ঢাকা, শুক্রবার 2 March 2018, ১৮ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৩ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কুমারখালীর বিভিন্ন মৌজায় গড়াই  নদীর মাটি-বালি লুট  

 

কুমারখালী (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা : কুমারখালীতে গড়াই নদীর মাটি ও বালি প্রতিদিন প্রকাশ্য দিবালোকে লুট হয়ে যাচ্ছে। আর মোটা অংকের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত সরকার। স্থানীয় প্রভাবশালী মাসুদ-কিবরিয়া গং এই মাটি ও বালি লুটের কারবারের সাথে জড়িত বলে জানাগেছে। উপজেলার সদকী ইউনিয়নের জিলাপীতলা হিজলাকরসহ  বিভিন্ন মৌজা এলাকায় গড়াই নদীর চরে সরেজমিন গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। 

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, জিলাপীতলা মোড়ের পাশের কাঁচ দিয়ে ঘেরা অফিসের বসে এই মাটি ও বালির কারবার নিয়ন্ত্রণ ওই এলাকার প্রভাবশালী মাসুদ ও কিবরিয়া। গড়াই নদীর গ্রামরক্ষা বাঁধ সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, কথা বলতেও ভয় লাগে। এখানে ছদ্মবেশে ওদের লোক ঘোরাফেরা করে। গ্রামরক্ষা বাঁধের পাশ থেকে গভীর করে মাটি কেটে নিয়ে ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে। আমাদের মতো অনেকেরই জমি আছে এখানে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেও কারো কিছুই করার নেই। ওরা জমির চারপাশ থেকে মাটি কেটে গভীর করে নেয়, ফলে আমাদের জমিতে আর চাষাবাদ করা সম্ভব হয়না। তাই বাধ্য হয়েই নামেমাত্র টাকায় ওদের কাছে মাটি বিক্রি করে দিতে হয়। 

সরেজমিন ঘুরে দেখাগেছে, গ্রামরক্ষা বাঁধের অদুরে একটি বাঁশ বাগান ও ছোট্ট একটি পানের বরজের চারপাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে। আরেকটু দূরে গিয়ে দেখা যায়, উত্তর-দক্ষিণ লম্বা ভিটা জমিতে কলার বাগান ও পাশেই ফলদ ও বনজ গাছ থাকাবস্থায় ওই জমির পাশের জমির গা ঘেঁষে খননযন্ত্রের (এক্সকাভেটর) সাহায্যে গভীর করে মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে। সরেজমিন গিয়ে জিলাপীতলা- হিজলাকর গড়াই নদীর চরে ৪টি এক্সকাভেটর (খননযন্ত্র) দেখা যায়। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা গ্রামরক্ষা বাঁধের অদুরের এই উঁচু জমির মাটি কেটে নেয়া হলে বর্ষা মৌসুমে গ্রামরক্ষা বাঁধ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ বাস্তবায়ণ সংস্থার অর্থায়নে নদীর তীরে নির্মিত হিজলাকর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ব্যারাকগুলো হুমকীর মুখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 

স্থানীয় একজন নারী বাসিন্দা বলেন, গেল বছর গড়াই নদী খননের সময় গ্রামরক্ষা বাঁধের পাশদিয়ে বালির স্তুপ তৈরি করা হয়েছিল। ফলে এই এলাকার মানুষ ভাঙ্গনের ঝুঁকিমুক্ত হয়। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই প্রভাবশালী বালি ব্যবসায়ী মাসুদ ওই স্তুপ থেকে বালি বিক্রি করতে শুরু করে। তবে এবারো নদী খননের সময় গ্রামরক্ষা বাঁধের পাশদিয়ে বালি ফেলা হয়েছে।   

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই এলাকার একজন শিক্ষার্থী জানান, খুব সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একাধিক খননযন্ত্রের সাহায্যে মাটি ও বালি কেটে ছোট বড় ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে জিলাপীতলা হিজলাকর এলাকার মানুষের চলাচলের একমাত্র পাকা রাস্তার বিটুমিন উঠে গিয়ে রাস্তুটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গেছে। আর রাস্তার ধুলোর কারণে আশাপাশের মানুষ দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন। স্কুল-কলেজে যাতায়াত করতে খুবই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। 

এ ব্যাপারে সদকী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, নদী তীরের জমির মাটি কেটে স্থানীয় প্রভাবশালীরা ইটভাটার মালিকদের নিকট বিক্রি করে দিচ্ছে। আর প্রকাশ্যে হরিলুট হচ্ছে বালি। কিন্তু সরকার প্রতিদিন মোটা অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই মাটি ও বালির গাড়ি চলাচল করায় সড়কগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এবং ধুলো উড়ে এলাকার মানুষের সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। নদী তীরের মাটি কাটা ও অবৈধপন্থায় এই বালি উত্তোলন বন্ধে অনতিবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ দাবী করেন তিনি। 

বালি ব্যবসায়ী মাসুদ জানান, বহু কাঠখড় পুড়িয়ে এই ব্যবসা করতে হচ্ছে। প্রতিদিন বহু ধরনের ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। সবাইকে ম্যানেজ করেই ব্যবসা করছি। আর কিবরিয়া নামের একব্যক্তি মাটির ব্যবসা করছে বলে জানান তিনি। 

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: শাহীনুজ্জামান বলেন, বালি উত্তোলনের জন্য কাউকে অনুমোতি দেয়া হয়নি। অবৈধভাবে বালি উত্তোলনের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে এবং হবে। 

উল্লেখ্য, গড়াই নদীর জিলাপীতলা- হিজলাকর এলাকা ছাড়াও পৌর এলাকার তেবাড়িয়া, যদুবয়রা ইউনিয়নের হাসদিয়া চর, লালন বাজার খেয়া ঘাট, চাপড়া ইউয়িনের সৈয়দ মাছ-উদ রুমী সেতুর উত্তর ও দক্ষিণের চর,  নন্দলালপুর ইউনিয়নের কাশিমপুর বাঁশআড়া চর, কয়া ইউনিয়নের চর এলাকার থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালি উত্তোলন করে শত শত ছোট বড় পরিবহন যোগে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই বালি উত্তোলনের সাথে সরকার দলীয় স্থানীয় প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ