ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 March 2018, ১ চৈত্র ১৪২৪, ২৬ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুনিরা হয়নি শনাক্ত ॥ মামলারও অগ্রগতি নেই

তোফাজ্জল হোসেন কামাল : কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকান্ডের ২৪ মাস পার হতে আর মাত্র ৫ দিন বাকী। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্তও চলছে উল্লেখিত সময় ধরেই। ২৩ মাস পার হয়ে যাওয়ার পর যখন ২৪ মাস পূর্ণ হওয়ার পথে,তখন খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল, আগামী ২০ মার্চ পূর্ণ হবে তনু হত্যাকান্ডের ২৪ মাস( দুই বছর)। এতদিনেও তনুর খুনিরা শনাক্ত হয়নি, মামলারও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এতদিনেও খুনি চিহ্নিত না হওয়ায় ক্ষুব্ধ তনুর পরিবার,তার সাথে ক্ষুব্ধ ওই হত্যাকান্ড নিয়ে সোচ্চার কুমিল্লার বিশিষ্টজন। তাদের আশংকা, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের মতই হয়তো তনুর হত্যাকান্ডের শেষ পরিণতি ঘটবে। তারপরও তারা আশায় বুক বেধে আছেন,হাল ছাড়তে নারাজ।
হত্যাকান্ডের পর থেকেই তনুর পরিবার সন্দেহভাজন আসামীদের গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, দফায় দফায় অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসাবাদের পরিসর ছোট করে আনা হচ্ছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রহস্য উদঘাটন করে অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেনি তনু। পরে তার স্বজনরা খোঁজাখুঁজি করে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লা সেনানিবাসে বাসার কাছেই জঙ্গলে তনুর মরদেহ দেখতে পান তার বাবা ইয়ার হোসেন। পরদিন ২১ মার্চ দুপুরে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মরদেহের প্রথম ময়নাতদন্ত হয়। ওইদিনই তনুর বাবা কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের নামে মামলা দায়ের করেন। মামলা পুলিশ, ডিবি হয়ে সিআইডির হাতে যায়। ছায়া তদন্ত করে র‌্যাব ও পিবিআই। কিন্তু এখনও কোনও ইতিবাচক খবর মেলেনি। প্রথম ময়নাতদন্তে তনুকে ধর্ষণের আলামত এবং মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের জন্য গত ৩০ মার্চ তনুর লাশ কবর থেকে তোলা হয়। থানা পুলিশ ও ডিবি’র পর ২০১৬ সালের পয়লা এপ্রিল থেকে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা-সিআইডি।
এদিকে, তনুর দুই দফা ময়নাতদন্তের পরও কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ মৃত্যুর সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করেনি। শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট। গত বছরের মে মাসে সিআইডি তনুর জামা-কাপড় থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। পরে সন্দেহভাজনদের ডিএনএ ম্যাচিং করার কথা থাকলেও তা করা হয়েছে কিনা- এ নিয়েও সিআইডি বিস্তারিত কিছু বলছে না। সর্বশেষ সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদ করা ব্যক্তিরা তনুর মায়ের সন্দেহ করা আসামী বলেও সিআইডি জানায়। তবে তাদের নাম জানানো হয়নি।
সর্বশেষ ২০১৭ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকা সিআইডি কার্যালয়ে বাবা ইয়ার হোসেন, মা আনোয়ারা বেগম, চাচাতো বোন লাইজু ও চাচাতো ভাই মিনহাজকে দিনভর পুরনো বিষয়গুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন ঢাকা সিআইডির কর্মকর্তারা। এরপর আর কোন খবর নেই। এটাই ছিল তনুর পরিবারের কাছে শেষ খবর।
গণজাগরণ মঞ্চ কুমিল্লার সংগঠক খায়রুল আনাম রায়হান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তনু হত্যা মামলাটি দীর্ঘদিন সিআইডিতে পড়ে আছে। মামলার কোনও অগ্রগতি নেই। সিআইডির গা-ছাড়া ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।’
তনুর মা আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘সিআইডি এখন আমাদের খোঁজও নেয় না। সার্জেন্ট জাহিদ ও তার স্ত্রীকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকারী কে জানা যাবে। কারণ, সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় টিউশনি করতে যাওয়ার পর জঙ্গলে তনুর মরদেহ পাওয়া যায়। সিআইডি একে ওকে জিজ্ঞাসার নামে শুধু শুধু সময়ক্ষেপণ করছে।’
তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেন, মেয়েকে হারিয়েছি। মেয়ে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারলে মনে মনে শান্তি পেতাম। সিআইডি অফিসে গিয়েছি মামলার খবর নিতে। সেখানে জানানো হয়েছে, তারা কাজ করছেন। আরও সময় লাগবে। আমি আল্লাহর কাছে বিচার দিয়ে রেখেছি, আল্লাহ বিচার করবেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার জয়েন্ট সেক্রেটারি মাইমুনা আক্তার রুবী বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি করা হচ্ছে, যাতে তনু হত্যা অন্য কোনও ঘটনার নিচে চাপা পড়ে যায়। তনু হত্যার বিচারে মানুষ আন্দোলন করেছে। তনু হত্যার বিচার না হলে বাংলাদেশের মানুষের নৈতিক পরাজয় হবে।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি আলী আকবর মাসুম বলেন, প্রথম থেকেই তনু হত্যা মামলা নিয়ে দায়িত্বশীল সংস্থাগুলো আন্তরিক নয়। তা না হলে দুইবার ময়নাতদন্ত করতে হয় না। দ্বিতীয় ময়না তদন্তের প্রতিবেদনে এতোদিন লাগতো না। সাগর-রুনির মামলার মতো এটিও অনিশ্চয়তার পথে হাঁটছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডি কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জালাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। দুই মাস আগেও তনুর মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের পরে মামলার স্বার্থে পুনরায় আরও অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসাবাদের পরিসর ছোট করে আনা হচ্ছে। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে খুব অল্প সময়ের মধ্যে রহস্য উদঘাটন করে অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে।’
সিআইডি’র কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার ড. নাজমুল করিম খান বলেন,আমরা থেমে নেই। আমরা কাজ করে যাচ্ছি, আশা করছি ইতিবাচক ফলাফল জানাতে পারবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ