ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 March 2018, ২৪ ফাল্গুন ১৪২৪, ১৯ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বরেন্দ্র অঞ্চলের গৃহস্থ পরিবারের দৈন্যদশা

বাগমারা (রাজশাহী) থেকে আফাজ্জল হোসেন: বরেন্দ্র অঞ্চল নামে খ্যাত রাজশাহীর বাগমারা ও তার পার্শ¦বর্তী এলাকায় শ্রমিক সংকট ও শ্রমিকের মজুরী অধিক হারে বেড়েছে। এতে করে কৃষক পরিবার  বোরো ধান, আলুক্ষেতসহ বিভিন্ন চাষাবাদে শ্রমিক সংকটে পড়েছে। গৃহস্থ কৃষক পরিবার অতিরিক্ত ব্যয় খরচ বাঁচাতে অধিকাংশই চাষের জমি এখন বর্গা(আদি) দিচ্ছেন। ফলে আয় কমতিতে গ্রামের গৃহস্থ পরিবার অভাব অনটনে বিপাকে রয়েছেন। কৃষকদের দাবি চাকুরীজীবিদের বেতন দ্বিগুণ, শ্রমিকের মজুরী তিনগুণ অথচ ফসলের মূল্য বাড়তি হলে সকলের মাথায় হাত রাখে। উৎপাদন খরচে গৃহস্থদের অকৃতকার্যতা নামছে তাতে দেখার কেউ নেই বলে তারা অভিযোগ করেন। বাজার ব্যবস্থার তদারকি বা মনিটরিং না থাকায় সুবিধা বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

 খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ কৃষির উপর নির্ভরশীল। যুগ যুগ ধরে ফসলি জমিতে আলু, পাট, ধান, আম ও শাক সবজিসহ বিভিন্ন ফসল ফলায়ে জীবনধারন করে। গত কয়েক বছর ধরে বাগমারা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাাকায় আলু, পাট, কপিসহ শাক সবজি পানির দামে বিক্রি চলছে। কৃষককের উৎপাদিত ফসলের মূল্য হ্রাসে উৎপাদন খরচ জুটছে না। ফলে কৃষকরা উৎপাদনে মুলধন হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষকদের ভাষ্যমতে, অসময়ে ধানের দাম বাড়লেও মওসুমে চড়া সুদের টাকা পরিশোধ করতে গোলার ধান শুন্য হয়ে পড়ে। প্রতি নিয়তই আলু, পাট, শাক সবজি ও আম নিয়ে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এতে মহাজন ও ব্যাংক ঋণের টাকায় ফসল করে ন্যায্য মূল্য না পেয়ে ভিটে মাটি বিক্রি করে নিঃশ্ব হয়ে পড়ছে। কৃষককের দাবি কৃষি উৎপাদনের প্রধান উপকরণ সার, বিদ্যুৎ ও কীটনাশকের দাম বাড়ছে প্রতি নিয়তই কিন্তু কৃষকদের কৃষি পণ্যের দাম বাড়ছে তুলনা হারে কম। গ্রামের কৃষকদের অবলম্বন কৃষি। বর্তমানে উপজেলার প্রায় অর্ধলক্ষাধিক কৃষি শ্রমিক এখন নানান পেশায় জড়িত হয়ে পড়েছেন। তাদের কেউ কেউ কৃষি কাজে শ্রম বিক্রির বদলে ভ্যান চালক, আলুর ষ্টোরের শ্রমিক, রাজমিস্ত্রী, কেউবা ভাটা শ্রমিক, আবার অনেকে মাছ উৎপাদন ও মাছ পরিবহনের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এসব কাজে অল্প শ্রম দিয়ে বেশি মজুরী পাওয়ার জন্য কৃষি শ্রমিকরা তাদের পৈত্রিক পেশা ছেড়ে এখন ভিন্ন পেশায় জড়িত হয়ে পড়েছেন। 

উপজেলার বালানগর গ্রামের কৃষি শ্রমিক মুকবুল হোসেন, আনিছুর রহমান ও হেলাল উদ্দিনসহ ১০/১২ জন শ্রমিক জানান, তারা আগে চাষাবাদের কাজে শ্রম বিক্রি করতেন। তাদের মতে, চাষাবাদে মজুরী কম এবং সময় লাগে বেশি। এছাড়া চাষাবাদে হাজিরা হিসাবেও মজুরী কম পাওয়া যায়। তবে অন্যান্য চুক্তি ভিত্তিক কাজে কম পরিশ্রম করে বেশি মজুরী পাওয়া যায়। তাদের মতে, এসব নানান কারণে দিন দিন চাষাবাদের কাজে কৃষি শ্রমিকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। এদিকে কৃষকরা বলেছেন, বর্তমান বাজারে আলুর দাম নেই বললেই চলে। গত শীত মওসুমে প্রচন্ড শৈতপ্রবাহের কারণে পানের পাতা ঝরা রোগে তাদের পান বরজের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এভাবে একের পর এক আবাদ করে কৃষকরা ক্ষতির শিকার হয়ে এখন মাজা তুলে দাঁড়াতে পারেছেন না। তার উপর আলু ও ইরি-বোরো মওসুম শুরু হওয়ায় তারা শ্রমিক সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বাড়তি মূল্য দিয়েও তারা শ্রমিক পাচ্ছেন না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে জমি আদি(বর্গা) দিয়ে দিচ্ছেন। গৃহস্থদের মতে, দিন দিন কৃষি শ্রমিকদের মজুরী বাড়তে থাকায় তাদের লাভের অংক কমে যায়। খরচ বাদ দিয়ে তখন লোকসান গুণতে হয়। 

মোহম্মাদপুর গ্রামের কৃষক জাবেদ আলী জানান, পৈত্রিক সূত্রে তাদের প্রায় বিশ একর জমি। বাপদাদার আমল থেকেই তারা কৃষক। কিন্তু বর্তমানে শ্রমিকের অভাবে তারা তাদের জমি গুলো বর্গা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দেউলিয়া গ্রামের রফিক জানান, বর্তমানে শ্রমিক পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়েছে। পাওয়া গেলেও তারা ব্যাপক মজুরী দাবী করে বসে। পরিমিত মজুরীর চেয়ে বেশী মজুরী দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে শ্রমিক মিলছে না। একই ভাবে বালানগর গ্রামের কৃষক এরশাদ আলী জানান, আলু, পান, পাটসহ বিভিন্ন ফসল আজ থেকে ১২ বছর আগে যে দামে বিক্রি হয়েছে তা এখনও বিদ্যমান। অথচ ওই সময় একজন শ্রমিক ৭০ থেকে ৮০ টাকায় মিলেছে অথচ এখন শ্রমিকের মজুরীর বেড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকাও কাজ করতে চায় না। এতে কৃষির উপর নিভর্রশীল অবহেলিত এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখের পরিমান বেড়ে নিঃশ্ব হয়ে পড়তে শুরু করেছে এমনটি মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এলাকার কৃষকদের সরকারের কাছে দাবি কৃষি উপকরণের মূল্য হ্রাস করে কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ করে কৃষকদের দুর্ভোগ কমাতে। এ প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রাজিবুর রহমান জানান, বর্তমানে ইরি-বোরো ভরা মওসুমে এই উপজেলায় শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। তার মতে কৃষি শ্রমিক না পাওয়ায় চাষাবাদও কিছুটা কমেছে। কারণ শ্রমিকের মজুরী বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেড়েছে। ফলে বিপাকে পড়েছেন চাষীরা।

কৃষি কর্মকর্তার মতে, কৃষিতে পুরোমাত্রায় যদি প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয় তবে এই সংকট অনেকাংশে কমে যাবে। এজন্য সরকার কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য কৃষকদের ভর্তুকী দেওয়া শুরু করেছেন। এতে কৃষকদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ