ঢাকা, রোববার 18 March 2018, ৪ চৈত্র ১৪২৪, ২৯ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সেই ‘মুক্তাঙ্গন’ এখন দখলদারদের কব্জায়

গাড়ী পার্কিং (উপরে) এবং ভাঙ্গাড়ির দোকানের দখলদারদের কব্জায় সেই মুক্তাঙ্গন -সংগ্রাম

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : রাজধানীর জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী মুক্তাঙ্গনে এক সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশে মুখর থাকতো। যখন কোথাও সমাবেশের । অনুমতি পাওয়া যেতনা তখন এই মুক্তাঙ্গণই ছিল শেষ ভরসা। এখানে বক্তব্য দিয়েছেন দেশের সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। অথচ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই মুক্তাঙ্গন চলে গেছে দখলদারদের কবজায়। এখন সমাবেশের পরিবর্তে এটি ব্যবহার হয় কার পার্কিং হিসেবে।
সূত্র মতে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন রাজধানীর পুরানা পল্টন এলাকায় মুক্তাঙ্গন পার্কটির অস্তিত্ব চরম হুমকির মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন দখলবাজদের দখলে আছে মুক্তাঙ্গনটি। কমপক্ষে ১০ বার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেও তা দখলমুক্ত করা যায়নি। এখন অবৈধ দখলদাররা সেখানে মসজিদ বানাচ্ছে। আর খোদ ডিএসসিসি নিজেই বিশাল এলাকাজুড়ে গণশৌচাগার নির্মাণ করেছে। আগে থেকেই সেখানে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের পল্টন থানার একটি অফিস রয়েছে। ভেতরে আছে বেশ কয়েকটি ভাঙাড়ির দোকান। সব মিলিয়ে মুক্তাঙ্গন বলে আর কিছু থাকছে না। ডিএসসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বলেন, ‘মুক্তাঙ্গনের জায়গায় আমরা একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি। কিন্তু তা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। এখন বিভিন্ন স্থায়ী স্থাপনা হয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে উচ্ছেদ করা যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মুক্তাঙ্গনে প্রায় শতাধিক গাড়ি অবৈধ পার্কিং করে রাখা হয়েছে। সারি সারি গাড়ি রেখে চালকরা বসে আড্ডা দিচ্ছে। পাশেই নতুন করে নির্মাণ করা একটি মসজিদ। মুক্তাঙ্গনের ভেতরে রয়েছে কয়েকটি ভাঙারির দোকান। সেখানে কিছু লোক বসবাসও করছে। ডিএসসিসি’র দু’টি ডাস্টবিন রয়েছে রাস্তার পাশে। পর গাছপালা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। হাতে গোনা কয়েকটি গাছ এখন চোখে পড়ে। মুক্তাঙ্গনের ভেতরে কয়েকটি বড় বড় ময়লার স্তূপ জমিয়ে রাখা হয়েছে। পল্টন মোড়ের অংশে রয়েছে বিসমিল্লাহ অ্যাকোয়ারিয়াম নামের একটি দোকান। এর পেছনে রয়েছে আরেকটি ময়লার স্তূপ।
জানা যায়, মুক্তাঙ্গনে সব ধরনের দখলের পেছনে রয়েছে অবৈধ মাইক্রোবাসচালকরা। তারাই এখানে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখতে সব ধরনের দখলকে উৎসাহ দেয়। সম্প্রতি মসজিদ নির্মাণ করা তাদের একটি নতুন কৌশল বলে জানায় অনেকে। ডিএসসিসির দুটি ডাস্টবিন রাতের আঁধারে মুক্তাঙ্গন থেকে সরিয়ে রাস্তায় রাখা হয়েছে। মসজিদের পাশে ‘ঢাকা মাইক্রোবাস ও কার মালিক সমিতি’ নামের তাদের সংগঠনের ব্যানার। এখানে মাইক্রোবাস স্ট্যান্ডের পেছনে রয়েছে মাসে লাখ লাখ টাকার চাঁদাবাজি। এ টাকা ভাগ করে নেন রাজনৈতিক দলের কিছু স্থানীয় নেতা। এখন তারা নিজেরাও দখলে মেতে উঠেছেন। যে যার মতো করে হকার বসিয়ে পুরো মুক্তাঙ্গন দখলে নিয়েছেন। রাজধানীর এ মুক্তাঙ্গন দখলবাজিতে খোদ ডিএসসিসির একটি অসাধু চক্রও রয়েছে। সম্প্রতি ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষ সেখানে গণশৌচাগার নির্মাণ করেছে। বিশাল এলাকাজুড়ে মুক্তাঙ্গনের জায়গায় এনজিওর অর্থে নির্মাণ করা হয়েছে এ শৌচাগার। এরপর গত কয়েক দিনের ব্যবধানে এ শৌচাগারের গা ঘেঁষে কিছু জায়গা স্থানীয় ১৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের ‘মুক্তাঙ্গন ইউনিট’ নামে একটি সাইনবোর্ড দিয়ে দখল করা হয়েছে। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চেয়ার-টেবিল বসিয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় পরিচয়ে লোকজন টেলিভিশন দেখছে। বেশ কিছু এলাকা তারা বেড়া ও কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে নিজেদের আয়ত্তে নিয়েছে।
এ বিষয়ে ১৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সালাম খান সেলিম বলেন, ‘আমাদের একটি ইউনিট করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তা মুক্তাঙ্গন দখল করে করার কোনো দরকার নেই। তবে কেউ সেখানে কিছু করে থাকলে তা আমি জানি না। আমরা কোনো দখলের সঙ্গে থাকতে চাই না।’ ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) খালিদ আহমেদ বলেন, ‘মুক্তাঙ্গনের জায়গায় যত স্থাপনা আছে সবই অবৈধ। এখানে অনেকবার উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। আর নতুন করে উচ্ছেদ অভিযানের কোনো পরিকল্পনা নেই।  মুক্তাঙ্গন আর ফিরে পাওয়া যাবে, সেই কথাও বলা যাচ্ছে না।’
জানা গেছে, মুক্তাঙ্গন পার্কটি পল্টন এবং জিরো পয়েন্টকে বিভক্ত করেছে এমন একটি স্থানে অবস্থিত। এখান থেকেই রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হতো। পত্রিকায় পাতায় প্রায়শ এই স্থানটির নাম উল্লেখ থাকতো।  কিন্তু পার্কটি কার্যত অস্তিত্বহীন। পার্কটির মোট ৮৩ ডেসিমিল জমি এখন অবৈধ দখলে। এখন এটি দখল করে সরকারি দল প্রতিটি গাড়ির মালিক বা ড্রাইভার থেকে ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা হারে সংগ্রহ করে।  যদি কোন ব্যক্তি গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য জায়গাটি ব্যবহার করতে চায় তবে তাকে নিবন্ধন ফি হিসাবে ১০,০০০ টাকা দিতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ