ঢাকা, শনিবার 17 March 2018, ৩ চৈত্র ১৪২৪, ২৮ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আইনী জটিলতায় বাড়ছে খেলাপি ঋণ

এইচ এম আকতার : খেলাপি ঋণ কমাতে কোন উদ্যোগই কাজে আসছে না। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার ১শ ৪০ কোটি টাকা। ব্যাংকাররা বলছেন, পুনঃতফসিলের পরও ঋণ পরিশোধ না করায় বেড়েছে খেলাপির পরিমাণ। তাদের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে বড় বাধা আইনি জটিলতা। আর আইনি জটিলতায় আটকে রয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৫১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনি জটিলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বাড়ছে।
গত তিন বছরেই সোনালী, জনতা, বেসিক আর ফারমার্স ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। জনমনে প্রশ্ন এতো এতো টাকা গেল কোথায়? উত্তরটা সহজ-যারা টাকা নিয়েছেন, ফেরত দেননি তাদের অনেকেই। এমন অবস্থা অনেক ব্যাংকেরই।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১২ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। এ সময়ে ঋণ বেড়েছে ৪৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা। অবশ্য নতুন ঋণ বাড়ায়, শতাংশের হিসাবে খেলাপি ঋণ নেমে এসেছে দুই অঙ্কের নিচে, ৯ দমমিক ৩১ শতাংশে।
ব্যাংকাররা বলছেন, যেসব গ্রাহক ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ নিয়েছেন, তাদের অনেকেই আবার খেলাপি হয়েছেন নতুন করে। বরাবরের মতো সবচে বেশি ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ।
বিশেষায়িত ব্যাংকের ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ, বিদেশি ব্যাংকের ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ আর বেসরকারি ব্যাংকের ৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ব্যাংকের মতে, খেলাপি ঋণ কমাতে, প্রধান প্রতিবন্ধকতা আইনি জটিলতা।
ব্যাংকারদের সংগঠন এবিবি বলছে, আইনি জটিলতা কাটাতে দরকার আদালতের সংখ্যা বাড়ানো, সাথে সরকারের সদিচ্ছা। বিষয়টি নিয়ে শিগিগরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে বসবে এবিবি।
 অর্থঋণ আদালতে সরকারি ব্যাংকের ৫৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আটকে আছে। এ আদালতে দুই লাখ মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিশাল অঙ্কের টাকা আদায় হচ্ছে না। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৫১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। বিশেষায়িত ব্যাংকের ৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা।
এ অর্থ ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের ৭৩ শতাংশ। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ৪৪ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। আর্থিক ঋণের সংজ্ঞার দুর্বলতা, ব্যাংকের দুর্বল প্রসিকিউশন, আলাদা বেঞ্চ না থাকা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কাংখিত হারে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ফলে মামলার জট বাড়ছে। এ জট নিরসনে অর্থঋণ আদালত আইনের সংস্কার, উচ্চ আদালতে আলাদা বেঞ্চ গঠনের প্রস্তাব করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিশেষজ্ঞদের সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থঋণ আদালতের রায়ের ৯০ ভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আসে। কিন্তু আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ঋণখেলাপিরা উচ্চ আদালতে চাতুর্যপূর্ণভাবে রিট দায়ের করছেন। যে কারণে অর্থ আদায় সম্ভব হচ্ছে না। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর অল্প টাকায় নিয়োজিত প্যানেলভুক্ত অনভিজ্ঞ আইনজীবীর চেয়ে ঋণখেলাপিদের আইনজীবীরা অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ। এতে উচ্চ আদালতে রিটের শুনানিতে ব্যাংকের পক্ষ যুক্তিতর্কে হেরে যায়। পাশাপাশি দলীয় আনুগত্য ও তদবিরের মাধ্যমে নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর লিগ্যাল অ্যাডভাইজারদের বিরুদ্ধে।
 সরকারি দলের প্রতি আনুগত্যের কারণে যোগ্যতা নিয়ে তাদের কখনও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না। এ ছাড়া একটি মামলা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে একাধিক মামলা। এতে বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে মূল মামলা। আর উচ্চ আদালতে অর্থঋণ মামলার শুনানির জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক বেঞ্চ না থাকায় কাংখিত হারে মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ফলে বাড়ছে মামলার জট।
অর্থঋণ আদালতের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আলাদা বেঞ্চ গঠনের অনুরোধ করে বেশকিছু দিন আগে আইনমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। চিঠিতে অর্থমন্ত্রী অর্থঋণ সংক্রান্ত রিটের কারণে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেই চিত্র তুলে ধরেছেন। কিন্তু এর পরও কোনো কাজ হয়নি। পাশাপাশি অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের সুপারিশ করেছে আইন কমিশন।
আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং আইন কমিশনের সদস্য প্রফেসর ড. এম শাহ আলম ও বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর এ সুপারিশ করেন। এ সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। আইন কমিশনের মতে, আর্থিক ঋণের সংজ্ঞায়ই রয়েছে দুর্বলতা। বিদ্যমান আইনের দুর্বলতার কারণে মামলার নিষ্পত্তির হার কম। ঋণ আদায়ে বিবাদীদের প্রতি সমন জারি প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়ায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণের অর্থ আদায় করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত অপরাধীর বিচার করা যাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একতরফা ডিক্রি হলেও পরে বিবাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুনরায় বিচার কাজ শুরু হওয়ার সুযোগ থাকছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গবর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এখানে আইনি জটিলতা আছে। তা না হলে ব্যাংক ঋণ সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এমন জট সৃষ্টি হবে কেন। বিচারকের অভাব বা আইনে কোনো জটিলতা আছে কিনা তা শনাক্ত করতে হবে। এ জন্য এর ভেতরে ঢুকতে হবে। প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন বা সংশোধন করে জট কমাতে হবে। তবে উচ্চ আদালতে ব্যাংক ঋণ মামলা পরিচালনার জন্য বিশেষ বেঞ্চ গঠন করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
 সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওবায়দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, ব্যাংক ঋণ সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা অনেক। প্রতি জেলায় একটি আদালত দিয়ে তা নিষ্পত্তি সম্ভব নয়। এ জন্য একাধিক আদালত স্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া উচ্চ আদালতে পৃথক বেঞ্চ গঠন করতে হবে।
 বেসিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আউয়াল খান বলেন, ব্যাংক ঋণ সংক্রান্ত মামলা পরিচালনার জন্য উচ্চ আদালত পৃথক বেঞ্চ গঠন করতে পারেন। এতে মামলার রায় দ্রুত দেয়া সম্ভব হবে।
সূত্রমতে, ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের লক্ষ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৬ লাখ ১৩ হাজার ৭৫৫টি মামলা করা হয়। এ মামলার সংখ্যা অর্থঋণ আদালতে এ যাবত ব্যাংকিং খাতের দায়েরকৃত মোট মামলার ৫৩ দশমিক ৪০ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ৬০ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য এসব মামলা করে। তবে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ২৮ হাজার ৫৩টি মামলা নিষ্পত্তি করে ৮ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা আদায় করা হয়। বাকি ৫১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা আটকে আছে। বিপরীতে মামলা ঝুলে আছে ৮৫ হাজার ৭০২টি।
বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য একই সময় পর্যন্ত মোট ৪ লাখ ৭ হাজার ৩৩২টি মামলা করে। যা ব্যাংকিং খাতে মোট মামলার ৩৫ দশমিক ৪৪ শতাংশের সমান। খেলাপি ঋণের ৫ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা আদায়ের জন্য এ মামলাগুলো দায়ের করা হয়। সর্বশেষ তথ্যমতে, ২ লাখ ৯০ হাজার ৬২০টি মামলা নিষ্পত্তি করে আদায় করা হয় মাত্র ২ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। এখন ১ লাখ ১৬ হাজার ৭১২টি মামলার বিপরীতে খেলাপি ঋণের ৩ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা আটকে আছে।
অর্থঋণ আদালত আইন যুগোপযোগী না হওয়ায় মামলা নিষ্পত্তির হার বাড়ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থঋণ আইন যুগোপযোগী করতে কতিপয় জামানত বিক্রির ক্ষেত্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। অনধিক দু’বারের বেশি মামলার শুনানি মুলতবি রাখা যাবে না। পাশাপাশি ডিক্রি-পরবর্তী মামলায় ডিক্রিকৃত অর্থ আদায়ের সুদ কমানো, অর্থঋণ আদালত অবমাননার দণ্ড বা শাস্তি বাড়ানো হলে খেলাপি ঋণ আদায় সহজ হবে।
আইন কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী এ আইন সংশোধন করা হলে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের অর্থ উদ্ধার সহজ হবে। কারণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের টাকা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে ব্যক্তি, শিল্পকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে। নির্ধারিত সময়ে ঋণের অর্থ ফেরত না দেয়ায় অর্থঋণ আদালত আইনের আওতায় মামলা দায়ের করতে হয়। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, ওই অর্থ ফেরত পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দুর্বলতার কারণে ঋণের অর্থ আদায় ব্যাহত হয়। এতে প্রত্যক্ষভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের জনগণ ক্ষতির মুখে পড়ে। ঋণ আদায়ের জন্য মামলা করা হলেও আইনের দুর্বলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত অপরাধীর বিচার করা যায় না এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণের অর্থ আদায় করতে ব্যর্থ হয়। এ কারণেই কমিশন আইনটি সংশোধনের সুপারিশ করে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। যে কারণে বাড়ছে মূলধন ঘাটতিও। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। আর খেলাপি ঋণ আদায় সন্তোষজনক নয়। গত জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মোট শ্রেণীকৃত ঋণের মধ্যে মাত্র ৪ দশমিক ১০ শতাংশ আদায় সম্ভব হয়েছে। টাকার অঙ্কে ১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। একইভাবে বিশেষায়িত ব্যাংকের আদায়ের পরিমাণ হচ্ছে ৬৪৯ কোটি টাকা, শতাংশের হিসাবে ১২ দশমিক ৭২।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ