ঢাকা, শনিবার 3 March 2018, ১৯ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৪ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শাহজাদপুরে সফল শ্বেত বিপ্লব

শাহজাদপুর সিরাজগঞ্জে একটি দুগ্ধ গরুর খামার

এম. এ. জাফর লিটন, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : নানা সমস্যার মধ্য দিয়েও বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ড হিসেবে খ্যাত শাহজাদপুর ও তাঁর আশে পাশের অঞ্চলে একটি সফল শ্বেত বিপ্লব সংঘঠিত হয়েছে। ১৮শ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে শুরু হওয়া অত্র অঞ্চলে দুগ্ধ গাভী পালন, দুধের বাণিজ্যিক উৎপাদন যা বর্তমানে দুগ্ধ শিল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও এক সময় বিছিন্ন ভাবে গাভী পালন করতো কিন্তু দেড়শ বছরের বেশি সময়ের ব্যবধানে এ অঞ্চলে গাভী পালন ও দুগ্ধ উৎপাদন এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে প্রতিদিন শাহজাদপুরে আড়াই লাখ লিটারের বেশি দুধ উৎপাদন হচ্ছে। যা বলতে গেলে সফল একটি শ্বেত বিপ্লব। বাঘাবাড়ী মিল্কভিটায় প্রতিদিন দেড়লাখ লিটার, বেসরকারি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান আফতাব, আকিজ, প্রাণ, বারো আওলিয়া, ব্র্যাকে ৭০ থেকে ৮০ হাজার লিটার দুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ছাড়াও ঘোষরা খামারীদের কাছ থেকে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ হাজার লিটার দুধ ক্রয় করছে। আর এই দুধের দ্বারা প্রতিদিন দেশের মোট তরল দুধের চাহিদার বিরাট অংশ পূরণ হচ্ছে। তরল দুধ ছাড়াও দুগ্ধজাত ছানা ও ঘি শিল্পেরও বিকাশ ঘটেছে। ফলে দুগ্ধগাভীর খামার ও দুধের উৎপাদনকে ঘিরে এ অঞ্চলে লাখ লাখ বেকার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ অঞ্চলে দুগ্ধ শিল্পের যেমন   বিপ্লব ঘটেছে তেমনি নানা সমস্যাও বিরাজমান আছে। শাহজাদপুরের নদীবেষ্টিত গ্রামগুলি থেকে সকাল বিকেল দুধবাহি ট্রলার, বা নৌকা বাঘাবাড়ী মিল্কভিটার দিকে যায় তখন আক্ষরিক অর্থে বলতে হয় দুধের নহর বয়ে যাওয়ার কথা। তাই এখানে যেমন সফল শ্বেত বিপ্লব হয়েছে তেমনিভাবে দুধে ভেজাল মিশ্রণ করে এই শ্বেতবিপ্লবকে ম্লান করে দিচ্ছে একশ্রেণীর দুগ্ধ কালোবাজারি চক্র। দুধের সাথে ঘি ও ছানাতেও ভেজাল মিশ্রণ করা হচ্ছে।
দুগ্ধ শিল্পের ইতিকথাঃ বৃহত্তর পাবনা জেলার শাহজাদপুরের রাউতারা,বহালবাড়ী,চরাচিথুলিয়া,বাঘাবাড়ী, পোতাজিয়া, ভাঙ্গড়া উপজেলার নাকডেমড়া, সাথিয়া উপজেলার সিলুন্দা,পাথাইলহাট,বিলচান্দ এলাকা এক সময় বিশাল জলরাশি থাকায় কৃষকের গোয়ালভরা গরু,বিলভরা মাছ ছিলো। খামার তৈরীর প্রথম সূচনা করেন জনৈক ইংরেজ কর্তা ব্যক্তি। এরপরেই বিশ্বকবি রবীন্দ্র নাথঠাকুর। তিনি পোতাজিয়ার জমিদারবাড়ী তদারকী করতে এসে এখানে উন্নত জাতের গাভী সরবরাহ করায় আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে। প্রতিবছর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রিয় পদ্মাবোটে চড়ে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুটিবাড়ী থেকে পদ্মা,ইছামতি,বড়াল,করতোয়া নদী হয়ে পোতাজিয়া এবং শাহজাদপুর কুটিবাড়ী ঘাটে  পৌঁছে জমিদারী তদারকি করতেন। যাত্রাপাথে বড়াল নদীর তীরে রাউতারার ঘিরিষ চন্দ্র ঘোষের ঘাটে যাত্রা বিরতি করে এখান থেকে ঘি,ছানা,মাখন কিনতেন এবং কলকাতায় কিছু পাঠাতেন। এভাবেই রাউতারার ঘিরিষ ঘোষের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠলে তিনি গরু পালনের জন্য বিনা খাজনায় তাঁর জমিদারীর কিছু জমি দাবি করেন এবং বাংলা ১৩০২সনের ২৯ চৈত্র মোক্তা ৫০০টাকায় বিশখালী, ঝালঝার, ছোটঝার, দখলবাড়ী, জামাতদার, ইঁটাখোলা, হারানি, বিলদাবানিয়া, লাছনা, খাগড়াসহ বিভিন্ন এলাকার ১৯২বিঘা জমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঘিরিষ ঘোষকে লিখে দেন। ১৮৯৪-৯৫ খৃষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এলাকার দুগ্ধ শিল্প ও খামারীদের উন্নয়নকল্পে সমবায় সমিতি গঠন করেছিলেন। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের পুশা  ভেটেরেনারি কলেজ থেকে উন্নতজাতের মুলতানি,সিন্ধি জাঁতের ষাঁড় এবং পাঞ্জাব থেকে শাহীওয়াল জাতের ষাঁড় এনে স্থানীয় জাতের সাথে সমন্বয় ক্রস করে পাবনা ব্রিড নামে  একটি নতুন গো-জাত উদ্ধাবন করেন। এরপর থেকেই দুগ্ধ গাভীর বাথান আর দুধের স্বর্গরাজ্য হিসেবে বিবেচিত হতে থাকে শাহজাদপুর অঞ্চল। শাহজাদপুরের বিলপাড়ে গড়ে উঠা বাথানই এখন এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম গো-চারণভূমি। বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি হাসিব খাঁন তরুণ জানান, ছোট বড় মিলিয়ে শাহজাদপুরে এখন ৫ শতাধিক বাথান রয়েছে।  যেখানে ১ থেকে দেড় লাখ উন্নত জাতের গাভী রয়েছে। আর বাথার কেন্দ্রিক পরিবারের সংখ্যাও ৮০ /৯০হাজার। কিন্তু বর্তমানে ভূমি দস্যুদের গ্রাসের কবলে পড়ে ৫ হাজার একর বাথান হৃাস পেয়ে দেড় হাজার একরে নেমে এসেছে। শাহজাদপুরে দুগ্ধ সমিতিভুক্ত সদস্যের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। সমিতির বাইরেও অনেক খামারি দুগ্ধ সবরাহ করে থাকে। তবে বর্তমানে দুগ্ধ গাভীর খাদ্যের মূল্য আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় খামারিরা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। দুধের মূল্য কম হওয়ায় খামারিরা এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ