ঢাকা, রোববার 11 March 2018, ২৭ ফাল্গুন ১৪২৪, ২২ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

রাজধানীতে একের পর এক খুন ॥ সিরিয়াল কিলার আতঙ্কে নারীরা

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : রাজধানীতে দু‘দিনের ব্যবধানে চারজন নারী খুন হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন নিজ বাসাতেই খুন হন বলে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী সূত্রে প্রকাশ। অপরজনের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ের পশ্চিম নাখালপাড়ায় নিজ ফ্ল্যাটে নির্মমভাবে খুন হন গৃহকর্ত্রী আমেনা বেগম। গত মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে এই দু’দিনের ব্যবধানে চার নারী খুনের পর নারীদের ভেতরে এক অজানা আতঙ্ক শুরু হয়েছে। তারা বলছেন, ২০১৬ সালের মাঝামাঝিতে দক্ষিণখান-উত্তরখান এলাকায় একের পর এক খুন হতে থাকেন বিভিন্ন বয়সী নারীরা। সেসব খুনের ঘটনা মনে করেই তারা এখন সিরিয়াল কিলার আতঙ্কে। এদিকে, পশ্চিম নাখালপাড়ার ‘রসুল ভিলা’র গৃহকর্ত্রী হত্যার ঘটনাটি ‘পরিকল্পিত’ বলে ধারণা করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে হত্যার পেছনে পারিবারিক ও স্থানীয় কোনও দ্বন্দ্ব আছে কিনা এবং ডাকাতির উদ্দেশ্যে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
এছাড়াও দক্ষিণখানের সিরিয়াল কিলিংয়ের সঙ্গে এই ঘটনার কোনও সম্পৃক্ততা আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই তিন কারণকে সামনে রেখেই রসুল ভিলার খুনের তদন্ত‘র কাজ করছে পুলিশ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময় ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার দেখা গেছে। এরা সাধারণত সময় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে একটি বিশেষ শ্রেণির মানুষকে টার্গেট করে একই স্টাইলে খুন করে। এক্ষেত্রে খুনির সঙ্গে তার সরাসরি কোনো বিরোধ থাকে না। তার জীবনে বিশেষ কোনো ঘটনার কারণে এক শ্রেণির মানুষকে টার্গেট করে একই স্টাইলে হত্যা করে সে। বাংলাদেশে আলোচিত সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ১১ নিরীহ নারীকে ধারাবাহিকভাবে হত্যা করে। সে টঙ্গী ও সাভারের দরিদ্র গার্মেন্ট কর্মীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে চাঁদপুরের প্রত্যন্ত এলাকায় নিয়ে প্রথমে ধর্ষণ ও পরে হত্যা করত। ২০০৯ সালে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে রসু। এখন রসু খাঁ জেলবন্দী। তার বিরুদ্ধে কয়েকটি হত্যা মামলার সাজা ঘোষণা হয়েছে। অচিরেই বাকি মামলাগুলোয় সাজা ঘোষণার পর আপীল শেষে তার সাজা কার্যকর করা হবে।
দু‘দিনের ব্যবধানে চার নারী খুন : দু‘দিনের ব্যবধানে চার নারী খুন হয়েছেন। তাদের মধ্যে তিনজন নিজ বাসার মধ্যেই খুন হন। অপরজনের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার তেজগাঁওয়ের পশ্চিম নাখালপাড়ায় নিজ ফ্ল্যাটে নির্মমভাবে খুন হন গৃহকর্ত্রী আমেনা বেগম। এর আগের দিন বুধবার দারুসসালাম থানার বসুপাড়ায় ডি-ব্লকের খাল থেকে অজ্ঞাত এক নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, তাকে কোথাও খুন করে লাশ বস্তায় ভরে খালে ফেলে দেয়া হয়েছে। একই দিন কদমতলী থানার শনিরআখড়া এলাকায় নিজ বাসা থেকে শিউলি (২৮) নামে এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের স্বামী মো. রিপনকে সন্দেহ করছে পুলিশ। মঙ্গলবার দারুসসালাম এলাকার টোলারবাগের একটি ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম বেগম (৪০) নামে এক নারীর গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
দক্ষিণখানের চার হত্যার কোনো কিনারা হয়নি : ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই দক্ষিণখানের উত্তর গাওয়াইরে গৃহকর্ত্রী শাহিদা বেগমকে (৫০) খুন করে তার সঙ্গে থাকা স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায় খুনি। এ ঘটনাটিকে নিছক ডাকাতি ও পূর্বশত্রুতার জের ধরে নিয়ে চলছিল তদন্ত। এর ১ মাস পর ২১ আগস্ট পূর্ব মোল্লারটেকের তেঁতুলতলায় গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে (৫৫) একইভাবে হত্যা করা হয়। এক্ষেত্রেও পুলিশ দুটি কারণ সামনে রেখে তদন্ত শুরু করে। পরে ৩১ আগস্ট দক্ষিণ আজমপুরের এ ব্লকের একটি বাড়িতে জেবুন্নিসা চৌধুরীকে একইভাবে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায় ওই ব্যক্তি। ৮ সেপ্টেম্বর গাওয়াইরের দক্ষিণপাড়ার একটি বাড়িতে একইভাবে ওয়াহিদা আক্তারকে খুন করা হয়। গৃহকর্ত্রী জেবুন্নিসা দেড় বছর চিকিৎসাধীন থাকার পর সম্প্রতি মারা গেছেন। দেড় মাসের ব্যবধানে একই স্টাইলে চারটি খুনে নড়েচড়ে বসে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। দক্ষিণখানে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করে। এমনকি বাড়িভাড়া দেয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাইকিং করা হয় সে সময়। কিন্তু সেই সিরিয়াল কিলার এখনও অধরা।
দক্ষিণখান থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা বলেন, আমরা এখনও সেই কিলারকে শনাক্ত করতে পারিনি। তাকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে আমরা কাজ করছি।
এসব হত্যার তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, খুনি মানসিক বিকারগ্রস্ত এ বিষয়ে আমরা অনেকটাই নিশ্চিত। তার টার্গেট সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে। খুনির জীবনে হয়তো এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে যে কারণে ধনাঢ্য পরিবারের নারীদের হত্যা করছে।
নাখালপাড়ায় হত্যায় ৩ কারণ : পশ্চিম নাখালপাড়ার ‘রসুল ভিলা’র গৃহকর্ত্রী হত্যার ঘটনাটি তিন কারণে ঘটতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ। তাদের ধারণা ‘পরিকল্পিত’ হত্যাকা- এটি। তবে হত্যার পেছনে পারিবারিক ও স্থানীয় কোনও দ্বন্দ্ব আছে কিনা এবং ডাকাতির উদ্দেশ্যে এই হত্যাকা-টি ঘটেছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এছাড়াও দক্ষিণখানের সিরিয়াল কিলারের সঙ্গে এই ঘটনার কোনও সম্পৃক্ততা আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তেজগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সেন্টু মিয়া বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, এটি পরিকল্পিত হত্যাকা-। তবে হত্যার কারণ সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত নই। পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে।’
জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৮ মার্চ) দুপুরে তেজগাঁওয়ের পশ্চিম নাখালপাড়ার এক বাড়িতে বাসা ভাড়া নেয়ার কথা বলে ভেতর ঢুকে গৃহকর্ত্রী আমেনা বেগম (৬৫)’ কে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে ওই গৃহকর্ত্রীর গলার চেন ও হাতে থাকা স্বর্ণের চুড়ি খুলে নিয়ে যায় তারা। এই ঘটনায় নিহতের ছোট ছেলে রাসেল আহমেদ বাবু বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামী করে তেজগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন।
এ ঘটনার তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- বাসা ভাড়া নিতে এসে আমেনা বেগমকে হত্যা করা হয় এবং নিহতের গলার চেন ও হাতে থাকা স্বর্ণের চুরি হত্যাকারী নিয়ে গেছে। এটি ডাকাতিজনিত ঘটনাও হতে পারে। তবে তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা ধারণা করছি, বাড়ির মালিক সম্পর্কে হত্যাকারী আগে থেকে খোঁজখবর নেয় এবং হত্যার উদ্দেশ্যে আগেই ঘটনাস্থল রেকি করেছিল। এখন পর্যন্ত হত্যাকারী সম্পর্কে কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি।’
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থলের আশপাশের কোনও বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। এই গলির মুখেও কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই। গলির সামনে কয়েকটি দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকলেও সেগুলো বন্ধ অথবা অচল অবস্থায় পাওয়া গেছে। এছাড়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। গলির মুখে ও সামনে কোনও সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় ঘটনার দিন দুপুরে এই গলিতে কে বা কারা প্রবেশ করেছিল, তা বলা যাচ্ছে না। এতে হত্যার কারণ ও আসামী শনাক্তে বেগ পেতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেজগাঁও পশ্চিম নাখালপাড়ার লুকাস মোড় থেকে রেল ক্রসিং গেট পর্যন্ত এলাকায় নিহত আমেনা বেগমের ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনরা বসবাস করেন। ষাটের দশক থেকেই তারা এই এলাকার প্রভাবশালী পরিবার হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয়রা আরও জানান, আমেনা বেগমের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেনও ঝামেলা নেই। কোনোদিন কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদ করতেও দেখিনি।
নিহতের ছোট ছেলে রাসেল আহমেদ বাবু বলেন, ‘বাবার মৃত্যুর পর এই বাড়ির সবকিছু আমার মা দেখাশোনা করতেন। মা কিংবা আমাদের সঙ্গে কারও কোনও শক্রতা ছিল না।’
রসুল ভিলা’র আশপাশের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছরের শুরুর দিকে বাসায় নিচতলার এক ভাড়াটিয়ার কাছে স্থানীয় কিছু যুবক এসে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। পরে বিষয়টি বাড়ির মালিককে জানানো হলে ওই চাঁদাবাজদের আটকে করা হয় এবং বিচার-সালিশের মাধ্যমে নিহত আমেনার আত্মীয় স্বজনরা বিষয়টি মীমাংসা করেছিল।
এ ঘটনার ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও তেজগাঁও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আমিনুল বলেন, ‘সব দিক বিবেচনা করেই এই হত্যাকা-ের তদন্ত করা হচ্ছে।’
দক্ষিণখানের চারটি খুনে সিরিয়াল কিলার রসু খাঁর মতো বিকৃত মানসিকতার খুনি জড়িত ধরেই চলছে তদন্ত। কিন্তু দেড় বছরেও সেই খুনিকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এতদিন পর তেজগাঁওয়ে একই স্টাইলে গৃহকর্ত্রী খুনের ঘটনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের। তাদের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সেই সিরিয়াল কিলার কি দীর্ঘ বিরতির পর আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে? যদি তাই হয় তবে বিষয়টি ব্যাপক উদ্বেগের। এ হত্যাকা-ের পর তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষিণখানের চারটি হত্যাকা- একই ব্যক্তি করেছে। সেই খুনের স্টাইলের সঙ্গে তেজগাঁওয়ের স্টাইলের পুরোপুরি মিল দেখা যাচ্ছে। এই কারণে এ হত্যায় সেই কিলার জড়িত বলে সন্দেহ জোরালো হচ্ছে।
দক্ষিণখানের হত্যাকা- বিশ্লেষণ করে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ওই যুবক কিলারের বয়স ২৩ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে। উচ্চতা প্রায় ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি। গায়ের রং ফর্সা। মাথার চুল ছোট। ফরমাল পোশাক ও কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে বাড়ি ভাড়া নিতে আসত সে। গৃহকর্ত্রীর সঙ্গে ফ্ল্যাট দেখতে যাওয়ার পর পেছন থেকে গৃহকর্ত্রীর মাথা ও ঘাড়ে চাপাতি দিয়ে কোপ দিয়ে হত্যা করত। তারপর স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যেত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ