ঢাকা, বৃহস্পতিবার 15 March 2018, ১ চৈত্র ১৪২৪, ২৬ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ফুটবলারদের ক্ষতি করছে!

মাহাথির মোহাম্মদ কৌশিক : আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশের অবস্থান এখন কোথায় সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। র‌্যাংকিং বাড়তে বাড়তে প্রায় দুইশ ছুঁয়েছে লাল সবুজ পতাকাধারী দলটির। তবে তা কিন্তু বোঝা যায়না ঢাকার ফুটবলের দিকে তাকালে। টাকায় টাকায় যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে ঢাকার ঘড়োয়া ফুটবল। জাতীয় দল বিরামহীনভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও তাতে বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়েনি ক্লাব ফুটবলে। খেলোয়াড়রা ঠিকই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছেন বিভিন্ন দলে। পেশাদারিত্বের মোড়কে চলা বাংলাদেশের ফুটবল কতটা অপেশাদারী হাতে পারে সেটা দলবদল আসলে আরো একবারের মতো পরিস্কার হয়ে যায়। দেখা যায় পুরো মৌসুমে ২/৩টি গোল করেই দাম হাঁকাচ্ছেন ৩৫/৪০ লাখ টাকা। ক্লাবগুলোও বাধ্য হয়েই খেলোয়াড়দের দলে নিচ্ছেন। এমনিতে বিশ্ববাজারে খেলোয়াড়দের দাম বাড়ছে হু হু করে। সেই উত্তাপ কিছুটা হলেও লেগেছে বাংলাদেশের ফুটবলে। এই যেমন পেশাদার ফুটবল শেষে গত ১৩ জানুয়ারী শেষ হয় ঘড়োয়া মৌসুম। স্বাধীনতা কাপই ছিল শেষ আসর। সেখানে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চারিদিকে হৈ চৈ ফেলে দেয় আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ। বয়সে তরুন এসব খেলোয়াড়রা আগামী মৌসুমের জন্য বড় দলগুলোর নজরে চলে এসেছেন। আগামী মৌসুম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে। আর দলগুলো এরই মধ্যে অনেকটাই ঘর গুছিয়ে ফেলেছে। জুনের শেষে আগামী মৌসুমের দলবদল শুরু হবে। ফলে দলবদলের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতে এখনো প্রায় চার মাসেরও কম সময় বাকি। অথচ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে ক্লাবগুলোর তোড়জোড়। ফুটবল অঙ্গনে উড়ছে টাকা। পেশাদার ফুটবলে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্তর্ভুক্তিতেই মূলত এমনটা হচ্ছে। শুধু ফুটবলারই নয়, কোচদের দলে টানতেও দেয়া হচ্ছে কোটি টাকার প্রস্তাব। দেশের ফুটবলে এসব ইতিবাচক দিক হলেও অনেকেই এটাকে অপাত্রে কন্যা দান বলছেন। ২০১০-১১ মৌসুমে ধানমন্ডি ক্লাবকে নাম বদলে শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবে রূপান্তরিত করা হয়। প্রথম মৌসুমে পেশাদার লিগের জন্য দল গঠন করতে গিয়ে ফুটবলারদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দিয়েছিলেন তৎকালীন সভাপতি মনজুর কাদের। এমননিতে মানসম্পন্ন ফুটবলারের অভাব থাকা বাংলাদেশের ফুটবলে ক্লাবগুলোকে অনেক কষ্ট করে দল গঠন করতে হয়। সে সময় জাতীয় অধিকাংশ ফুটবলারদের দলে ভিড়িয়ে চমকও দেখায়। তখন আবাহনী, মোহামেডান, শেখ রাসেল, মুক্তিযোদ্ধা, ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো দলগুলোকে মাঝারি মানের দল গঠন করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে খেলোয়াড়রা বাংলাদেশের জন্য বড় কোন অবদান রাখতে পারেন না তারাই উচ্চমূল্যে বিকছেন। কারো কারো ক্ষেত্রে ইনজুরি লুকিয়ে খেলারও অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা একটা মৌসুমে শেষ হওয়ার আগেই পরের মৌসুমের জন্য দল খোজা শুরু করে দেন তারা। এটাকে যদিও অপেশাদারী মনোভাব বলা যাবেনা, তবে এক মৌসুমে দলের জন্য পুরোপুরি অবদান না রাখারা অভিযোগও বেশ পুরনো। শেখ জামালের পর ২০১২-১৩ মৌসুমে শেখ রাসেল সেরা দল গড়তে আগের ক্লাবের ধারা ধরে রাখেন। পেশাদার যুগে প্রবেশের পর এই প্রথম কোন ক্লাব ট্রেবল জয়ের কৃতিত্ব অর্জন করে। এরপর সর্বশেষ মৌসুমের জন্য নবাগত দল সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেড বড় দল গড়ে। লিগ চ্যাম্পিয়ন রেসে টিকে থাকা দলটি যদিও কোন সাফল্য পায়নি। তপু বর্মনের মতো ডিফেন্ডারকে ৫৮ লাখ টাকায় দলে ভিড়িয়েছিল দলটি। অথচ এই খেলোয়াড়কে আগের মৌসুমের জন্য শেখ রাসেল অফার করেছিল ৪২ লাখ টাকা। নতুনের সেই ধারা এবার ধরে রেখেছে বসুন্ধরা কিংস। মৌসুম শুরুর পাঁচ মাস আগেই ঘর গুছিয়ে ফেলেছে চ্যাম্পিয়নশীপ লিগ থেকে শিরোপা জয় করে আসা দলটি। এখন অনেকটাই প্রতীয়মান হচ্ছে, একেকটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান একটা করে দল নিয়ে মাঠে নামবে আর ফুটবলারদের পারিশ্রমিকও বাড়তে থাকবে। শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের স্পোর্টিং ডিরেক্টর সালেহ জামান সেলিম বাংলাদেশের ফুটবলে পরিচিত সংগঠকদের একজন। ক্লাবটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জড়িয়েছে রয়েছেন তিনি। গত মৌসুমে দল গঠন করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে তাকে। দেশের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরা গ্রুপ পাশে থাকার পরও ভালমানের দল গঠন করা সম্ভব হয়নি। এবার কিছুটা আগেভাগে মাঠে নেমে দলগুছিয়ে ফেলেছে। ১০ কোটি টাকা বাজেট নিয়ে মাঠে নামা এরই মধ্যে সাড়ে আট কোটি টাকা খরচও করে ফেলেছে। দল হিসেবে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে এবার সর্বোচ্চ ৬০ লাখ টাকা দিয়ে দলে নিয়েছে গোলরক্ষক আশরাফুল ইসলাম রানা। খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘খেলোয়াড়রা মাঠে কষ্ট করে খেলে, তারা টাকা পাবে এতে আমাদের কোন সমস্যা নেই। দল গঠন করতে গেলে তো টাকা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। কিন্তু যে খেলোয়াড়টি তার যোগ্যতা থেকে বেশি অর্থ পায় তার তো ভাল করার আগ্রহ কমে যায়। যারা বেশি পাওয়ার তাদেরকে তো ঠকানো হচ্ছেনা। কিন্তু ভালমানের ফুটবলার না থাকায় তারা সুযোগ নিচ্ছে’। গত মৌসুমে ভাল দল গড়েও সাফল্য না পাওয়া সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘খেলোয়াড়দের টাকা দেওয়ার জন্যই আমাদের ক্লাব তৈরি আছে। গত মৌসুমে দল গড়তে গিয়ে দেখেছি কিভাবে খেলোয়াড়রা নিজেদের জাহির করে। কিন্তু মাঠে তার ফল কতটা পেয়েছি সেটা আপনারা ভাল করেই জানেন। খেলোয়াড়দের টাকা দিতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু যোগ্যতাসম্পন্ন ক’জন খেলোয়াড় বাংলাদেশে রয়েছে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়’। দুই ক্লাব কর্তাই বলেছেন ক্লাবগুলো যদি নিজেরা একাডেমী করে তবে ভালমানের খেলোয়াড়ের সংকট যেমন থাকবেনা ঠিক তেমনি পারিশ্রমিকের এই হার তুলনামূলকভাবে কমে আসবে। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে সারাদেশে তোলপাড় হয়েছিল মোনেম মুন্নার পারশ্রমিক। সে সময় প্রায় ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে আবাহনীতে থেকে গিয়েছিলেন এই ডিফেন্ডার। সে সময় মুন্না ভারতের ইষ্টবেঙ্গলে খেলেছিলেন। এছাড়া নিয়মিতই খেলেছিলেন চট্টগ্রামের লিগে। মুন্নার সেই পারিশ্রমিক নিয়েও সে সময় আলোচনা হয়েছিল। সে সময় হয়তো মোহামেডানে যোগ দিলে ত্রিশ লাখ টাকা পেতেন মুন্না! ক্লাবের প্রতি ভালবাসায় আবাহনী ছেড়ে অন্য কোন ক্লাবে যাননি মুন্না। আর এখনকার খেলোয়াড়দের ক্লাবের প্রতি কোন দরদই লক্ষ্য করা যায়না। সে কারণে এক মৌসুম খেলার পর পরের মৌসুমের জন্য নতুন দলের সন্ধানে থাকেন তারা। আর অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ফুটবলের ক্ষতি করছে বলে মনে করেন সাবেক স্ট্রাইকার শেখ মোহাম্মদ আসলাম। কিছুটা ক্ষোভ নিয়ে তিনি বলেন, ‘খেলোয়াড়রা বেশি টাকা পেলে সাবেক একজন খেলোয়াড় হিসেবে আমারই ভাল লাগে। কিন্তু কারা টাকা পাচ্ছে সে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে। ভালমানের একজন খেলোয়াড়কে বেশি টাকা দিলে কারো কোন কথা থাকতোনা। যে ষ্ট্রাইকার পুরো মৌসুমে খেলে ৩/৪ টি গোল করে তাকে আপনি কেন ৩০ লাখ টাকা দিয়ে দলে নেবেন। আর আমাদের ক্লাবগুলোরও কিছু করার থাকেনা’। আরেক সাবেক ফুটবলার আব্দুল গাফ্ফার বলেন, ‘আমরা যখন খেলেছি তখন টাকার নিজেকে কিভাবে মেলে ধরা যায় সেই চিন্তাই বেশি করেছি। ফুটবলে টাকা থাকলে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়রা আগ্রহী হবে। ফুটবল খেললে অর্থ উপার্জন করা যায় সে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে নতুন প্রজন্মের মধ্যে। কিন্তু অযোগ্যরা টাকা পেলে ভালো ফুটবলার হওয়ার তাগিদটা কমে যাবে। তখন খেলা নয়, নজর চলে যাবে টাকার দিকে। এখন তো দেখছি সেটাই হচ্ছে। ক্লাবগুলো অপাত্রে টাকা ঢালছে। এটাই সবচেয়ে ফুটবলের বড় ক্ষতির দিক’। গত মৌসুমে দেদার টাকা ঢেলেও কোন সাফল্য পায়নি সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব। সাফল্য বলতে গেলে প্রথমবারের মতো এএফসি কাপ প্রাক বাছাইয়ের খেলা। সেখানেও হোম ও অ্যাওয়ে দু’ম্যাচেই পরাজয়ের স্বাদ নিতে হয়েছে মালদ্বীপের টিসি স্পোর্টিং ক্লাবের বিপক্ষে। এক মৌসুম পরই উপলব্দি হয়েছে টাকা দিয়ে ভাল দল গড়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। দরকার ভালমানের ফুটবলার। সেই পথেই এবার হাটছে নতুন দলটি। এবার দলবদলের অনেক আগেই ক্লাবটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছেন তারকার পেছনে ছুটবেন না। নতুন ফুটবলারদের দিকে মনোযোগী এই সংগঠক বলেন, ‘বাংলাদেশের ফুটবলের যে অবস্থা সেখানে তারকা ফুটবলার কাকে বলা যেতে পারে সে বিষয়টি নিয়ে আমার আপত্তি আছে। নামহীন এসকল তারকা খেলোয়াড়দের পেছনে না ছুটে নিজেদের বয়সভিত্তিক দুটি দল এবং বাইরের কিছু তরুণ খেলোয়াড় এবার দলে নেব। বড় সুবিধা হলো মূল দলের পাইপলাইন হিসেবে আমাদের দুটি বয়সভিত্তিক যে দল আছে সেখান থেকেই ফোকাসটা থাকবে। এছাড়া গতবার যে ১৪ জন রয়েছে তাদের একটু ঝালিয়ে নিতে পারব’। প্রিমিয়ার লিগে মূল দলের পাশাপাশি সাইফের অনূর্ধ্ব-১৮ ও অনূর্ধ্ব-১৬ দল রয়েছে। এবার সেদিকে নজর রয়েছে ক্লাবটির। বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশীপ লিগ (বিসিএল) থেকে প্রথমবারের মতো পেশাদার লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে বসুন্ধরা কিংস। জাতীয় দলের সাবেক তারকা ষ্ট্রাইকার রোকনুজ্জামান কাঞ্চনের নেতৃত্বে বড় সাফল্য পায় দলটি। মৌসুম শুরু হতে কয়েক মাস বাকি থাকলেও এরই মধ্যে দল গঠনের কাজ শুরু করে দিয়েছে তারা। সর্বশেষ মৌসুমে যে ভুমিকায় ছিল সাইফ স্পোর্টিং এবার ঠিক একই ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে বসুন্ধরা কিংস। দলটি এবার কিছুটা হলেও আটঘাট বেধেঁই নেমেছে দল গঠনের জন্য। ক্লাবটির সভাপতি ইমরুল হাসান সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করেই দল গঠন করতে চান, ‘দেশের ফুটবলের মান কোন অবস্থায় রয়েছে সেটা আমাদের সবারই কমবেশি জানা। আমাদের চেয়ারম্যান মহোদয়সহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চাইছেন ফুটবলের এই দঃসময় কাটিয়ে যাতে সু’সময় ফিরে আসে’।
পাইওনিয়ার ফুটবল লিগ দিয়ে যাত্রা শুরু করে গত মৌসুমে বাফুফের পেশাদার লিগ কমিটির কাছে আবেদন করে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ খেলতে। এরপর এ বছর প্রিমিয়ারে উত্তরণ ঘটেছে। অভিষেক মৌসুমে লিগ শিরোপা জেতা নয়, চারিদিকে সাড়া ফেলতে চায় তারা। একটি টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতা নয়, সাড়া ফেলতে চায় ক্লাবের পরিচিতিটা বাড়িয়ে। এ জন্যই আনুষ্ঠানিক দলবদলের বেশ আগেই মাঠে নেমে দল গোছানোর কাজটাও শুরু করে দিয়েছে। আবারো মোটা অংকের পারিশ্রমিক পাচ্ছেন খেলোয়াড়রা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ঢাকার ফুটবলে কতটা টাকা? যা দিয়ে সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন যা হওয়ার তা হচ্ছে ফুটবলারদের, দেশের ফুটবলের নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ