ঢাকা, বুধবার 14 March 2018, ৩০ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৫ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নেপালে বিমান দুর্ঘটনা

গত সোমবার নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরণের সময় বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলার একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। বিমানটিতে পাইলট ও ক্রুসহ ৭১ জন যাত্রী ছিলেন। সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, নারী কো-পাইলট এবং ৫২ জনের মৃত্যু ঘটেছে। প্রথমে বেঁচে গেলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন পাইলট আবিদ সুলতানও। বিমানটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। নেপাল সরকার হতাহতদের উদ্ধার এবং চিকিৎসার পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এবং ইউএস-বাংলার পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু গেছেন। নেপাল সরকার এবং দেশটির সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষও তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছে। এরই মধ্যে বিধ্বস্ত বিমানটির ব্ল্যাক বক্স উদ্ধার করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ব্ল্যাক বক্সের মাধ্যমে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব হবে।
এদিকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু হতে না হতেই দুর্ঘটনার সম্ভাব্য কারণ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়ে গেছে। বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলার কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারে কর্মরতদের ভুল ও বিভ্রান্তিকর নির্দেশনার কারণেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। অন্যদিকে নেপালের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানের পাইলট নাকি ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশনা অমান্য করে ভুল দিক থেকে অবতরণের চেষ্টা করেছিলেন। আর সে কারণেই বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। কন্ট্রোল টাওয়ারের এই বক্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের পাইলটসহ তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, নিহত ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ পাইলট ছিলেন। তিনি অন্য বিভিন্ন বিমান সংস্থার পাইলটদের প্রশিক্ষণ দিতেন। সুতরাং তার দিক থেকে কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশনা অমান্য করা এবং ভুল দিক থেকে বিমান অবতরণ করানোর চেষ্টা করার প্রশ্ন উঠতে পারে না। তাছাড়া পাইলট এবং কন্ট্রোল টাওয়ারে দায়িত্ব পালনরতদের কথোপকথনের যে রেকর্ড ইউটিউবের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তার পর্যালোচনাতেও পরিষ্কার হয়েছে, পাইলটের কোনো ভুল ছিল না। বাস্তবে কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশনাই ছিল অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। একবার দক্ষিণ দিক থেকে অবতরণের নির্দেশনা দেয়ার পর মুহূর্তে আবার উত্তর দিক থেকে অবতরণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই আবার একই দক্ষিণ দিক থেকে অবতরণের নির্দেশনা গিয়েছিল কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে। একেবারে শেষ মুহূর্তে কন্ট্রোল টাওয়ার বলেছিল, বিমানের অবতরণ ঠিকভাবে হচ্ছে না। কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার তা ঘটে গেছে। বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে।
বিমানের পাইলট এবং কন্ট্রোল টাওয়ারের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝিকে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে সামনে এনে পাইলটের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করা  হলেও আমরা বিষয়টিকে গুরুতর মনে করি। কারণ, ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানের মতো দক্ষ ও অভিজ্ঞ একজন পাইলটের পক্ষে কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশনা উপেক্ষা করে ভুল দিক থেকে অবতরণের চেষ্টা চালানো সম্ভব হওয়ার কথা নয়। ভুল অবশ্যই কন্ট্রোল টাওয়ারের হয়েছিল। মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে দিক পরিবর্তন করতে বলা এবং মুহূর্তের মধ্যে আবার উল্টো দিক থেকে অবতরণ করতে বলার মাধ্যমে কন্ট্রোল টাওয়ারে কর্মরতরাই দুর্ঘটনাকে অনিবার্য করে তুলেছিল কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে দরকার বিমানটির অবস্থা সম্পর্কেও অনুসন্ধান করা। এতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল কি না অথবা বিমানটি আদৌ চলাচলের জন্য উপযোগী ছিল কি না সে সম্পর্কেও তদন্ত করতে হবে।  প্রসঙ্গক্রমে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সম্পর্কিত কিছু তথ্যের উল্লেখ করা দরকার। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত নেপালের ওই একই বিমান বন্দরে ৭০টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিশ্বের কোনো একটি মাত্র বিমান বন্দরে এত বেশি দুর্ঘটনা কখনো ঘটেনি। অথচ এটা মোটেও ব্যস্ত কোনো বিমান বন্দর নয়। খুব স্বল্পসংখ্যক বিমানই এখানে যাতায়াত করে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই দুর্ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চারদিকে উঁচু পাহাড় ঘিরে থাকায় উড্ডয়ন এবং অবতরণের উভয় সময়ই প্রচন্ড ঝুঁকি থাকে। তাছাড়া বিমান বন্দরের একমাত্র রানওয়েটিও সমান বা মসৃণ নয়। এর শুরু ও শেষের অংশ ভূমির কাছাকাছি স্তরে থাকলেও মাঝখানের বড় একটি অংশ উঁচু-নিচু এবং অসমান। সে কারণে সাবলীলভাবে উড্ডয়ন যেমন করা যায় না তেমনি অবতরণ করাও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ ব্যাপারে দেশটির সরকার এবং সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশসহ নেপালে আকাশ পথে যাতায়াতকারী সকল দেশ তো বটেই, আন্তর্জাতিক পরিবহন সংস্থাও বিভিন্ন সময়ে কথা বলেছে। নেপালকে তার বিমান বন্দরের সংখ্যা বাড়ানোর এবং ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরকে নিরাপদ করে তোলার লক্ষ্যে পদক্ষেপ নেয়ারও তাগিদ দেয়া হয়েছে। কিন্তু নেপালের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। সেজন্যই ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এখনো ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপদজনক অবস্থায় রয়ে গেছে।
আমরা আশা করতে চাই, সোমবারের মর্মান্তিক ও ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর নেপাল সরকার এবং দেশটির সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ বিমান বন্দরের ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে উঠবে। নেপাল চাইলে বিভিন্ন রাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থাও নিশ্চয়ই ঋণ দেয়াসহ সকল প্রকারে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে। নেপালের উচিত এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা। কারণ, বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত হিমালয়ের অবস্থান নেপালে। তাছাড়া প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণেও নেপাল পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় একটি দেশ। সেখানে সারা বছরই হাজার হাজার পর্যটক যাতায়াত করেন। পর্যটন দেশটির অর্থনীতির তথা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসও। একই কারণে বিমান বন্দরের আধুনীকায়ণ ও উন্নয়ন করা নেপালের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।
আমরা কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত বিমানের নিহত সকল যাত্রীর জন্য শোক প্রকাশ করার পাশাপাশি তাদের স্বজনদের জানাই গভীর সমবেদনা। যারা আহত হয়েছেন তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব শুধু ইউএস-বাংলা বিমান সংস্থার নয়, উভয় দেশের সরকারেরও। আমরা আশা করতে চাই, নিহত ও আহত সকলের পরিবারকেই আইনত প্রাপ্য ক্ষতিপূরণের অর্থ বুঝিয়ে দেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ