শনিবার ০৫ জুন ২০১০
Online Edition

রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল

রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিলেন জমিদার বাবু সুদর্শন চক্রবর্তী। আটটি বিষয়ে ৮০ নম্বরের বেশি পেয়ে তিনি তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদালয়ে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন। তার সমস্ত খাতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রশালায় সংরক্ষণ করা হয়। ১৮২৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত সুদর্শন বাবুর মতো অনেক ছাত্রই কলেজিয়েট স্কুলের নাম উজ্জ্বলতর করে যাচ্ছেন। শিক্ষানগরী হিসেবে রাজশাহী মহানগরীর গোড়াপত্তন হয় ১৮২৮ খৃস্টাব্দে ‘বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল' প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। মূলত ইংরেজি শিক্ষার প্রতিস্থাপনা ও প্রসারকল্পে রাজশাহীতে কর্মরত ইংরেজ কর্মকর্তা ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়, ‘বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল' যা এখন রাজশাহী গব. কলেজিয়েট স্কুল নামে সুপরিচিত। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে এটিই দেশের প্রথম স্কুল। যারা রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে পাস করেছেন তাদের ফলাফল নিয়ে সে সময় রাজশাহী থেকে প্রকাশিত এ অঞ্চলের প্রথম সংবাদপত্র হিন্দু রঞ্জিকা পত্রিকার খবর বের হতো। যেমন ১ ‘জানুয়ারি ১৮৮৭ তারিখের সংখ্যায় ছাপা হয়: এবার রাজশাহী জেলার উচ্চ শ্রেণী ইংরেজি স্কুল সমুদয় হইতে নিম্নলিখিত ছাত্রগণ উত্তীর্ণ হইয়াছে। পরীক্ষার ফল আশাতীত সন্তোষজনক হইয়াছে।' পত্রিকাটির ২২ জুন ১৮৮৭ তারিখে সংখ্যায় সুসংবাদ শিরোনামে ছাপা হয়: ‘এবার রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুুলের ছাত্র সুদর্শন চক্রবর্তী এন্ট্রান্স পরীক্ষোত্তীর্ণ ছাত্রগণের মধ্যে সুদর্শন চক্রবর্তীর ন্যায় সর্বজয়ী হওয়ায় আমরা সমধিক আনন্দ লাভ করিয়াছি। রাজশাহী কলেজের এই গৌরবে উত্তরবঙ্গ আজ গৌরবান্বিত হইয়াছি।' রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের দেড়শত বছর পূর্তি উপলক্ষে সিকান্দার আবু জাফর লিখেছেন, বৃটিশ শাসন আমলে তৎকালীন অখন্ড বাংলায় ১৮৩৬ সালের যে তিনটি স্কুল সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হয় তার মধ্যে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল একটি। অন্য দু'টির একটি হচ্ছে কলকাতার হেয়ার স্কুল এবং অন্যটি হচ্ছে মুর্শিদাবাদ ইংলিশ হাইস্কুল। ১৯৮৬ সালে দেড়শত বছর পূর্তির সময় বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক রমজান আলী তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, ১৮২৮ সালে নাটোর, দিঘাপতিয়া, পুঠিয়া, দুবলহাটি, বলিহার ও কাশিমবাজারের রাজা এবং জমিদারদের অনুপ্রেরণায় এই বিদ্যাপীঠের গোড়াপত্তন করা হয়। তখন এর নামকরণ করা হয় ‘বাউলিয়া ইংলিশ স্কুল'। ১৯৩৬ সারের ২০ জুন বিদ্যালয়টি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীনে আসে। ১৮৩৫ সালে বিদ্যালয়টি তৎকালীন সময়ে এদেশের শিক্ষা বিস্তারের ভারপ্রাপ্ত অধিকর্তা উইলিয়াম অ্যাডামের শিক্ষা বিবরণীর অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮৫৮ সালে এর ছাত্র সংখ্যা ২শ' থেকে বৃদ্ধি হয়ে ২শ' ১৫ হয়। ঐ বছরই বিদ্যালয়টি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করে। সেই সময় কোনও শিক্ষা বোর্ড ছিল না। অবিভক্ত বাংলায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রবেশিকা (বর্তমান এসএসসি) পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। এক পর্যায়ে বিদ্যালয়টির নবনির্মিত ভবনটি পদ্মা নদীর ভাঙনের কবলে পড়ে। এরপরে বিদ্যালয়টি একটি ভাড়া ঘরে চলতে থাকে। পুঠিয়ার রাজা যোগেন্দ্র নারায়ণের আর্থিক সহায়তায় ১৮৬২ সালে বিদ্যালয়টির বর্তমান জায়গায় কয়েকটি কক্ষ নির্মাণ করা হয়। ১৮৭৩ সালে বোয়ালিয়া সরকারি ইংলিশ স্কুলের সঙ্গে রাজশাহী মহাবিদ্যালয়ের দু'টি শ্রেণী সংযোজিত হয়। সম্ভবত তখন থেকেই এর নামকরণ করা হয় কলেজিয়েট স্কুল। পুঠিয়ার মহারাণী শরৎ সুন্দরী প্রদত্ত অর্থানুকূল্যে বিদ্যালয়ের আরো দু'টি কক্ষ নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ের তিনটি ও একটি কলেজের এটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত এই বিদ্যালয় রাজশাহী শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। ১৯৬৯ সাল থেকে এটি রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা পরিদফতরের উপ-পরিচালকের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৪ সাল থেকে এখানে প্রাতঃকালীন শাখা চালু করা হয়েছে। এই শাখায় তৃতীয় থেকে ষষ্ট শ্রেণী এবং দিবা শাখায় সপ্তম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। প্রাতঃকালীন শাখা গ্রীষ্মকালে সকাল সাতটা এবং শীতকালে সাড়ে সাতটায় বসে। দিবা শাখা বেলা ১২টায় বসে। এ বিদ্যালয়টিতেই ঐতিহাসিক রাজশাহী কলেজের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০০৮-০৯ সালের শিক্ষাবর্ষ থেকে স্কুলে আবার একাদশ শ্রেণী খোলা হয়েছে। প্রথম বর্ষে বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের ১১০ জন ছাত্র ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে কলেজ শাখায় কোন শিক্ষকও নিয়োগ দেয়া হয়নি। স্কুলের শিক্ষকরাই পাঠদান করছেন। বিদ্যালয়ে বর্তমানে এখন এই স্কুলের শিক্ষার্থী এক হাজার ৭শ'। শিক্ষক রয়েছে ৫৫ জন। রাজশাহী রেলস্টেশন বা বাস টার্মিনালে নেমে সোনাদিঘির মোড় বললে রিকশাওয়ালাকে আর কোনও ঠিকানা বরতে হয় না। রাজশাহী শহরের প্রাণকেন্দ্র সোনাদিঘির মোড়ে এলেই দেখা যাবে বিশাল ফটকের উপরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচটি ভবন। ফটক মাড়িয়ে ভেতরে যেতেই বাম পাশে পড়বে পাঁচতলা বিশিষ্ট ভবনটি। এটি সম্প্রতি উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণীর জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। পঞ্চম তলার নির্মাণ কাজ এখনো চলছেই। মাঠের দক্ষিণ দিকে রয়েছে লাল রঙের তিনতলা ভবন। পশ্চিম পাশে রয়েছে হলুদ রঙের তিনতলা ভবন। এই ভবনের সামনেই বেড়ে উঠছে বেশ কয়েকটি মেহগনি গাছ। এখানেই এখন বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে স্টল দেয়া হয়। মাটের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে করা হয়েছে একটি তিনতলা ছাত্রাবাস ও তার পাশেই রয়েছে প্রধানশিক্ষকের বাসভবন। এর সামনে দিয়ে বেড়ে উঠেছে বেশ কিছু মেহগনি গাছ। বিদ্যালয়ের মাঠে ঢুকে ১৮২ বছরের ঐতিহ্যের কিছুই হয়ত চোখে পড়বে না। কারণ, এখন আর নেই সেই পুরোনো ভবন। তবে বিদ্যালয়ের পূর্ব পাশ দিয়ে সেই সরুর রাস্তাটি এখনো রয়েছে। রাস্তার পাশের সেই সেলুনটি এখনো আছে। ওই সেলুনে সংরক্ষিত রয়েছে সেই চেয়ারটি সেখানে নাকি রাজশাহী কলেজের ছাত্র থাকার সময় জ্যোতি বসু শেভ করাতেন। তবে আগে বিদ্যালয়ের ফটক মাড়িয়ে বাইরে এলেই চোখে পড়ত উত্তর পাশের দিল খোলা সোনাদিঘি, এখন আর সেটি চোখে পড়বে না। দিঘিটি আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিশাল পৌর মার্কেট। আর বিদ্যালয় মাঠের তিনদিকে নতুন ঢঙের ভবন আগেকার বিশাল মাঠটি তিনদিকের ভবনের চাপে ছোট হয়ে এসেছে। সারাদিন এই মাঠ মুখর করে রাখে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী। -সোহরাব হোসেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের সাবেক ছাত্র এবং শিক্ষকদের কয়েকজন গত কয়েক দশকে এই স্কুল থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কৃতিত্বের সঙ্গে বের হয়েছেন। তৈরি হয়েছে অসংখ্য শিল্পী, খেলোয়াড়, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। আন্তর্জাতিক বিশ্বেও এ স্কুলের অনেক শিক্ষার্থী ঈর্ষণীয় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। এ বিদ্যালয়ের ছাত্র স্যার যদুনাথ সরকার ১৮৮৭ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে অধ্যাপনা শুরু করেন। এরপর উপমহাদেশের বিভিন্ন খ্যাতনামা কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন। ১৯২৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হয়েছিলেন। এই বছর তিনি বোম্বের এশিয়াটিক সোসাইটির সুবর্ন পদক পান এবং সিআই উপাধি লাভ করেন। এর আগেই ১৯২৩ সালে বিলাতের রয়েল এশিয়াটিক সোসাইট তাকে সম্মানিত সদস্য মনোনীত করে। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হলেও ইতিহাসে অসাধারণ দখল রাখতেন। তিনি ভারতে মোগল শাসন এবং শিবাজী সম্বন্ধে মৌলিক গবেষণার কাজ করেছেন। তার রচিত আরঙ্গজেবের পাঁচ খন্ড ইতিহাস এবং শিবাজীর জীবনী গ্রন্থ অনুসন্ধানী ও মৌলিক ইতিহাস গ্রন্থ হিসাবে স্বীকৃত। রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের গৌরবোজ্জ্বল ১৮২ বছরের বৃহৎ পরিসরে অনেক প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব এ স্কুলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ পর্যন্ত যারা এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন তাঁদের মধ্যে সারদা প্রসাদ বোস মি. রিজ শ্রী হরগোবিন্দ সেন, যদুনাথ মুখার্জী, কালিনাথ দে, গবিন্দ চন্দ্র মৈত্র, কালি কুমার দাস, লোকনাথ চক্রবর্তী, শশি ভুষন সেন, জয় গোপাল দে, রাজেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, আহসান উল্লাহ খান বাহাদুর, ব্রজবল্লব দত্ত, অভয় চরণ দাশ, চিন্তাহরণ চক্রবর্তী, বিরেন্দ্রনাথ সেন, প্রসন্ন কুমার দেব, বিজয় চন্দ্র সেন, মান মোহন সেন গুপ্ত, আসাদ আবদুল মাহমুদ, হেদায়েতুল ইসলাম, বিজয় কুমার ভট্টচার্য, এম খলিল, এমএ লতিফ, একেএম হাশেম, আব্দুল জববার আহাম্মেদ, এম এমরান আলী, আব্দুর রাজ্জাক, ইজহারুল হক, এমকে রহমান, রশিদ আহমদ, বাহাদুর আলী সরকার, ইজাবুল হক ও রমজান আলীর নাম উল্লেখযোগ্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ