ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 March 2018, ১ চৈত্র ১৪২৪, ২৬ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খালেদা জিয়ার জামিন রোববার পর্যন্ত স্থগিত

স্টাফ রিপোর্টার: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন  বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেওয়া জামিন রোববার পর্যন্ত স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। এ সময়ের মধ্যে নিয়মিত লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করতে বলা হয়েছে।
গতকাল বুধবার সকালে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের  বেঞ্চ এ আদেশ দেন। জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ এ আদেশ দেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও দুদকের পক্ষে খুরশীদ আলম খান শুনানি করেন। খালেদা জিয়ার পক্ষে ছিলেন এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এ জে মোহাম্মদ আলী ও জয়নুল আবেদীন।
তবে আসামী পক্ষের বক্তব্য না শুনেই এই আদেশ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা।
আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশের পরে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এডভোকেটন জয়নুল আবেদীন এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের বক্তব্য না শুনেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই ধরনের আদেশ দিয়েছেন। এই আদেশে আমরা ব্যথিত। আদালতের এই আদেশের বিষয়ে কী ভাষায় আপনাদের কাছে বর্ণনা করবো, তা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।
জয়নুল আবেদীন বলেন, আমরা ধারণা করেছিলাম, চিরাচরিতভাবে আপিল বিভাগ যেটা করেন, উভয়পক্ষের বক্তব্য শোনেন, তারপর আদেশ দেন। আজকের বিষয়টি হলো, আপিলটি দুদকের আইনজীবী উপস্থাপন করার সঙ্গে সঙ্গে আদালত বললেন যে আগামী  রোববার সিপি (লিভ টু আপিল বা আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) ফাইল করেন। জামিন আগামী  রোববার পর্যন্ত স্থগিত থাকবে। আমাদের কোনো বক্তব্য তিনি (প্রধান বিচারপতি) শুনলেন না। কোনো রকম আইনগতভাবে এই মামলাটি মোকাবিলা করার জন্য ন্যূনতম সুযোগ আমাদের দিলেন না। না দিয়ে স্টে অর্ডার অনুমোদন করলেন।
জয়নুল আবেদীন বলেন, আমরা এই আদেশে অত্যন্ত ব্যথিত ও মর্মাহত হয়েছি। আজ যে কাজটি হলো বিচার বিভাগে এর আগে এভাবে কখনো ছিল না। আজকের বিচার বিভাগের কাছ থেকে এটা আশা করিনি। তার কারণ আপনারা জানেন, এই ধরনের শর্ট সেন্টেন্সে (স্বল্প সাজা) দেশের সর্বোচ্চ আদালত কখনো হস্তক্ষেপ করেননি। চেম্বারে (চেম্বার আদালত) স্টে না থাকার পরেও সেই মামলায় স্টে দিলেন।
তিনি বলেন, আমি আদালতকে একটি কথা বলতে চেয়েছিলাম, আপনি যদি স্টে নাও দেন, তাহলেও খালেদা জিয়া কারাগার থেকে বের হতে পারছেন না। সরকার তাকে বের হতে দেবেন না। ইতোমধ্যে তারা বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতারের পরিকল্পনা করে রেখেছে। এই অবস্থার মধ্যে যদি আপনারা স্টে দেন তাহলে মানুষের মনোভাবের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এরপরও আদালত আমাদের কথা শুনলেন না।
খালেদা জিয়ার এই আইনজীবী আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আশা করি  রোববার আদালত উভয়পক্ষকে শুনবেন। অতীতের নজিরগুলো লক্ষ্য রেখেই আজ যে আদেশটি দিলেন তা ভ্যাকেট (বাতিল) করবেন। বেগম জিয়া জনসম্মুখে বের হয়ে আসবেন।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে গত সোমবার চার মাসের জামিন দেন হাইকোর্ট। এ আদেশ স্থগিত চেয়ে মঙ্গলবার পৃথক আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদক। আবেদনের শুনানি নিয়ে খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত না করে আবেদন দুটি বুধবার শুনানির জন্য আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
শুনানিতে যা হলো: বুধবার খালেদা জিয়ার জামিনাদেশ স্থগিত চেয়ে করা আবেদনের ওপর শুনানির শুরুতেই দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান আদালতকে বলেন, হাইকোর্ট চারটি কারণ দেখিয়ে খালেদা জিয়াকে জামিন দিয়েছেন। আমরা এখনো সে আদেশের সার্টিফায়েড কপি পাইনি। আদেশের কপি পেলে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) করবো।
এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, সিপি (লিভ টু আপিল) ফাইল করে আসেন।
তখন দুদকের আইনজীবী বলেন, সিপি ফাইল করতে  রোববার-সোমবার পর্যন্ত আমাদের সময় দেওয়া হোক। সে পর্যন্ত জামিন স্থগিত রাখা হোক।
এরপর আদালত বলেন, ঠিক আছে সিপি ফাইল করে আসেন  রোববারের মধ্যে। এ পর্যন্ত জামিন স্টে থাকবে।
তখন খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন আদালতকে বলেন, আমাদের কথা আগে শোনেন। আমাদের বক্তব্য তো শুনেন নাই। আমাদের না শুনে এভাবে আদেশ দিতে পারেন না। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, শুনতে হবে না।  রোববার পর্যন্ত তো স্থগিত দিয়েছি। ওই দিন আসেন। তখন শুনবো।
জয়নুল আবেদীন তখন প্রধান বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি একতরফাভাবে শুনানি করে আদেশ দিলে এতে আদালতের প্রতি পাবলিক পারসেপশন খারাপ হবে।
জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা পাবলিক পারসেপশনের দিকে তাকাই না। কোর্টকে কোর্টের মতো চলতে দিন।
এরপর জয়নুল আবেদীন ও এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, না শুনেই তো আদেশ দিলেন। আদালত বলেন, আমরা অন্তর্র্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছি। আমাদের শোনার দরকার নেই।
জয়নুল আবেদীন বলেন, এই মামলায় চেম্বার আদালত তো স্টে দেয়নি। এই সময়ের মধ্যে আসামীও বের হবে না। তাই স্টের প্রয়োজন নেই। এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, আমরা তো শুনানির সুযোগ পেলাম না।
এরপরই আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকা থেকে অন্য মামলার শুনানি শুরু করেন আদালত।
সে মামলার শুনানির একপর্যায়ে খালেদা জিয়ার পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি গিয়াস উদ্দিন আহমদ দাঁড়িয়ে আদালতকে বলেন, আপনি তো না শুনেই একতরফা আদেশ দিলেন। আমাদের কথা শুনতে হবে। কেন শুনবেন না?
তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, কার কথা শুনবো, কার কথা শুনবো না তা কি আপনার কাছে শুনতে হবে?
গিয়াস উদ্দিন আবারো একটু উত্তেজিত হয়ে একই কথা বললে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি কি আদালতকে থ্রেট করছেন? জবাবে গিয়াস উদ্দিন বলেন, শুনে তারপর আদেশ দিতে হবে। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, থ্রেট দেবেন না।
একপর্যায়ে এটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ্য করে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, আপনি তো কোর্টকে শেষ করে দিলেন। তখন এটর্নি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক ড. আক্তারুজ্জামানের আদালত খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদন্ড দেন। একই আদালত খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয় জনের সবাইকে মোট দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা অর্থদন্ডে দন্ডিত করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ