ঢাকা, রোববার 18 March 2018, ৪ চৈত্র ১৪২৪, ২৯ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

ঢাকার হারিয়ে যাওয়া পঞ্চায়েত

নূরুল আনাম (মিঠু) : আদিম মানব সমাজের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন থেকেই গণতন্ত্র ও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার ভিত্তি রচিত হয়েছিল। প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের গোত্র ভিত্তিক জীবনধারা কিংবা প্রাচীন উপমহাদেশের ষোড়শ মহাজনপদ অথবা প্রাচীন গ্রীসের নগর রাষ্ট্রে যে ধরনের গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটেছিল  তা হয়তো আধুনিককালের গণতন্ত্রের  সাথে মেলানো যাবে না। কিন্তু সে যুগের মাপকাঠিতে এর মধ্যেই এক বিশেষ ধরনের গণতন্ত্র ও স্থানীয় শাসন ও সরকারের বিকাশ সাধিত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের গোত্রীয় ব্যবস্থার সংশোধিত ও উন্নত রূপ ছিল ইসলামী গণতন্ত্র। চূড়ান্তভাবে একথা বলা যায় যে, অঞ্চলভিত্তিক নেতৃত্ব বিকাশের ইতিহাস মোটেই সাম্প্রতিক নয়। আধুনিক ঢাকা শহরের গোড়াপত্তন কবে হয়েছিল তা আজও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে শহর হিসাবে ঢাকার যাত্রা মুসলিম পূর্ব যুগ থেকেই শুরু হয়েছিল তার স্বপক্ষে কিছু যুক্তি প্রমাণ আছে। বিশেষত গুপ্ত যুগের মুদ্রায় এই মত দৃঢ়মূল হয়েছে। সেই শহর নিশ্চিন্তভাবেই অনেক ছোট বা গ্রামের আকারে ছিল এবং তা বুড়িগঙ্গা তীরবর্তি স্থানেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ঢাকার আধুনিক প্রশাসন সৃষ্টি হওয়ার আগে থেকেই প্রচলিত ছিল পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। ঠিক কবে থেকে এই ব্যবস্থার পত্তন হয় তা অবশ্য জানা যায়নি। তবে মোগল আমল থেকে এই ব্যবস্থা প্রচলিত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন এসেছে বার বার, আইন-কানুন হয়েছে নতুন, শাসন ও বিচার ব্যবস্থা হয়েছে যুগোপযোগী। উত্থান-পতন ও ভাঙ্গাগড়ায় ঢাকার নাগরিক জীবন বারংবার বিপর্যস্ত হয়েছে। কিন্তু ঢাকার পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার সহজে হেরফের হয়নি। বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা সুচারুভাবে পরিচালিত হয়েছে। পঞ্চায়েত সাধারণত মহল্লার জনগণের রুটিরুজির ব্যবস্থা, কাজ-কর্মে উৎসাহ দান, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, মামলা-মোকদ্দমা, ঝগড়া-বিবাদ নিষ্পত্তি করা, গরিব মেয়েদের বিয়ের ব্যবস্থা করা, মৃতদের সৎকার ইত্যাদিই ছিল পঞ্চায়েতের কাজ। আগেই বলা হয়েছে, যে, মোঘল আমলে এর সূচনা হলেও উনবিংশ শতাব্দির মধ্যভাগে ঢাকার তৎকালীন নবাব আবদুল গনির প্রচেষ্টায় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা আবারও জেগে উঠে। তার উদ্যোগে ঢাকার বাইশটা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ মহল্লা নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় পঞ্চায়েত গঠিত হয়। এটাই বাইশ পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েতের সময়সীমা নির্দিষ্ট না থাকলেও তা পরিবর্তিত হতো। নবনির্বাচিত পঞ্চায়েত সর্দার, নায়েব সর্দারদের বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অভিষিক্ত করা হতো। আর সেই অনুষ্ঠানে সর্দারদের মাথায় পাগড়ি পরিয়ে দিতেন স্বয়ং ঢাকার নবাব। এ উপলক্ষে প্রীতিভোজের আয়োজনও থাকত। প্রথমদিকে পঞ্চায়েতের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল। মহল্লাবাসীর দানে অর্জিত এই তহবিল একমাত্র জনকল্যাণেই ব্যয় হতো। এর তত্ত্বাবধানে ছিলেন স্বয়ং সরদার। তাকে সহযোগিতা করত মহল্লাবাসীকে নিয়ে গঠিত একটি কমিটি। এর কাজকর্মের জন্য একটি সরকারি বাংলো ঘর থাকত। এটি ছিল মহল্লাবাসীর মিলনকেন্দ্র। পঞ্চায়েতে সামাজিক কর্মকা-ের প্রয়োজনীয় সব দ্রব্যসামগ্রী থাকত। কিন্তু ৪৭-এর মহারাষ্ট্রবিপ্লবের মহাপ্লাবন থেকে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাও মুক্ত ছিল না। আর তাই তা ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিভু নিভু প্রদীপের কোথাও কোথাও তা সক্রিয় থাকলেও পূর্বের মত সক্ষম রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এখনও একে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। তবে তাকে অবশ্যই যুগোপযোগী হতে হবে। কেননা, এই ব্যবস্থা জনস্বার্থেই উপযোগী। এ যুগেও সমাজে সৌহার্দ্য গড়ে তুলতে এই ব্যবস্থার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সব শেষে বাইশ পঞ্চায়েতের কয়েকজন বিখ্যাত সরদারের নাম উল্লেখ করা হলো। তারা হচ্ছেন :
সরদারদের সরদার মির্জা আবদুল কাদের সরদার, নাজিরাবাজারের মতি সরদার, আবদুল মাজেদ সরদার ও চাঁদ সরদার, আমলীগোলার আবদুর রহিম সরদার, লক্ষ্মীবাজারের রহমত সরদার, চাঁনখারপুলের মিয়া সরদার, মগবাজারের ওসমান সরদার, কলতাবাজারের নাসির উদ্দিন সরদার, গে-ারিয়ার কোব্বাদ সরদার, রায় সাহেব বাজারের ইলিয়াস সরদার, লোহারপুলের আহসান উল্লাহ সরদার, চকবাজারের নবী সরদার, বাবু বাজারের চুনু সরদার, পোস্তগোলার নওলাক সরদার, ফরিদাবাদের গোলাম আলী সরদার, আলমগঞ্জের কাদের সরদার, রহমতগঞ্জের বসুরুদ্দিন সরদার, বাসাবোর পান্ডব আলী সরদার, গোয়ালঘাটের হাজী ইউসুফ আলী সরদার, সাতরওজার সালাম সরদার, ইসলামপুরের মিয়া সরদার, দয়াগঞ্জের আলী সরদার, ইমামগঞ্জের সাহাবউদ্দীন সরদার, জিন্দাবাহারের সাত্তার সরদার, বংশালের রহমান সরদার, লালবাগের বারেক সরদার, খাজে দেওয়ানের নবাব সরদার, নবাবগঞ্জের চাঁনমাল সরদার, হাজারীবাগের এনায়েত সরদার, নারিন্দার লেটকু সরদার,দক্ষিণ মৈশ-ির ফকির চাঁন সরদার ও আলুরবাজারের আবদুল হাই সরদার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ