ঢাকা, সোমবার 12 March 2018, ২৮ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৩ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আন্তর্জাতিক নদী দিবস এবং প্রমত্তা পদ্মার শীর্ণ দশা

আশিকুল হামিদ : আগামী ১৪ মার্চ বিশ্বের দেশে দেশে আন্তর্জাতিক নদী দিবস পালিত হবে। ছোট-বড় সকল নদ-নদীকে প্রাকৃতিক নিয়মে চলমান থাকতে দেয়া, বাধাগ্রস্ত না করা এবং কোনো নদ-নদীকে বিলীন না করে ফেলাই দিবসটির মূল সুর ও উদ্দেশ্য। সেদিক থেকে ‘নদীমাতৃক’ বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের আসলে আনন্দিত ও উজ্জীবিত হওয়ার কথা। অন্যদিকে বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত এবং নৈরাশ্যজনক শুধু নয়, ভীতিকরও। কারণ, কয়েকটি মাত্র নদ-নদী এখনো কোনোভাবে চলমান তথা বেঁচে থাকলেও বেশিরভাগই ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কোনো একটি নদ-নদীকেই এখন আর চলমান বা বহমান বলার উপায় নেই। আগের অবস্থায় তো নেই-ই।
প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেয়ার জন্য এককালের প্রমত্তা নদী পদ্মার কথা বলা যায়। মাত্র দশক তিন-চারেক আগেও যে পদ্মার এক কূল থেকে আরেক কূল দেখা যেতো না, ঢেউয়ের পর ঢেউ এসে তীরে আছড়ে পড়তো এবং শিশু-কিশোররা দূরে থাকুক, যুবক ও বয়স্ক জেলে ও কৃষকরা পর্যন্ত তীরের ধারে-কাছে যাওয়ার সাহস পেতো না, সে প্রমত্তা পদ্মার দশাই এখন অতি শীর্ণ হয়ে পড়েছে। এখন আর কোনো কবি ও গীতিকার ‘পদ্মার ঢেউরে’ দিয়ে কবিতা বা সংগীত লেখা শুরু করার কথা চিন্তা করতে পারেন না। বেশ কয়েক বছর ধরে শুকনো মওসুম শুরু না হতেই পদ্মা সরু খালে পরিণত হচ্ছে। মাত্র ক’দিন আগে গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক সচিত্র রিপোর্টে জানানো হয়েছে, রাজশাহীর গোদাগাড়ি থেকে কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর মুখ পর্যন্ত দীর্ঘ এলাকাজুড়ে পদ্মা অনেকাংশে মৃত নদীর রূপ নিয়েছে। ভারত ফারাক্কাসহ অসংখ্য বাঁধের পাশাপাশি যথেচ্ছভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার ফলে এবং ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি না পাওয়ার ফলে পদ্মার কোথাও পানি নেই বললেই চলে। একযোগে বিস্তার ঘটেছে অসংখ্য চরের। পদ্মার দুই তীর ঘেঁষে এখন শত শত চর।
শুধু তা-ই নয়, পানি না থাকায় হার্ডিঞ্জ পয়েন্টে ১৫টি পিলারের মধ্যে ১২টিই দাঁড়িয়ে আছে শুকনো চরের মধ্যেÑ মূল নদীর অনেক বাইরে। যে তিনটি মাত্র পিলার সামান্য পানির মধ্যে রয়েছে সেখানেও আশপাশের কৃষকরা চাষাবাদ করছে। খন্ড খন্ড অনেক ক্ষেতের ছবিসহ রিপোর্টটিতে বলা হয়েছে, ফসলের সমারোহ এখন সেই পদ্মার বুকজুড়ে, যা এককালে ছিল ‘প্রমত্তা’। শুকনো মওসুম শুরু হতে না হতেই মাইলের পর মাইল জুড়ে চর পড়েছে। পদ্মা পরিণত হয়েছে অতি সরু একটি খালে। বাংলাদেশে প্রবেশের আগে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেয়ার ফলেই এমন করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পদ্মাই শুধু নয়, এর শাখা-প্রশাখাসহ ৩৬টি নদ-নদীও শুকিয়ে গেছে। এগুলোর কোনো কোনোটিকে এমনকি খালও আর বলার উপায় নেই। চাষাবাদ তো করা হচ্ছেই, এসবের ওপর দিয়ে ভারি যানবাহনও চলাচল করছে। পদ্মার বিভিন্ন স্থানে পানির পরিমাণও এত কম যে জেলেরা এমনকি নিজেদের খাবার মতো মাছই ধরতে পারছে না। অর্থাৎ পদ্মা তার স্বরূপ খুইয়ে ফেলেছে।
বলা দরকার, সবকিছুর পেছনে রয়েছে ভারতের প্রতারণা ও পানি আগ্রাসন। ফারাক্কার পাশাপাশি নানা নামের অসংখ্য বাঁধ বা ব্যারাজ এবং জঙ্গিপুরের কাছে নির্মিত ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। ফারাক্কা পয়েন্টের প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি চলে যাচ্ছে হুগলি ও ভাগিরথি নদীতে। একযোগে ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ ও বিহারের প্রায় চারশটি পয়েন্ট থেকে পানি সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। এছাড়া ১৩ হাজার ছয়শ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে তিনটি বৃহদাকার ক্যানেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে দেশটি। এই ক্যানেল তিনটিতেও পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের আগে গঙ্গার তথা বাংলাদেশের পদ্মার ৯০ শতাংশ পানিই অবৈধভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত। এভাবে চলতে থাকলে ন্যায্য হিস্যা দূরে থাকুক, বাংলাদেশ এক সময় পানিই পাবে না। পদ্মাও হারিয়ে যাবে ইতিহাসের অন্ধকারে। কিন্তু সবকিছু জানা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার ভারতের কাছে প্রতিবাদ যেমন জানাচ্ছে না তেমনি চাপ দিচ্ছে না পানির ন্যায্য হিস্যার জন্যও। সরকারের দিক থেকে এমন অবস্থার সুযোগ নিয়ে এবছরও ভারত চুক্তি লংঘন করেছে এবং বাংলাদেশকে ৩৩ হাজার কিউসেক কম পানি দিয়েছে। সে কারণে পদ্মা তো বটেই, দেশের অন্য ৫৪টি নদ-নদীও শুকিয়ে গেছে।
পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় মাওয়া থেকে ক্যাওড়াকান্দি পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌপথে যাতায়াতের সময় একটি-দুটি নয়, কয়েকটি পর্যন্ত স্থানে প্রতিদিনই যাত্রী ও যানবাহনসহ ফেরি আটকে পড়ছে। আটকে থাকতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তারপর কয়েক ঘণ্টা লাগছে ড্রেজিং করে ফেরিগুলোকে আবারও চালু করতে। এ অবস্থায় পড়তে হচ্ছে খুলনা, বাগেরহাট, ফরিদপুর, মাদারিপুর, কুষ্টিয়া এবং বরিশালসহ বহু এলাকার মানুষকে, যারা মাওয়া-ক্যাওড়াকান্দি এবং নগরবাড়ি-দৌলতদিয়া হয়ে যাতায়াত করেন। সেই সাথে রয়েছে শত শত পণ্যবাহী যানবাহনও। ফলে সব মিলিয়েই বাংলাদেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে।
ওদিকে যারা যাতায়াত করেন তাদের সকলকেই পদ্মার করুণ দশা দেখে বিস্মিত ও দুঃখিত হতে হয়। পানি কমতে কমতে পদ্মা এতটাই রুগ্ন, শীর্ণ ও অগভীর হয়ে পড়েছে তা ভাবতে পারেন না সচেতনজনেরা। অভিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, বহুস্থানে চরই শুধু পড়েনি, কোনো কোনো চর রীতিমতো বসবাসযোগ্যও হয়ে উঠেছে। বহু পরিবার ওইসব চরে গিয়ে বাসাবাড়ি বানিয়ে বসবাস করতেও শুরু করেছে। সে কারণে চলছে চর দখলের প্রতিযোগিতা। উল্লেখ করার মতো দ্বিতীয় বিষয়টি পানির গভীরতা। ফেরি চলাচল করার জন্য মাত্র ছয়-সাত ফুট গভীরতা দরকার। সেটাও এখন নেই পদ্মার বেশির ভাগ স্থানে, যার জন্য যখন-তখন ডুবোচরে আটকে পড়ছে ফেরিগুলো। বেশ কিছু এলাকায়  পদ্মার বুকে ৪০/৫০ ফুট পর্যন্ত ভেতরে এসে ছেলে-মেয়েরা সাঁতার কাটছে, বয়স্করা কোমর পানিতে গোসল করছে। অর্থাৎ সব মিলিয়েই এককালের প্রমত্তা পদ্মা এখন খাল-বিলের পর্যায়ে নেমে এসেছে।
একটি নদীর জন্য এর চাইতে করুণ পরিণতির কথা কল্পনা করা যায় না। বলা বাহুল্য, এর পেছনে রয়েছে ইতিহাস। সে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত সত্য হলো, ভারতকে প্রথমে সুযোগ দিয়েছিল স্বাধীনতা পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, সে চুক্তির ভিত্তিতেই ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল ভারত। কথা ছিল, ফারাক্কা বাঁধ সম্পূর্ণরূপে চালু করার আগে শুষ্ক মৌসুমে প্রাপ্ত পানির পরিমাণ নিয়ে উভয় পক্ষ যাতে সমঝোতায় আসতে পারে সে উদ্দেশ্যে ভারত প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে ফিডার ক্যানেল চালু করবে। সে অনুসারে ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ৪১ দিনের জন্য ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল। কিন্তু ৪১ দিনের পরও ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি না করেই ১৯৭৬ সালের শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গার পানি হুগলি নদীতে নিয়ে যায়। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে ফিডার ক্যানেল চালু করার পর হার্ডিঞ্জ ব্রিজের নিচে পদ্মায় পানি প্রবাহ যেখানে ছিল ৬৫ হাজার কিউসেক সেখানে ১৯৭৬ সালে তার পরিমাণ নেমে আসে মাত্র ২৩ হাজার ২০০ কিউসেকে। এর প্রধান কারণ ছিল ফিডার ক্যানেল দিয়ে ভারতের যথেচ্ছ পরিমাণে পানি প্রত্যাহার।
এভাবেই শুরু হয়েছিল ভারতের পানি আগ্রাসন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ভারত আবারও সুযোগ নিয়েছিল। সে বছরের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পর, ১৯৯৭ সালের মার্চেই ভারত তার পানি আগ্রাসনকে আরো প্রচন্ড করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী মার্চের প্রথম ও দ্বিতীয় ১০ দিনের চক্রে বাংলাদেশের প্রাপ্য যেখানে ছিল ৩৫ হাজার কিউসেক, ভারত সেখানে দিয়েছিল গড়ে ২১ হাজার কিউসেক। সর্বনিম্ন পরিমাণ পানি পাওয়ার রেকর্ডও স্থাপিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালের মার্চেই- ২৭ মার্চ বাংলাদেশ পেয়েছিল মাত্র ছয় হাজার ৪৫৭ কিউসেক। এমন অবস্থার কারণ, ৩০ বছর মেয়াদী চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ না রাখার পরিপূর্ণ সুযোগ নিয়েছিল ভারত। একই চুক্তির আড়াল নিয়ে ভারত এখনো পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশকে পানি বঞ্চিত করে চলেছে। এজন্যই এককালের প্রমত্তা পদ্মা শুকিয়ে একটি খালে পরিণত হয়েছে।
ভারতের এই পানি আগ্রাসনের ফলে বাংলাদেশকে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হচ্ছে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশ হারিয়েছে ৬৮ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে কৃষিরও। অথচ এভাবে চলতে পারে না। সরকারের উচিত বিশেষ করে ১৯৯৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী হিস্যা আদায়ের চেষ্টা করা। ভারত সম্মত না হলে সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে। ভারত শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে আসায় ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক আইনে ভাটির দেশকে পানিপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা অপরাধ। কিন্তু ভারত শুধু বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্তই করছে না, বাংলাদেশকে পানি-প্রতিবন্ধী রাষ্ট্র বানানোরও পদক্ষেপ নিয়েছে- যা আন্তর্জাতিক আইনে এক গুরুতর অপরাধ। এজন্যই মামলা দায়েরের মাধ্যমে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা দরকার, যাতে পদ্মা একেবারে হারিয়ে না যায়। একই কথা সত্য অন্য অন্তত ৫৪টি নদ-নদী সম্পর্কেও- যেগুলোও ভারতের পানি আগ্রাসনের শিকার হয়ে ইতিহাসের বিষয়ে পরিণত হতে চলেছে। এসব নদ-নদীর ব্যাপারে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা দরকার। ভারত কূটনৈতিক পর্যায়ে সম্মত না হলে সরকারের উচিত বিষয়টি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে উপস্থাপন করা। বাংলাদেশের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এটাই হোক এবারের আন্তর্জাতিক নদী দিবসের প্রধান চিন্তা ও সিদ্ধান্ত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ