ঢাকা, শুক্রবার 9 March 2018, ২৫ ফাল্গুন ১৪২৪, ২০ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শাহজাদপুরে চরাঞ্চলের ফসলি জমিতে যমুনার গভীর বালি ॥ অসম্ভব হয়ে পড়েছে চাষাবাদ

শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : যমুনা নদীর কৈজুরী পয়েন্টে জেগে উঠা ধু ধু বালুচর

 

এম. এ. জাফর লিটন, শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : গভীর বালুর আস্তরণে ঢাকা পড়েছে শাহজাদপুরের যমুনার বুকে জেগে উঠা চরের হাজার হাজার একর ফসলী জমি। গত বন্যায় প্রবল স্রোতে যমুনা নদীর বালুতে তীরের ৩টি ইউনিয়নের কয়েক হাজার একর ফসলী জমি ঢেকে যায়। সরজমিনে ঘুরে ভাট দিঘুলিয়ার চর হয়ে সোনাতনী ইউনিয়নের শ্রীপুর, মাকড়ার চর, ছোট চানতাঁরা ও বড় চাঁনতারা চরের মাঝখানে বিশাল দীর্ঘ এক বালুচর লক্ষ্য করা গেছে। এই সুদীর্ঘ এবং গভীর বালু চরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের চলাচলে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বালুচরে দাঁড়ালে মনে হয় যেন একটি মরুভূমি। যমুনা চরের কয়েকটি গ্রাম উন্নয়নবঞ্চিত তাই বিস্তীর্ণ বালুচর তাঁদের অর্থনীতির জন্যও বড় বাধা। বালুচর গভীর হওয়ায় এখানে কোনরকম  চাষাবাদ করা সম্ভব হয় না। সরজমিনে ঘুরে, যমুনা অববাহিকার এসব ফসলী মাঠ চাষাবাদের অনুপযোগী বলেই মনে হয়েছে। যমুনা নদীর তীরবর্তী কৈজুরী, গালা, জালালপুর ইউনিয়নের কয়েক হাজার একর জমিতে ৩/৪ ফুট গভীর হয়ে বালুর আস্তরণ পড়েছে যার ফলে কৃষকদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

এ বছর বন্যায় শাহজাদপুরের প্রায় ১৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ সূত্রে জানা গেছে। যার কারণে আসন্ন ইরিÑবোরো চাষাবাদ বালুর আস্তরণ পড়ার কারণে ব্যাহত হওয়ার  আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রতি বছর বন্যার পরে যমুনা তীরবর্তী ফসলী জমির মাঠ বালুর আস্তরণে ঢেকে গেলেও এ বছর আরও বেশি আস্তরণ পড়েছে।

শাহজাদপুর উপজেলা নি¤œাঞ্চল হওয়ায় বছরে ইরিÑবোরো, রবি সরিসার চাষাবাদ ছাড়া অন্য কোন চাষাবাদ সম্ভব হয়না। তাই কৃষকরা বছরে দুইবার চাষাবাদ করে কৃষিখাতে খুব সাফল্য দেখাতে পারছে না। এ ছাড়াও ইরি ধান ঘরে তোলার আগেই বন্যার পানিতে ভেসে যায়। অপরদিকে যমুনা নদীর ভাঙ্গনে কয়েক হাজার ফসলী জমি কয়েক বছরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ জুড়ে বালুর আস্তরণ দেখে কৃষকদের যেন মাথায় হাত। ফলে বন্যার পানি নেমে গেলেও গভীর বালুর আস্তরণ সরাতে না পেরে চাষাবাদ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এ ব্যাপারে জামিরতা গ্রামের কৃষক জহুরুল ইসলাম জানান, তাদের জমিগুলো যমুনা তীরবর্তী হওয়ায় গভীর ঘন বালুর আস্তরণে পুরো জমি ঢেকে গেছে। মাষকালাই, খেসারী ডাল রোপন করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া রবি শস্য ধান রোপনও সম্ভব হবে না। প্রমত্তা যমুনার বুকে বানতিয়ার, সোনাতনী, ছোট চানতারা, বড় চানতারার চর, ঠুটিয়ার চর, মাকড়ার চর,বাঙ্গালার চর, রতনদিয়ার চর শাহজাদপুর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের অংশ। যাতায়াত আদিকাল  থেকে নৌকা এবং বালুচরের হাঁটা পথের ওপর নির্ভরশীল এখানকার শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যবস্থাও নাজুক। বালুচর আবাদ অনুপোযোগী হওয়ায় সেখানে কালাই, সরিষা, বাদামসহ বিভিন্ন ফসল নানা প্রতিকূলতার মধ্যে আবাদ করার পর বন্যার করাল গ্রাসে প্রতি বছরই তা বিলীন হয়ে যায়। বন্যার সময় বাড়ি-ঘরে থাকে হাঁটুসম পানি। তখন মাচা কিংবা ভেলায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করে। এছাড়া এখানকার অধিকাংশ মানুষ কর্মহীন। জীবনের প্রয়োজনে জীবিকার তাগিদে তারা রাজধানী ঢাকা, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নাটোর ও রাজশাহীতে শ্রম ফেরি করে। অনেকে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালায়। নৌকায় নদী পাড়ি দিয়ে ধু ধু বালুচর হেঁটে যেতে হয় প্রায় ৪/৫ কি. মি. দূরে চরের গ্রামগুলোতে। বড় চানতাঁরার আবুল কাশেম জানান, চরের মানুষের দুঃখ-র্দুদশার অন্ত নেই। নদী ভাঙনে আজ নিঃস্ব, রিক্ত ও অসহায়। এক সময় ঘরে গোলাভরা ধান ও সর্বদা প্রশান্তি ছিল। এখন কষ্ট আর অশান্তি অস্থি-মজ্জায় মিশে গেছে। সব হারিয়ে নানা প্রতিকূলতায় ঠুটিয়ার চরে বসবাস করে। মঞ্জুয়ারা বেগম ও জাহেদা বেগম বলেন, ‘আমগোরে দুকের শ্যাষ নাই। পোলা-পানগো লইয়া বহুত কষ্ট করতাছিলাম।’ এসব অঞ্চলে ভাঙনের ভয়ে কেউ ঘর পাকা করতে পারে না। ফলে দুর্বিষহ জীবন কাটে শাহজাদপুরের যমুনা চরবাসীর। যমুনা তীরের কৃষকদের হতাশা যেন কমছেই না প্রতি বছর বন্যার পানি এলেই কৃষকদের মধ্যে হতাশা চলে আসে। এসব বালু দ্রুত সরাতে না পারলে চাষাবাদ করতে ব্যর্থ কৃষকদের অনাহারে দিন কাটাতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ