ঢাকা, শুক্রবার 9 March 2018, ২৫ ফাল্গুন ১৪২৪, ২০ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

গণপরিবহনে নারীর ওপর যৌন নিপীড়ন

৮ মার্চ পালিত আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শিরোনামের একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। গত ৬ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত ওই গবেষণা রিপোর্টে জানানো হয়েছে, রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ৯৪ শতাংশ নারীই যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। গবেষণা জরিপে অংশগ্রহণকারীদের কাছে জানা গেছে, হয়রানি ও নিপীড়ন যে পুরুষেরা করে তাদের মধ্যে ৬৬ শতাংশের বয়স ৪১ থেকে ৬০ বছর। ষাটোর্ধ পুরুষেরাও পিছিয়ে থাকে না। তারাও সুযোগ পেলে নিপীড়ন করে। 

তবে নারীদের জন্য বেশি বিপদজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে কম বয়সী যুবক ও পুরুষেরা, যাদের বয়স ২৬ থেকে ৪০-এর মধ্যে। সাধারণ বাস বা গণপরিবহনে তো বটেই, নারীরা যৌন হয়রানির বেশি শিকার হয় টেম্পো এবং টেম্পো নামের হিউম্যান হলারে। সে কারণে ৯৬ শতাংশ নারীই এসব টেম্পো এবং হিউম্যান হলারকে সবচেয়ে অনিরাপদ বাহন মনে করে। সাধারণ বাসের পাশাপাশি রিকশা এবং সিএনজির ক্ষেত্রেও নারীদের অভিজ্ঞতা কমবেশি একই রকম। অর্থাৎ সব যানবাহনেই তাদের ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়। তারা যৌন হয়রানির শিকার হয়। যাত্রীদের পাশাপাশি রয়েছে যানবাহনের চালক, কন্ডাক্টর ও হেল্পারসহ অন্যরাও। তারাও নারীদের নির্যাতন ও উত্ত্যক্ত করে থাকে যথেচ্ছভাবে। চলন্ত বাসের ভেতরে নির্যাতন শুধু নয়, ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে মাঝে-মধ্যেই।  

এই নির্যাতন ও নিপীড়নের ধরন সম্পর্কেও তথ্য রয়েছে ব্র্যাক-এর ওই গবেষণা রিপোর্টে। ইচ্ছাকৃতভাবে শরীরে স্পর্শ করা ও চিমটি কাটা, শরীর ঘেঁষে বসা বা দাঁড়ানো, কাঁধে হাত রাখা, হাত-বুক বা শরীরের অন্যান্য স্থানে স্পর্শ করা ও চাপ দেয়ার মতো বিভিন্ন তথ্যের উল্লেখ করে রিপোর্টে জানানো হয়েছে, যৌন হয়রানি ও নির্যাতন যারা করে তারা এমনকি বাসে বা হিউম্যান হলারসহ যানবাহনে ওঠার ও নামার সময়ও অশালীন তৎপরতা চালিয়ে থাকে। 

অনেক ক্ষেত্রে বসার বা দাঁড়ানোর স্থান পরিবর্তন করতে গিয়েও নারীরা বেশি নির্যাতিত হয়। ৮১ শতাংশ নারী জানিয়েছে, সব বুঝেও তারা মানসম্মানের স্বার্থে চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়। প্রতিবাদও জানায় অনেকে কিন্তু এতে লাভের চাইতে ক্ষতিই নাকি বেশি হয়। কারণ, অন্য পুরুষ যাত্রীরা বিকৃত আনন্দের হাসি হাসে। ব্যঙ্গ-তামাশা করে। এসব কারণে গবেষণার জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের মধ্যে ২১ শতাংশ গণপরিবহনে যাতায়াত কমিয়ে দিয়েছে। যাতায়াত একেবারে বন্ধও করেছে অনেকে। তাদের বড় একটি অংশ নির্যাতনের কবল থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় হিজাব পরতে শুরু করেছেÑ যাতে সুন্দর চেহারার কারণে অসভ্য পুরুষেরা তাদের প্রতি আকৃষ্ট না হয়। এতে অবশ্য খুব একটা লাভ হয়নি। কারণ, যৌন হয়রানি যারা করে তাদের দরকার যে কোনো বয়স ও চেহারার নারী। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, যানবাহনে নির্যাতন ও হয়রানির এই খবর সকল বিচারেই অগ্রহণযোগ্য। ব্র্যাক-এর গবেষণা রিপোর্টে বেশি বয়স ও শারীরিক কারণে অক্ষমতা, অতৃপ্তি এবং স্ত্রী বা নারী সঙ্গী না থাকার মতো বেশ কিছু কারণের উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অভিমতেরও উল্লেখ রয়েছে রিপোর্টে। কিন্তু বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্যে এসেছে আইনের বিষয়টি। বলা হয়েছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও দেশে এখনো যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এর ফলে যৌন নিপীড়নসহ নারী নির্যাতন শুধু বেড়েই চলছে না, বিভিন্ন তথ্য-পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বর্তমান সরকারের আমলে নারী নির্যাতনের রেকর্ডও স্থাপিত হয়েছে। ধর্ষণ ও গণধর্ষণ থেকে হত্যা ও নানামুখী নির্যাতন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে এত বেশি ও ভয়ংকর ধরনের নির্যাতনের শিকার নারীরা অতীতে আর কখনো হয়নি। শিশুরাও যে বাদ যাচ্ছে না বরং তাদের ওপর চালানো নির্যাতনও যে ক্রমান্বয়ে আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছেÑ সে সম্পর্কেও গণমাধ্যমে মাঝে-মধ্যেই রিপোর্ট  প্রকাশিত হচ্ছে। সংক্ষপে বলা যায়, দেশে নারী নির্যাতন আসলে সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বাস্তবেও পরিস্থিতি যে অত্যন্ত ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে সে সম্পর্কেই ধারণা পাওয়া গেছে ব্র্যাক-এর এই গবেষণা রিপোর্টে। 

বলা দরকার, সবই সম্ভব হয়েছে ও হচ্ছে আসলে দেশে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে। মেয়েরা, এমনকি শিশুরা পর্যন্ত নির্বিঘেœ যাতায়াত করতে পারবে না, তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে, তারা ধর্ষণেরও শিকার হবেÑ এমন অবস্থা অবশ্যই চলতে দেয়া যায় না। শুধু তা-ই নয়, বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো লাঞ্ছিত হতে হবে, তার ওপর নেমে আসবে নির্যাতনের খড়গ এবং তাকে এমনকি গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়ারও চেষ্টা চালানো হবেÑ এসবের কোনো একটিও সভ্য সমাজের লক্ষণ নয়। এমন অবস্থার অবসান ঘটাতে হলে নির্যাতনকারী সকলের বিরুদ্ধেই আইনত ব্যবস্থা নেয়া দরকার। জনগণ এমন অবস্থার নিশ্চয়তা চায়Ñ যাতে আর কোনো নারীকেই যাতায়াতের পথে যৌন হয়রানি ও  নির্যাতনের শিকার হতে না হয়। একথা বুঝতে হবে যে, দেশে কোনো আইন না থাকায় এবং যৌন অপরাধের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে বলেই এমন ঘটনা ঘটতে পারছে। সুতরাং সবার আগে দরকার যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করাÑ যার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই সরকারের।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ