ঢাকা, শুক্রবার 16 March 2018, ২ চৈত্র ১৪২৪, ২৭ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সিরাজগঞ্জে কাপড়ের বাজারে চরম মন্দা তাঁত শিল্পের অস্তিত্ব হুমকির মুখে

বেলকুচি (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা : তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত সিরাজগঞ্জের চৌহালী, বেলকুচি, এনায়েতপুর, শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, কামারখন্দ ও কাজিপুর উপজেলা এলাকায় তাঁতিদের মাঝে বর্তমানে দারুণ হতাশা বিরাজ করছে। একদিকে তাঁত শিল্পের উৎপাদন কাজের প্রয়োজনীয় কাচামাল সুতা, রং এবং রাসায়নিক দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি এবং সেই সাথে দীর্ঘদিন যাবৎ তাঁতের কাপড়ের বাজারে দারুণ মন্দাভাব বিরাজ করায় এই জেলার তাঁত শিল্পের অস্তিত্ব বর্তমানে হুমকির সম্মুখীন। ইতোমধ্যেই এই এলাকার প্রায় অর্ধেক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাঁত শিল্পের সাথে জড়িত হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক এবং মালিক বর্তমানে বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এই অবস্থা আরও চলতে থাকলে অচিরেই বর্তমানে চালু তাঁতগুলোও বন্ধ হয়ে এক ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই জেলায় এ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য কোনও তাঁত শুমারী না হওয়ায় নির্ভূলভাবে প্রকৃত তাঁত সংখ্যা না জানা গেলেও মিডিয়া এবং বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক সিরাজগঞ্জ জেলায় পাওয়ারলুম, চিত্তরঞ্জন এবং পীটলুম মিলে প্রায় দেড় লক্ষ তাঁত রয়েছে। এসব তাঁতে উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গী, ধুতি, থ্রি-পিচ এবং গামছা অনেক উন্নত মানের এবং সারা দেশে বিপুলভাবে সমাদৃত। এখানকার তাঁতের শাড়ি ও লুঙ্গী বিদেশে বেসরকারি উদ্যোগে রফতানি হয় বলেও তাঁতিরা জানান। সরকারি তাঁতজাত সামগ্রী দেশের রফতানি পণ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে তাঁত ফ্যাক্টরির মালিকরা দাবি করেন। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে এই এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা বিশেষভাবে তাঁত শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। তাঁতের কাপড়ের বাজার ভালো থাকলে সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা ভালো থাকে, আর বাজারে মন্দাভাব দেখা দিলে মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও খারাপ হয়ে যায়। সিরাজগঞ্জ জেলার তাঁতীদের কাপড় বেচাকেনার প্রধান হাটগুলো হচ্ছে, বেলকুচির সোহাগপুর হাট, চৌহালীর এনায়েতপুর হাট, শাহজাদপুর হাট। এতিনটি হাট ঘুরে দেখা গেছে, তাঁতিরা কাপড় বিক্রির জন্য তাঁতবস্ত্র সাজিয়ে বসে আছে। কিন্তু হাটে বেপারি ও পাইকারদের আগমন তেমন নেই। ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতাই বেশি। অথচ ২/১ বছর আগেও এ সময়ে এনায়েতপুর, সোহাগপুর এবং শাহজাদপুর হাটে কাপড়ের বেপারি এবং পাইকারি ক্রেতাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে থাকতো। এসব হাট থেকে নিয়মিতভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁতের শাড়ি, লুঙ্গী, ধুতী, থ্রি-পিচ, গামছাসহ বিপুল পরিমাণ তাঁত বস্ত্র সরবরাহ করা হতো সারা দেশে। বর্তমানে আর সে অবস্থা নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই হাটগুলোতে আগত কাপড়ের ক্রেতা বিক্রেতাদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, শুধু এই এলাকার হাটগুলোরই অবস্থা এরূপ নয় দেশের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী কাপড়ের হাট যেমন- বাবুর হাট, গাউছিয়া হাট, পাবনার আতাইকুলা হাট, কুষ্টিয়ার কুমারখালী হাটসহ অন্যান্য ছোট বড় সকল কাপড়ের হাটে বেচা কেনায় মন্দাভাব বিরাজ করছে। তাঁত শিল্পের বর্তমান করুণ পরিস্থিতি নিয়ে এই অঞ্চলের নেতৃস্থানীয় তাঁত ফ্যাক্টরির মালিকদের মধ্যে কয়েকজন বেলকুচির জামান টেক্সটাইলের মালিক আলহাজ্ব এমএবাকী, রায় প্রোডাক্ট এর জ্যোতি শাড়ির মালিক বৈদ্যনাথ রায়, ফাইম টেক্সটাইলের মালিক গোলাম কিবরিয়া বাবু সরকার, সুবর্ণসারার হাজী বদিউজ্জামান, তামাই গ্রামের আবু হাজী, জিধুরীর আনিছুর রহমান, চালা গ্রামের আমিরুল ইসলামসহ তাঁত ব্যবসায়ীরা জানান, সুতা, রং, কেমিক্যালসহ তাঁত বস্ত্র উৎপাদনের সকল উপকরণের মূল্য অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছে সে অনুপাতে উৎপাদিত কাপড়ের মূল্য বৃদ্ধি পায়নি। তার ওপর প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে অবৈধ পথে কম মূল্যের নিম্নমানের কাপড় এসে বাজার দখল করায় এখানকার উৎপাদিত কাপড়ের বাজারে ধস নেমেছে। ব্যবসায়ীরা দুঃখ করে বলেন, এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনোরূপ নজরদারী নেই। তাঁতবোর্ড নামে যে সংস্থাটির এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখার কথা তার কোনোরূপ কর্মকা- নেই বললেই চলে। এই অবস্থায় এলাকার ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক তাঁতিরা ইতোমধ্যেই তাদের চলতি মূলধন হাড়িয়ে তাদের তাঁত বন্ধ হয়ে বেকার হয়ে গেছে। অন্যদিকে মাঝারি এবং বড় ফ্যাক্টরি যাদের কারখানায় চিত্তরঞ্জন তাঁত এবং পাওয়ারলুমে কাপড় উৎপাদিত হয়, তাদের অবস্থাও এখন ভয়াবহ। স্থানীয় কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক যেমন- ঢাকা ব্যাংক, আই এফ আইসি ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, ব্যাংক গুলো থেকে এই এলাকার ফ্যাক্টরি মালিকগণ তাদের কারখানার চলতি মূলধন হিসেবে মোটা অংকের টাকা ঋণ নিয়ে কারখানা পরিচালনা করতেছিল। দীর্ঘদিন যাবৎ কাপড়ের বাজারে মন্দাভাব বিরাজ করায় উৎপাদিত কাপড় বিক্রি করতে না পারায় গুদাম ভর্তি কাপড় থাকলেও তাঁত শ্রমিকদের মুজুরি এবং সুতা রং ক্রয় করার মত টাকা মহাজনের হাতে না থাকায় তাঁত চালু রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে চালু তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের টাকা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তা পরিশোধ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহীতাদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ইতোমধ্যেই ঋণ খেলাপী হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের চাপে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করায় তাঁত ফ্যাক্টরি বন্ধ করে এইসব তাঁত মালিকরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অনেক তাঁতি বর্তমান অবস্থায় এ পেশা ত্যাগ করে অন্য পেশায় চলে গেছে। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কামরুন্নাহার সিদ্দিকা, চৌহালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ওলিউজ্জামান বলেন, সিরাজগঞ্জের আর্থসামাজিক অবস্থার মূলে যেহেতু এই তাঁত শিল্প সুতরাং, আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথেই বিবেচনা করি। তাঁত শিল্প” কে আমরা এই জেলার ব্রাান্ডিং প্রস্তাব করেছি। তারা আরও জানান খুব শীঘ্রই এই জেলার প্রকৃত তাঁত সংখ্যা নিরূপনের জন্য তাঁত শুমারী করা হবে। এদিকে তাঁত বস্ত্রের বাজার চাঙ্গাসহ এই শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় সরকার অবিলম্বে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন বলে এই অঞ্চলের তাঁতিরা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ