ঢাকা, শুক্রবার 16 March 2018, ২ চৈত্র ১৪২৪, ২৭ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

নজরুল ও জসীমউদ্্দীন

আবদুল মান্নান সৈয়দ : মুসলমান সমাজের এই দুই তরুণ শিল্পী সম্বন্ধে মত প্রকাশ করবার সময় এখনো বহু দূরে থাকুক, কিন্তু এঁরা ধন্য হয়েছেন এই জন্য যে, একালের মুসলমান সমাজের অন্তরে তার সাহিত্যিক সার্থকতা সম্বন্ধে এক নব আশার সঞ্চার এঁরাই করতে পেরেছেন। [‘বাংলা সাহিত্যের মুসলিম ধারা,’ ‘শাশ্বত বঙ্গ’]

১৯৩৯ সালে কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ও কবি জসীমউদ্্দীন (১৯০৩-৭৬) সম্পর্কে এই মন্তব্য করেছিলেন সমকালের সমালোচক কাজী আবদুল ওদুদ। বাঙালি মুসলমানের বিলম্বিত আধুনিক কাব্যযাত্রা শুরু হয় কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) থেকে। মানতেই হয়, গদ্যে বাঙালি-মুসলমান প্রথমাবধি যতোখানি দক্ষতা দেখিয়েছে, কবিতায় তা পারেনি। নজরুলের অব্যাহতি আগে দুজন মাত্র কবির রচনায়- শাহাদাৎ হোসেন (১৮১৩-১৯৫৩) ও গোলাম মোস্তফার (১৮৯৭-১৯৬৪) কবিতায়-খানিকটা কাব্য-আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু নজরুল ইসলামের প্রথম এবং জসীমউদ্্দীনের- কাজী আবদুল ওদুদের সমকালীন সাক্ষ্য থেকে বুঝতে পারছি, বৃহত্তর বাঙালি মুসলমানের মনে সাহিত্যিক চরিতার্থতা সম্বন্ধে বিশ্বাস ও উৎসুক্য জন্মায়। আর সমগ্র বাংলা সাহিত্যের পরিধিতে এঁরা দুজন- নজরুল ও জসীমউদ্্দীন একটু আগে পরে কলকাতার পরিশীলিত সাহিত্যজগতে খানিকটা অমার্জিত কিন্তু অনেকখানে বিস্ময়কর নতুনত্ব নিয়ে উপস্থিত ছিলেন।

কবি-সমালোচক সঞ্জয় ভট্টাচার্য একবার বলেছিলেন, নজরুল ইসলামের পর জসীমউদ্্দীনের আবির্ভাব যেন নায়কের পর চিত্রশিল্পীর অভ্যুদয়। কথাটি অলংকৃত কিন্তু গভীর সত্যবান। নজরুলের যৌবন-উন্মাদ উত্তাল ধ্বনিময়তার পর জসীমউদ্্দীনের কবিতার শান্ত চিত্রধর্মিতা সত্যিই লক্ষ্য করার মত। বয়সে জসীমউদ্্দীন নজরুলের কয়েক বছরের ছোটো ছিলেন। নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ সালে, জসীমউদ্্দীনের জন্ম ১৯০৩ কি ১৯০৪ সালে। নজরুলের জন্ম বর্ধমানের এক গ্রামে, জসীমউদ্্দীনের ফরিদপুরের এক গ্রামে। বিশের দশকে দুজনেই বিকশিত হয়েছিলেন কলকাতায়। নজরুলের সাহিত্যিক বিকাশ ও বলয় কলকাতায়- মাত্র তেইশ-চব্বিশ বছরে; আর জসীমউদ্্দীন কলকাতা ও উত্তরকালে ঢাকায় চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন বছর ধরে। একই বছরে একই স্থানে, ১৯৭৬ সালে ঢাকায়, মার্চ ও আগস্টে, দুজন মৃত্যুবরণ করেন। শেষ পর্যন্ত এঁরা দুজন দুই প্রজন্মের কবি, নজরুল বিশের দশকের, জসীমউদ্্দীন তিরিশের দশকের। দুজনের দুটি চারিত্রচিহ্নজ্ঞাপক অনপনেয় অভিধা চিরকালের মত মুদ্রিত হয়ে গেছে, ‘বিদ্রোহী কবি’ আর ‘পল্লী কবি’। দুজনের মধ্যে পার্থক্য অনেক, কিছু কিছু বিস্ময়কর সাযুজ্য আছে; দুই কবিই যে সাহিত্য জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন এক সময়, হারানো পত্রিকার পৃষ্ঠায় তার সাক্ষ্য আছে। সে জন্য অনেক সময়ই তারা সমকালীন সমালোচকদের (কাজী আবদুল ওদুদ, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, হুমায়ুন কবির) লেখায় একই সঙ্গে উচ্চারিত করেছেন। 

২. পরস্পরের চোখে

নজরুল ও জসীমউদ্্দীন কী চোখে পরস্পরকে দেখেছিলেন, সেটা দেখা যাক আগে।

বেনজীর আহমদের ‘বন্দীর বাঁশী’ বইয়ের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন কবি। বেগম সুফিয়া কামালের ‘সাঁঝের মায়া’, আবদুল কাদিরের ‘দিলরুবা’, মোহাম্মদ সুলতানের ======== ‘শেকওয়া ও জওয়াবে শেকওয়া’ প্রভৃতির ‘গুণালোচনা’ (আবদুল কাদিরের ভাষায়Ñ করেছিলেন। ২রা জানুয়ারি ১৯২৯ সালে একটি পত্রে কবি আবদুল কাদিরকে নজরুল লিখেছিলেন, ‘তুমি আর জসীম যেন একই নদীর জোয়ার-ভাটা, একই ¯্রােতের রকমফের।’ ৫ই অক্টোবর ১৯২৯ সালে কবি আজিজুল হাকিমকে (যিনি পরে নজরুলের প্রথমা স্ত্রী নার্গিস আসার খানমকে বিবাহ করেন) নজরুল এক চিঠিতে লিখেন, ‘জসীম, কাদির প্রভৃতিকে আমি ভালোবাসি আমার চেয়ে।’ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ নজরুলের সিলেট সফর প্রসঙ্গে একটি স্মৃতিচারণায় লিখেছেন:

সেদিন নজরুল ইসলাম তার [বেনজীর আহমদের] কবি প্রতিভার প্রশংসা উপলক্ষে বলেছিলেন, তাঁর [নজরুলের] পরে আমাদের মুসলিম সমাজে যে দুজন কবির অভ্যুদয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তার মধ্যে একজন হলেন জসীমউদ্্দীন, অপরজন বেনজীর আহমদ। এদের প্রতিভা প্রসঙ্গে কবি বলেছিলেন, জসীম আমাদের গ্রাম্য জীবনকে তার তুলির আঁচড়ে মূর্ত করে তুলেছে এবং যারা ছিল সমাজের মধ্যে অপাংক্তেয় তাদের জীবনের চিত্রকে ভদ্র, জীবনের সামনে জীবন্ত করে পেশ করেছে। বেনজীর তারই ধারায় অগ্রসর হয়ে অর্ধমৃত জাতির মধ্যে আবার প্রাণসঞ্চার করেছে। 

[জামালউদ্দীন মোল্লার ‘চেনা-অচেনার বেনজীর ও অন্যান্য’]

কোনো স্মৃতিকথা বা আত্মজীবনী লেখার সময় পাননি নজরুল, যেখানে জসীমউদ্্দীনের প্রসঙ্গ থাকতে পারতো। তবে, আমাদের জন্য আনন্দের কথা যে, জসীমউদ্্দীনের জবানিতে নজরুলের সঙ্গে তার সম্পর্ক মূর্ত হয়ে উঠেছে তার ‘ঠাকুর বাড়ির আঙিনায়’ (প্রথম প্রকাশ ; ১৯৬১, দ্বি সং ১৯৬৩) গ্রন্থের ‘নজরুল’ শীর্ষক স্মৃতি রচনায়। প্রথম সাক্ষাতে নজরুলকে জসীমউদ্্দীন তার কবিতার খাতা দেখতে দিয়েছিলেন, নজরুল তখন থাকেন বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে। ঐ খাতা দেখে নজরুলের প্রতিক্রয়া জসীমউদ্্দীন লিপিবদ্ধ করেছেন:

কবিকে আমি আমার কবিতার খাতাখানি পড়িতে দিলাম। কবি দুই একটি কবিতা পড়িয়াই খুব উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিলেন। আমার কবিতার খাতা মাথায় লইয়া নাচিতে আরম্ভ করিলেন। আমার রচনার যে স্থানে কিছুটা বাকপটুতা ছিল, সেই লাইনগুলি বারবার আওড়াইতে লাগিলেন।

পরে নজরুলের চেষ্টাতেই জসীমউদ্্দীনের কয়েকটি কবিতা ‘মোসলেম ভারত, ‘সাধনা’ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এমনকি যে নজরুল একটি চিঠিতেই একবার জানিয়েছিলেন, ‘আমি চিঠি পেয়ে তার উত্তর না দিয়েই আমার অভদ্রতার প্রিন্সিপাল রক্ষা করি।’ তিনিও সদ্যাগত তরুণ কবি জসীমউদ্্দীনকে কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন। যে একটি মাত্র নজরুলের চিঠি জসীমউদ্্দীন উদ্ধৃত করেছেন তাও এই প্রসঙ্গে উৎকলনযোগ্য:

তাই শিশু কবি,

তোমার কবিতা পেয়ে খুশী হলুম। আমি দক্ষিণ হাওয়া। ফুল ফুটিয়ে যাওয়াই আমার কাজ। তোমাদের মত শিশু কুসুমগুলিকে যদি আমি উৎসাহ দিয়ে আদর দিয়ে ফুটিয়ে তুলতে পারি, সেই হবে আমার বড় কাজ। তারপর আমি বিদায় নিয়ে যাব আমার হিমগিরির গহন বিবরে।

বিভিন্ন উপলক্ষে নজরুল কয়েকবার গিয়েছেন ফরিদপুরে, জসীমউদ্্দীনের বাড়িতেও থেকেছেন। জসীমউদ্্দীনের বাড়িতে থেকে নজরুল ‘বালুচর’ নামে একটি কাব্যগ্রন্থ রচনার পরিকল্পনাও করেছিলেন, যেমন তিনি চট্টগ্রামে হাবিবুল্লাহ বাহারদের বাড়িতে থেকে ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ (১৯২৭) ও ‘চক্রবাক’ (১৯২৯)-এর অনেকগুলি কবিতা লিখেছিলেন। নজরুলের পক্ষে সেটা আর লেখা হয়নি, কিন্তু জসীমউদ্্দীনের একটি কবিতাগ্রন্থের নাম দেখতে পাচ্ছি : ‘বালুচর’ (১৯৩০)। ফরিদপুরে পদ্মানদীর তীরে বসে একটি কবিতাও নজরুল লিখে দিয়েছিলেন জসীমউদ্্দীনকে। কবিতাটি জসীম হারিয়ে ফেলেছেন, কিন্তু স্মৃতি থেকে তার অপরূপ দুটি পংক্তি উদ্ধৃত করেছেন:

আকাশেতে একলা দোলে একাদশীর চাঁদ,

নদীর তীরে ডিঙি-তরী পথিক-ধরা ফাঁদ।

 

ব্যক্তি নজরুল সম্পর্কে জসীমউদ্্দীনের ধারণা:

যখন যেখানে তাহাকে দেখিয়াছি, স্বমহিমায় তিনি সমুজ্জ্বল। বড় প্রদীপের কাছে আসিয়া ছোট প্রদীপের যে অবস্থা, আমার তাহাই হইত। অথচ গুণপনাকে এমন অকুণ্ঠ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করিতে নজরুলের মত আর কাহাকেও দেখি নাই। অপর কাহারও প্রশংসা করিতে পারিলে তিনি যেন কৃতার্থ হইয়া যাইতেন। 

আর নজরুল কিভাবে অসুস্থ কবিকে গ্রহণ করেছিলেন-

আমি কবির কোন রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয় নই। তবু, কবি আমাকে আপন ভাইয়ের মত তার গৃহের একজন করিয়া লাইলেন।... যখনই কবিগৃহে গমন করিয়াছি, কবি-পতœীর ব্যবহারে তাহাদের গৃহখানি আমার আপন বলিয়া মনে হইয়াছে। অগ্রজ কবির প্রতি জসীমউদ্্দীনের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ঐ স্মৃতিচারণার ছত্রে ছত্রে প্রকাশিত। নজরুলকে বারবার তিনি ‘বয়স্ক-শিশু’ বলে অভিহিত করেছেন।

‘ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়’-এর ‘নজরুল’ নামাঙ্কিত রচনায় জসীমউদ্্দীন তাকে বলেছিলেন, ‘মুসলিম সমাজের শ্রেষ্ঠ কবি’। নজরুলের মূল্যায়নমূলক একটি অসম্পূর্ণ প্রবন্ধও লিখেছিলেন জসীমউদ্্দীন ১৯৬৩ সালে। এই রচনায় জসীমউদ্্দীন একটি নতুন দৃষ্টিপাতে দেখেছেন নজরুল ইসলামকে। এই রচনার প্রথম বাক্যটিই বিস্ময়কর (প্রথম অনুচ্ছেদের অনেকখানি উদ্ধৃত করছি) নজরুলের দেশাত্মবোধক কবিতাগুলির অধিকাংশই প্রবন্ধ, কবিতাকারে রচিত। এখানে সুন্দর কথা নয়, ভাল কথা পদ্যাকারে রচিত। কডওয়েলের ভাষায় এগুলিকে ‘ঐবরমযঃবহবফ ষধহমঁধমব’ বলা যাইতে পারে। কবি তার জন্মকালে সমাজের দলপতিরা যেসব কথা সকলকে জানাইবার প্রয়োজন মনে করিতেন, তাহা এই ‘ঐবরমযঃবহবফ ষধহমঁধমব’-এ রচিত হইত। মানুষের প্রয়োজনে এগুলি রচিত হইত বলিয়া প্রয়োজন ফুরাইলে আর সেগুলির অস্তিত্ব থাকিত না। কিন্তু সেগুলির ভিতর দিয়া যে ছন্দ ও প্রকাশভঙ্গিমা ফুটিয়া উঠিত, পরবর্তী যুগের লোকেরা তাহা অন্য কথা প্রচার করিতে ব্যবহার করিত। নজরুলের দেশাত্মবোধক কবিতাগুলি যদিও ভাল কথা বলিবার প্রয়োজনে রচিত হইয়াছে, তবু তাহার মধ্যে একটা কাঁথার রঙিন নকশার মত মাঝে মাঝে এমন সুন্দর কথা আছে তাহা যে কোন পাঠককে মুগ্ধ করিয়া তোলে।

প্রবন্ধটিতে জসীমউদ্্দীন ‘ভাল কথা’ ও ‘সুন্দর কথা’ এই দুই শব্দপুঞ্জ নিয়ে খেলা করেছেন। এ থেকে জসীমউদ্্দীনের কাব্যাদর্শও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভালো কথা, প্রয়োজনের কথা, উপযোগিতার কথা, কবিতার কথা সাহিত্যে জসীম স্বীকার করেন, কিন্তু তিনি ভালোবাসেন সুন্দর কথা অর্থা’ সৌন্দর্য, মাধুর্য। নজরুল তাৎক্ষণিকতাকে ব্যবহার করেন, সমকালকে অতিক্রম করেন। আর জসীমউদ্্দীন প্রেম-বিরহ-মৃত্যুর মত চিরন্তন বিষয় ছেঁকেই নির্মাণ করেন সৌন্দর্য। জসীমউদ্্দীন চিরন্তনকে তার বেদনা ও মাধর্য সমেত পুনরাবিষ্কার করেন; আর নজরুল সমকাল থেকে উড়াল দেন চিরন্তনত্বে, সমকালের মধ্যেই এমন তীব্রভাবে প্রবিষ্ট হন যে চিরদিনের বেদনা-আনন্দ-বিদ্রোহ রূপায়িত হয়ে যায়।

নজরুল তার কবিতায় বাঙালি-মুসলমানদের জন্য কি অসাধ্য সাধন করেছিলেন, সমকালীন জসীমউদ্্দীন তার প্রতত্যক্ষ সাক্ষী:

দেশের লোকসাহিত্য ছাড়া ইতিপূর্বে বাঙালি ভদ্র মুসলমানদের টুপি চাপকান বর্জিত বিক্ষুব্ধ বাঙলা সাহিত্য-সাধনা শুধুমাত্র মুসলমান সমাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। নজরুল তার রোগা চাপকান টুপিসহ হিন্দুর অন্দরমহলে প্রবেশ করিলেন। ইহার পরে মুসলমানী বিষয়বস্তু লইয়া নজরুল কবিতার পর কবিতা রচনা করিয়া চলিলেন। বাঙলা সাহিত্য নজরুলের আরবি ফারসি শব্দের মেহেদী পরিয়া নববধূর মত রাঙা টুকটুকে হইয়া উঠিল। 

নজরুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা ‘বিদ্রোহী’ (অগ্নিবীণা) সম্পর্কে জসীমউদ্্দীন বলেন, এই কবিতা শুধু ভাবের দিক দিয়েই বাঙলা সাহিত্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করিল না; ভাষা, ছন্দ এবং ধ্বনিতরঙ্গের ভিতর দিয়েও এই কবিতা বাঙলা সাহিত্যে এক নতুন সুর আনিয়া দিল। ‘বিদ্রোহী’ কবি তার ভাবধারা এই শ্মশান ভৈরব কবির কংঙ্কপালে জন্মলাভ করিয়াই যেন ঘোষণা করিল, এই ভাষায় এই ছন্দে বাঙলা সাহিত্যে আর কোন দ্বিতীয় কবিতা হইবে না।

পুঁথি সাহিত্যের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক বিশ্লেষণে তিনি কিন্তু নিরাবেগ যুক্তনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন। 

নজরুল এই পুঁথিসাহিত্যের মানসপুত্র তো নহেনই, বরঞ্চ বাঙালি মুসলমানের একটি উল্লেখযোগ্য দান এই পুঁথিসাহিত্যকে তিনি একাধিক প্রবন্ধে অবহেলা ও বিরূপ করিয়াছেন। তিনি যে কোনোদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে এই পুঁথি সাহিত্য উপভোগ করিয়াছিলেন তাহারও প্রমাণ পাওয়া যায় না। পুঁথিসাহিত্যের লেখকরা আরবি, ফারসি শব্দের ধ্বনিতরঙ্গ না বুঝিয়াই এবড়োথেবড়োভাবে যেখানে ভাব প্রকাশের উপযুক্ত বাঙলা শব্দ খুঁজিয়া পান নাই সেখানে ইচ্ছামত আরবি, ফারসি শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। নজরুল আরবি, ফারসি শব্দের কলিতরঙ্গ বুঝিয়া কোন রচনার মধ্যে মুসলমানী আবহাওয়া ফুটাইয়া তুলিতে এসব শব্দ ব্যবহার করিয়াছেন। মুসলমানী কোন বিষয় ছাড়া তিনি তাহার কবিতায় এরূপ আরবি, ফারসি শব্দ ব্যবহার করেন নাই।

এই বিশ্লেষণে কেবল নজরুলের সচেতনতার নিদর্শন নেই, এ জসীমউদ্দীনেরও সচেতনার উদাহরণ। অর্থাৎ ভাষা বিষয়ের অনুসারী হবে জসীমউদ্দীনের কাব্যভাষা (এবং গদ্যভাষায় তার বিষয়ের সঙ্গে ওতোপ্রতো যুক্ত। 

৩ : সাযুজ্য-বৈযুজ্য

‘রবীন্দ্রনাথের বিরাট মহাজনি কারবারের পর খুচরো দোকানদার হওয়াতে লজ্জার কিছু নেই, সেটাকে তো অনিবার্য বলা যায়’, বুদ্ধদেব বসুর ‘রবীন্দ্রনাথ ও উত্তরসাধক’ (সাহিত্যচর্চা’ প্রবন্ধটির একটি বাক্যের অর্ধাংশ উদ্ধৃত করলুম (অর্ধাংশের এ জেন্য যে বাক্যের এ টুকুতে আমি জোর দিতে চাচ্ছি।) রবীন্দ্রপরবর্তী নজরুল ইসলাম রবীন্দ্রনাথের মহাজনি কারবারের পর খুচরো দোকানদার হননি, নিজেই আর-এর মহাজনি কারবার ফেঁদে বসেছেন। আজ নজরুলের মৃত্যুর পনেরো বছর পরে একথা অসংশয়ে বলা যায় যে, তিনি নিজেই বাংলা কবিতার এক যুগ¯্রষ্টা। বুদ্ধদেবের ঐ প্রবন্ধেই এ বাক্যেরই কিছু পরে তাই নজরুলের নাম এসেছিল অনিবার্যভাবে এবং বুদ্ধদেবের কণ্ঠ থেকে এই অমোঘ উচ্চারণ নিষ্কান্ত হয়েছিল ‘সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের মায়াজাল ভাঙলো।’  (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ