ঢাকা, বুধবার 14 March 2018, ৩০ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৫ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক হস্তান্তর নিয়ে এলজিইডি-সিটি কর্পোরেশন ঠেলাঠেলি

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক (ফ্লাইওভার) হস্তান্তর নিয়ে শুরু হয়েছে ঠেলাঠেলি। এই ঠেলাঠেলি হচ্ছে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) এর সাথে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের (ডিসিসি)। ঠেলাঠেলির কারণে উড়াল সড়কটির উদ্বোধনের চার মাস পরও এটির দেখভাল‘র দায়িত্ব কেউ বুঝে নেয়নি। এলজিইডি বলছে, দুই সিটি কর্পোরেশনকে উদ্বোধনের পরপরই বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। আর সিটি কর্পোরেশন বলছে, আমরা এখনও বুঝে নেইনি। মিটিং-সিটিং চলছে।
নির্মাণ কাজ শুরু করার পরপরই এ উড়াল সড়কের নকশার ত্রুটি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন আসে সংবাদমাধ্যমে, যার সুরাহা এখনও হয়নি। বাঁ দিকে স্টিয়ারিংয়ের কথা মাথায় রেখে বিদেশী প্রকৌশলীর করা নকশায় নির্মিত এ উড়াল সড়কে ডানে যাওয়া বা রাইট টার্নের ব্যবস্থা না রাখা, ওঠা-নামার র‌্যাম্প জটিলতাসহ বেশ কিছু ত্রুটির কথা সে সময় বলেছিলেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ অপেক্ষা আর স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগের পর গত ২৬ অক্টোবর যান চলাচলের জন্য পুরোপুরি খুলে দেয়া হয়  মৌচাক-মগবাজার উড়াল সড়ক। এরপরই শুরু হয় ঠেলাঠেলি।
দু‘বছরের প্রকল্প মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়ক‘র (ফ্লাইওভার) কাজ শেষ হতে সময় লেগেছে ৬ বছর। দফায় দফায় নানা অজুহাতে প্রকল্প ব্যয় ও নির্মাণের সময় বাড়িয়ে ৬ বছর পর যখন প্রকল্পটির কাজ শেষে ওই উড়াল সড়কে যানবাহন চলাচলের সুযোগ করা হয়েছে, তখন দেখা দিয়েছে নানা বিপত্তি। রাজধানীর যানজট নিরসনে এই উড়াল সড়কটি জনগুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নির্মাণ করা হলেও এটি এখন যানজট নিরসনের পরিবর্তে কোন কোন স্থানে তা বাড়িয়েছে।
ঢাকার কেন্দ্রভাগে অন্যতম ব্যস্ত এবং চলাচলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ছয় বছর ধরে এই নির্মাণকাজের জন্য দারুণ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দা ও চলতি পথের যাত্রীদের। বেহাল রাস্তার কারণে মগবাজার, মৌচাক, শান্তিনগর এলাকার বিপণী বিতান ও দোকানপাটের ব্যবসায়ীরা হয়েছেন ক্ষতির শিকার। প্রতিদিন চলাচলের দুর্ভোগে পড়ে অনেকেই ওই এলাকা ছেড়ে অন্য এলাকায় বাসা নেয়ায় স্থানীয় ভবন মালিকদেরও বিপাকে পড়তে হয়েছে।
প্রায় ৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই উড়াল সড়কের বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি)। প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুশান্ত কুমার পাল দৈনিক সংগ্রামকে জানান, মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কটির সর্বশেষ অংশ উদ্বোধনের পর গোটা উড়াল সড়কটি কার্যকর হয়। এ প্রকল্পটি ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে উদ্বোধনের পরই। এই প্রকল্পের ডিজাইন-ড্রয়িংসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কাগজপত্র তাদেরকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এর সফট কপিও তাদেরকে দেয়া হয়েছে। এখন ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনই প্রকল্পটির দেখভাল করবে। তাদের ওপরে সব দায়িত্ব এমনিতেই বর্তায়।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, প্রকল্পটির উদ্বোধনের পর এটি দুই সিটি কর্পোরেশনকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে বলে যে কথা বলা হচ্ছে, তা সত্য নয়। তারা (এলজিইডি) আমাদেরকে বুঝিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রকল্পটি আটকে আছে। আমরা কিভাবে বুঝে নেব, তা নিয়েই এখন চিঠি চালাচালি করা হচ্ছে, বৈঠকও হয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আমরা প্রকল্পটির যার যার অংশ বুঝে নেব।
জানা গেছে, মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কটির বাংলামোটর, মগবাজার, তেজগাঁও, মালিবাগ রেলগেইট, রামপুরা অংশ পড়েছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায়। আর বাকি অংশ মৌচাক, মালিবাগ মোড়, রাজারবাগ, শান্তিনগর অংশ পড়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায়।
উড়াল সড়কটি নির্মাণের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, উদ্বোধনের পরই সেটি এলজিইডিকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন তারাই সব কিছু দেখভাল করবে। তবে নিয়ম অনুযায়ী আগামী জুন পর্যন্ত উড়াল সড়কের কাঠামোগত কোন ত্রুটি হয় কি না সেটি দেখবে তমা কনস্ট্রাকশান।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে ২০১১ সালে যখন এই উড়াল সড়ক নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এরপর কয়েক ধাপে তা বেড়ে ১ হাজার ২১৮ কোটি ৮৯ লাখ ৬৯ লাখ টাকায় পৌঁছায়। এ প্রকল্পে সৌদী ডেভেলপমেন্ট ফান্ড এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অর্থায়ন করে। প্রতি মিটার নির্মাণে গড়ে ১৩ লাখ টাকা খরচ পড়ে বলে সরকাররের ভাষ্য।
মৌচাক-মগবাজার উড়াল সড়ক সোনারগাঁও, মগবাজার এবং মালিবাগ রেলক্রসিং অতিক্রম করেছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সাতটি মোড়-সাতরাস্তা, এফডিসি, মগবাজার, ওয়্যারলেস গেইট, মৌচাক, মালিবাগ, রামপুরা এবং শান্তিনগরের ওপর দিয়ে গেছে। চার লেইনের এ উড়াল সড়কে ওঠা-নামার জন্য তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা, সোনারগাঁও হোটেল, মগবাজার, রমনা (হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল সংলগ্ন রাস্তা), বাংলামোটর, মালিবাগ, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও শান্তিনগর মোড়সহ বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছে ১৫টি র‌্যাম্প।
ভূমিকম্প সহনীয় করার জন্য এ উড়াল সড়কে ‘পট বিয়ারিং’ এবং ‘শক ট্রান্সমিশন ইউনিট’ সংযোজন করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়কের মিডিয়ান বরাবর কলামের ওপর এ উড়াল সড়ক নির্মাণ করায় নিচের সড়কের উপযোগিতা কমবে না। এটির নির্মাণ কাজ করা হয়েছে তিন ভাগে। একটি অংশে রয়েছে সাতরাস্তা-মগবাজার-হলি ফ্যামিলি পর্যন্ত, আরেকটি অংশে শান্তিনগর-মালিবাগ-রাজারবাগ পর্যন্ত এবং শেষ অংশটি বাংলামোটর-মগবাজার-মৌচাক পর্যন্ত। এর মধ্যে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত অংশটি ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ উন্মুক্ত করা হয়। ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর এর ইস্কাটন-মৌচাক অংশ যান চলাচল উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। আর সোনারগাঁও হোটেলের দিকে নামার র‌্যাম্পটি গত ১৭ মে খুলে দেয়া হয়।
ভারতের সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও নাভানার যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠান ‘সিমপ্লেক্স নাভানা জেভি’ এবং চীনা প্রতিষ্ঠান দ্য নাম্বার ফোর মেটালার্জিক্যাল কনস্ট্রাকশন ওভারসিজ কোম্পানি (এমসিসিসি) ও তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড এর নির্মাণ কাজ করে।
জানা গেছে, মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কটি উদ্বোধন করা হয়েছে চার মাস আগে। এর মধ্যে মৌচাক অংশে ট্রাফিক সিগনালের বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়েছে তিনবার। এই তার চুরি হওয়ার কারণে উড়াল সড়কটির নতুন অংশের ট্রাফিক সিগনালগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তার সাথে রাতের বেলায় মৌচাক, মালিবাগ, রামপুরা, রাজারবাগ, শান্তিনগর অংশে বাতি জ্বলে না। তিনবার বৈদ্যুতিক তার চুরির কারণে এখন আর নতুন করে তার না লাগানোয় অন্ধকারে যানবাহন চলাচলের সময় ঘটছে দুর্ঘটনা। সর্বশেষ গত ২ মার্চ ট্রাফিক সিগনালের তার চুরির ঘটনা ঘটে।
সুশান্ত কুমার পাল বলেন, মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কটির সর্বশেষ উদ্বোধনের পর প্রায়ই বৈদ্যুতিক তার চুরি হয়ে যায়। এ যাবত তিনবার তার চুরি হয়েছে। প্রথম দু‘বার তার চুরির পরই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তারাই তাদের পক্ষ থেকে দু‘বার তার লাগিয়েছে তাদের খরচে। এখন আবার তার চুরির পর কে টাকা খরচ করে তার লাগাবে এ জন্য টানাপোড়েনের কারণেই তার লাগানো হচ্ছে না। তিনি জানান, প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে এলজিইডির দায়-দায়িত্ব প্রকল্প শেষেও শেষ হয়ে যায় নি। তাই ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে বলে প্রথম দু‘বার তার লাগানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আর কত খেসারত দেবে? তারপরও তারা সমস্যা সমাধানে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে চেষ্টা করছেন বলে জানান।
ওই উড়াল সড়কে রাতের বেলায় বাতি না জ্বলার কারণে সন্ধ্যার পর ওই উড়াল সড়ক জুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। যানবাহনের আলোয় কিছুটা সময় আলোর বিচ্চুরণ ঘটলেও ভোরের আলো ফোটার আগ পর্যন্ত আলো আধারীর খেলায় মেতে থাকে উড়াল সড়কটি। এতে করে ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটছে। আর নানা ধরনের অপরাধের আখড়ায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
সূত্রটি জানায়, উড়াল সড়কটি উদ্বোধনের সময় সিগনাল বাতির তাপর, লাইটের বৈদ্যুতিক তার লাগানো হয়েছিল। কয়েকদিন যেতে না যেতেই সেই তার চুরি হয়ে যায়। ফের লাগানো হলে গত ২১ ফেব্রুয়ারি তার চুরি হয়। সর্বশেষ, গত ২ মার্চ তার চুরি হয়ে যায়। এখন এ খাতে আর কোন বরাদ্দ নেই তমার। তাই বিষয়টি এলজিইডিকে জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, মগবাজার-মৌচাক উড়াল সড়কের মৌচাক অংশের দুটি স্থানে ৫টি ট্রাফিক সিগনাল বাতি লাগানো হয়েছে। তার চুরির আগে সেগুলোতে আলো জ্বলতে দেখা গেছে, সিগনাল মোতাবেক যানবাহন চলাচলও করেছে। এখন তার চুরির পর চার লেনের ওই মৌচাক অংশের ট্রাফিক সিগনাল চলছে হাতের ইশারায়। ঠেলাঠেলির কারণে এখন আর বৈদ্যুতিক তার লাগানো হচ্ছে না। ফলে উড়াল সড়কজুড়ে এখন রাতের বেলায় শুধু অন্ধকারই অন্ধকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ