ঢাকা, বুধবার 14 March 2018, ৩০ ফাল্গুন ১৪২৪, ২৫ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

‘মা নেপালে পৌঁছেই তোমাকে ফোন দেব’

নেপালে যাওয়ার পূর্বে শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমাবন্দরে আলিফ

খুলনা অফিস : নেপালের কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলার বিমানের যাত্রী আলিফুজ্জামান আলিফ এর রূপসা তীরের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। তার মতো একজন মেধাবী ও পরিশ্রমী ছাত্রনেতাকে হারিয়ে এলাকাবাসীর মাঝে শোকে ছায়া নেমে এসেছে। ছেলেকে হারিয়ে মা-বাবা হয়েছে বাকরুদ্ধ। শোকার্ত পরিবারকে শান্তনা দিতে বাড়িতে যার খুলনার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। গতকাল তার বাড়িতে গিয়েছিলেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জামাল, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আরাফাত হোসেন পল্টুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। এ সময় আলিফের পরিবারের সদস্যরা নেতৃবৃন্দকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের আহাজারীতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। ‘আলিফ নেপালে পৌঁছে মাকে ফোন দেয়ার কথা বলেছিল, সে জানিয়েছিল-‘মা নেপালে পৌঁছেই তোমাকে ফোন দেব, কিন্তু সে আর ফোন দিতে পারেনি।’ কান্না জড়িত কণ্ঠে এ কথা বললেন নেপালের কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলার বিমানের যাত্রী আলিফুজ্জামান আলিফ (৩০) এর বড় ভাই মো. আশিকুর রহমান হামিম।  গতকাল মঙ্গলবার সকালে আলিফদের বাড়িতে গেলে হামিম জানান, এটিই ছিল সোমবার সকাল সাড়ে ৭টায় যশোর থেকে বিমানে ঢাকায় যাওয়ার পথে মায়ের সঙ্গে তার শেষ কথা।

আলিফুজ্জামান আলিফ খুলনার রূপসা উপজেলার আইচগাতি গ্রামের বারোপূর্ণের মোড় সংলগ্ন জিরোপয়েন্ট মসজিদের বিপরীতে (আইচগাতি স্কুল রোড) মোল্লা মো. আক্তারুজ্জামানের ছেলে। তিনি খুলনার বিএল কলেজ থেকে এবার মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি এবং মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড খুলনা জেলা শাখার তথ্য ও প্রচার সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গেও সম্পৃক্ত। স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকালে বিমানে উঠার পূর্বে যশোর বিমান বন্দরে দাঁড়িয়ে কয়েকটি সেলফি তুলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন আলিফুজ্জামান। সেখানে তিনি লেখেন-‘বাই বাই খুলনা, ওয়েলকাম ঢাকা ১২/০৩/২০১৮’। এরপর ঢাকা থেকে ইউএস বিমানে উঠে তার টিকিটটি একজন বন্ধুকে ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে দেন আলিফুজ্জামান। টিকিটে দেখা গেছে-আলিফুজ্জামানের ফাইট নম্বর বিএস ২১১, ইকোনমি ক্লাসিক টিকেট নম্বর ৭৭৯২৪০২০১৩৯৪৯।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আলিফ স্থানীয় বেলফুলিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং খুলনার আহসান উল্লাহ কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেয়। এরপর ২০০৭ সালে সে কাজের সন্ধানে সৌদীতে যায়। সেখানে ২০১০ সালে ফিরে ফের খুলনা সিটি কলেজে ভর্তি হয়ে ডিগ্রি পরীক্ষা দেয়। সর্বশেষ সে খুলনার বিএল কলেজ থেকে মাস্টার্স পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এখনও কয়েকটি পরীক্ষা বাকি রয়েছে।

ছোট ভাই ইয়াছির আরাফাত জানায়, প্রতিদিনের ন্যায় গত রোববার সর্বশেষ রাত ১০টায় মা-বাবা ও আমরা দুই ভাই একত্রে খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমিয়ে পড়ি। আমরা তিন ভাই, এর মধ্যে আলিফ দ্বিতীয়। সে সরকারি বিএল কলেজের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। পরীক্ষা চলা অবস্থায় ১০ দিন বন্ধ থাকার সুবাদে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক নেপালে একটি মেলায় অংশগ্রহণের জন্য সোমবার সকালে সে বাড়ি থেকে রওনা হয়। 

আলিফের বড় ভাই হামিম বলেন, ‘আলিফ রাজনীতি এবং ঠিকাদারি করতো। তার কোন শত্রু ছিল না। তার ভবিষ্যৎ ইচ্ছা ছিল সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করা।’ গতকাল সকাল পৌনে ৮টার দিকে আলিফদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় একটি শোকাহত পরিবেশ। স্বজন ও প্রতিবেশিদের ভিড়। তৃতীয়তলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিবারের সঙ্গেই থাকতেন অবিবাহিত আলিফ। ঘরে ঢুকতেই চোখে পড়ে আলিফের ছোট বাবা (চাচা) মো. বাবর আলীর দিকে। আদরের ভাইপোর শোকে মূহ্যমান তিনি। একাধারে কেঁদেই চলেছেন, আর আলিফের সঙ্গে তার বিভিন্ন স্মৃতির কথা আওড়াচ্ছেন। বলছেন, ‘আমাকে আর কে চাচা বলে ডাকবে, আমার বুকের মানিক তুই কেন নেপালে গেলি- ইত্যাদি’।

আলিফের খালাতো বোন রাহিমা আক্তার শান্ত বলেন, ‘সংবাদ শোনার পর মঙ্গলবার সকাল ৮টার ফ্লাইটে তার খালু শাহাবুর রহমান নেপালের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। তিনি পৌঁছানোর পরই তারা সঠিক তথ্য জানতে পারবেন।’

রাহিমা জানান, বিমান দুর্ঘটনার খবর শোনার পর আলিফের অসুস্থ বাবা আরো অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আর মাও বাকরুদ্ধ। কেউই কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। হামিম জানান, আলিফের বন্ধুরা নেপালে চলমান বাণিজ্য মেলায় স্টল দিয়েছে। সেখানে বেড়াতে যাওয়ার জন্যই আলিফ চার দিনের সফরে নেপাল যায়। আলিফের নিকটাত্মীয় মো. সাব্বির খান দ্বীপ জানান, আলিফ নেপাল ভ্রমণের জন্য সোমবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয়। সে যশোর থেকে প্রথম ফ্লাইটে বেসরকারি এয়ারওয়েজ নভো এয়ারে ঢাকায় যায়। সে দুপুর পৌনে একটার দিকে ইউএস-বাংলার বিমানে (ফ্লাইট বিএস ২১১) ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রওনা হয় নেপালের উদ্দেশে। সে বিমানের সর্বশেষ আসনে ছিল। নেপালের স্থানীয় সময় বেলা ২টা ২০ মিনিটে কাঠমান্ডুতে নামার সময় পাইলট নিয়ন্ত্রণ হারালে বিমানটি রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে এবং আগুন ধরে যায়। এদিকে, ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে আলিফদের আইচগাতির বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীসহ উৎসুক জনতার ভিড় জমে গেছে। তার বাড়িতে এসে আলিফের খবর জানার চেষ্টা করছেন। তবে, পরিবারের সদস্যরা অনেকটাই দুঃচিন্তাগ্রস্ত ও শোকাহত হয়ে পড়েছেন।

আলিফের অপর আত্মীয় স্থানীয় আইচগাতি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী খান জুলু বলেন, তিনি খবর পেয়ে আলিফদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শোক বিরাজ করছে। পরিবারের সদস্যদের সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছেন তারা।

আইচগাতি এলাকার বাসিন্দা আবু হোসেন বাবু বলেন, আলিফ সোমবার সকালে বিমানে ওঠার আগে সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ