ঢাকা, শনিবার 17 March 2018, ৩ চৈত্র ১৪২৪, ২৮ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মিলন নির্যাতনের পর কারাগারেই বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে

স্টাফ রিপোর্টার : তেজগাঁও ছাত্র দলের নেতা জাকির হোসেন মিলনের মৃত্যু নিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শকের বক্তব্য ‘সত্যের অপলাপ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি। গতকাল শুক্রবার সকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এই প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, সারা জাতি জানে রিমান্ডে নির্যাতনের কারণে তরতাজা তরুণ ছাত্র নেতা জাকির হোসেন মিলনের মৃত্যু হয়েছে। আইজিপি বলেছেন, কারাগার নয়, হাসপাতালে মারা গেছেন মিলন। তার এই বক্তব্য আসলে ঠিক নয়, এটা অসত্য। আইজিপির বক্তব্য সত্যের অপলাপ। জাকির হোসেন মিলন হাসপাতালে নয়, বরং নির্যাতনের পর কারাগারেই বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
বৃহস্পতিবার খুলনার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ মহাপরিদর্শক ড. জাবেদ পাটোয়ারি বলেন,  ঢাকায় ছাত্র দল নেতা জাকির হোসেন মিলনের মৃত্যু পুলিশি হেফাজতে নয়, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি হাসপাতালে মারা গেছেন। তারপরও যেহেতু বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, তা তদন্ত করা হবে। গত ৬ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপির মানববন্ধন থেকে গোয়েন্দা পুলিশ মিলনকে আটক করে। এরপর তিনদিন রিমান্ড শেষে রোববার কারাগারে নেয়ার পর অসুস্থ হন মিলন। সোমবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বিএনপিসহ পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, পুলিশের নির্যাতনেই মিলনের মৃত্যু হয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, কেন্দ্রীয় নেতা আসাদুল করীম শাহিন, আবেদ রাজা, আমিনুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবুকে পুনরায় রিমান্ডে নেবার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, শফিউল বারী বাবু’র আবার রিমান্ড মনজুরে এক অজানা আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে মানুষের মধ্যে। রিমান্ড মানে তো মেরে ফেলা, রিমান্ড মানে তো হাত-পা ভেঙে ফেলা, রিমান্ড মানে তো আঙ্গুলের নখ তুলে ফেলা। এটাই তো রিমান্ডের  বৈশিষ্ট হিসেবে দৃশ্যমান। তাই কোনো রাজনৈতিক নেতার যখন রিমান্ড হয় একটা হাড় হীম করা শিহরণ প্রতিটি নেতা-কর্মীর মধ্যে বয়ে যায়- কার নখ উঠবে, কার গোটা শরীর ক্ষতবিক্ষত হবে। রিমান্ড হচ্ছে ক্ষতবিক্ষত উৎপীড়নের অপর নাম। আমরা বাবুকে রিমান্ডে নেয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং বাবুসহ যেসব নেতা-কর্মী রিমান্ডে আছেন তাদের কাল্পনিক মামলা প্রত্যাহার করে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানাচ্ছি।
রিজভী বলেন, আজকের পত্রিকায় দেখেছেন কীভাবে ডিবি পুলিশ ডিবিসি’র ক্যামেরাম্যান সুমন হাসানকে হাতকড়া লাগিয়ে  পৈশাচিক কায়দায় নির্যাতন করছে। গোটা শরীর থেকে তার শার্ট খুলে ফেলে দেয়া হয়েছে এবং তার পিঠে ও বুকে আঘাতের চিহ্ন। তাকে বেদম প্রহার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই পুনরুজ্জীবিত ও বহুব্যাপী সন্ত্রাস এক বিপদজনক মাত্রায় দৃশ্যমান হলো। ডিবিসি’র ক্যামেরাম্যান সুমন হাসানকে নির্মম নির্যাতনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং দোষীদের বিরুদ্ধে  আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
রিজভী বলেন, যেভাবে প্রধান বিচারপতিকে বন্দুকের জোরে জিম্মি করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে, যেভাবে নি¤œ আদালতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে; সেখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে, বেগম খালেদা জিয়ার মামলায় সেটিরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিএনপি চেয়ারপার্সন সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জামিন বিষয়ে সরকারি চক্রান্ত লক্ষ্য করছে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ। শুধুমাত্র ব্যক্তিগতভাবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়া হয়েছে। সরকারপ্রধান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সম্পূর্ণ নির্দোষ বেগম জিয়াকে কারাবন্দী করেছে।
রিজভী বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিভাগীয় শহরে সমাবেশ হচ্ছে।  দুইটিতে হয়ে গেছে। বরিশাল মহানগরীতে আগামী ২৪ মার্চ জনসভা হওয়ার কথা ছিলো, এটি পিছিয়ে আগামী ৭ এপ্রিল জনসভা হবে। খালেদা জিয়াকে কারাগারে দীর্ঘ সময় বন্দী রাখতেই সরকার ‘নীলনকশা’র অংশ হিসেবেই তার জামিন বিলম্বিত করতে এটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে নানা কৌশল করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।  তবে সর্বোচ্চ আদালতের কাছে  সুবিচার পাবেন বলে  প্রত্যাশা করেন রিজভী।
বিএনপির এ মুখপাত্র বলেন, দুদক এখন বিরোধী দল দমনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল করে তারা আবারও প্রমাণ করল তারা সরকারের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার। বাংলাদেশ ব্যাংক লুট হলো, সরকারি ব্যাংক লুট হয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলো, অথচ দুদক এক্ষেত্রে উটপাখীর মতো বালিতে মাথা গুঁজে রেখেছে। মামলা করা তো দূরে থাক এদের বিরুদ্ধে একটা শব্দও মুখ থেকে বের হয় না। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যন্ত খেয়ে ফেলা হয়েছে। পত্রিকার হেড লাইন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ২০ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা। প্রকৃত টাকার অংক আরও অনেক বেশী। এই খেলাপী ঋণের টাকা সব ক্ষমতাসীনদের পকেটে ঢুকেছে। লুট করে শেয়ার বাজার শেষ করে দেয়া হয়েছে। এসব লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে দুদক ব্যবস্থা নিয়েছে এমন কথাতো শুনিনি। কারণ তারা সরকারি দলের লোকদের আত্মীয়স্বজন, সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদেরও আত্মীয়স্বজন। এই লুটপাটের বিরুদ্ধে যাতে কোন আওয়াজ না ওঠে সেজন্য গণতন্ত্রকে আইসিইউতে পাঠিয়ে গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করা হয়েছে এবং সোচ্চার বিরোধী দলকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ