ঢাকা, রোববার 18 March 2018, ৪ চৈত্র ১৪২৪, ২৯ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ, ঘুষ ও ঋণের বিধান

মোহাম্মদ শামসুল হুদা : সুদ : ইসলামে ‘সুদ’কে সম্পূর্ণভাবে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ সুদ হচ্ছে শোষণের হাতিয়ার। সুদ গরীবকে আরো গরীব বানায় এবং ধনীকে আরো ধনী হবার সুযোগ করে দেয়। তাই সুদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের অসংখ্য কুফল। সুদ হারাম হওয়া সংক্রান্ত বিস্তারিত বিধি বিধান অষ্টম হিজরীতে অবতীর্ণ হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ৭টি আয়াত, ৪০টিরও অধিক হাদীস এবং ইজমা দ্বারা সুদের নিষিদ্ধতা প্রমাণিত।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেছেন : “যারা সুদ খায় তারা কিয়ামতের দিন (কবর থেকে) ঐ ব্যক্তির ন্যায় ওঠবে যাকে শয়তান আছর করে মাতাল করে দিয়েছে। এ ধরনের শাস্তির কারণ এই যে, সুদখোর লোকেরা বলত, বেচা-কেনাতো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ তা’আলা বেচা কেনাকে হালাল করেছেন আর সুদরকে করেছেন হারাম। সূরা আল বাক্বারাহ ২: ১৭৫।
আল্লাহ্ তা’আলা ক্রয় বিক্রয়কে হালাল করেছেন আর সুদরকে করেছেন হারাম। শৃঙ্খলাবদ্ধতা, ঐক্য সংহতির মনোভাব, স্বতন্ত্রবোধ, ন্যায়পরায়ণতা, প্রতিশ্রুতিশীলতা, আত্মত্যাগ, সততা, সংযমশীলতা, মিতব্যয়ীতা, কঠোর পরিশ্রম, স্বজাতির সেবায় নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন জাতীয় মূল্যবোধের সংরক্ষণ ইত্যাদি মহৎ ও উন্নত গুণাবলী ইসলামের বৈশিষ্ট্য। মুসলমানগণ আজ এ সমস্ত গুণাবলী থেকে দূরে সরে গেছে। শৃঙ্খলাহীনতার কারণই মুসলমানগণের অধঃপতনের কারণ তাই শৃঙ্খলাহীনতার উৎপত্তি ঘটে চিন্তা চেতনার গীনতা থেকে। তাই চিন্তা-চেতনায় দীনতা যখন প্রকাশ হয়ে পড়ে তার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ নিঃস্ব, কপর্দকশূন্য ও পতের বিখারীতে পরিণত হয়েছে। এমন কি রাজা বাদশাহ পর্যন্ত রাজ্যহারা হয়ে গেছে।
আমি বলতে চাই মুসলমানরা যদি উন্নতি চায় এবং অন্যান্য জাতিসমূহের সাথে নিজেদের সমৃদ্ধশালী জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে তাদের উচিত হবে প্রথমেই সুদী লেনদেন বর্জন করা ও নিজস্ব অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আঁকড়ে দরা এবং অবাধ ও স্বচ্ছ লেনদেনের সুব্যবস্থা করা।
পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে- “আল্লাহ্ পাক সুদের মাল নিশ্চিহ্ন করে দেন।”
বাহ্যত: কারো মনে হতে পারে যে, সুদের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি পায়, আসলে পার্থিব জীবনেই সুদের সম্পদকে আল্লাহ তা’আলা নিশ্চিহ্ন করে দেন। যেমন- সম্পদ চুরি হয়ে যাওয়া, অযথা খরচ বেশি হওয়া ইত্যাদি। সম্পদ নিশ্চিহ্ন হওয়ার আরেরকটি দিক হলো, সুদখোর তার উপার্জিত সম্পদ থেকে উপকৃত হতে পারে না। অভাব অনটনের মাঝেই সে একদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। মোট কথা সুদী মালে কোন বরকত থাকে না। পক্ষান্তরে দান খয়রাতের মাধ্যমে বাহ্যত: সম্পদ হ্রাস হচ্ছে বলে মনে হলেও আল্লাহ পাক সে সম্পদের মাঝে বরকত দান করেন। ফলে সে সম্পদ বৃদ্ধি পেতে থাকে। সম্পদ বৃদ্ধির এই নি’আমত কখনো দুনিয়াতেই লাভ হয়, আর পরকালে তার প্রতিদানতো নিশ্চিতরূপেই পাওয়া যাবে।
সুদের মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়তে গিয়ে মানসিক দিক থেকে অপরিসীম ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। সুদর গ্রহণের ফলে অন্তর এমনই পাষাণ হয়ে যায় যে, কারো প্রতি কোন মায়া মমতা থাকে না। কারো বিপদে সুদখোরের মনে সহানুভূতি জাগে না। এমনকি আপন আত্মীয়ের কাছ থেকেও সুদ গ্রহণ করতে তার বিবেক বাধা দেয় না। এজন্য বলতে চাই সুদ বর্জনেই হলো উন্নতির বিকল্প পথ। সুদের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দিয়ে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে অস্থায়ী সুখ লাভ করা যেতে পারে কিন্তু সাদকার মাধ্যমে শুধুমাত্র অস্থায়ী সুখই লাভ হবে না বরং সাদাক্বাহ্ পরকালের দীর্ঘ ও চিরস্থায়ী সুখ শান্তি বয়ে আনবে।
সুদখোর কঠোর নিষ্ঠুর, নির্মম ও নির্দয়। দরিদ্র জনগণের প্রতি তাদের মায়া মমতা ও সহানুভূতির লেশমাত্র নেই। তাই সমাজের অসহায় ও রগীব লোকেরা সুদখোরদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে বাহ্যিক ভয় করে বটে, কিন্তু সম্মান করে না। ভয় ও সম্মান ককনো এক জিনিস নয়। দুই লোকদের ভয় করাটা স্বাভাবিক। কারণ তারা কারো কোন ক্ষতি করতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধাবোধ করে না। কিন্তু সমাজের কোন স্তরেই তাদের সম্মান নেই। সবাই তাদেরকে ঘৃণা করে। সুতরাং সুদখোররা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে তা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে পৃথিবীর কোথাও সুদখোরদের সুখে সম্মানে নেই। পক্ষান্তরে যারা হালাল পন্থায় জীবিকা উপার্জন করেন এবং দান খয়রাত করেন, তারা সুখ শান্তি ও সম্মান নিয়ে বসবাস করছেন। তাদেরকে কখনো ধন-সম্পদের পিছনে দিশেহারা হয়ে ঘুরতে দেখা যায় না। তাদের সুখ শান্তি হয়তো কম। তাদের বাহ্যিক চাকচিক্য হয়তো নেই কিন্তু স্ত্রী, সন্তান-সন্তুতি, পিতা-মাতা আত্মীয়-স্বজন সবাইকে নিয়ে তারা সুখ শান্তিতে আছে। এটাই তো প্রকৃত সুখ।
ঘুম : বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণের নিকট ঘুষ একটি বহুল পরিচিত শব্দ। ঘুষ একটি সামাজিক ব্যাধি। আমাদের সমাজ ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে এ সর্বনাশা অসুখ। ক্রমেই সমাজ ব্যবস্থা থেকে বিলুপ্ত হচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে মানবতা। আজকাল যে দিকে তাকান, সেদিকেই ঘুষ চোখে পড়ে, নজরে আসে। ঘুমের উৎপত্তি সম্পর্কে জানা যায়, দেব-দেবীর কাহিনী পড়লে দেবতাদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, মনুষ্য কর্তৃক নানা রকম উপটৌকন বা ঘুষ প্রদানের ঘটনা দেখা যায়। ফল-মূল, অস্ত্র, শস্য, নারী থেকে আরম্ভ করে কি না ছিল সেই উপটৌকনের তালিকায়। এই উপমহাদেশে ঘুষের ব্যাপক প্রসার ঘটে বিদেশী শস্তিসমূহ এই অঞ্চলের শাসন ক্ষমতা গ্রহণের পর। ঘুষ শুধু উপরথেকে নিচেই বিস্তৃত হয়নি। নিচ থেকে বিস্তৃত হয়েছে পরেও। ব্রিটিশ আমলে ঘুষ প্রতিষ্টানিকতা পায়। এই আমলে জনগণের কল্যাণের নামে প্রণীত হয় নানাবিধ আইন। ভূমি রাজস্ব আদায় উন্নয়, আইন-শৃঙ্খলা, রক্ষা, বিচার কার্য ইত্যাদির সাথে সাথে ইংরেজ রাজ পুরুষদের ব্যক্তিগত উচ্চভিলাসের পথ পরিক্রমায় ঘুষের পরিধি বিস্তৃত থাকে।
ঘুষ হচ্ছে অনেকটা প্রেমের মতো। প্রেম নামক অমিত শক্তি যেমন প্রেমিক-প্রেমিকাকে দুর্বার গতিতে টানে-ঘুষ নামক যাদুকরী শক্তি একভাবে কাছে টানে- ঘুষদাতা এবং ঘুষখোরকে। প্রেমিক প্রেমিকাকেন একজন আরেক জনের প্রতি আকৃষ্ট হয় তার সঠিক কারণ যেমন বলা যায় না, তেমনি ঘুষ দাতা ও ঘুষরখোরের পরস্পরের আকর্ষণের সুনির্দিষ্ট কারণ বর্ণনা করা অসম্ভব। ঘুষের সংজ্ঞায় বলতে হয়- কোন ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা গ্রগণের জন্যে য বিশেষ সুবিধা দেয়া হয় তাই হচ্ছে উৎকোচ বা ঘুষ। ঘুষ কখনো দিতে বাধ্য করা হয়, আবার কখনো নিজস্ব প্রয়োজনেই দেয়া হয়।
পবিত্র কুরআন মজীদ আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন ইরশাদ করেন : “তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্দ ভোগ করো না এবং জনগণের সম্পদের কিয়দাংশ জেনে শুনে অন্যানয়ভাবে আত্সসাৎ করার উদ্দেশ্যে শাসন কর্তৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না। সূরা আল বাক্বারাহ ২ : ১৮৮।
অন্য এক আয়াতে ইরশাদ করেন, “হে মানব জাতি। যমীনের মধ্যে যা কিছু রয়েছে তা থেকে তোমরা হালাল ও পবিত্র বস্তুসমূহ খাও। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। কেননা, সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।” সূরা আল বাক্বারাহ ২ : ১৬৮।
আলোচ্য আয়াতে হারাম পন্থার সম্পদ অর্জন এবং ভোগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাই আল্লাহ পাক হালাল পন্থায় সম্পদ অর্জন এবং ভোগ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতা এবং ঘুষের দালাল সকলের উপর অভিসম্পদ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়েই জাহান্নামে যাবে।” পবিত্র কুরআনে ও গুনাহের কাজ। ঘুষ মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ই নষ্ট করে দেয়।
আমাদের বর্তমান সমাজে ঘুষ একটি মারাত্মক সংক্রামক বাধির ন্যায় বিস্তার লাভ করেছে। ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। কেউ ঘুষ দিচ্ছে স্বেচ্ছায়, আবার কেউ ঘুষ দিচ্ছে বাধ্য হয়ে এবং ঘৃণা ভরে। ঘুষের অর্থ আজ প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে মিশে আছে আমাদের রক্ত মাংসের সাথে। যারা সুদ ঘুষ খেয়ে টাকার পাহাড় গড়েছে তাদের জীবনের সামান্য নিরাপত্তাও নেই। কোথাও বসে দুদ- বিশ্রাম করার ফুরসতও তাদের হয় না।
মোটকথা, হারাম উপার্জনের পরিণতি অশুভই হয়ে থাকে। আর যারা অন্যের দু’পয়সা অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করে না। যতদূর সম্ভব হালাল উপার্জন দিয়ে খেয়ে পরে কোন রকমে জীবন কাটিয়ে দেয়। এ ধরনের লোকেরা কতই না সুখে আছে।
আর বিচারকদের ঘুষ দেয়া প্রসঙ্গে বলতে চাই। বিচারক ও তার সহযোগীদের মধ্যে ঘুষের আদান প্রদান করা ইসলাম চিরতরে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- “তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং জেনে-শুনে মানুষের ধন-সম্পত্তির কিংদংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে বিচারকগণের নিকট পেশ করো না।” সূরা আর বাক্বারাহ ২: ১৮৮”।
পবিত্র কুরআনের এই আয়াতটি বিচারকদের ঘুষ দেয়া প্রসঙ্গে বলা হয়েছে। মনে রাখতে হবে যে, বিচারকের ফয়সালা বা রায়ের দ্বারা কোন হারাম জিনিস হালাল হয়ে যায় না। আবার কোন হালাল জিনিসও হারাম হয়ে যায় না। কারণ বিচারকদের রায় সাধারণত: প্রকাশ্য যুক্তি প্রমাণ ও দলিলাদির উপর ভিত্তি করে দেয়া হয়ে থাকে। সুতরাং যে ব্যক্তি ধোঁকা দিয়ে কিংবা ভুয়া দলিল ও প্রমাণপত্র পেশ করে অথবা ভুল তথ্য সরবরাহ করে বা ভুল যুক্তি দিয়ে বিচারকের ফায়সালাকে নিজের স্বপক্ষে আনার এবং সত্যকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করবে সেই দায়ী এবং গুনাহগার হবে। আর যদি কেউ বিচারককে ঘুষ দিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে এবং বিচারক ঘুষ খেয়ে রায় দেন, তাহলে ঘুষদাতা ও বিচারক উভয়েই দায়ী ও গুনাহগার হবে।
ঘুষখোর প্রথম জীবনে ঘুষের বাড়তি আয়ে খুবই ভাল থাকে কিন্তু শেষ জীবনে যখন মৃত্যু পথযাত্রী হয়ে পরপারের পথে যাত্রা করেন তখনই দেখা দেয় বিড়ম্বনা। রোগে শোকে মুহ্যমান হয়ে যান। শত ধন-সম্পত্তি এবং টাকা-পয়সা থাকা সত্ত্বেও মহান আল্লাহর দেয়া নি’আমত ভক্ষণ করাও তার পক্ষে দূরহ হয়ে পড়ে। নিজের পাশাপাশি সন্তান-সন্তুতি স্ত্রীসহ অন্যান্য সকলে রোগাক্রান্ত হন কিংবা বিভিন্ন জটিলতায় আটকে গিয়ে সর্বশান্ত হয়ে পড়েন। আর পরকালে ঘুষখোরদের জন্য তো কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নির্দিষ্ট রয়েছে। তাদের অপরাধ অমার্জনীয়। ঘুষকোরদের নেক ‘আমল, নেক কাজ কোন কাজে আসবে না। তাদের জাহান্নাম গমন রোধ করতে পারবে না।
হাদীসে এসেছে- “আর রাশি ওয়াল মুরতাশি ফিননারে।” অর্থাৎ ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহিতা উভয়ে সমান অপরাধে অপরাধী।
হাদীসে- “সত্তর প্রকার অপরাধের উল্লেখ রয়েছে। ঘুষ গ্রহণের অপরাধনিজের মায়ের সাথে ৩০ (ত্রিশ) বার যিনা করার গর্হিত কাজ।”
আমাদের সমাজ ব্যবস্থার যে বিষয়টি লক্ষ্যণীয় তা হচ্ছে “ঘুষ” খাওয়াটা এখন অনেকটা নেশায় পরিণত হয়েছে এবং বিভিন্ন কৌশলে ঘুষ দেয়া হচ্ছে। ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি আমাদের সমাজে লজ্জার কোন বিষয় নয়। যে কাজটিতে সফল হয়, তার প্রশংসা হয়। উপরি যেখানে বড়, সেখানে অন্য বিবেচনা থোড়াই আমল পায়। ঘুষের ব্যাপারে পারিবারিক প্রতিরোধ নেই। কোন পিতাই প্রায় বলেন না তোর ঘুষের টাকায় ভাত খাব না, তোর টাকা গন্ধযুক্ত টাকা। কোন স্ত্রীই বলেন না স্বামীকে বেতন তো অত নয়, পেলে কোথায় অত টাকা। কোন সন্তানই বলে না তোমার পাপের ভাগ বা গুনাহর ভার তোমার একার; আমরা তোমার হালাল রুজির নুন-ভাতেই তুষ্ট ছিলাম। আনুবীক্ষণিক ব্যতিক্রম ছাড়া সন্তানের সব পিতা-মাতাই সন্তানের বাড়তি আয়ে তুষ্ট থাকেন। সন্তান একাধিক থাকলে উৎস নির্বিশেষে যার আয় বেশি তাকে নিয়ে বেশি গৌরব করেন।
তাই আমাদেরকে ঘুষ থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজন পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সেজন্য ব্যক্তি, গোষ্ঠি, পরিবার, অঞ্চল, সমাজ, রাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বত্র এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। মানব বন্ধন, শোভা যাত্রা, সভা ছাড়াও স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদরাসা, মাসজিদ, মন্দিরে সকল স্তর থেকে ঘুষের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে ও সমালোচনা করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিকারী শিক্ষাই ঘুষ, দুর্নীতি প্রতিরোধে সাহায্য করে। কারণ নৈতিকতা অর্জন ছাড়া ঘুষ, দুর্নীতি নির্মূল করা কখনো সম্ভব নয়। মানুষকে মহত হতে হবে। কেননা মহত মানুষের জীবন ও আদর্শই সাফল্যের বাতিঘর।
পরিশেষে বলতে চাই, গুষ মানুষের সীমাহীন লোভ সৃষ্টি করে এবং দানশীলতার মতো মহৎ গুণকে দূর করে দেয়। ঘুষ মানুষের উদারতা, সহনশীলতা, দানশীলতা মনোভাবের পরিবর্তে স্বার্থপরতা, সংকীর্ণতা, কৃপণতা, নির্মমতা ও প্রতিশোধমূলক মনোভাবের জন্ম দেয়। মোটকথা, ঘুষ হচ্ছে মানুষের উন্নত ও আদর্শ চরিত্র গঠনের প্রতিবন্ধক।
ঋণ : পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ঋণদাতার ফযীলত বর্ণনা করে বলেন, “কে এমন আছে, যে আল্লাহকে কর্জে হাসনা বা উত্তম ঋণ দিবে এরপর তিনি তার জন্য তা বহু গুণে বৃদ্ধি করে দিবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার।” সূরা আল হাদীস ৫৭ : ১১।
আল্লাহ পাক বলেন, যদি তোমরা মহান আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করো, তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তা দ্বিগুণ করে দিবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। আর আল্লাহ তা’আলা গুণাগ্রাহী সহনশীল। উল্লিখিত আয়াতে মহান আল্লাহকে ঋণ দেয়ার অর্থ হচ্ছে তার বান্দাদের ঋণ দিয়ে তাদের অভাব মোচন করা। কেউ যদি মহান আল্লাহর বান্দার প্রতি করুণা করে তাহলে আল্লাহ তা’আলাও তার প্রতি করুণা করবে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : “কোন মুসলমান অন্য মুসলমানকে একবার ঋণ (কর্জে হাসানা) দিলে তা মহান আল্লাহর পথে সে পরিমাণ সম্পদ দু’বার সাদাক্বাহ, করার সমতুল্য।”
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে- “আর ঋণ গ্রহীতা যদি অভাবগ্রস্থ হয়, তবে তাকে স্বচ্ছলতা আসা পর্যন্ত সময় দেয়া উচিত। আর যদি ক্ষমা করে দাও তবে তা তোমাদের জন্য খুবই উত্তম যদি তোমার উপলব্ধি করতে পারতে।” সূরা আল বাক্বারাহ ২ : ২৮০।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক ব্যক্তিকে এভাবে উপদেশ দিয়েছেন ‘গুনাহ কম করো’ তোমার মৃত্যু সহজ হবে: ঋণ কম করো, স্বাধীনভাবে জীবন-যাপন করতে পারবে। বিনা প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করা এবং পাওনা পরিমোধ টাল-বাহানা করা মারাত্মক অপরাধ এবং ঋণদাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নামান্তর।
অন্যত্র এক হাদীসে ঋণ গ্রহণের নিন্দা করা হয়েছে এবং ঋণ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই দুই রকম হাদীসের মর্মার্থ হলো বিনা প্রয়োজনে ঋণ গ্রহণ করা নিন্দনীয়। সুতরাং এর থেকে বিরত থাকা উচিত।
একান্ত প্রয়োজন ব্যতিত ঋণ গ্রহণ করা মোটেই ঠিক হবে না। একান্ত প্রয়োজন যেমন- জিহাদ করা, কাফনের কাপড় ক্রয় করা, লজ্জা নিবারণের কাপড় কেনা ইত্যাদি। অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনে ঋণ নেয়া যেতে পারে। আর এসব ব্যাপারে ঋণ নিলে আল্লাহ তা’আলা সেই ঋণ আদায়ে সাহায্য করেন।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : আমি জান্নাতের দরজায় লেখা দেখেছি যে সাদাক্বাহ দিলে দশ গুণ সাওয়াব পাওয়া যায় আর ঋণ লাভমুক্ত ঋণ) প্রদান করলে আঠার গুণ সাওয়াব পাওয়া যায়।
অন্য এক হাদীসে এর কারণ বর্ণনা করা হয়েছে যে, সাদাক্বাহ্ প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও চাওয়া হয়, আর ঋণ চাওয়া হয় শুধু প্রয়োজনের কারণেই। এটাই স্বাভাবিক অবস্থা তাছাড়া কারো প্রযোজনে পূর্ণ করেদিলে সে ব্যক্তি যে পরিমাণ খুশি হয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এজন্য ঋণ দেয়া অনেক বেশি সাওয়াবের কাজ।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : মহান আল্লাহর রাস্তাসমূহের একটি রাস্তা। আল্লাহ তা’আলা যখন কাউকে অপমাণিত করতে চান, তখন তার ঘাড়ে ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেন। ঋণগ্রন্থ ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে তার জান্নাতে প্রবেশ হওয়ার বিষয়টি স্থগিত হয়। অর্থা- তার আত্মা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে না, যতক্ষণ না তার ঋণ আদায় করা হয়।
তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরো বলেছেন, শহীদদের সমস্ত গুনাহ  মাফ করা হয় কিন্তু ঋণ মাফ করা হয় না। ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বিলাসিতা বর্জন করা উচিত এবং মেহমান অতিথি আসলেও তাদের জন্য ঋণ করে মেহমানদারী করা ঠিক না।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : যদি কোন ব্যক্তি তোমাদের কাউকে ঋণ দেয়, ঋণী ব্যক্তি যেন তাকে উপহার না দেয়। স্ত্রীর মোহরানা বাকী থঅকলেও এই মোহরানাও ঋণের অন্তর্ভুক্ত হবে। তাই যে, ব্যক্তি ঋণগ্রন্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করবে সে বড়ই দুর্ভাগা।
সহীহুল বুখারী’র এক রিওয়ায়েতে আছে নাবী কারীম (সাল্লাল্লা-হু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : যে ব্যক্তির কাছে কারো কোন পাওনা থাকে তার উচিত দুনিয়াতেই তা পরিশোধ করা অথবা মাফ করিয়ে নেয়া। নতুবা কিয়ামতের দিন দিরহাম দিনার, টাকা পয়সার কোন অস্তিত্ব থাকবে না। কারো যদি কোন দাবি থাকলে তা নিজের সৎকর্ম দিয়ে পরিশোধ করা হবে। সৎকর্ম মেষ হয়ে গেলে পাওনাদারদের গুনাহ প্রাপ্য অর্থ পরিমাণে তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে। সহীহুল বুখারী।
বাংলাদেশে অনেক বে-সরকারি সংস্থা রয়েছে। সেই সংস্থাগুলি দারিদ্র বিমোচন করার জন্য ঋণ দিয়ে থাকেন। সংস্থাগুলি ১ বছর বা দু বছর মেয়াদী ঋণ দিয়ে সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তির মাধ্যমে ঋণ তুলে নেন। তাতে দখা যায় ঋণের সুদের পরিমাণ ২২ থেকে ৩৫ ভাগ দাড়িয়ে যায়। আবার এই ঋুণ সময় মত না দিলে ঋণ গ্রহিতাকে অপমাণ ছাড়াও ঘরের আসবাবপত্র, ঘরের টিন প্রভৃতি খুলে নিয়ে যেতে দ্বিধাবোধ করে না। তবে পত্রিকান্তে দেখা যায় বেসরকারি সংস্থা থেকে পুরুষ বা মহিলা ঋণ নিয়ে অনেকে স্বাবলম্বী হয়ে জীবন-যাপন করছে। আমার মনে হয় ঋণনিয়ে ১০ থেকে ২০ ভাগ লোকের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও বাকী ৮০ ভাগ লোক স্বাবলম্বীর আওতায় পড়ে না। বরঞ্চ ঋণ গ্রহিতাদের ঋণ দাতা সংস্থার সুদ দিতে দিতে তাদের সহায় সম্বল হারিয়ে ফেলে ও হয়রানি ছাড়াও মানসিক দিক দিয়ে পর্যুদস্ত হয়। তবে এনজিওগুলো যেমন গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যাক, আশা, প্রশিকা, ঠেঙ্গামারা শতশত সংস্থাগুলো সব ধরনের লোক বা ব্যবসা খাতে ঋণ দিয়ে থাকে। এনজিওগুলো হতে ভিক্ষুকরা সুদমুক্ত ঋণ নিয়ে বেশিরভাগ। ভিক্ষুক স্বাবলম্বী হয়েছে, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কারণ এদেরকে ঋণের সুদ দিতে হয়নি। এ ধরণের সুদ মুক্ত ঋণ দিলে বেশির ভাগ ঋণ গ্রহীতাদের স্বালম্বী হওয়ার রাস্তা সুগম হয়।
কোন সংস্থা ব্যাংক, বীমা, কাহারো কাছে ঋণগ্রস্ত হওয়া মোটেই ঠিক না। ঋণ ছাড়াই কিভাবে স্বাবলম্বী হওয়া যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। সুদী অর্থাবস্থায় ব্যাংক, বীমা, কর্পোরেশন ও অন্যান্য সুদী প্রতিষ্ঠানগুলো জনকল্যাণমূলক প্রকল্প গ্রহণ করতে বাধ্য থাকে না। কারণ সুদসহ মূলধন ফেরত পাবে এটাই তাদের প্রধান হিসাব।
সুদ মানুষের মধ্যে নির্মমতা, সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা, কৃপণতা, নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতার জন্ম দেয় সুদ হচ্ছে মানুষের উন্নত চরিত্র গঠনের প্রতিবন্ধক। সুদ মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধিও মেধা বিকাশের বাধা সৃষ্টি করে। মোট কথা সুদ সমাজে বেকারত্ব বৃদ্ধি করে। অতএব এ থেকে বেঁচে থাকা সকলের দায়িত্ব।
লেখক : সম্পাদক, সাপ্তাহিক দিনাজপুরের কাগজ। রিপোর্টার, দৈনিক ইত্তেফাক ও দি নিউন্যাশন, পার্বতীপুর, দিনাজপুর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ