ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 March 2018, ১ চৈত্র ১৪২৪, ২৬ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নিরাপদ খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ -পবা

স্টাফ রিপোর্টার : সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে, নাগরিকদের জন্য নিরাপদ খাদ্য, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এবং সুস্থ পরিবেশের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু রাষ্ট্র মানুষের এই অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস উপলক্ষে বুধবার বেলা ১১টায় রাজধানীতে এক সেমিনারে নেতৃবৃন্দ এ কথা জানান। পবার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে “নিরাপদ খাদ্য, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এবং সুস্থ পরিবেশের অধিকার নিশ্চিতকরণ” শীর্ষক এ সেমিনারের আয়োজন করে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন- পবা।
১৫ মার্চ বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস। ভোক্তা অধিকার ও চাহিদার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির একটি মাধ্যম হিসেবে দিবসটি বিবেচিত। এ বছর দিবসটির লক্ষ্য হচ্ছে- ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে সারা বিশ্বে ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থা ভোক্তাদের জন্য আরো অবাধ, নিরাপদ ও সুলভ করা। কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক বিকশিত অধিকারগুলো হলো- মৌলিক চাহিদার সন্তুষ্টির অধিকার, নিরাপত্তার অধিকার, জানার অধিকার, পছন্দ করার অধিকার, ভোক্তা শিক্ষা অধিকার, সুস্থ পরিবেশের অধিকার।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল বাজার ব্যবস্থায় অধিকতর স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণ’।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১২০টি দেশে ২৪০টির বেশি সংস্থা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করে আসছে।
দিবসটি উপলক্ষে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত সেমিনারে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-র চেয়ারম্যান আবু নাসের খানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক প্রকৌকশলী মো. আবদুস সোবহান মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
আবদুস সোবহান মূল প্রবন্ধে বলেন, ১৯৮৩ সাল থেকে বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস পালিত হচ্ছে। কনজুমার্স ইন্টারন্যাশনালের সফল প্রচারাভিযানের ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ ভোক্তা অধিকার নীতিমালা গৃহীত হয় এবং পরবর্তীতে ২০১৫ সালে তা সংশোধন করা হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে- নাগরিকদের জন্য অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, বিশ্রাম-বিনোদনের ব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা। জনগণের পুষ্টিবিধান ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধন। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন করা। সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও জনগণের মৌলিক চাহিদা বিশেষ করে নিরাপদ ও পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্য, নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা, সুস্থ পরিবেশ, ইত্যাদি এখনও নিশ্চিত হয়নি। বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা-অব্যবস্থাপনায় এ সকল মৌলিক চাহিদা আজ হুমকির মুখে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের এসব মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করে প্রতিশ্রুত সেবা নিশ্চিত করা।
বক্তারা বলেন, মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম হচ্ছে খাদ্য। দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য বিষমুক্ত ও নিরাপদ এবং পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রকে আমরা এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে দেখছি না।
তারা বলেন, অতি মুনাফা লোভী কৃষক, উৎপাদনকারী, মজুতকারী, পাইকারী ও খুচরা বিক্রেতা খাদ্যে রাসায়নিক দ্রব্যাদি, ডিডিটি, কীটনাশক, কাপড়ের রং, ফরমালিন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফেন, Hormone Growth ব্যবহার করছে। জনগণকে বাধ্য হয়ে এসব বিষাক্ত খাবার গ্রহণ করতে হচ্ছে এবং তারা নিরাপদ এবং পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১৬ ভাগ মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত খাদ্য গ্রহণের ফলেই কিডনি রোগ হচ্ছে। প্রতিমাসে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার রোগী দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। দীর্ঘদিন বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে গর্ভবতী মা ও তার পেটের ভ্রুণের ক্ষতি হয়, সন্তানও ক্যান্সার, কিডনিসহ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। এছাড়াও শিশু স্বল্পবুদ্ধি, স্মরণশক্তি কম ও অল্প বয়সে বৃদ্ধ হয়। প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হচ্ছে। খাদ্যের সঙ্গে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ গ্রহণের পর তা নিঃশেষ না হয়ে দেহের ভেতর দীর্ঘদিন জমা থাকে। ফলে এ বিষক্রিয়া বংশ থেকে বংশে স্থানান্তর হয়।
নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে নিম্নোক্ত করণীয় তুলে ধরা হয় পবার সেমিনার থেকে-
  বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবসকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া।
  ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা।
  খাদ্যে ভেজাল দেয়া ও রাসায়নিক দ্রব্যাদি মিশানো কিংবা মেয়াদোত্তীর্ণ বা ভেজাল ও রাসায়নিক দ্রব্যাদিযুক্ত খাবার বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত পণ্য আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী এবং লেবেল ছাড়া বা মিথ্যা লেবেলের অধীন পণ্য বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
  বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা ও প্যাথলজি ফি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নজরদারিতে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা। লাইফ সাপোর্টের নামে মৃত ব্যক্তিকে জিম্মি করে লাখ-লাখ টাকা লুটে নেয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করা।
  সরকারি হাসপাতালে যন্ত্রপাতি নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং বিভিন্ন পরীক্ষা নিশ্চিত করা।
  আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের আর্থিকভাবে সুবিধা প্রদান এবং ডাক্তারদের কনসালট্যান্সি ফি কমানোর ব্যবস্থা নেয়া।
 শিল্পকারখানায় বর্জ্য পরিশোনাগার স্থাপন এবং নিয়মিত তা পরিচালনা করতে মালিকদের বাধ্য করা এবং নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
 ভোক্তা অধিকার সংরক্ষেণে ভোক্তা, ব্যবসায়ী, সরকারি সংস্থাগুলোর ভোক্তা অধিকারের বিষয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার- প্রচারণার মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
 সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, পবা’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান অনুষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কামরুজ্জামান মজুমদার, পবা’র সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল, নাসফের সাধারণ সম্পাদক মো. তৈয়ব আলী, বানিপা’র সাধারণ সম্পাদক এমএ ওয়াহেদ, পবা’র সদস্য রাজিয়া সামাদ, মোস্তারী বেগম, কানিজ ফাতেমা, জনউদ্যোগ-এর সদস্য সচিব তারিক হাসান মিঠুল প্রমুখ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ