ঢাকা, বুধবার 14 March 2018, ৩০ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৫ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশের গণতন্ত্র আজ সংকটে

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : বাংলাদেশের গণতন্ত্র সন্ধিক্ষণে। এখানে বিরোধীদের গণতান্ত্রিক কোনো অধিকারই নেই। এমন মন্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, সরকারি দল রাস্তা অবরোধ করে হরহামেশা সভা-সমাবেশ করলেও প্রতিপক্ষের বেলায় তা অনুপস্থিত। শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন বা অবস্থান কর্মসূচিতেও ব্যাপক লাঠিচার্জ এমনকি টিয়াসেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। এমনকি ঘরোয়া আলোচনাও চলতে পারছে না। সেখানেও গ্রেফতার অভিযান চলছে। এক কথায় সরকারের সমালোচকরা কোথাও কর্মসূচি পালন করতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নয়নশীল দেশে মিছিল-মিটিং ছাড়া গণতন্ত্রের উন্নয়ন কখনোই সম্ভব নয়। যেখানে গণতন্ত্রের গোড়াপত্তন মাত্র সমৃদ্ধির পথে সেখানে মিছিল-মিটিং ছাড়া সেটি টিকে না। তারা বলছেন, এখানে পদে পদে অধিকার লংঘনের ঘটনা ঘটছে। আইনের শাসন অনুপস্থিত। বিচারবিভাগ সরকারের নিয়ন্ত্রণে। মানুষের মৌলিক ও মানবিক অধিকার নেই। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার নেই। রাজনীতিবিদদের কঠোর হাতে দমন করা হচ্ছে। একদিকে সরকার বলছে, কারো রাজনৈতিক কর্মকান্ডে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না। অথচ সোমবার জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমানসহ দলটির সিনিয়র বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর আগে সংগঠনটির আমীর ও সেক্রেটারি জেনারেলসহ সিনিয়র অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের অপরাধ, তারা রাজনীতি করেন। দেশের গণতন্ত্র ও জনগণের ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করছেন। গ্রেফতারের সময় তারা সবাই নিয়ম মেনেই রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করছিলেন। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, এভাবে কন্ঠরোধ বা গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন কি করে হবে?
বিএনপির গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাধা দেয়া হবে না। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন ঘোষণা দেয়ার মাত্র একদিনের মাথায় বিএনপির শান্তিপূর্ণ কালোপতাকা কর্মসূচিতে নির্মমভাবে নেতাকর্মীদের বেধড়ক লাঠিপেটা এবং জলকামান নিক্ষেপ করার ঘটনা ঘটিয়েছে পুলিশ। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চলাকালে হঠাৎ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেভাবে টেনেহিঁচড়ে সিনিয়র নেতাদের গ্রেফতার করলো তা ইতিহাসে নজিরবিহীন ও কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। হামলার ঘটনার পরের দিন আগের বক্তব্য থেকে সরাসরি ইউটার্ন করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যা করা দরকার তাই করেছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিএনপিকে লক্ষ্য করে বলেছেন, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করলে ঘরে বা অফিসে করুন। অথচ তার নিজ দল আওয়ামী লীগ গত ৭ মার্চ ঢাকার রাজপথ দখলে নিয়ে সমাবেশ করেছে। পুরো রাজধানীকে অচল করে দেয়া হয়েছিল। মানুষের দুর্ভোগ ছিল সীমাহীন। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার একদিকে বিরোধী দলগুলোকে কর্মসূচি পালনের কথা বলছে। কিন্তু বাস্তবে তাদের সভা-সমাবেশের ন্যূনতম কোনো অধিকার নেই। এমনকি শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন, পতাকা প্রদর্শন, অনশনের মতো কর্মসূচিও পালন করতে দেয়া হচ্ছে না।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠা প্রকাশ করেছেন কেএস ভেঙ্কটাচালম। তিনি একজন কলামিস্ট ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার। দ্য ডিপ্লোম্যাটের মতামত কলামে এক প্রতিবেদনে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র সন্ধিক্ষণে। ভেঙ্কটাচালম লিখেছেন, বাংলাদেশে দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আধিপত্য। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে অখ্যাত কোন তৃতীয় দলের চ্যালেঞ্জ করাটা কার্যত অসম্ভব। খালেদা জিয়ার দ-কে কেন্দ্র করে যদি বিএনপির সম্ভাবনা ধূলিসাৎ হয়, তাহলে বাংলাদেশ ডি-ফ্যাক্টো এক-দলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গত কয়েকবছর ধরে গোটা দেশকে সত্যিকার অর্থেই রাজনৈতিক বিবর্জিত করে ফেলা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো অধিকার নেই, রাজনৈতিক নেতাদেরকে মিথ্যা মামলায় হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে, কারাগারে নেয়া হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের কোনো অধিকার বলতে কিছু নেই। তিনি অভিযোগ করে বলেন, তারা (সরকার) যেহেতু তাদের সমালোচনার অধিকার বন্ধ করে দিচ্ছে, যেহেতু তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবার অধিকার ও রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছে। সরকার ত্রাস ও ভীতি ছড়িয়ে আজকে তারা সারা দেশে একদলীয় শাসনকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা নিজেরাই থাকবে, অন্য কেউ থাকবে না এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, আমরা গণতন্ত্রের স্বীকৃত বিরোধী দলের অধিকারগুলো প্রয়োগ করতে চাই। সভা-সমাবেশ বিরোধী দলের সার্বজনিন অধিকার। এটি কোনো বেআইনি কর্মসূচি নয়। তিনি জানান, ক্ষমতাসীন দল পুরো রাস্তা দখল করে মিছিল করছে, সেটা আইনি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও তার আশে-পাশে মিছিল করছে সেটা আইনি। আর আমরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে জনসভা করবো সেটা নাকি বেআইনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, জনসভা করার, সমাবেশ করার যে অধিকার আমাদের সংবিধানে রয়েছে, সেই অধিকার বাস্তবায়ন আমরা দেখতে চাই। কিন্তু সেটি আজ অনুপস্থিত। এই সরকার গণতন্ত্রের সবগুলো স্তম্ভকে ভেঙ্গে তছনছ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনেও সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে সমাবেশস্থলে আক্রমণ করছে। দলের নেতাকর্মীদের টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে আটক করা হয়। যা বর্তমান দুঃশাসনের মধ্যেও এক ভয়ঙ্করতম কালো অধ্যায়।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র মানে বিক্ষোভ-সমালোচনা। গণতন্ত্র মানে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাসীন দলের একতরফা বলে যাওয়া নয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পাবলিক প্রপার্টি, এটি কোন ব্যক্তি, দল বা জোটের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা সম্পত্তি নয়। সেখানে যদি আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টিসহ মহাজোটের অন্যান্য দল সমাবেশ করতে অনুমতি পায়, তাহলে বিএনপিসহ বিরোধী দলকে জনসভা করতে না দেয়া ক্ষমতাসীনদের হুংকারসর্বস্ব রাজনীতিরই প্রতিফলন।
গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও। অনেকেই বলছেন, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ। যদি এ উত্তরণের পক্ষে-বিপক্ষে রয়েছে নানাজনের নানা মত। উন্নয়নশীলতার চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সামনে উন্নয়নশীল দেশে উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোকপাত করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। গত শনিবার এক সভায় তিনি বলেন, দেশে সুশাসন থাকলে উত্তরণ সুযোগ হিসেবে দেখা দেবে। উত্তরণকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে হলে দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। ‘বাংলাদেশ গ্র্যাজুয়েশন ফরম দ্য এলডিসি গ্রুপ পিটফলস অ্যান্ড প্রমিসেস’ শীর্ষক এক সংলাপে তিনি আরও বলেন, সুশাসন যদি না থাকে, তাহলে দেশে স্থিতিশীলতা থাকবে না। সে ক্ষেত্রে নীতির গুণগত মান এবং যেসব প্রতিষ্ঠান আমাদের সমাজকে ধরে রাখে সেগুলোয় দুর্বলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। দেশের ভেতরে স্থিতিশীলতা ও ঐক্যবোধ না থাকে, তাহলে উত্তরণকে সুফল হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।
রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা বলছেন, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা এখনো সন্তোষজনক নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরমতসহিষ্ণুতার অভাব প্রকট। যে কারণে প্রায়ই অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ বছরই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিগত জাতীয় নির্বাচনে বিরোধী দল বিএনপি অংশগ্রহণ করেনি। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার যেসব কারণ দেখিয়েছিল তারা, সেসব আমলে নেয়নি সরকার। পারস্পরিক অনৈক্য ও অনাস্থার কারণে নষ্ট হয়েছে দেশের স্থিতিশীলতা। তারা বলছেন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় বিরোধী মতকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। দলের চেয়ে দেশের স্বার্থ করে দেখার সংস্কৃতি চালু না হওয়ার কারণে বেড়েই চলেছে পারস্পরিক দ্বন্ধ। কেমন হবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এরপরে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে কিনা তাও সংশয়-দীর্ণ। অতীতের মতো নির্বাচনে হেরে যাওয়া দল কর্তৃক জ্বালাও-পোড়াও চালানো হলে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে অর্থনীতি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের গণতন্ত্র এখন সরকার নির্ভর হয়ে পড়েছে। তাদের প্রত্যক্ষ অনুমতি ছাড়া সভা সমাবেশ অনেকটা নিষিদ্ধ। আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটভুক্ত দলগুলো হর হামেশা সভা-সমাবেশ করছে। অথচ বিরোধরিা সেই সুযোগ পাচ্ছেনা।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলন, রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এরশাদ-মেননের দল সমাবেশের অনুমতি পায়। তাদের দলের কয়টা লোক আছে যে তারা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি পায়? অথচ বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। এই হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের নমুনা। তারা রাস্তা দখল করে সমাবেশ করে আর অন্যদের সমাবেশের অনুমতি দেয়না।
রিজভী বলেন, শেখ হাসিনার শাসন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অন্ধকারময় পর্ব। এখানে মানুষের স্বর স্তব্ধ। বিএনপিসহ বিরোধী দলের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করার আয়োজন চলছে। রাষ্ট্রীয় মদদে গোয়েন্দা পুলিশকে লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে বিএনপি’র শন্তিপূর্ণ কর্মসূচির ওপর। গণমাধ্যমের মাথার ওপর ঝুলছে ধারালো তরবারী। সভা-সমাবেশ পুলিশের আকস্মিক আক্রমনের শিকার। মুক্তকন্ঠ এখন মানুষ ভুলে যেতে শুরু করেছে। তথ্য জানার অধিকার আইন করে বন্ধ করা হয়েছে, নাগরিক স্বাধীনতার গলা টিপে ধরার জন্য। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন- দেশে গণতন্ত্রের সংকট নেই, তিনি আসলে ঘুরিয়ে বলেছেন। দেশে আওয়ামী-গণতন্ত্রের সংকট নেই, কিন্তু প্রকৃত গণতন্ত্র রাজপথে বেওয়ারিশ লাশের মতো পড়ে আছে। গুম, খুন, অপহরণ, বিচার বহির্ভূত হত্যা, নারী-শিশু নির্যাতনের পৈশাচিকতা ওবায়দুল কাদের সাহেবের আওয়ামী গণতন্ত্রের নমূনা। আসলে ওবায়দুল কাদের সাহেবের এই দাবি এদেশের জনগণ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বহুদলীয় গণতন্ত্রকে অপমান করা। বিএনপির এ মুথপাত্র বলেন, ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের বাণী গুমরে গুমরে কাঁদছে। সুপ্রীম কোর্টের সিদ্ধান্ত সরকারের বিরুদ্ধে যাওয়ায় প্রধান বিচারপতির মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে দেশ থেকে শিফট করে দেয়া হয়েছে। স্বাধীন বিচার বিভাগ আওয়ামী লীগের আতঙ্ক। তাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে স্বাধীন বিচার বিভাগ বিরানভূমিতে পরিণত হয়।
দেশ ও গণতন্ত্র গভীর সংকটে নিপতিত মন্তব্য করে বাংলাদেশ ন্যাপ মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেন, গণতন্ত্র হুমকির মুখে। মানুষকে কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না। রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বাধা দেয়া হচ্ছে। এই রকম গণতন্ত্রহীন বাংলাদেশের জন্য মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই। কোনভাবেই এই অবস্থা মেনে নেয়া যায় না। তিনি বলেন, চলমান অবস্থা দেখে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন আজ সুদূর পরাহত।
অভিযোগে প্রকাশ, ২০০৮ সালে বিতর্কিত এক প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিএনপি ও জামায়াতের সভা-সমাবেশের উপর অলিখিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। শুরুতে বিএনপিকে মাঝে মধ্যে সমাবেশ করতে দেয়া হলেও জামায়াতকে দেখা মাত্রই গুলী করা হতো। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির উপরও চাপ বাড়তে থাকে। কারণ দলটি সরকারের সেই একতরফার নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বিএনপি যখনই কোনো ইস্যুতে বা কোনো বিশেষ দিবসে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি চায়, তা নিয়ে গড়িমসি শুরু হয়। এমনকি ঘরোয়া সভাতেও বাধা দেয়া হয়। অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বিএনপির নেতাদের সাক্ষাৎও দেননা। যখনই সমাবেশের দাবি উঠে তখনই আইনশৃঙ্খলার অবনতি, যানজট সৃষ্টিহ নানান অজুহাতে বিএনপিকে অনুমতি দেয়া হয়না। কিন্তু সরকারি দল রাস্তা-ঘাট বন্ধ করে হর-হামেশাই রাজধানীতে সভা-সমাবেশ করছে।
এছাড়া দেশের আরেক জনপ্রিয় দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকেও দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর ধরে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে বাধা দেয়া হচ্ছে। অভিযোগে প্রকাশ, দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের প্রায় সব অফিসই তালাবদ্ধ। জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের উপর সরকারের দমনপীড়ন চোখে পড়ার মত। দলটি গণতান্ত্রিক পন্থায় শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করলেও দেখামাত্র গ্রেফতার করা হচ্ছে। মিথ্যা মামলায় দিনের পর দিন রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। রাজপথে কর্মসূচি না থাকলেও থেমে নেই গ্রেফতার কার্যক্রম। দলটির অভিযোগ, তাদের শীর্ষ কয়েকজন নেতাকে মিথ্যা অভিযোগ এনে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। এমনিতেই দলটি কোনো সভা-সমাবেশ করতে পারছেনা। দেশব্যাপী তাদের অফিসগুলোও বন্ধ। কেন্দ্রীয় নেতারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে। যারা বাইরে আছেন তাদের অধিকাংশই এখানে-সেখানে মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারের রোষানলে পড়ে পরিবারগুলোও এখন অসহায়। জামায়াত-শিবিরের উপর সরকারের এমন কু-নজর ছিল যে, দেখামাত্রই তাদের গুলীর নির্দেশনা ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি। অভিযোগে প্রকাশ, সরকার শুধু জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের দমন পীড়ন করেই ক্ষান্ত হয়নি, যে কোনো ঘটনা ঘটলেই তদন্তের আগেই তার দায়ভার সংগঠনগুলোর উপর চাপিয়ে দেয়া হয়। আর এর মাধ্যমে শুরু হয় নতুন করে গ্রেফতার ও দমনপীড়ন।
সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে সেটি মানে না বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ হলো, সবাইকে সভা-সমাবেশের সুযোগ দেয়া। মূলত দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও এই শ্লোগানকে কেন্দ্র করে সূচনা হয়েছিল। কিন্তু এখন যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া দল আওয়ামী লীগই বিষয়টি বেমালুম ভুলে গেছে। তারা এখন একদলীয় শাসন চালাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল ও তাদের জোটগত দলগুলো যখন তখন রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়ে সমাবেশ করলেও বিরোধী পক্ষের জন্য সেটি যেন ‘হারাম’। দেশের সবচেয়ে বৃহত্তম দল বিএনপি বারবার তাদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হবে বলে ঘোষণা দিলেও সরকারি দল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাতে বর্বর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীতে সমাবেশ করার উপর নিষেধাজ্ঞা চলছে। একাধিকবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের ঘোষণা দিলেও অনুমতি না পাওয়ায় সেটি করতে পারেনি দলটি। প্রতিবাদে কালো পতাকা মিছিল করতে চেয়েছিল সেটিরও অনুমতি দেয়া হয়নি। এমনকি কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূটিতেও হামলা চালানো হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ