ঢাকা, রোববার 11 March 2018, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৪, ২২ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শুধু খালেদা জিয়ার মুক্তি নয় ভোট ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ আন্দোলন

খুলনা : খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির উদ্যোগে খুলনা বিভাগীয় বিশাল সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

* পুলিশ ও প্রশাসনকে দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করছে সরকার
* নিরপেক্ষ সরকার ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে মুক্ত করা হবে
* খালেদা জিয়া কোন হুমকি-ধামকির কাছে মাথা নত করবেন না
খুলনা অফিস : বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগ দেশব্যাপী লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছে। অপকর্মের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সরকার পুলিশ ও প্রশাসনকে দলীয় কর্মীর মতো ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, পুলিশ জনগণের প্রতিপক্ষ নয়, এই  ভেবে তাদের কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, জনতার স্রোত বাধা দিয়ে রোখা যায় না। সভা-সমাবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা, ১৪৪ ধারা, হামলা-মামলা ও গ্রেফতার উপেক্ষা করে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি প্রমাণ করে জনগণ আওয়ামী লীগের বিপক্ষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তিনি বলেন, এ আন্দোলন শুধুমাত্র খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য নয়, মানুষের ভোটের, ভাতের ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এ আন্দোলনে বিজয়ী হতে হলে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহবান জানান। বিএনপি  চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গতকাল শনিবার বিকেলে নগরীর কেডি ঘোষ রোডস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহবানে বলেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে জনগণ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল দেশ স্বাধীনের জন্য। আজ সেই মার্চ মাসেই গণতন্ত্র ধ্বংস করতে আওয়ামী লীগ মরিয়া হয়ে উঠেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনা ভোটে এমপি হয়েছেন। ওই সময় ভোট কেন্দ্রে কুত্তা ছাড়া কিছুই ছিলনা। তাই দেশের মানুষ ওটাকে কুত্তা মার্কা নির্বাচন বলে।
তিনি কারাগারে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে আবেগ প্রবল হয়ে বলেন, আমরা ভেবে ছিলাম তিনি হয়তবা ভেঙে পড়েছেন। কিন্তু কারাগারে গিয়ে দেখলাম, তিনি আগের মতোই তেজদ্বীপ্ত হয়ে আছেন। আমরা আবেগ প্রবল হলেও তাকে দেখেছি বজ্রের মতো কঠিন। তাকে একটি নির্জন কক্ষে রাখা হয়েছে। তার উপর চলছে প্রচন্ড মানসিক চাপ। তারপরও তিনি কোথাও মাথা নত করেননি। তিনি অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়েছেন। নির্যাতনে তার ছোট ছেলে মৃত্যু বরণ করেছেন। ওয়ান ইলেভেনের সময় বড় ছেলে তারেক রহমান পঙ্গু হয়েছেন। নয় বছর সৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলন করেছেন। কিন্তু কখনো তিনি অন্যায়ের কাছে আপোষ করেননি। এবারও তিনি কোন হুমকি-ধামকির কাছে মাথা নত করবেন না। এভাবে দীর্ঘকাল গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কোন নেতানেত্রীর ত্যাগের নজীর নেই।
তিনি বলেন, দেশনেত্রীর নির্দেশ সকল নির্যাতন উপেক্ষা করে শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
মির্জা ফখরুল বলেন, শহীদ জিয়া ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা দিয়ে দেশকে মুক্ত করেছিলেন। আজ নিরপেক্ষ সরকার ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের মাধ্যমে দেশের অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে মুক্ত করা হবে।
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১০ টাকার চাল এখন ৭০ টাকা হয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ছে লাগামহীনভাবে। এরপরেও আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা মিডিয়ার সামনে মিথ্যা বক্তব্য দিতেও লজ্জা পাচ্ছে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, আওয়ামী লীগ প্রশাসন ও পুলিশের জোরে রাজনীতি করছে। তারা বলছে, বিএনপি আন্দোলন করতে পারে না। আমরা লগি-বৈঠার আন্দোলন করতে পারি না। দেশনেত্রীর নির্দেশে সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছি। তিনি বলেন, শহীদ জিয়া বাকশাল থেকে দেশ ও জনগণকে মুক্ত করেছিল। আমরা লুটেরাদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করে গণতন্ত্র মুক্ত করবো।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, আগামীতে বিনা ভোটে আর হাসিনাকে ছাড় দেয়া হবে না। তবে, নির্বাচনের নামে এ দেশে কোন পাতানো খেলাও হবে না। তের বছরের জেল হওয়ার পরেও হাসিনার মন্ত্রীর সভায় সদস্য থাকতে পারে। তবে, মিথ্যা মামলা থেকে মুক্ত হয়ে খালেদা জিয়াও নির্বাচনের মাঠে থাকবে।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসী, ফ্যাসিস্ট দল হিসেবে পরিচিত। আমাদের জনসভার কথা শুনে সরকারের হৃদপিন্ডে কম্পন শুরু হয়েছে। যার কারণেই সকল বাধা উপেক্ষা করে জনসভায় লোকে লোকারন্নে পরিণত হয়েছে। 
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা মহানগর সভাপতি নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু ও এডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা মশিউর রহমান ও সৈয়দ মেহেদী হাসান রুমী, যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট মুজিবর রহমান সরোয়ার, প্রকাশনা সম্পাদক হাবিবুল ইসলাম হাবিব, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক সোহরাব হোসেন, কেন্দ্রীয় নেতা মাসুদ অরুণ, আমিরুজ্জামান খান শিমুল, অমলেন্দু দাস, কবির মুরাদ ও এনপিপির চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ।
বিভাগীয় বক্তাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন খুলনা জেলা বিএনপি সভাপতি এডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনা, খুলনা সিটি মেয়র মনিরুজ্জামান মনি, বাগেরহাট জেলা সভাপতি আব্দুস সালাম, নড়াইল জেলা সভাপতি জাহাঙ্গীর বিশ্বাস, চুয়াডাঙ্গা সভাপতি অহেদুল ইসলাম বিশ্বাস, সাতক্ষীরা জেলা সাধারণ সম্পাদক তারিকুল হাসান, যশোর জেলা সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট সাবেরুল ইসলাম সাবু, ২০ দলীয় জোটের নেতাদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন খুলনা মহানগর বিজেপি সভাপতি এডভোকেট লতিফুর রহমান লাবু ও মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান।
খুলনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান, নগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফকরুল আলম ও প্রচার সম্পাদক আসাদুজ্জামান মুরাদের পরিচালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন নগর বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি সাহারুজ্জামান মোর্ত্তজা, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুল হাসান বাপ্পি, শফিকুল ইসলাম তুহিনসহ মহিলা দল, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ।
হেলাল-বকুলের শো-ডাউন ঃ দুপুরের পর থেকেই নগরীর কেডি ঘোষ রোডস্থ দলীয় কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ড থেকে খন্ড খন্ড মিছিল আসতে থাকে। এর একটি বড় অংশই ছিল জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কারাবন্দী আজিজুল বারী হেলাল ও ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি রকিবুল ইসলাম বকুলের অনুসারীদের দখলে। এ সময় তারা স্লোগান দিতে থাকে ‘হেলাল-বকুলের খুলনায় শেখ হাসিনার কবর হবে’, হেলাল-বকুলের খুলনায় পুলিশের বাধা মানে না, নিষেধাজ্ঞা মানে না’। এ সময় নেতাকর্মীদের হাতে কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়া ও আজিজুল বারী হেলালের ছবি সংবলিত প্লাকার্ড শোভা পায়। এ ছাড়া আগামী নির্বাচনে খুলনা-৩ আসনে মনোনয়নের জন্য বকুলের ছবি সংবলিত প্লাকার্ড দেখা যায়। জনসভায় বক্তাদের বক্তব্যে হেলাল-বকুলের কথা উঠে অসে। যা উপস্থিতির মাঝে প্রাণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। 
জনসভা ঘিরে পুলিশের কঠোর অবস্থান : খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে খুলনায় বিএনপির বিভাগীয় জনসভা ঘিরে কড়া অবস্থান নেয় পুলিশ। শনিবার ভোর থেকে নগরীর শহীদ হাদিস পার্ক, পুরাতন যশোর রোড, পিকচার প্যালেস মোড় ও কেডি ঘোষ রোডে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাঁজোয়া গাড়ি অবস্থান নেয়।
বিএনপি নেতারা জানান, পুলিশ দলীয় কার্যালয়ের সামনের কেডি ঘোষ রোডের পশ্চিম পাশে সমাবেশের অনুমতি দিলেও সকাল থেকে সেখানে মঞ্চ তৈরি ও মাইক টানাতে বাধা দেয়। তবে দুপুর একটার পর থেকে মঞ্চ তৈরি ও মাইক টানানো শুরু হয়। এর আগে শহীদ হাদিস পার্কে একই দিন ও সময়ে বিএনপি ও মহিলা আওয়ামী লীগ জনসভা আহ্বান করায় উদ্ভূত পরিস্থিতি এড়াতে গতকাল শুক্রবার শহীদ হাদিস পার্ক ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় জনসভার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে আজ শনিবার সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত শহীদ হাদিস পার্ক ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।
মহানগর বিএনপি’র সভাপতি নজরুল ইসলাম বলেন, জনসভা ভু-ুল করতে গ্রেফতার, হয়রানি ও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ। তারা দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আতংক তৈরি করতে চাচ্ছে। তিনি বলেন, শত উসকানি সত্ত্বেও বিএনপি দলীয় কার্যালয়ের সমানে শান্তিপূর্ণ জনসভা করবে। দুপুর ৩টায় এই জনসভার কার্যক্রম শুরু হয়।
জনসভার আগে পুলিশী হয়রানির অভিযোগ ঃ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তির দাবিতে শনিবারের খুলনা বিভাগীয় জনসভাকে  কেন্দ্র করে ব্যাপক পুলিশী হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত তিন দিনে খানজাহান আলী থানা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ২৫জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এদিকে, জনসভা বানচালে নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি তল্লাশীর নামে পুলিশী হয়রানি ও পরিবারের নারী সদস্যদের সাথে দুর্ব্যবহারও করা হয়েছে।
দলীয় সূত্র মতে, বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে নগরীর খানজাহান আলী থানা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক শেখ আমজাদ হোসেন, শরিফুল আনাম, মো. আলী হোসেন, শহিদুল ইসলাম, ইউসুফ মোল্লা, আব্দুস সামাদ, জিয়া, মনির হোসেন, মো. হারুন, মো. আরিফ, সেলিম হোসেন, মো. রাশেদ, মো. আনিস, আবু জাহাদ, মো. আশিক, মো. সোহাগ মোল্লা, মো. শাহ আলম শিকদার, রফিকুল ইসলাম, মো. কামাল হোসেন, মো. পলাশ ও মো. নজরুল ইসলামকে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে।
বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা মহানগর সভাপতি নজরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘জনসভা বানচাল করতে অবৈধ সরকারের হয়ে যা যা করার দরকার, পুলিশ তাই করেছে। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও বাধা দিয়েছে। বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করছে পুলিশ। তল্লাশীর নামে ঘর-বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। এটা গণতান্ত্রিক ব্যবহার হতে পারে না। অবিলম্বে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল নেতা-কর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি। সকল বাধা-বিঘœ পেরিয়ে শান্তিপূর্ণ জনসভা সফল করায় সকলের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ