর্তা ও সদস্য নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার পর আবেদনের সংখ্যা দেখে কর্মকর্তারা অবাক হয়েছেন। ২৪২টি পদের বিপরীতে মোট ২ লাখ ১৭ হাজার আবেদন পড়েছে। অবস্থা এমনই যে আবেদনগুলোর প্রাথমিক যাচাই (শর্ট লিস্ট) করাও সংস্থাটির পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ২৬ হাজার টাকা বেতনের এসআইয়ের নয়টি পদের জন্য এত আবেদনের কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না কর্মকর্তারা।

মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা জানান, গত ডিসেম্বরে ১২ ধরনের ২৪২টি পদে নিয়োগের আবেদন চাওয়া হয়। এর মধ্যে সর্বাধিক ৭৮ হাজারজন আবেদন করেছেন নয়টি এসআই পদের জন্য। এ ছাড়া হিসাবরক্ষকের ১২টি পদে আবেদন করেছেন ৩ হাজার ৫৫৮ জন, সহকারী প্রসিকিউটরের দুটি পদে দেড় হাজারজন আবেদন করেছেন। এই তিন পদেরই বেতন হবে গ্রেড-১১ অনুযায়ী। যার মূল বেতন সাড়ে ১২ হাজার টাকা। বাসাভাড়া ও অন্য সুবিধাদি মিলিয়ে মাসে মোট বেতন হবে ২৬ হাজার টাকার মতো। এই তিন পদের ন্যূনতম যোগ্যতা চাওয়া হয়েছিল স্নাতক পাস।

এ ছাড়া গবেষণা তথ্য সংগ্রহকারীর একটি পদের জন্য ৬০৩ জন, কম্পিউটার অপারেটরের চারটি পদে ২ হাজার ৫৬২ জন, গাড়ি চালকের ৪৬টি পদে ৩ হাজার ১৮৭ জন, অফিস সহকারীর ২৮টি পদে ৫২ হাজার ৪০৩ জন, টেলিফোন অপারেটরের তিনটি পদে ৩ হাজার ৪৩৬ জন, সিপাইয়ের ১০১টি পদে ৪১ হাজার ৮৮৮ চন, ওয়্যারলেস অপারেটরের ৩০টি পদে ২৯ হাজার ৬৪৬ জন, নিরাপত্তাপ্রহরীর চারটি পদে ৭৫৮ জন এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দুটি পদের জন্য ২৯১ জন আবেদন করেছেন।

সংস্থাটির উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. মামুন বলেন, পুরো আবেদনপ্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন হয়। গত ৩১ জানুয়ারি ছিল আবেদনের শেষ তারিখ। এখন কীভাবে পরীক্ষা নেওয়া হবে, তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা চলছে।

দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এখন মোট জনবল ১ হাজার ১৯২ জন। আরও কিছু লোকজন নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তারা কখনো ভাবতে পারেননি এই কটি পদের জন্য এত আবেদন পড়বে। এখন এগুলো তাদের পক্ষে প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করাই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই পরীক্ষার দায়িত্ব বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ইনস্টিটিউট বা বিভাগকে দেয়া যায় কি না, তা নিয়ে কথাবার্তা চলছে।

মাদকের সঙ্গে জড়ালে চাকরি থাকবে না: ডিজি

মাদকসেবন, মাদক ব্যবসা বা মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার মতো কোনো কাজে জড়ালে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি থাকবে না বলে হুঁশিয়ার করেছেন মহাপরিচালক (ডিজি) মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ কথা বলেন।

মহাপরিচালকের কাছে সাংবাদিকেরা জানতে চান, অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী মাদকসেবন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ ব্যাপারে কী করছেন?

জবাবে জামাল উদ্দীন বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ এলে এবং তদন্তে তা প্রমাণিত হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি থাকবে না। এ ব্যাপারে সব সময়ই কঠোর ভূমিকা থাকবে।

প্রশ্নের জবাবে জামাল উদ্দীন বলেন, দেশে মোট কত মাদকসেবী আছে, সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে ধারণা করা হয়, এই সংখ্যা ৫০ লাখ থেকে ৭০ লাখ হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হয়। বৈঠকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে থাকা ৪৯টি ইয়াবা তৈরির কারখানার ঠিকানা দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দিয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে।

মাদক কর্মকর্তারা নজরদারিতে

যে জেলায় মাদক মামলা বা অভিযানের সংখ্যা কম হবে, সেই জেলার মাদক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে মামলার সংখ্যা বেশি দেখানোর প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া যাবে না, নিলে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা। গত রোববার মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ সমন্বয় সভার বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সূত্রগুলো জানায়, ২৮ জন মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা সঠিকভাবে তাদের কাজ না করায় এবং অভিযোগ থাকায় তাদের শোকজ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। প্রতিটি বিভাগে বিশেষ অভিযান চালানো হবে বলে ঠিক করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সুরক্ষা সেবা বিভাগ ঠিক করেছে, মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা, কাজ ও সততা বিবেচনা করেই বদলি ও পদোন্নতি দেওয়া হবে। এ ছাড়া যদি কেউ বদলির জন্য মন্ত্রী বা সচিবের কাছে বারবার তদবির করেন, তবে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। এই কর্মকর্তাদের সংশোধনের জন্য দুই মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যারা বেশিসংখ্যক অভিযান পরিচালনা করেছেন অথচ মামলা কম দেখিয়েছেন, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ