ঢাকা, রোববার 4 March 2018, ২০ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৫ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বাঁশ ও বেত দুর্দিন ॥ ভালো নেই রাণীনগরের এই কারিগররা

নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় সময়ের বিবর্তনের ফলে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ ও বেত দ্বারা তৈরি নানান নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার আজও ধরে রেখেছে তাদের পৈতৃক পেশা। উপরের ছবিটি উপজেলার কাশিমপুর ঋশিপাড়া থেকে তোলা

আহাদ আলী, নওগাঁ সংবাদদাতা: বাঁশ আর বেতকেই জীবিকার প্রধান বাহক হিসাবে আঁকড়ে রেখেছে উপজেলার গুটি কয়েক মানুষ। এই বাঁশ আর বেতই বর্তমানে তাদের জীবিকার প্রধান বাহক। কিন্তু দিন দিন বাঁশ আর বেতের তৈরি বিভিন্ন পন্যের চাহিদা কমে যাওয়ায় ভাল নেই এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা। তবুও বাপ-দাদার এই পেশাকে এখনও ধরে রেখেছে কিছু সংখ্যক ঋষি পরিবার।
বর্তমান প্রযুক্তির যুগে নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় বাঁশ ও বেত শিল্পের তৈরি মনকারা বিভিন্ন জিনিসের জায়গা করে নিয়েছে স্বল্প দামের প্লাষ্টিক ও লোহার তৈরি পন্য। তাই বাঁশ ও বেতের তৈরি মনকারা সেই পন্যগুলো এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। কদর না থাকায় গ্রামগঞ্জ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশের তৈরি বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় আকর্ষণীয় আসবাবপত্র। অভাবের তাড়নায় এই শিল্পের কারিগররা দীর্ঘদিনের বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে আজ অনেকে অন্য পেশার দিকে ছুটছে। শত অভাব অনটনের মাঝেও উপজেলায় হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার আজও পৈতৃক এই পেশাটি ধরে রেখেছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় যে, বর্তমানে উপজেলার কাশিমপুর ইউপি’র কাশিমপুর ঋষিপাড়ার ৩০-৩৫টি, মিরাট ইউনিয়নের কনোজ গ্রামে ৪০/৫০টি, গোনা ইউনিয়নের নিজামপুর গ্রামে ১১০টি পরিবার, কৃষনপুর গ্রামের ৫০টি ও ঝিনা গ্রামের ৭০টি পরিবারই বর্তমানে এই শিল্পটি ধরে রেখেছেন। পুরুষদের পাশাপাশি সংসারের কাজ শেষ করে নারী কারিগররাই বাঁশ দিয়ে এই সব পণ্য বেশি তৈরি করে থাকেন। সনাতন ধর্মের মধ্যে একটি মাত্র গোত্র আছে যারা শুধু বাঁশ ও বেত দ্বারা এই সব পণ্য তৈরি করে থাকেন। বর্তমানে বেত তেমন সহজ লভ্য না হওয়ায় বাঁশ দিয়েই বেশি এই সব চিরচেনা পণ্য তৈরি করছেন এই কারিগররা। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে আজ অনেক পরিবারই বাপ-দাদার এই পেশা ছেড়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন। বর্তমানে আধুনিকতার যুগে বাজারে সহজলভ্য ও আর্কষনীয় বিভিন্ন প্লাষ্টিক পণ্য ও আন্যান্য দ্রব্য মূল্যের সাথে পাল¬া দিতে না পারায় এই শিল্পের অনেক কারিগররা তাদের বাপ-দাদার পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এসব বাঁশ শিল্পের কারিগররা তাদের পূর্ব পুরুষের এ পেশা আকঁড়ে ধরে রাখার আপ্রান চেষ্টা করেও হিমশিম খাচ্ছেন। দিন দিন বিভিন্ন জিনিসপত্রের মূল্য যেভাবে বাড়ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না এই শিল্পের তৈরি বিভিন্ন পণ্যের মূল্য যার কারণে কারিগররা জীবন সংসারে টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছেন। কয়েক দশক আগে নওগাঁ জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চালান হত এই কারিগরদের তৈরি এই সব বাঁশ ও বেতের পণ্যগুলো। এক সময় রাণীনগরসহ দেশের ঘরে ঘরে ছিল বাঁশের তৈরী এই সব সামগ্রীর কদর ছিল অনেক। কালের আর্বতনের সাথে সাথে বিশেষ আর চোখে পড়ে না এই পণ্যগুলো। অপ্রতুল ব্যবহার আর বাঁশের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে বাঁশ শিল্প আজ হুমকির মুখে। বাঁশ ও বেত থেকে তৈরী সামগ্রী বাচ্চাদের দোলনা, র‌্যাখ, পাখা, ঝাড়–, টোপা, ডালী, মাছ ধরার পলই, খলিশানসহ বিভিন্ন প্রকার আসবাবপত্র গ্রামঞ্চলের সর্বত্র বিস্তার ছিল। এক সময় যে বাঁশ ২০ থেকে ৩০ টাকায় পাওয়া যেত সেই বাঁশ বর্তমান বাজারে কিনতে হচ্ছে দুইশত থেকে আড়াইশ টাকা সেই সাথে বাড়েনি এসব পণ্যের দাম। জনসংখ্যা বৃদ্ধি সহ ঘর বাড়ী নির্মাণে যে পরিমান বাঁশের প্রয়োজন সে পরিমান বাঁশের ঝাড় বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এই পরিবার গুলো বিভিন্ন সময়ে আসা সরকারি ভাবে সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই বাপ-দাদার এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে গিয়ে আজ তারা মানবেতর জীবন-যাপন করছে।
উপজেলার কাশিমপুর ঋশিপাড়ার নারী কারিগর রতœা, কাজলী, দহর চাঁদ, রহিদাস, উপেন দাসসহ অনেকে বলেন, এই গ্রামের পরিবারগুলো আজও এ কাজে নিয়োজিত আছি। একটি বাঁশ থেকে ১০-১২টি ডালি তৈরি হয়। সকল খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি পণ্য থেকে ১০-২০ টাকা করে লাভ থাকে। তবে আগের মত আর বেশি লাভ হয় না বর্তমানে। তাই এই সীমিত লাভ দিয়ে পরিবার চালানো অতি কষ্টের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের। তারা নিজেরাই বিভিন্ন হাটে গিয়ে ও গ্রামে গ্রামে ফেরি করে এই সব পণ্য বিক্রয় করে থাকেন। তারা আরও জানান যে, খেয়ে-না খেয়ে অতি কষ্টে তাদের বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী এই বাঁশ শিল্প টিকে রাখতে ধার দেনা ও বিভিন্ন সমিতি থেকে বেশি লাভ দিয়ে টাকা নিয়ে কোন রকম বাপ-দাদার এই পেশাকে আঁকড়ে জীবিকা নির্বাহ করে আসছি। আমাদের এই শিল্পটির উন্নতিকল্পে যদি সরকারি ভাবে অল্প লাভে ঋণ দেয়া হয় তাহলে বাঁশ শিল্পের কারিগররা স্বাবলম্বী হবে আর হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ