ঢাকা, রোববার 4 March 2018, ২০ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৫ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

উন্নয়নের ব্ল্যাক-হোল!

‘মহাসড়ক মানেই মহাদুর্ভোগ’ শিরোনাম থেকেই উপলব্ধি করা যায় আমাদের মহাসড়কের হাল-হকিকত। ৩ মার্চ প্রথম আলো পত্রিকায় মুদ্রিত খবরটিতে বলা হয়, সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) অধীন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-সেতু মেরামত ও নির্মাণে গত আট বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এরপরও সড়কের বেহাল অবস্থা বদলায়নি। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় মহাসড়কের স্থানে স্থানে খানাখন্দক, সড়কপথে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে। জেলা ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। জোড়াতালির মেরামত, পরক্ষণেই গর্ত- এই চক্রেই চলছে গত আট বছর। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা প্রতিবেদন-২০১৭ অনুযায়ী এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিকৃষ্ট সড়কের দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। কেবল নেপাল বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ। আর সওজের হাইওয়ে ডিজাইন ম্যানুয়াল (এইচডিএস) বিভাগের ২০১৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদন অনুসারে দেশের ৩৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক খারাপ। ৩৯ শতাংশ সড়ক-মহাসড়ক ভাল। আর সাড়ে ২৩ শতাংশ চলনসই। এরপর তারা গত নভেম্বরে নতুন করে জরিপ শুরু করেছে। এর প্রাথমিক ফল অনুযায়ী সড়ক-মহাসড়কের অর্ধেকই খারাপের পর্যায়ে চলে গেছে। এর মধ্যে খুলনা অঞ্চলের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলের সড়কের অবস্থাও খারাপ।
সড়ক-মহাসড়কের দুরবস্থা নিয়ে লেখালেখি কম হয়নি। বহু সচিত্র প্রতিবেদনও আমরা দেখেছি। আশ্বাস বাণীও আমরা শুনেছি। এরপরও ফলাফল হলো এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ নিকৃষ্ট সড়কের দেশ। শুধু নেপাল বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ। গত আট বছরে সওজ যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচ করলো তার ফলাফলটা এমন হলো কেন? সড়ক নির্মাণের পর তা টানা ১৫ বছর কোনরকম মেরামত ছাড়াই ভালো থাকবে- এটা ধরে নিয়েই নকশা করার রীতি রয়েছে দেশে। এরপর টুকটাক মেরামত করে ২০ বছর পর পুনঃনির্মাণ করার কথা। অথচ বাংলাদেশে নির্মাণের পরের বছর থেকেই মেরামতের দরকার পড়ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র সড়ক ব্যবস্থাপনা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, নির্মাণের ২০-২৫ বছর পর্যন্ত হাত দিতে হয় না। এরপর টুকটাক মেরামত করে সড়কের বয়স ৪০ বছর পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে ক’দিন পরপর রাস্তা মেরামত করার এই প্রবণতাকে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক অভিহিত করেছেন উন্নয়নের ‘ব্ল্যাকহোল’ বা অন্ধকূপ হিসেবে। এটা কোনভাবে মেনে নেয়া যায় না, সরকার এর দায় এড়াতে পারে না। তিনি মনে করেন, তিন করণে এত দ্রুত মেরামতের দরকার পড়ছে। যেমন : ১. নির্মাণ ও মেরামতে গলদ, ২. অতিরিক্ত মালবাহী যান চলাচল, ৩. দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
নির্মাণ ও মেরামত গলদের কারণ হচ্ছেÑ রাজনৈতিক ঠিকাদারদের দৌরাত্ম্যে প্রকৃত ঠিকাদাররা কাজ পান না। আর রাজনৈতিক ঠিকাদারদের কাছ থেকে মানসম্পন্ন কাজ আদায় করা যায় না। ফলে প্রকৌশলীরাও ঠিকাদারদের সঙ্গে সমঝোতার পথেই হাঁটেন, কাজের মান সম্পর্কে খুব একটা প্রশ্ন তোলেন না। সরকার ই-টেন্ডারিং চালু করলেও তাতে কাজ হচ্ছে না। কারণ, এক জেলার কাজ অন্য জেলা বা দূর থেকে কেউ করার সাহস পান না। প্রাণের মায়াতো সবারই আছে। আর কেউ দূর থেকে কাজ পেলেও তাকে চাঁদা বা কমিশন দিতে হয়। ফলে কাজ সঠিক হয় না। ওভারলোডিং বা অতিরিক্ত মালবাহী যান চলাচলের বিষয়টিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সরকার নিজেই ২২ টন (পেছনের চাকায়) মাল বহনের অনুমতি দিয়েছে। এটা একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন অধ্যাপক শামছুল হক। এছাড়া দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণেও সড়ক ভাঙছে। বাংলাদেশের সড়কগুলো বিটুমিনের। পানি আর বিটুমিন পরস্পরের শত্রু। ফলে কোন সড়কে পানি জমে থাকলে সড়ক ভাঙবেই। ভারতে গুরুত্বপূর্ণ সব সড়ক কংক্রিট ঢালাইয়ে নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এতে বর্ষার বা পানির প্রভাব পড়বে না। এই ব্যবস্থায় খরচ সামান্য বেশি হলেও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ কমে যাবে। বিশেষজ্ঞদের এইসব মতামতকে সরকার গুরুত্ব দিলে ভাল হয়। জনগণকে দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করাই সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালিত না হলে সরকার ও কর্তৃপক্ষের গুরুত্ব কমে যাবে জনগণের কাছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ