ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 March 2018, ১ চৈত্র ১৪২৪, ২৬ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আবারও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা

সরকার আবারও গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে। এ ব্যাপারে যথারীতি অর্থমন্ত্রীকেই দৃশ্যপটে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি কয়েকটি উপলক্ষে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, সরকার নাকি গ্যাসের জন্য ভর্তুকি দিয়ে আর কুলিয়ে উঠতে পারছে না! এজন্যই নিতান্ত বাধ্য হয়ে গ্যাসের দাম বাড়াতে হচ্ছে। জনাব মুহিত প্রসঙ্গক্রমে এলএনজি বা তরলিকৃত গ্যাস আমদানিতে ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার যুক্তি তুলে ধরেছেন। এলএনজির বেড়ে যাওয়া মূল্য এবং দেশের ভেতরে ভর্তুকির মধ্যে সমন্বয় সাধনের লক্ষ্যেই গ্যাসের দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি অবশ্য ঠিক কোন মাস থেকে কত টাকা বাড়ানো হবে সে বিষয়ে প্রশ্নসাপেক্ষ নীরবতা অবলম্বন করেছেন।
অন্যদিকে তথ্যাভিজ্ঞরা মনে করছেন, সত্যিই বাড়ানো হলে সিঙ্গেল বার্নার বা একমুখী চুলার জন্য ৯০০ টাকা এবং ডাবল বার্নার বা দ্বিমুখী চুলার জন্য ৯৫০ টাকা দাম নির্ধারণ করা হতে পারে। তথ্যাভিজ্ঞদের অনেকে আরো বেশি পরিমাণের বিষয়েও অনুমান করছেন। এমন ধারণা ও অনুমানের কারণ, দুটি চুলার ক্ষেত্রে বর্তমানে যে হারে অর্থাৎ যথাক্রমে ৭৫০ এবং ৮০০ টাকা করে দিতে হচ্ছে সে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছিল গত বছর ২০১৭ সালের পহেলা মার্চ থেকে। তার আগে পর্যন্ত দিতে হতো যথাক্রমে ৬০০ এবং ৬৫০ টাকা। অর্থাৎ সেবার এক দফাতেই ১৫০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছিল। কথা আরো আছে। এই দাম বাড়ানোর সময় এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনÑ বিইআরসির পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল, ২০১৭ সালেরই জুন থেকে গ্যাসের দাম আরেক দফা বাড়িয়ে যথাক্রমে ৯০০ এবং ৯৫০ টাকা ধার্য করা হবে। দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে রীট করেছিলেন একজন নাগরিক। মাননীয় বিচারপতিরা দ্বিতীয় দফায় দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়ার ফলে বিইআরসিকে পিছু হঠতে হয়েছিল। মাঝখান দিয়ে এক দফায় ১৫০ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কিন্তু ঠিকই কার্যকর করেছিল সরকার। জনগণের ওপর এই সিদ্ধান্ত চাপানো হয়েছিল মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে।
ওদিকে সরকার যে উচ্চ আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি সে কথারই প্রকাশ ঘটে চলেছে অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘোষণায়। বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না, দেশে বিরোধী কোনো দলের আন্দোলন বা প্রতিবাদ না থাকার সুযোগ নিয়ে যে কোনো সময় আবারও গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হবে। আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি অটোরিকশা ও কারসহ সিএনজি চালিত সকল যানবাহনের ক্ষেত্রে তো বটেই, শিল্প-কারখানার ক্ষেত্রেও গ্যাসের দাম বাড়ানো হবে আনুপাতিক হারে।
আমরা সরকারের এই চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে মোটেই সমর্থনযোগ্য মনে করি না।  অর্থমন্ত্রীর তথা সরকারের যুক্তির সঙ্গেও একমত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাসাবাড়িতে তথা আবাসিক খাতে মোট উৎপাদিত গ্যাসের সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয়িত হয়। সে কারণে আবাসিক খাতে মূল্য বাড়ানোর কোনো অজুহাতই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রাসঙ্গিক দ্বিতীয় তথ্যটি হলো, কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি দেশে উত্তোলিত বিপুল পরিমাণ গ্যাস বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের গ্যাস যাচ্ছে বিশেষ করে ভারতে। এর ফলেই আসলে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের কার্যক্রমও প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ, বিভিন্ন উপলক্ষে মন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীনদের অনেকেই জনগণকে বাসাবাড়িতে বোতলজাত করা এলপি গ্যাস ব্যবহার করার পরামর্শ শুনিয়ে বেড়িয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে আবার এলএনজির কথা শোনা যাচ্ছে।
বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে, এলপি গ্যাস ও এলএনজি ব্যবহারের পক্ষে ক্ষমতাসীনদের প্রচারণা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অনুসন্ধানেও তেমন কিছু তথ্যই বেরিয়ে এসেছে। জানা গেছে, বেশ কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি বহুদিন ধরে বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজি ও এলপি গ্যাস বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি করছে। বলা হচ্ছে, মূলত তাদের স্বার্থেই সরকার এলএনজি ও এলপি গ্যাসের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে, জনগণ যাতে আবাসিক খাতে এই গ্যাস ব্যবহার করে এবং কোম্পানিগুলো যাতে যথেচ্ছভাবে মুনাফা লুণ্ঠন ও জনগণকে শোষণ করতে পারে। বর্তমান পর্যায়েও বিইআরসির মাধ্যমে সরকার এমন অবস্থা সৃষ্টি করতে চাচ্ছে, জনগণ যাতে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে এলএনজি ও এলপি গ্যাস কিনতে বাধ্য হয়।
অন্যদিকে আমাদের আপত্তির কারণ হলো, বর্তমান সরকারের আমলে দলবাজ ও বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর হাতে নানাভাবে টাকার পাহাড় জমা হলেও সাধারণ মানুষের জন্য চাকরি ও ব্যবসার মতো আয়-রোজগারের কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি বললেই চলে। তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার বরং ক্রমাগত অবনতি ঘটেছে। তারা শেয়ার বাজারে লুণ্ঠিত হয়েছে, সঞ্চয়ী হিসাব থেকে মুনাফার হার কমিয়ে ব্যাংকিং খাতেও তাদের বঞ্চিত ও বিপন্ন করা হয়েছে। তাদের আয়-রোজগার অনেক কমে গেছে। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে বিশেষ করে আবাসিক গ্রাহকদের জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানোর অর্থ আসলে মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো নিষ্ঠুরতার নামান্তর মাত্র।
একই কারণে আমরা বছর না ঘুরতেই আবারও গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তটির বিরোধিতা করি। আমরা মনে করি, দাম বাড়ানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো জা¡লানি খাতে সিস্টেম লসের নামে চুরি ও লুণ্ঠন বন্ধ করা এবং এলএনজি ও এলপি গ্যাসের আমদানিতে দলীয় লোকজনকে প্রশ্রয় ও অগ্রাধিকার না দেয়া। সরকারকে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সংকট কাটিয়ে ওঠার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপও নিতে হবে। জাতীয় অর্থনীতি একেবারে মুখ থুবড়ে পড়ার আগেই উৎপাদন বাড়িয়ে বাসাবাড়িতে তো বটেই, শিল্প-কারখানাতেও গ্যাসের নতুন সংযোগ দেয়া এবং চাহিদা অনুযায়ী গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো দরকার। কেবলই দাম বাড়ানো কোনো সমাধান হতে পারে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ