ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 March 2018, ২৪ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৯ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘সব অবৈধ’ ঠেকাতে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত সুরক্ষিত করতে অবশেষে কাঁটাতারের বেড়া (ফেঞ্চিং) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ত্রিদেশীয় এই সীমান্তের ‘সব অবৈধ’ কারবার ঠেকাতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ধারাবাহিক অনুপ্রবেশসহ সকল ধরনের অবৈধ কার্যক্রম ঠেকাতে বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় পর্যায়ক্রমে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উভয়দেশের সম্মতিতে সীমান্তে অবৈধ প্রবেশ ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপ প্রতিহত করতে দুই দেশের মধ্যকার সীমান্তে বেড়া নির্মানের কাজ শুরুর কথা গত বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই জানিয়েছে ভারতের সীমান্ত প্রতিরক্ষা বাহিনী ‘বিএসএফ’। সে হিসেবে উভয় দেশের পক্ষ থেকেই বেড়া নির্মানের কাজ চলছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৫৭৮টি বিওপি সীমানা বরাবর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বিজিবির যানবাহন, অস্ত্র বা বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট-এ (বিওপি) রক্ষিত সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ জনগণ, মাদক, অস্ত্র ইত্যাদির অবৈধ প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে বিওপি এলাকায় যে কোনও ধরনের অবাঞ্ছিত ঘটনা প্রতিরোধ করতেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ এই প্রকল্প নিয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় দেশের আট বিভাগের ৩২ জেলার ৪০টি উপজেলায় বিদ্যমান ৫৭৬টি ও দুটি ভাসমান বিওপিসহ ৫৭৮টি বিওপি বরাবর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে ,বাংলাদেশ ও ভারত‘র মধ্যকার সীমান্ত হচ্ছে দীর্ঘ সীমান্ত । ৪ হাজার ৯৬ কি.মি এর এই সীমান্তজুড়ে ইতিমধ্যে অধিকাংশ স্থানেই ভারত কাঁটাতারের বেড়া নির্মান করেছে । বাকী সীমান্তেও তাদের বেড়া নির্মানের কাজ চলমান আছে বলে জানা গেছে ।
আর বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকা হচ্ছে ১শ‘৭০কিলোমিটারের।যার অধিকাংশই জলপথ । বাংলাদেশের ভেতরে রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তে কাটাতারের বেড়া দেয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ।আর ওই দেশ থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে এবার বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বেড়া দিচ্ছে মিয়ানমার সরকার ।সব মিলে বাংলাদেশের সাথে ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকা হচ্ছে ৪ হাজার ২শ‘৬৬ কি.মি.।
এদিকে, ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে ১৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে। ভারতের সঙ্গে সীমান্তের দু’পাশে ১৬ কিলোমিটার এলাকায় দুই দেশের জনগণের অবাধ চলাচল নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষর অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে মিয়ানমার। ভারত এই চুক্তি স্বাক্ষরে আগ্রহী হলেও মিয়ানমার ‘অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতা’র কথা উল্লেখ করে জানায় চুক্তি স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নিতে তাদের আরো সময়ের প্রয়োজন।মঙ্গলবার এই চুক্তি স্থগিতের কথা জানায় মিয়ানমার সরকার।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এর জন্য বিভিন্ন বিওপির পরিসীমা বরাবর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ (১ম পর্যায়) প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করবে বিজিবি। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থের পুরোটাই দেবে সরকার। ২০১৯ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ তিন দিক দিয়ে স্থলভাগের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত। সীমান্ত এলাকায় পাচারকারীরা অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, মাদক দ্রব্য, জাল মুদ্রা, স্বর্ণ, রৌপ্য ও ইলেক্ট্রনিক সামগ্রী অবৈধভাবে পাচার করে যা দেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক।
বিজিবি একটি আধা-সামরিক বাহিনী হিসেবে সীমান্ত এলাকায় সব ধরনের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ বাহিনী বর্তমানে ৫৭টি ব্যাটালিয়নের মাধ্যমে সারাদেশের সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিওপির মাধ্যমে বিজিবি সদস্যরা সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করেন। এছাড়া, অবৈধ অনুপ্রবেশে বাধা, চোরাকারবারিদের তৎপরতা রোধ, সীমান্তবর্তী সেনাদের সতর্ক রাখার লক্ষ্যে তাদের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার মাধ্যমে এ বাহিনী কাজ চালায়।
বিজিবি সূত্র জানায়, তাদের মোট বিওপির সংখ্যা ৮৪৫টি। এর মধ্যে ২৬৭টি বিওপিতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। বাকি ৫৭৮টি বিওপির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সীমানা বরাবর কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের জুন মাসে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়। প্রকল্পটির ওপর ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। পিইসি সভার সুপারিশের আলোকে প্রকল্পটির ডিপিপি পুনর্গঠন করে এ বছরের ৮ জানুয়ারি জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে পাঠানো হয়। বিভিন্ন সময় বিওপিগুলোর পরিসীমার দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রকল্পের মোট ব্যয় পিইসির সুপারিশ করা ব্যয়ের তুলনায় ৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিজিবি সূত্র জানায়, ৫৭৮টি বিওপিতে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৭১ রানিং মিটার কাঁটাতারের বেড়াসহ আনুষঙ্গিক নির্মাণ কাজ করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান এবং অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ তারই অংশ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সীমান্ত এলাকার জানমালের নিরাপত্তা অনেকংশেই নিশ্চিত হবে।
এছাড়া, গত ৪ ফেব্রুয়ারি এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সংসদকে জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ধারাবাহিক অন্প্রুবেশ ঠেকাতে বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত এলাকায় পর্যায়ক্রমে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ –মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধ, মাদকদ্রব্যসহ অন্যান্য চোরাচালান প্রতিরোধ, বিভিন্ন প্রকার সীমান্ত অপরাধ দমন এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকায় শাহপরীদ্বীপ হতে ২৭১ কি. মি. রিং রোডসহ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে- যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইয়াবা পাচার রোধে টেকনাফ অঞ্চলের জন্য সকল বাহিনীর সমন্বয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টেননাফে একটি স্পেশাল জোন করার প্রস্তাব সরকারের বিবেচনাধীন আছে।
গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের দৈনিক 'দ্য ইরাওয়াদি' দেশটির প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র ইউ জ থায়ের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে জানায়ে ,রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে বাংলাদেশের সাথে ১৭০ কিলোমিটার সীমান্তের বাকি থাকা ৪০ কিলোমিটার দ্রুত কাটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
মিয়ানমার সরকার বেড়া নির্মাণের ক্ষেত্রে নানা যুক্তির কথা বললেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ সীমান্তে জরুরি ভিত্তিতে মিয়ানমার কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্দেশ্য মূলত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তন রোধ করতে এবং তাদের রাখাইন রাজ্যছাড়া করতে। নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান চলাকালে এই কাঁটাতারের বেড়া কেটে দেওয়া হয় যাতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে যেতে পারে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। অল্প কিছু আছে তাদেরকেও বেড়া নির্মাণের আগেই অত্যাচার করে বের করে দেবে অথবা হত্যা করে ফেলবে।
রাখাইনে ১২ লাখের মতো রোহিঙ্গার বাস ছিল। এখন তার প্রায় ১০ লাখই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাকিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০০৫ সালের পর বারবার আশ্বাস দিয়েও বাংলাদেশ থেকে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমার আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত নেয়নি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ