ঢাকা, শুক্রবার 16 March 2018, ২ চৈত্র ১৪২৪, ২৭ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে চড়ে ভোট চেয়ে জনসভা করছে আর আমাদের সভা করার অনুমতি দিচ্ছে না

চট্টগ্রাম অফিস : বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বৃটিশ, পাকিস্তান ও  স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেছিল বীর চট্টলার জনগণ। দেশ বর্তমানে মহাসংকটে ও বিপদে। আমার মাকে জেলে বন্দী করে রাখা হয়েছে। আমার ভাইকে গুম করা হয়েছে ও খুন করা হয়েছে। দেশের মানুষের সমস্ত অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার লুঠ করেছে সরকার। ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে দেশের মানুষের বিরুদ্ধে আইন করা হয়েছে। কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বৃহস্পতিবার নূর আহমদ সড়কে দলীয় কার্যলয়ের সামনে চট্টগ্রাম মহনগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি আয়োজিত মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার মামলার ফরম্যাট করে রেখেছে। যখন যাকে খুশি তাকে ওই ফরম্যাটে ফেলে জেল-জুলুম করছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৭৮ হাজার মামলা হয়েছে। এতে ১১ লাখ বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামী করা হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য আন্দোলন করছে না।  গণতন্ত্র রক্ষার জন্য আন্দোলন করছে। শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে চড়ে ভোট চেয়ে জনসভা করছে। আর আমাদের সভা করার অনুমতি দিচ্ছে না। এক দেশে দুই আইন চলছে। 

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এখন আন্দোলন শুধু খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলন নয়, সঙ্গে সঙ্গে গণতন্ত্র, দেশ রক্ষা ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের আন্দোলন শুরু হয়েছে। এ আন্দোলনে আমরা বিজয়ী হবই। কারাগারে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া মনোবল হারাননি। তিনি আগের চেয়ে আরও তেজস্বী রয়েছেন। ফলে আমাদের সকলকে আরও ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এ সরকার বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে। প্রধান বিচারপতিকে বন্দুকের মুখে পদত্যাগ ও বিদেশ যেতে বাধ্য করেছে। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-নেতারা পুকুর চুরি করছে। ব্যাংক লুট করা হচ্ছে। সরকার শুধু বাগাড়ম্বর করছে। মিডিয়ার সামনে মিথ্যাকে সত্য আর সত্যকে মিথ্যা বলছে। সরকার ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়াবে বলেছিল। এখন চালের দাম ৬০-৭০ টাকা। পেট্রল ডিজেল গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সরকার গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করে আছে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য যতরকম অপরাধ আছে তা তারা করছে।

ফখরুল ইসলাম বলেন, মা আজকে অস্থির কখন তার ছেলেকে তুলে নেয়, স্ত্রী অস্থির হয়ে থাকে কখন স্বামীকে তুলে নেয়, বোন অস্থির হয়ে থাকে কখন তার ভাইকে তুলে নিয়ে যাবে। এটা একদিন দুই দিনের নয়। গত কয়েকবছর ধরে আওয়ামী লীগ অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। বেআইনিভাবে জাকির হোসেন মিলনকে গ্রেফতার পুলিশের হেফাজতে নির্মমভাবে নির্যাতন করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এই সরকার দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকারবিরোধী কাজ করছে। নির্যাতন-নিপীড়ন করে সরকার বিরোধী দলকে দমন করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চাইছে। একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চাইছে। দলের নেতা জাকির হোসেন মিলন পুলিশ নির্যাতন করে শহীদ করেছে। তার মতো আরও অনেক নেতাই নির্যাতনের শিকার হয়ে শহীদ হয়েছে। জাকির হোসেনের বাবা নেই। আজ তার পরিবার অসহায় অবস্থায় আছে। তার স্ত্রী, দুই বাচ্চা, তার মা এক করুণ অবস্থার মধ্যে বেঁচে আছে। এ রকম শত শত হাজার হাজার পরিবার আছে বাংলাদেশে।

পুলিশের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা কেন জনগণের প্রতিপক্ষ হচ্ছেন? দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়েছেন। তাকে বাইরে রেখে নির্বাচন করার সাহস করবেন না। কারাগারের জরাজীর্ণ কক্ষে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে। তাকে ন্যূনতম আইনি অধিকার দেয়া হয়নি। 

 নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে ফখরুল বলেন, আপনাদের কাছে বারবার এই আবেদন জানাতে চাই। আপনারা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকুন। দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি, বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি বিশ্বাস রাখুন। আজ দেশের এই সংকটে দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ। বিএনপি নেতারা ঐক্যব্ধ, সবাই এক হয়ে, এক কাতারে দাড়িয়ে আপনাদের সঙ্গে কথা বলছে। আপনাদের কাছে যাচ্ছে, জনগণের কাছে যাচ্ছে। এই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে বিজয় অর্জন করতে হবে। তিনি বলেন, ইস্পাত দৃঢ় ঐক্য সৃষ্টি করতে হবে। সকলকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যনের মাধ্যমে এই সরকারের পতন ঘটাতে হবে।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড.খনদকার মোশারফ হোসেন বলেন, দেশ নেত্রীর মুক্তি চাইতে এখানে এসেছি। সরকার বিএনপি ভয় পায়। খালেদা জিয়াকে ভয় পায়। দেশের জনগণকে ভয় পায়। এজন্য অন্যায়ভাবে খালেদা জিয়াকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। কারাগারে তিনদিন ধরে তাকে ডিভিশন দেয়া হয়নি। আদালতে ঘড়ে বন্ধুক রেখে তাকে মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে। বিএনপি ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল স্বৈরাচার এরশাদের সময় ও ১/১ সময়। এখন তাকে কারাগারে বন্দী করে বিএনপিকে ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। 

ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, আমাদের এজন্ডা তিনটি। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে। অন্যথা দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে এই অবৈধ সরকারকে বিদায় করতে হবে। 

মির্জা আব্বাস বলেন, খুলনা ও চট্টগ্রামে বিএনপিকে সমাবেশ করতে অনুমতি দিতে সরকার বাধ্য হয়েছে। ঢাকায়ও সমাবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য করা হবে। 

ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, একটি রাজনৈতিক মিথ্যা মামলায় দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে কারাগারে বন্দী রাখা হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করা হবে। 

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এক দেশে দুই আইন চলছে। আওয়ামীলীগ গত দু’মাসে লালদিঘীতে ৪ বার সভা করেছে। সব সভায় মারামারি করেছে। আমাদেরকে সেখানে জনসভা করার অনুমতি দেয়া হয়নি। রাত ১১টায় বলা হয়েছে দলীয় কার্যালয়ের সামনে আমাদেরকে সমাবেশ করতে হবে। 

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা.শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে আরো বকতিতা দেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, মো.শাহজাহান, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, জয়নাল আবেদিন ফারুক, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এসএম ফজলুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, শ্রমিক দল নেতা এ এম নাজিম উদ্দিন, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, নগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

সমাবেশকে কেন্দ্র করে ধরপাকড়- বৃহস্পতিবারের আহুত বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে বুধবার রাতে প্রশাসন ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। রাতে মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর নিয়াজ মোহাম্মদ খানসহ ৩৩ বিএনপি যুবদল ছাত্রদলের নেতাকর্মীকে আটক করে  পুলিশ।এ ছাড়া মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসেম বক্করকে গ্রেফতারের জন্য তার এনায়েত বাজার বাসায় অভিযান চালায় কোতোয়ালী থানা পুলিশ।বিএনপি নেতা কর্মীরা বলছে, ডবলমুরিং থানা বিএনপির প্রস্তুতি সভা চলাকালে বুধবার দিবাগত রাত ৯টার দিকে পুলিশ ধনিয়ালাপাড়ার একটি বাসা থেকে নগর বিএনপি সহ সভাপতি নিয়াজ মোহাম্মদ খান ও থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম প্রকাশ বাদশা মিয়াসহ ৩৩ জন নেতা কর্মীকে আটক করেছে ডবলমুরিং থানা পুলিশ।এসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কোন মামলা বা অভিযোগ নেই ।

এদিকে ব্যাপক ধরপাকড় সত্ত্বেও চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিকাল ৩টায় বিশাল জনসমাগম হয়। নগরীর ৪১ ওযার্ড থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী সমাবেশে যোগ দেয়। সবার মুখে ছিল বেগম জিয়াকে মুক্তি দেয়ার শ্লোগান। সমাবেশকে ঘিরে বিপুল পুলিশ র‌্যাব, গোয়েন্দা পুলিশ মোতায়েন করা ছিল। সন্ধ্যায় শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয় সমাবেশ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ