ঢাকা, শনিবার 17 March 2018, ৩ চৈত্র ১৪২৪, ২৮ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ : ॥ ৯ম পর্ব ॥
এমতাবস্থায় বার্মা পুনরায় বৃটিশ দখলীভূক্ত হলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বিশেষত অং সান ‘সর্ব বার্মা ভিত্তিক’ রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে BNA থেকে পদত্যাগ করে সরাসরি রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং AFO কে সর্ব বার্মা ভিত্তিক রুপ দিয়ে ১৯৪৫ সালের আগষ্ট মাসে Anti Fascist Peoples Freedom League (AFPFL) প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় জেনারেল অং সানকে রেংগুনস্থ বৃটিশ গভর্ণর জেনারেলের অধীনে গঠিত অন্তবর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। AFPFL প্রতিষ্ঠার ৪ মাস পর ১৯৪৫ সালের ২৪-২৬ ডিসেম্বর বার্মার সকল মুসলিম সংগঠনকে একীভূত করে সকল মুসলমানকে বার্মার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অভিন্ন স্রোত ধারায় সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে Pyinmana নামক স্থানে সর্ব বার্মা ভিত্তিক মুসলিম সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে সিয়াজী উ আবদুর রাজ্জাক Burma Muslim Congress (BMC) প্রতিষ্ঠা করেন এবং তিনিই এর সভাপতি নির্বাচিত হন। অতঃপর একে AFPFL-এর অংগ সংগঠনরূপে ঘোষণা দেয়া হয়। তিনি General Council of Burma Muslisn Associations (GCBMA) কর্তৃক বার্মা সংবিধানে মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র অধিকার ঘোষণার দাবীকে অযৌক্তিক বলে অভিহিত করেন এবং এর মাধ্যমে মুসলমানেরা স্থায়ীভাবে বার্মার মূল ধারা হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে বলে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে GCBMA কে BMC এর পদাংক অনুসরণ করে AFPFL-এ যোগদানের পরামর্শ দান করেন। উল্লেখ্য, বার্মার মুসলমানদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে ১৯৩৬ সালে GCBMA প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বার্মায় জাপানের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে বার্মার সকল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে পড়ে। ১৯৪৫ সালে বার্মা হতে জাপানীদের বিতাড়নের পর এটি পুনর্গঠিত হয় এবং বার্মার মুসলমানদের স্বার্থ সংশিষ্ট বিষয় নিয়ে কর্মকান্ড শুরু করে।
বৃটিশ প্রদত্ত শর্ত পূরণের জন্য জেনারেল অং সান সারা দেশব্যাপী সফর করেন। সীমান্তবর্তী ও পাহাড়ী জাতিসমূহ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে বর্মী জাতীর সাথে ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেও অং সান অবশেষে তাদেরকে বুঝাতে সক্ষম হন যে, বার্মার স্বাধীনতার জন্যই প্রাথমিকভাবে সবাইকে ইউনিয়নে থাকতে  হবে। জাতিগত ও রাজ্যগত স্বায়ত্বশাসনের কথা পরে বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে আরাকানে এসে মগ নেতাদের বুঝাতে সক্ষম হন যে, এ মুহূর্তে স্বায়ত্বশাসনের চিন্তা বাদ দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে থাকলেই সার্বিক স্বার্থ রক্ষা করা হবে। আরাকানের মুসলমানরা কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে দূর্বল ও শক্তিহীন হলেই তোমাদের হাতে স্বায়ত্বশাসন ন্যাস্ত করা হবে।
বার্মার সকল জাতিগোষ্ঠীকে ঐকমত্যে আনা এবং স্বাধীনতা উত্তর ভবিষ্যত জাতীয় নীতিনির্ধারণ প্রশ্নে আলোচনার্থে জেনারেল অং সান ১৯৪৭ সালের ২-১২ ফেব্রুয়ারি বার্মার শান রাজ্যের অন্তর্গত ‘প্যানলং’ নামক পার্বত্য শহরে ‘প্যানলং জাতীয় সম্মেলনের’ আহ্বান করেন। সম্মেলনে সীমান্তবর্তী ও পাহাড়ী জাতিসমূহকে আমন্ত্রণ জানালেও আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গাদের কোন প্রতিনিধিকে আহ্বান না করে উ অং জান ওয়াই নামক জনৈক মগকে আরাকান জাতিসত্ত্বা ও জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে অংশ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্যানলং সম্মেলনে সিদ্ধান্ত হয় যে, বৃটিশদের কাছ থেকে Union of Burma-এর স্বাধীনতা আদায়ের মাধ্যমেই সকল জাতিসত্ত্বার স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিত হবে। সর্ব বার্মার সকল জাতির প্রতিনিধিকে নিয়ে Union of Burma-এর ফেডারেল সরকার গঠিত হবে। স্বাধীনতার দশ বছর পর সান এবং কায়াজাতি ইচ্ছা করলে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা লাভের সুযোগ পাবে। সকল জাতির স্বকীয় অধিকার ঐতিহ্য, ভাষা-ধর্ম প্রভৃতি সুনিশ্চিত করার জন্য ফেডারেল সরকার ওয়াদাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু এক সময়ের স্বাধীন সার্বভৌম ঐতিহ্য-মন্ডিতরাজ্য আরাকানের মগ প্রতিনিধি সম্মেলনে আরাকানের স্বাধীনতা বা স্বায়ত্বশাসন সম্পর্কে কোন প্রস্তাব কিংবা কোন প্রশ্নই উত্থাপন করেন নি; যা অং সান ও মগদের গোপন আঁতাতের রাজনৈতিক কৌশলের ফলশ্রুতি বলেই রোহিঙ্গা নেতৃবৃন্দসহ অনেকে মনে করেন।
প্যানলং সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক স্বাধীন বার্মা ইউনিয়নের সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে উ চান টুনকে উপদেষ্টা মনোনয়ন করে একটি সংবিধান প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়। ইতোমধ্যেই ১৯৪৭ সালের ১৯ জুলাই দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা চলাকালে জেনারেল অং সান, উ আবদুর রাজ্জাকসহ সাতজন শীর্ষস্থানীয় নেতা আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে উ নু বার্মার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হন। ১৯৪৬ সালের ১৪ই জানুয়ারি GCBMA নেতৃবৃন্দ বৃটিশ গভর্ণর সমীপে বার্মা ইউনিয়নের স্বাধীনতা লাভের প্রক্রিয়ায় মুসলমানদের অধিকার বিষয়ে একটি স্বতন্ত্র অধিকারনামা ঘোষণার দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি পেশ করে ব্যর্থ হলেও পুনরায় ১৯৪৭ সালের ৪ আগষ্ট প্রস্তাবিত সংবিধানে একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হিসেবে বার্মার মুসলমানদের স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়ে বার্মার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী উ নু’র কাছে চিঠি প্রেরণ করেন। ২ অক্টোবর সংবিধান প্রণয়ন কমিটির উপদেষ্টা উ চান টুন GCBMA এর সভাপতি বরাবরে প্রেরিত চিঠির উত্তরে উলেখ করেন “বার্মা ইউনিয়নের সংবিধান অনুসারে যে সমস্ত মুসলমান বার্মায় জন্ম গ্রহণ করেছে, বার্মায় লালিত পালিত হয়েছে, বার্মায় শিক্ষা গ্রহণ করেছে এবং যাদের পিতা-মাতা অথবা পিতা-মাতার যে কোন একজন বার্মার নাগরিক তাদের সবাই বার্মার নাগরিক।” কিন্তু GCBMA নেতৃবৃন্দ এতে সন্তষ্ট হতে পারেনি। তারা মনে করে যে, সংখ্যালঘু হবার কারণে বার্মার মুসলমানগণ যে কোন আইন পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হবার সুযোগ লাভ করবেনা। তাই সংস্থার পক্ষ থেকে সংবিধানের ৮৭ নং অনুচ্ছেদে সংখ্যালঘুদের আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থার মত মুসলমানদের জন্যও সংখ্যালঘু হিসেবে আসন সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেবার জন্য অনুরোধ জানানো হলেও সরকারিভাবে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়।
বার্মার অধীনে আরাকান -৫
বার্মা ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বৃটিশের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। অতঃপর ১৯ নভেম্বর বার্মার অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মত মুসলমানদের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানিয়ে GCBMA এর পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। প্যানলং সম্মেলনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক শান, কাচিন, কায়া, কারেন ও চিন রাজ্যগুলো অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা লাভ করে। ঐ রাজ্যগুলোর মতই আরাকান পৃথক ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তা অধ্যুষিত রাজ্য হয়েও বোধপায়া কর্তৃক দখলীভূক্ত আরাকানের এক ইঞ্চিও শৃংখল মুক্ত হয়নি। যে স্বপ্ন আর প্রত্যাশায় মুসলমানরা স্বাধীনতা আন্দোলনের জাতীয় নেতা জেনারেল অং সানকে সমর্থন দিয়েছিল, শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক আচরণ, মুসলমানদের ধর্মচ্যুতিকরণ ও সাংস্কৃতিক আত্মীকরণের নামে স্বতন্ত্র জাতিসত্তার বিনাশ সাধন করে ব্যাপকভাবে বর্মীকরণ প্রক্রিয়ায় তাদের সে প্রত্যাশা গভীর হতাশায় রুপান্তরিত হয়।
স্বাধীনতার পর সাময়িক সংকট কেটে বার্মা ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন কর্তৃক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পূর্ব পর্যন্ত সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি মোতাবেক জনপ্রতিনিধিত্বশীল, জবাবদিহিমূলক শাসনতন্ত্রের অধীনে শাসিত হয়েও মুসলমানরা মানবাধিকার ফিরে পায়নি; বরং জাতিগত রোষানলে পড়ে নির্বিচারে হত্যাকান্ড ও ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়। বার্মা কর্তৃপক্ষ ১৯৪৭ সালে নতুন শাসনতান্ত্রিক পরিষদ নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রণীত ভোটার তালিকায় ‘সন্দেহজনক নাগরিক’ অজুহাতে আরাকানের মুসলিম অধ্যুষিত জনপদগুলোকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়। বার্মার প্রথম প্রধানমন্ত্রী উ নু’র মত ব্যক্তিত্ব আরাকানে মুসলমানদের প্রতি সর্বজনীন সুনজর প্রয়োগ করতে পারেননি; বরং ন্যূনতম মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হন। উ নু’র শাসনকালে স্বাধীনতার পর পরই ১৯৪৮ সালে আরাকান থেকে মুসলমানদের বিতাড়ন ও তাদের মধ্যে ভয়-ভীতি সৃষ্টির পদক্ষেপ হিসেবে আকিয়াবের মগ ডেপুটি কমিশনার ক্যাইউ এর নেতৃত্বে ৯৯% মগদের নিয়ে ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের অধীনে তদন্তের নামে Burma Territorial Force (BTF) গঠিত হয়। BTF উত্তর আরাকানের বুদ্ধিজীবী, গ্রাম্য প্রধান, উলামা এবং হাজার হাজার সাধারন মানুষকে হত্যা করে এবং মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামের বাড়িঘর জালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
মূলত বৃটিশ কর্তৃপক্ষই সাম্প্রদায়িক বিভেদের সূচনা করেছিল। মুসলমানরা বৃটিশের পক্ষে যুদ্ধ করে জাপানীদের তাড়িয়ে দিলেও তারা প্রচার করে -“Burma for the Budhist Burmans  Ges Burmese Muslims are Foreign Immigrants or kalas” আরাকানে মুসলমানদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের বিরুদ্ধে মগ সম্প্রদায় স্বার্থ সিদ্ধির জন্য এ প্রচারণাকে তুঙ্গে তুলতে থাকলে বর্মী সরকার পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ অভিযানে নামে। অপর পক্ষে স্বাধীকার আন্দোলনের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মুসলমানরা স্বতন্ত্র কোন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে না পারায় অপপ্রচার সত্যায়নের দিকে অগ্রসর হয়। ফলে মুসলমানরা আরাকানের বৈধ নাগরিক হয়েও বার্মার সংবিধানে নৃতাত্তিক বা বুনিয়াদী জাতি হিসেবে তালিকাভূক্তির দাবীতে ব্যর্থ হয়। মুসলিম নেতৃবৃন্দ বর্মী সরকারের কাছে ’৪২ এর গণহত্যার উপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করে বিতাড়িত মুসলমানদের স্বীয় বসতবাড়ীতে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেবার আবেদন জানালে AFPFL সরকার এসকল দাবী প্রত্যাখ্যান করেন এবং সরকারি চাকরি হতে মুসলমানদের অপসারণ করে তদস্থলে মগদের নিয়োগ শুরু করেন। ফলে মুসলমানরা ক্রমশ আন্দোলনমুখী ও বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
প্রথমে মোহাম্মদ জাফর হুসাইন কাওয়াল বা জাফর কাওয়াল নামে আকিয়াবের জনৈক যুবক মুক্তি আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি কাওয়ালী গাইতেন বলে তাঁকে কাওয়াল বলা হয়। তিনি নিজেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুঃখ-দূর্দশা নিয়ে গান রচনা করতেন, গানের মাধ্যমে সরকারের জুলুম সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করে তুলতেন এবং মুসলমানদের বাঁচার একমাত্র পথ হিসেবে সশস্ত্র বিপবে যোগদানের জন্য মুসলিম যুবকদের উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি যেখানেই যেতেন সেখানেই শত শত লোক তাঁর বিপবাত্মক গান শুনে মুজাহিদ আন্দোলনে যোগদান করত। বৃটিশ-বার্মা শাসিত আরাকানে রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদে জাফর কাওয়াল প্রাথমিকভাবে বিপবাত্মক কাওয়ালী গেয়ে জনগণকে তাদের অধিকার আদায়ে সচেতন করে তোলেন। অতঃপর ১৯৪৭ সালের ২০ আগষ্ট বুচিদংয়ের দাব্রুচং গ্রামে জাফর কাওয়ালের নেতৃত্বে মুজাহিদ পার্টি সাংগঠনিক রূপ লাভ করে। বার্মা স্বাধীনতা অর্জনকালে এ পার্টির পক্ষ থেকে স্বাধীনতা অথবা পূর্ণস্বায়ত্ব শাসন দাবী করে ব্যর্থ হলে ১৯৪৮ সালের জুলাই মাসে বুচিদং শহরের ১২ মাইল উত্তরে টং বাজার নামক স্থানে এক সমাবেশ করে আন্দোলনের নীতি পুনর্নির্ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে ক্রমশ সশস্ত্র আন্দোলনের রূপ নেয়। ১৯৫০ সালের ১১ অক্টোবর আততায়ীর হাতে তিনি নিহত হলে মোহাম্মদ আব্বাস এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দান করেন। আন্দোলন যত তীব্রতর হয়, সরকারের পক্ষ থেকে কৌশলগত বিরোধিতাও তত বৃদ্ধি পায়। মুসলমানদের পাশাপাশি কারেন জাতির একটি সশস্ত্রদল তাদের স্বাধীন আবাসভূমির দাবীতে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আরাকানের মগ সম্প্রদায়ের একটি দল আরাকানের স্বাধীনতার দাবীতে Arakan National Liberation Party নামে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। স্বাধীনতা উত্তর দশ বৎসর পূর্ণ না হতেই প্যানলং সম্মেলনের শর্ত বাস্তবায়নের জন্য শান ও কায়া জাতি কেন্দ্রীয় সরকার হতে বিচ্ছিন্ন হবার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। মুসলমানদের মুজাহিদ আন্দোলন সফলতার সাথে এগুতে থাকলে আব্বাসের নেতৃত্বাধীন বাহিনী হতে দলত্যাগী কিছু স্বাধীনতাকামী মোহাম্মদ কাসিম ওরফে কাসিম রাজার নেতৃত্বে Rohingya Libaration Front (RLF) নামে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। উল্লেখ্য যে, মুহাম্মদ কাশিম মুজাহিদ পার্টির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি সশস্ত্র সংগ্রামকেই রোহিঙ্গাদের একমাত্র মুক্তির পথ হিসেবে উপলব্ধি করে Rohingya Liberation Front গঠন করেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই এ আন্দোলন ব্যাপক সফলতা অর্জন করেন। এমনকি তিনি রাজা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। সরকারিভাবে তাকে ডাকাতের সরদার আখ্যা দিয়ে গ্রেফতারের জন্য আড়াই হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। ১৯৬৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার এলাকায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর এ আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে। মুসলমানদের ত সক্ষম হলে কেন্দ্রীয় সরকার চিন্তিত হয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের মুজাহিদ আন্দোলনকে বন্ধ করার প্রথম রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ১৯৫৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় প্রধানমন্ত্রী উ নু রেডিও’র মাধ্যমে তাদেরকে স্বদেশী (Indigenous Ethnic Community) হিসেবে ঘোষণা করেন। এছাড়া তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ ও চাকরিতে নিয়োগের কথা বলা হয়, বার্মা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতিসপ্তাহে নিয়মিত দু’বার রোহিঙ্গা ভাষায় প্রোগ্রাম প্রচার করা হয়, পার্লামেন্ট ও অন্য সশস্ত্র বাহিনী ১৯৫৪ সালের মধ্যে মংডু, বুচিদং, ও রাথিডংসহ উত্তর আরাকানের ৮০% এলাকা বর্মী  শাসনমুক্ত করােন্য সংস্থায় রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব স্বীকৃত হয় এবং ৫৭’এর নির্বাচনে রোহিঙ্গা মুসলমানরা প্রথম ভোটাধিকার লাভ করে সাতটি আসনে পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে বিজয়ী হয়।
এক দিকে শাসক শ্রেণী রোহিঙ্গা মুজাহিদদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিতে থাকে অপরদিকে একই সময়ে তাদের উপর কঠোরভাবে সামরিক চাপ সৃষ্টি করে এবং Combined Emmigration and Army Operation, Union Military Police Operation প্রভৃতির নামে মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালায়। দেশের বিশৃংখল পরিস্থিতিতে ১৯৫৮ সালে প্রধানমন্ত্রী উ নু দেশে শান্তি শৃংখলা প্রতিষ্ঠার জন্য সামরিক বাহিনী প্রধান জেনারেল নে-উইনের নেতৃত্বাধীন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দেশের শাসনভার অর্পণ করেন। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী উ নু এর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। জেনারেল নে উইন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বে এসে আরাকানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বেপরোয়া উচ্ছেদ অভিযান শুরু করলে প্রায় বিশ হাজার মুসলমান সীমান্ত অতিক্রম করে কক্সবাজার এলাকায় পালিয়ে আসে। তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর জাকির হোসেনের নেতৃত্বে পাকিস্তান-বার্মা উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় এবং বর্মীপক্ষ একে আকিয়াবের মগ গোষ্ঠীর একটি সাম্প্রদায়িক কারসাজি বলে অভিহিত করে সকল উদ্বাস্তুকে স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়।
এ উচ্ছেদ অভিযানকালে বার্মার ইমিগ্রেশন পুলিশ মংডু মহকুমা থেকে শতাধিক মুসলমানকে বন্দী করে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নামায় উলেখ করে যে, তারা বার্মার নাগরিক নয়, কেননা তারা পুলিশের কাছে তাদের নাগরিকত্বের সমর্থনে কোন প্রমাণপত্র দেখাতে সক্ষম হয়নি। ইমেগ্রেশন পুলিশ নির্দিষ্ট ফরমে বন্দীদের নাম পূরণ করে বার্মা থেকে তাড়িয়ে দেবার আদেশনামা জারীর জন্য পূরণকৃত ফরম মংডুর মহকুমা প্রশাসনের নিকট উপস্থাপন করে। মহকুমা প্রশাসক আদেশ নামা জারী করে সংশিষ্ট ফরমে দস্তখত করেন এবং বার্মা থেকে বহিস্কারের আদেশ কার্যকর করার জন্য বন্দীদেরকে রেংগুনে প্রেরণ করেন।
বন্দীদের মধ্য হতে জনৈক হাসান আলী ও মুসা আলী নামে দু’ব্যক্তি বার্মার সুপ্রীম কোর্ট বরাবরে ফরিয়াদ জানায় যে, তারা বার্মার বৈধ নাগরিক, পুলিশ তাদেরকে অন্যায়ভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে গ্রেফতার করেছে। মহামান্য আদালত ১৯৫৯ সালের ৪ নভেম্বর বন্দীদ্বয়কে মুক্তি দেবার জন্যে নির্দেশ দেন। এরপর বন্দীদের মধ্য থেকে আরও ৭৬ জন বন্দী সুপ্রীম কোর্টে ফরিয়াদ জানালে মহামান্য আদালত তাদেরও মুক্তি দেবার জন্য নির্দেশ দেন। পুনরায় একইভাবে অভিযুক্ত ২৩ জন বন্দী বার্মার সুপ্রীম কোর্ট বরাবরে আতœপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দানের জন্য আবেদন জানায়। এরপর সুপ্রীম কোর্টের বিজ্ঞবিচারপতি তাদের মুক্তি দানের আদেশ দিয়ে এক নির্দেশনামা জারী করেন এবং তাতে উলেখ করেন, বার্মার ইমিগ্রেশন পুলিশ সুপ্রীম কোর্টের পরপর দু’টি নির্দেশ অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
প্রথমত, হাসান আলী ও মুসা আলী নামক দু’জন বন্দীকে মুক্তিদেবার জন্য নির্দেশ জারী করা হয়েছিল, সংগত কারণেই ইমিগ্রেশন পুলিশের উচিৎ ছিল একই প্রক্রিয়ায় আটককৃত সকল বন্দীর মুক্তি দেয়া; কিন্তু তা করা হয়নি।
দ্বিতীয়ত, অপর ৭৬ জন বন্দীকে মুক্তি দেবার জন্য বিজ্ঞবিচারপতি পুনরায় নির্দেশ জারী করলেও ইমিগ্রেশন পুলিশ সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশ অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক আরো ২৩ জনকে মুক্তি দেবার নির্দেশ জারী করেছে কিন্তু তারাসহ একই অভিযোগে আটকৃত অন্যান্য বন্দীদের  মুক্তি দেয়া হয়নি। নির্দেশনামায় আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ইমিগ্রেশন কর্তৃক উপস্থাপিত সংশ্লিষ্ট ছাপানো ফরমে মংডু মহকুমা প্রশাসক কোন বিচার বিবেচনা ব্যতিরেকে দস্তখত করেছেন যার অর্থ দাঁড়ায়, বেআইনীভাবে দেশের কিছু নাগরিককে তাদের আবাসভূমি থেকে বিতাড়িত করা এবং দেশের বৈধ নাগরিক অধিকারকে অস্বীকার করা; আর একজন নাগরিককে স্বীয় আবাসভূমি থেকে বিতাড়ন করা মূলত মৃত্যুর দন্ডাদেশ দেবার শামিল। মাননীয় আদালত আরো প্রত্যক্ষ করেন যে, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাদের সরবরাহকৃত অভিযোগনামায় আটককৃতরা বর্মী ভাষা জানেনা বলে উল্লেখ করেছেন এবং তাদের বার্মার নাগরিকত্বের স্বপক্ষে কোন প্রমাণপত্র দেখাতে পারেনি বলে জানিয়েছেন। বিজ্ঞবিচারপতি এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন যে, ইউনিয়ন অব বার্মায় বহু ধর্ম, বর্ণ ও জাতি বসবাস করে। বার্মা ইউনিয়নে অনেক জাতি আছে যারা বর্মী ভাষা জানেনা। তাই বর্মীভাষা জানা বার্মার নাগরিকত্বের আবশ্যকীয় শর্ত নয়। নির্দেশনামার উলেখ মতে বার্মার সংবিধানের ৪ (২) অনুচ্ছেদে নাগরিকত্বের উপর অধ্যাদেশে বলা হয়েছে যে, তারা বার্মার নাগরিক; যারা বার্মায় জন্ম গ্রহণ করেছে, লালিত পালিত হয়েছে এবং যাদের পূর্ব পুরুষ বার্মাতে তাদের আবাস গড়ে তুলেছে। অতএব, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ও মংডু মহকুমা প্রশাসকের কার্যকলাপ বেআইনী । তাই মাননীয় আদালত সকল বন্দীর অবিলম্বে মুক্তি দেবার জন্য নির্দেশ জারী করছেন।
বার্মার অধীনে আরাকান-৬
উ নু ১৯৬০ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নে উইন এর নিকট থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করে বার্মা ফেডারেশনের অধীনে সংখ্যালঘু সমস্যা সমাধানের জন্য সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ লক্ষ্যে তিনি উত্তর আরাকানের মুসলিম প্রধান অঞ্চল নিয়ে Meyu Frontier Administration গঠন করে এ অঞ্চলকে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন এবং বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে মুসলমানদের বার্মার একটি বুনিয়াদী জাতি হিসেবে অভিহিত করে। আরাকানের মগ গোষ্ঠীর নির্যাতন থেকে মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য মূলত এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। মুসলমানরা সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও মগ সম্প্রদায় একে বার্মা সরকারের Divide and Rule নীতি বলে অভিহিত করে এবং আরাকানের Kala (বিদেশীদের) রক্ষার উদ্যোগ বলে অভিযোগ এনে একে হাস্যস্পদ উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করলেও মুসলমানরা একে ‘নিপীড়িত মানুষের হাফ ছেড়ে বাঁচা’ বলে উলেখ করে। প্রধানমন্ত্রী উ নু রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে একটি শান্তি প্রিয় জাতি হিসেবে উলেখ করে সশস্ত্র আন্দোলনকারীদেরকে আত্মসমসর্পনের অনুরোধ জানান। উ নু’র আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৬১ সালের ৪ জুলাই সকল মুজাহিদ অস্ত্র সমর্পন করেন। এ অস্ত্র সমর্পন অনুষ্ঠানে বার্মার ভাইস চীফ অব ষ্টাফ ব্রিগেডিয়ার অং জি ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন এবং বার্মা সরকারের পক্ষ থেকে সে ভাষণ প্রচার করা হয়। ব্রিগেডিয়ার অং জি তাঁর ভাষণে উলেখ করেন যে, রোহিঙ্গা মুসলমানরা আরাকানেরই শান্তিপ্রিয় নাগরিক। বার্মা সরকারের তরফ থেকে শুধুমাত্র ভুল বুঝাবুঝির কারণে রোহিঙ্গাদের প্রতি বহু অন্যায় করা হয়েছে; আজ এ ভুল বুঝাবুঝি অবসানের মাধ্যমে সকল সমস্যা দুরীভূত হয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, পৃথিবীর সব সীমান্তে একই জাতি সীমান্তের দুই পারে বসবাস করে। এ জন্যে কোন নাগরিকের জাতীয়তা প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া উচিত নয়।
বার্মার স্বাধীনতার এক দশকেরও বেশী সময় অতিবাহিত হবার পরও অবর্মী সম্প্রদায়গুলো লক্ষ্য করলো অধিকাংশ বর্মী শাসক তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের সাথে সাথে সাংঘাতিকভাবে অবহেলা ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক ব্যবহার করছে। বঞ্চনা ও আধিপত্যবাদী শাসন-শোষণ সম্প্রদায়গুলোর মাঝে বিদ্রোহের জন্ম দেয়। বিরাজমান রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী উ নু বিদ্যমান সম্প্রদায়গত বৈষম্য সমাধানের লক্ষ্যে একটি ফেডারেল সম্মেলন আহ্বান করেন। কিন্তু সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল নে উইন বর্মী জাতিগত অভিযানের প্রশ্নে কোন ছাড় দিতে রাজী ছিলেন না। তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন যে, ‘এ মুহূর্তে বিভিন্ন জাতিসত্তার স্বীকৃতি প্রদান উ নু শাসনের জন্য অনিবার্য হয়ে পড়েছে’। তাই তিনি ১৯৬২ সালের ২ মার্চ ফেডারেল সম্মেলন শেষ হবার পূর্ব মুহুর্তে একটি রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উ নুকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলপূর্বক বার্মাকে নিষিদ্ধ গণতন্ত্রের দেশে পরিণত করে রোহিঙ্গাসহ বার্মার সংখ্যালঘু জাতিসমূহের সকল প্রকার সাংবিধানিক অধিকার বাতিল করেন। Mohammed Yunus Gi fvlvq- In March 2, 1962 Gen. Ne Win, the then Burma`s Army Chief, seized power in a bloodless military coup, abolished the constitution and dissolved the Parliament. All power of the states - ligeslative, judiciary and executive had fallen automatically under the control of the ‘Revolutionary Council’ (RC) headed by him.”
জেনারেল নে উইন ক্ষমতায় এসে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ৯৫% সামরিক অফিসার ও সামান্য সংখ্যক বর্মী সিভিলিয়ান নিয়ে Burma Socialist Programme Party (BSPP) গঠন করে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলমানরা নবগঠিত BSPP-তে যোগ না দিলেও আরাকানের মগরা ব্যাপকভাবে যোগদান করে। মুসলমানরা প্রধানত কৃষিজীবি হলেও আকিয়াবসহ আরাকানের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের অনেকেই প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ছিল। কেউ কেউ আবার ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্য করেও জীবন যাপন করত। নে উইন ১৯৬৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের ব্যাংক ও ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানসমূহ রাষ্ট্রীয়করণ করলে রোহিঙ্গা ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষত বিভিন্ন ইস্যুতে মগদের অত্যাচার ও লুটপাটের কারণে আতংকিত ব্যবসায়ীরা জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য পন্থা অবলম্বন শুরু করে। জেনারেল নে উইন Burmese Way to Socialism কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে মূলত বৌদ্ধধর্ম, বর্মী-জাতীয়তাবাদ ও মার্কসবাদের একটি অদ্ভুত মিশ্র ব্যবস্থার প্রবর্তন করে দেশের অর্থনীতিকেও মারাতœক বিপর্যয়ের সম্মুখীন করেন। ১৯৬০ সালে বার্মার মাথাপিছু আয় যেখানে ৬৭০ ডলার ছিল, পরবর্তীতে তাঁর এ নতুন ব্যবস্থার কারণেই ২০০ ডলারে নেমে আসে।
জেনারেল নে উইন ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েই মুসলমানদের নির্মূলের জন্য আরাকানী মগদের উস্কিয়ে দেয়। ১৯৬৪ সালে তাদের United Rohingya Organisation (এটি ১৯৫০ সালে আরাকানের মংডু শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়। শাসমুল আলম চৌধুরী এবং মাষ্টার বদিউর রহমান যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সংগঠনটি ১৯৬৪ সালে নে উইন কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।), The Rohingya Youth Organisation (ছাত্র-যুব সমাজের মাঝে ইসলামি চেতনাকে জাগ্রত করার জন্য ১৯৫৬ সালে রেঙ্গুনে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আবদুল মান্নান (U Tin Win) এবং রশীদ বা মং যথাক্রমে এর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।), Rangoon University Rohingya Students Association (বিশ্ববিদ্যালয়ের রোহিঙ্গা মুসলমান ছাত্রদের মাঝে ইসলামি চেতনাকে জাগ্রত করার জন্য রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৫৯ সালের ৩ ডিসেম্বর এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে মোহাম্মদ হুসাইন কাশিম এবং মোহাম্মদ খান দায়িত্ব পালন করেন।), Rohingya Jamiatul Ulama (রোহিঙ্গা আলিম সমাজকে একতাবদ্ধ করার জন্য এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। মাওলানা আবদুল কুদ্দুস এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।), Arakan National Muslim Organisation (সুবহান উকিলের নেতৃত্বে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তিনি ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।), Arakanese Muslim Youth Organisation (আরাকানের মুসলিম যুব সমাজকে ইসলামি মূল্যবোধের ভিত্তিতে নৈতিকতা গঠনের নিমিত্তে মোহাম্মদ কাশিম ও মং মং গিয়াই এর নেতৃত্বে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।) এবং Rohingya Student Association (রোহিঙ্গা ছাত্রদের মাঝে দ্বীনই চেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৯৫৫ সালে শাহ্ আলম ও শাহ্ লতিফ এর নেতৃত্বে রেঙ্গুনে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। উপরোলেখিত সংগঠনসমূহ ১৯৬৪ সালে নে উইন কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়।) প্রভৃতি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ নিষিদ্ধ করেন এবং ১৯৬৫ সালের অক্টোবর মাস থেকে Burma Broadcasting Service (BBS) থেকে নিয়মিতভাবে রোহিঙ্গা ভাষায় প্রচারিত অনুষ্ঠান প্রচার বন্ধ করে দেন। অতঃপর ১৯৬৬ সালে সমস্ত বেসরকারি সংবাদপত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।
উ নু এর শাসনামলেও বার্মার ক্যাবিনেটে মুসলমান সদস্য ছিল। আরাকানের আকিয়াব অঞ্চলের অধিবাসী সুলতান মাহমুদ ছিলেন মুসলিম মন্ত্রী। এ ছাড়াও খনিজ ও শ্রম মন্ত্রী ছিলেন উ খিন মং লাট, শিল্পমন্ত্রী ছিলেন উ রশীদ এবং মালয় ফেডারেশন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্রে বার্মার রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বপালন করেছিলেন উ পে খিন। উ খিন মং লাট খনিজ ও শ্রম মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজকল্যাণ ও স্বাস্থ্য বিভাগেরও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। বার্মা মুসলিম কংগ্রেসের সভাপতির দায়িত্ব পালনের সুবাদে তিনি সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান দেশগুলোতে স্বার্থকভাবে মিশন পরিচালনা করেন এবং সে সময় বহু খ্যাতিমান ও উচ্চপদস্থ মুসলমান বার্মায় আগমন করেন। কিন্তু নে উইন ক্ষমতা গ্রহণের পর আর কোন মুসলমানকে মন্ত্রী বা রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করা হয়নি; বরং তিনি আরাকানের প্রশাসনকে বৌদ্ধিকরণ করে অনেক মুসলমান পুলিশকে বার্মার দূর্গম এলাকায় বদলী করেন এবং অনেককে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। উচ্চপদস্থ মুসলিম কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর গ্রহণ অথবা উত্তর আরাকান হতে অন্যত্র বদলী করা হয়। পক্ষান্তরে মগদের চাকরি ও ব্যাবসার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দানের মাধ্যমে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। মুসলমানদের চাকরি রক্ষা কিংবা পদোন্নতির জন্য স্বধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হওয়া অত্যাবশ্যক ছিল।
নে উইনের শাসনামলে কয়েকবার মুদ্রা অচল ঘোষণার ফলে মুসলমানদের জন্য এক শাসরুদ্ধকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। ১৯৬৪ সালের ১৭ মে ৫০ ও ১০০ টাকার মুদ্রামূল্য রহিত করা হলে আরাকানী মুসলমানরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আরাকানী মগরা নিজেদের মধ্যকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও স্থানীয় ইঝচচ এর সদস্য থাকার সুবাদে জমাকৃত অর্থের মূল্যমান নতুন টাকা ফেরৎ পেলেও মুসলমানরা তাদের ডিপোজিটকৃত টাকা ফেরৎ পায়নি। পক্ষান্তরে সকল ব্যবসা-বাণিজ্য ও রেশন বিতরণের সার্বিক তদারকী মগদের হাতে থাকায় মুসলমানদের অর্থনৈতিক মেরুদ- ভেঙে পড়ে। উপরন্ত ১৯৬৭ সালে বার্মায় বিশেষত রাজধানী রেংগুনে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিলে আরাকান থেকে চাল আমদানী করে রেংগুনে পাঠানো হয়। সরকারিভাবে মুসলমানদের মজুতকৃত খাদ্য-শস্য জোর পূর্বক আদায় করে এবং সামরিক আধাসামরিক বাহিনীর লুটপাটের মাধ্যমে তাদের গোলা শূন্য করে নেয়া হয়। একদিকে অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, খাদ্য-শস্য লুট, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ এবং মুদ্রা অচল ঘোষনায়  অর্থনৈতিক দৈন্যের কারণে খাদ্যাভাবে মৃত্যুমুখে যাত্রা; অন্যদিকে সাংগঠনিক কর্মকা- নিষিদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিবাদের ভাষা কেড়ে নিয়ে সরকারিভাবে নির্যাতন চালায়। এমতাবস্থায় মুসলমানদের মৃত্যু মুখে পতিত হওয়া ছাড়া আর কোন গত্যান্তর ছিল না। (চলবে)
(লেখক : প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, mrakhanda@gmail.com)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ