ঢাকা, শুক্রবার 16 March 2018, ২ চৈত্র ১৪২৪, ২৭ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সংকটে বিপন্ন বেসরকারি ব্যাংক

দেশের বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো নানামুখী সংকটে বিপন্ন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো ব্যাংক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম চালাতেও হিমশিম খাচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলো সম্পর্কে এ ধরনের আশংকাজনক খবর প্রকাশিত হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৫ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, প্রায় সকল বেসরকারি ব্যাংকেই এখন ভয়াবহ পুঁজি সংকট চলছে। নগদ টাকার অভাবে ব্যাংকগুলো এমনকি দু’চার লাখ টাকার চেকের বিপরীতেও টাকা দিতে পারছে না। বিভিন্ন ব্যাংকের অনেক শাখায় মাত্র ১৫/২০ হাজার টাকা ওঠাতে গিয়েও গ্রাহকদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এক শাখা থেকে গ্রাহককে নিকটবর্তী অন্য শাখায় যেতে বলা হচ্ছে। এভাবে ভোগান্তি ও হয়রানির কারণে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক বেসরকারি ব্যাংক থেকে তাদের আমানত তথা জমানো টাকা উঠিয়ে ফেলতে শুরু করেছেন। টাকা ওঠানোর এবং হিসাব বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার একই পথে এগিয়ে চলেছে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও। এর ফলেও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হয়ে পড়ছে। 

এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সাবেক ব্যাংকারসহ অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইন অনুযায়ী হাজার কোটি টাকার অংকে পুঁজি ছাড়া কোনো ব্যাংককে সাধারণত কার্যক্রম শুরু করতে দেয়া হয় না। পাশাপাশি থাকে গ্রাহকদের আমানত বা জমানো অর্থ। সব মিলিয়ে যে কোনো ব্যাংকের কাছেই ২০/৩০ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা। অন্যদিকে প্রায় কোনো ব্যাংকের কাছেই বর্তমানে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ নেই। আর না থাকার প্রধান কারণ, ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক বিবেচনার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে যাকে-তাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ দিয়েছে। উদ্দেশ্যে অসততা থাকায় ঋণ দেয়ার সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইন মানা হয়নি। এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে একই ব্যক্তিকে তার ২২টি প্রতিষ্ঠানের নামে পাঁচ-ছয় হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়া হয়েছে। এ ধরনের ব্যক্তিরা ঋণের অর্থ পরিশোধ করেন না। করেনও নি। ফলে একদিকে ঋণ খেলাপিদের সংখ্যা বেড়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকগুলো বিপন্ন হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো ব্যাংকের কাছে এমনকি মূল পুঁজির কাছাকাছি পরিমাণের অর্থও আর অবশিষ্ট নেই। 

এসব ঋণখেলাপি গোষ্ঠীর সঙ্গে আবার সরকারদলীয় অসৎ ও টাউট ব্যবসায়ীরাও যোগ দিয়েছেন। সরকারের অঘোষিত সহযোগিতায় এই গোষ্ঠী পুঁজিবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কেনার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে পরিবর্তন করার এবং নিজেরা পরিচালক হওয়ার তৎপরতা চালিয়েছেন। লক্ষ্য হাসিলে তারা অনেকাংশে সফলও হয়েছেন। এর ফলেই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ ইসলামী ধারার দুটি বড় ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদে পরিবর্তন ঘটেছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও একই গোষ্ঠীর কর্তৃত্ব ও প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।  সরকারের অন্য কিছু অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্তের পরিণতিতেও দেশের ব্যাংকিং খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এসব সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রাধান্যে এসেছে নতুন নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও সরকার একের পর এক নয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে রাজনৈতিক বিবেচনা। কিন্তু দেশের অর্থনীতি ও পুঁজিবাজারের পরিসর অত্যন্ত সীমিত হওয়ার কারণে এসব ব্যাংক মোটেও সাফল্যের মুখ দেখতে পারেনি। কোনো কোনো ব্যাংক বরং প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই লোকসান গোনার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণও হয়ে উঠেছে। 

উদাহরণ দেয়ার জন্য তথ্যাভিজ্ঞরা ফারমার্স ব্যাংকের কথা উল্লেখ করেছেন। সরকারি চাকরির শর্ত লংঘন করে ‘জনতার মঞ্চে’ নেতৃত্বদানকারী সাবেক সচিব ও পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে চেয়ারম্যান করে প্রতিষ্ঠিত ফারমার্স ব্যাংক সূচনাকাল থেকেই দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। ব্যবসা ও আমদানি-রফতানির জন্য বাণিজ্যিক ঋণের নামে ব্যাংকটি আওয়ামী ব্যবসায়ীদের হাতে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে দিয়েছে। এসব ঋণের কোনো অর্থই ফিরে আসেনি। অর্থাৎ কেউই ঋণ পরিশোধ করেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও ফারমার্স ব্যাংক একদিকে অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি, অন্যদিকে নতুন নতুন আওয়ামী ব্যবসায়ীকে শত এবং হাজার কোটি টাকার অংকে ঋণ দেয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। এভাবে ব্যাংকটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে এসে গিয়েছিল। 

উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠাকালে ঋণসহ কৃষকদের সহায়তা দেয়ার উদ্দেশ্যের ঘোষণা দিলেও ফারমার্স ব্যাংকের কাছ থেকে কৃষকরা কোনো সহায়তাই পায়নি। কৃষকদের দোহাই দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকটি বরং আওয়ামী লীগের ব্যবসায়ী নামধারীদের লুণ্ঠনের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সব মিলিয়ে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ব্যাংকটির ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করে পারেননি। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কিছুদিন আগে পদত্যাগ করে বিদায় নিয়েছেন চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন খান আলমগীর। তথ্যাভিজ্ঞরা বলেছেন, ‘মখা যুগের’ অবসান ঘটলেও ফারমার্স ব্যাংকের পক্ষে আর কখনো লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া সম্ভব হবে না। 

অন্য বেসরকারি ব্যাংকগুলোও কমবেশি একই অবস্থার শিকার হয়েছে। বেসিক ব্যাংক ধরনের বিশেষ কোনো ব্যাংকের উদাহরণ উল্লেখ করার পরিবর্তে সাধারণভাবে বলা যায়, ঋণসহ নানা অজুহাতে অর্থের লুণ্ঠন সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলেই বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোকে বিপন্ন হতে এবং অস্তিত্বের সংকটে পড়তে হয়েছে। এমন অবস্থার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গলদ ছিল আসলে এসব ব্যাংককে অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্তের মধ্যেই। কারণ, অত্যন্ত সীমিত অর্থনীতির বাংলাদেশে এত বেশিসংখ্যক ব্যাংকের লাভজনক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ছিল না, এখনো নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও শুধু ২০১২ সালেই সরকার নয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছিল। এর ফলে দেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা পৌঁছেছিল ৫৭টিতে। এ ছাড়া ছিল ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত, দুটি বিশেষায়িত এবং নয়টি বিদেশি ব্যাংক। এসবের বাইরেও কয়েকটি ব্যাংক এবং ৩২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালিয়েছে। অথচ বাংলাদেশের মতো ক্ষুদে অর্থনীতির একটি দেশে এত বেশিসংখ্যক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লাভজনক হওয়া এবং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। কিন্তু এ বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও সরকার নতুন নতুন ব্যাংককে অনুমোদন দিয়েছিল। জানা গেছে, প্রতিটি ব্যাংকের সঙ্গেই ক্ষমতাসীন দলের রাঘব-বোয়ালরা জড়িত রয়েছেন। 

বলার অপেক্ষা রাখে না, বেসরকারি ব্যাংককেন্দ্রিক পরিস্থিতি এরই মধ্যে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এমনটি ঘটেছে আসলে সরকারের ভুল ও ক্ষতিকর নীতি এবং দলবাজিভিত্তিক সিদ্ধান্তের কারণে। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত বিদ্যমান ব্যাংকগুলোকে বিপর্যয়ের কবল থেকে উদ্ধার করার উদ্যোগ নেয়া এবং সে লক্ষ্যে দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠা। না হলে এবং ঋণ ও বাণিজ্যের নামে লুণ্ঠনের বাধাহীন কারবারকে চলতে দেয়া হলে একদিকে কোনো ব্যাংকের পক্ষেই বিপর্যয় কাটিয়ে লাভজনক হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না, অন্যদিকে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে দেশের ব্যাংকিং খাত। আমরা তাই সরকারের প্রতি দ্রুত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ