ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 March 2018, ১ চৈত্র ১৪২৪, ২৬ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অথচ ৭ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে

গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণ চলছে

কামাল উদ্দিন সুমন : চরম গ্যাস সংকটেও মাইলে পর মাইল গ্যাস লাইন করে চলছে সরকার। কবে এসব সঞ্চালন লাইনে গ্যাস সরবরাহ করা হবে কিংবা আদৌ হবে কিনা তা কেউই বলতে পারেনা। তারপরও কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে গ্যাস সঞ্চালনে নতুন লাইন নির্মাণ কাজে। প্রায় ৭ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণ কাজ করছে পেট্রোবাংলা।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম জানান, গ্যাসের কিছুটা সংকট আছে, সেটি ঠিক। তবে নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হচ্ছে। এছাড়া এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। ফলে এখনকার সংকট কেটে যাবে। সে সময় যাতে সঞ্চালন লাইনের অভাবে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত না হয় সেজন্য  পাইপলাইন সম্প্রসারণের কাজ চলছে।
বর্তমানে দিনে কমপক্ষে সাড়ে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে পেট্রোবাংলা স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন দুই হাজার সাতশ ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ করে থাকে।
সূত্র জানায়, গ্যাস স্বল্পতার কারণে ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ ও সার কারখানা বাদে অন্য সব খাতে নতুন গ্যাস সংযোগের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সরকার। পরে বিভিন্ন সময় সীমিত পর্যায়ে সংযোগ দেয়া হলেও আবাসিকে পাইপলাইনের গ্যাস ব্যবহার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে বিভিন্ন সময়। তবে ভবিষ্যতে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনাকে হিসাবে রেখেই সারা দেশে চলছে গ্যাস পাইপলাইন সম্প্রসারণের বেশকিছু প্রকল্প। যদিও সম্ভাবনা অনুযায়ী গ্যাসক্ষেত্র না মিললে এসব সঞ্চালন লাইনে গ্যাস সরবরাহের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ও পরিকল্পনাধীন পাইপলাইন প্রকল্পের ওপর একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে গ্যাস সঞ্চালন লাইনের বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাখরাবাদ-সিদ্ধিরগঞ্জ গ্যাস সঞ্চালন লাইনটি নির্মাণে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৪৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৮১ শতাংশ শেষ হয়েছে। ৬০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পাইপলাইনটির নির্মাণকাজ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।
গ্যাস ট্রান্সমিশন ক্যাপাসিটি এক্সপানশন প্রকল্পের আওতায় আশুগঞ্জ থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত ৬১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পাইপলাইনটির কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। সরকারি অর্থায়নে লাইনটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫১৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
অন্যদিকে মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ কাজ চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। ৯১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ লাইন নির্মাণেও অর্থায়ন করছে বাংলদেশ সরকার। এতে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৩৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আগামী জুনে এপ্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
ধনুয়া-এলেঙ্গা ও বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাড়ের নকলা পর্যন্ত পাইপলাইনটির ৩৮ শতাংশ কাজ হয়েছে। জাইকার অর্থায়নে নির্মাণ হচ্ছে ৫২ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ পাইপলাইন। ৯৭৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে লাইনটির নির্মাণ শেষ হবে ২০১৯ সালের জুনে।
চট্টগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত আরেকটি পাইপলাইনের নির্মাণ কাজ চলছে। ১৮১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে লাইনটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১ হাজার ৯৬২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের কাজ চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ৬ শতাংশ শেষ হয়েছে।
শেরপুরের শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল থেকে মৌলভীবাজার পর্যন্ত নির্মাণ হচ্ছে আরেকটি পাইপলাইন। এ প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৩১ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ।
৭৭৬ কোটি ১১ লাখ টাকায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা থেকে ফৌজদারহাট পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করছে জিটিসিএল। প্রকল্প শেষ হওয়ার মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হলেও কাজ মাত্র ১৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। কোম্পানিটির নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ হচ্ছে আরো তিনটি গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন। এর মধ্যে ২৩৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকায় গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে জয়দেবপুর, ১ হাজার ১০৯ কোটি ২৩ লাখ টাকায় মহেশখালী থেকে আনোয়ারা পর্যন্ত সমান্তরাল আরেকটি লাইন ও ৩৬৭ কোটি ১০ লাখ টাকায় মীরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সরবরাহের জন্য গ্যাস পাইপলাইন ও কেজিডিসিএল গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক উন্নয়নের কাজ চলছে। এ তিন প্রকল্পের মধ্যে গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে পাইপলাইন নির্মাণের কাজ ৯২ শতাংশ শেষ হয়েছে।
এর বাইরেও পরিকল্পনায় রয়েছে আরো বেশকিছু সঞ্চালন লাইন। মহেশখালী জিরো পয়েন্ট গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মাধ্যমে ৪২ ইঞ্চি ব্যসের সাত কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকল্পটির ডিপিপি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ পর্যালোচনা করছে। পরিকল্পিত আরেকটি সঞ্চালন লাইন হলো কুটুম্বপুর-মেঘনাঘাট গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন। ৬৩৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য প্রকল্পটির মাধ্যমে ২৪ ইঞ্চি ব্যাসের ৪৫ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হবে। নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের পরিকল্পনায় প্রকল্পটির ডিপিপি জিটিসিএল পর্যালোচনা করছে। এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিলের (ইএসএফ) অর্থায়নেও দুটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। রংপুর, নীলফামারী, পীরগঞ্জ শহর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্ক নির্মাণের একটি পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। বগুড়া-রংপুর-সৈয়দপুর গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের অন্য একটি প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫২০ কোটি টাকা।
তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী জানান, দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে সরকার আগামী ২৫ এপ্রিল থেকে জাতীয় গ্রিডে দিনে ৫০ কোটি ঘনফুট আমদানিকৃত গ্যাস সরবরাহ করতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী ২৩ এপ্রিল এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) বহনকারী প্রথম জাহাজটি কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের অদূরে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত ভাসমান টার্মিনাল নোঙর করবে। ২৫ এপ্রিল থেকে এই এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হবে। এ জন্য সরকার এরই মধ্যে মহেশখালীর টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন নির্মাণের কাজ শেষ করেছে।
 এদিকে শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পড়ে থাকা প্রায় দুই হাজার শিল্প প্রতিষ্ঠান এই সংযোগ পাবে। আগামী এপ্রিল থেকে দেশে এলএনজি আসার পর পর্যায়ক্রমে শিল্পে গ্যাস সংযোগ দেয়া হবে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মীর মশিউর রহমান বলেন, আগামী মাসে যেহেতু এলএনজি আসছে তাই গ্যাস পাওয়া সাপেক্ষে শিল্পে গ্যাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন যে আবেদনগুলো রয়েছে সেগুলোতে আগে সংযোগ দেয়া হবে।
তবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো.ফয়েজউল্লাহ বলেন,এখনই কোন কোন শিল্প প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস সংযোগ দেয়া হচ্ছে তার তালিকা তৈরি হয়নি। আমরা দেখবো যারা আবেদন করেছে তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে কি না, থাকলে তার চাহিদা কতটুকু তা দেখা হবে। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ আছে কি না তা যাচাই বাছাই করে এইসব সংযোগ দেয়া হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ