ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 March 2018, ২৪ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৯ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নির্জন কারাগারে খালেদা জিয়ার একমাস পূর্ণ

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : বেগম খালেদা জিয়া। সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। একাধিকবারের বিরোধী দলীয় নেতা। সাবেক সেনা প্রধান ও রাষ্ট্রপতির সহধর্মিনী। দেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে যিনি ‘আপোষহীন’ হিসেবে দেশে বিদেশে স্বীকৃত। দীর্ঘ ৩৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে একাধিকবার সরকারের রোষানলে পড়েছেন। তবে সবচেয়ে বেশী ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে গত প্রায় এক যুগের শাসনামলে। এই সময়ে তিনি হারিয়েছেন তার মমতাময়ী মা ও ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে। পঙ্গুত্ব বরণ করে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে আছেন বড় ছেলে তারেক রহমান। প্রায় ৪০টি মামলা তার বিরুদ্ধে। কারাগারে যেতে হয়েছে দুই বার। প্রথমবার ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বও  সেনা-সমর্থিত অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তখন তাকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার স্পিকারের বাসভবনকে সাবজেল ঘোষণা দিয়ে সেখানে রাখা হয়েছিল। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতের এক আদেশে খালেদা জিয়া মুক্তি পান। দীর্ঘ দশ বছর পর দ্বিতীয়বার কারাগারে যেতে হয় খালেদা জিয়াকে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় তার পাঁচ বছরের কারাদ-ের রায় ঘোষণা করেন বিশেষ আদালত। ওই দিন বিকালেই তাকে রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডের পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, সরকারের নির্দেশেই আদালত খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়েছে। গতকাল বুধবার (৭ মার্চ) বিএনপি চেয়ারপার্সন ও দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাসের একমাস পূর্ণ হচ্ছে। তার মুক্তির দাবিতে বিএনপি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
দলের চেয়ারপার্সনের কারাবাসের একমাস পূর্ণের দিনে গতকাল বেগম জিয়ার সাথে দেখা করেছেন বিএনপির সিনিয়র বেশ কয়েকজন নেতা। সাক্ষাতে বেগম জিয়া কোনো উস্কানিতে পা না দিয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যেতে দলকে নির্দেশনা দিয়েছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ম্যাডাম দেশের সার্বিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। একইসাথে চলমান শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে গ্রেফতার ও আহত নেতাকর্মীদের বিষয়েও জানতে চান। তিনি সবার কাছে দোয়া কামনা করেছেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কারাগারে বেগম জিয়া ‘ সুস্থ আছেন’ তিনি (খালেদা জিয়া) দেশবাসীকে জানাতে বলেছেন, তিনি অটুট আছেন, তার শরীর ভালো আছে। দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য তিনি যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছেন। তার সাথে আলাপ করে আমরা এতোটুকু বুঝতে পেরেছি, তার মনোবল অত্যন্ত উঁচু আছে। তিনি সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিকুল পরিবেশকে মোকাবিলা করছেন। এই কারারুদ্ধ অবস্থায় তিনি দেশের জন্যই চিন্তা করছেন। সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে বলে তিনি মনে করেন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. আখতারুজ্জামান বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ডের রায় দেন। এরপর তাকে পুরনো ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়া হয়। ইতোমধ্যে নির্জন কারাগারের একমাত্র বন্দি হিসেবে খালেদা জিয়া ৩০ দিন অতিবাহিত করেছেন। শুরুতে খালেদা জিয়া ডিভিশন না পেলেও পরে আদালতের নির্দেশে ডিভিশন কার্যকর করা হয়। আবেদনের পর ব্যক্তিগত গৃহপরিচারিকা ফাতেমা বেগমকেও সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করে কারা কর্তৃপক্ষ।
বিগত এক মাসে স্বজনেরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে বার কয়েক দেখা করার সুযোগ পেয়েছেন। এর বাইরে দু’বার সাক্ষাৎ করতে পেরেছেন আইনজীবীরা। সর্বশেষ গতকাল দলের সিনিয়র নেতারা তার সাথে দেখা করেছেন। তবে প্রতিদিনই বিএনপি বা খালেদা জিয়ার অনুসারিদের মধ্যে কেউ না কেউ কারাগারে দেখা করতে আসছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি না থাকায় তারা ফিরে যাচ্ছেন।
জানা গেছে, ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে নেয়ার পরের দিন ৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা কারার সুযোগ পান তার স্বজনেরা। ওইদিন তার মেজ বোন সেলিনা ইসলাম, ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমা ও তাদের ছেলে ফায়েক ইস্কান্দার দেখা করেন।এরপর ১০ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তার আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, আবদুর রেজ্জাক খান, এজে মোহাম্মদ আলী ও ব্যারিস্টার খন্দকার মাহবুব হোসেন। পরে তারা কারাফটকে সাংবাদিকদের জানান, খালেদা জিয়ার সঙ্গে আইনি ও দলীয় বিষয়ে আলোচনা করেছেন তারা। আদালতের নির্দেশ ১১ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে ডিভিশন দেয়া হয়। ওদিনই তার সঙ্গে গৃহপরিচারিকা ফাতেমা বেগমকেও রাখার নির্দেশনা দেন আদালত।
এরপর ১৩ ফেব্রুয়ারি ওকালতনামাসহ কিছু কাগজপত্রে খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর আনতে কারাগারে যান তার আইনজীবী সানাউল্লা মিয়াসহ কয়েকজন। কিন্তু, তারা দেখা করতে পারেননি। ফলে কাগজপত্রগুলো কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়ে ফিরে আসেন তারা। ১৪ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার অনুমতি চাইতে কারাফটকে যান বিএনপিপন্থী সাত চিকিৎসক। কিন্তু, তারাও অনুমতি না পেয়ে ফিরে আসেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেন তার ছোট ছেলে মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর শাশুড়ি মোখলেমা রেজা, খালেদার ভাইয়ের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, ভাগিনা সাজিদ ইসলাম, শাহরিয়ার আখতার ও ভাতিজা মো. আল মামুন।
১৯ ফেব্রুযারি সোমবার বিকেলে রায়ের সত্যায়িত কপি হাতে পান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। বিচারক রায়ের কপি সত্যায়ন করার পর এটি খালেদার আইনজীবীদের হাতে তুলে দেন বিশেষ জজ আদালত-৫ এর পেশকার মোকাররম হোসেন। পরের দিন ২০ ফেব্রুয়ারি বিচারিক আদালতে খালেদা জিয়াকে দেয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার প্রস্তুতি নিতে দ্বিতীয় দফায় সুপ্রিম কোর্ট বারের কনফারেন্স রুমে বৈঠক করেন তার আইনজীবীরা। ২২ ফেব্রুযারি খালেদা জিয়ার সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আপিল গ্রহণ করে বিচারিক আদালতে খালেদা জিয়াকে করা অর্থদ- স্থগিতের আদেশ দেন।
একই সঙ্গে এ মামলায় বিচারিক আদালতের সকল নথি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে পাঠাতে সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশনা দেয়া হয়। এরপর জামিন আবেদন শুনানির জন্য নতুন দিন ঠিক করে দেন আদালত। ২১ ফেব্রুয়ারি ছুটির দিনে খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের স্ত্রী কানিজ ফাতেমা, ভাগ্নি অনন্যা ইস্কাদার, রাইজা ইসলাম, নাতনি শাহিনা জামান ও ভাগ্নে মো. মামুন দেখা করেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ডা. দেওয়ান মো. সালাউদ্দিন বাবুর নেতৃত্বে কয়েকজন নেতা খালেদা জিয়ার জন্য মাছ, মুরগি, মিনারেল ওয়াটারসহ হরেক রকম ফল নিয়ে যান। কিন্তু, অপেক্ষা করে তাদের শূন্য হৃদয়ে ফিরে আসতে হয়।
গত ৪ মার্চ  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকেরা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে না পেরে ফিরে যান। এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. তাজমেরি এস ইসলাম জানান, ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু, কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয়নি। পরে দেখা না করেই ফিরে এসেছি।
খালেদা জিয়ার করা জামিন আবেদনের ওপর ২৫ ফেব্রুয়ারি  শুনানি হয়। নিম্ন আদালতের নথি আসার পরে এ বিষয়ে আদেশ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন হাইকোর্ট। ফলে খালেদা জিয়ার জামিনের অপেক্ষা দীর্ঘ হয়। এ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার নওশাদ জমির বলেন, আমরা খবর পেয়েছি, নিম্ন আদালত নথি পাঠাতে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। তারা এখন সরকারি সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করছেন। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, আশা করছি আমাদের দলের প্রধান হাইকোর্টের আদেশে জামিন পাবেন।
কারা সূত্র জানায়, দুজন ডেপুটি জেলার ও চারজন কারারক্ষী খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন। একজন চিকিৎসক ও একজন ফার্মাসিস্ট তার নিয়মিত দেখাশোনা করছেন। যদিও বিএনপির অভিযোগ, খালেদা জিয়াকে কারাগারে সুচিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে গত সোমবার (৫ মার্চ) বিএনপিপন্থী চিকিৎসকেরা সাংবাদিক সম্মেলন করে তার পাঁচটি রোগ আছে বলে দাবি করেন। তারা বেগম জিয়ার সাথে একাধিকবার সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েও পাননি।
সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার কারাবাসের একমাস উপলক্ষে দোয়ার আয়োজন করা হবে। কাল শুক্রবার বাদ জুমা এই দোয়ার আয়োজন হতে পারে।  পাশাপাশি প্রতিবাদ কর্মসূচিও অব্যাহত রাখা হবে।
জানা গেছে, কারাগারে খালেদা জিয়ার সময় কাটে ইবাদত বন্দেগী আর বই ও খবর পড়ে। প্রতিদিনই তিনি খুব ভোওে ঘুম থেকে উঠেন। ফজরের নামাজ শেষে কিছু সময় তিনি কোরআন তেলোয়ানসহ ইবাদত বন্দেগী করেন। এরপর সকালের নাস্তা করেন। এরই মাঝে তার হাতে পৌঁছে যায় কয়েকটি জাতীয় পত্রিকা। তিনি সেগুলো পড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। দিনের বেশীর ভাগ সময় তিনি ইবাদত ও বই-পত্রিকা পড়ে সময় কাটান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ