ঢাকা, সোমবার 19 March 2018, ৫ চৈত্র ১৪২৪, ৩০ জমদিউস সানি ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বেঁধে যেতে পারে পারমাণবিক যুদ্ধ

আখতার হামিদ খান : [জলবায়ুর পরিবর্তন মানুষের জীবনযাপন থেকে শুরু করে পৃথিবীর প্রায় সব কিছুতেই পরিবর্তনের প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। জলবায়ুর পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আবহাওয়ার ওপর ব্যাপকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করছে। বাংলাদেশে গ্রীষ্মে  ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শীতে শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বছরে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে এবং সেই সঙ্গে বন্যা, সাইক্লোনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের হারও বাড়ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে চাষযোগ্য জমির পরিমাণও যাচ্ছে কমে। বিশেষ করে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় ধানি জমিতে লবনাক্ততার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ফলে পানির সরবরাহ কমে যাচ্ছে, কমে যাচ্ছে উৎপাদন কার্যক্রম। আর এই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী যেসব উন্নত দেশ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বস্তবায়ন করছে না বরং আরো অধিক হারে কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে দাবি আদায়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করতে হবে। ধারণা করা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সারা পৃথিবীতে তৈরি হবে বিপুলসংখ্যক জলবায়ু উদ্বাস্তু, ফলে সৃষ্টি হতে পারে অস্থিরতা হানাহানিসহ ধ্বংসপ্রায় এক পৃথিবীর পরিণতির পরিস্থিতি হয়তো বেঁধে যেতে পারে একটি পারমাণবিক যুদ্ধ পর্যন্ত।]
ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ আজ বড়জোর তিন ঋতুর দেশে পরিণত হয়েছে। বেড়েছে শীত, গরমের তীব্রতা, অসময়ের বৃষ্টিপাত। জলবায়ুর এ ধরনের রূপান্তর যখন দশকজুড়ে সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়ায় তখনই তাকে সাধারণভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের সংজ্ঞাভুক্ত করা হয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের সামগ্রিক প্রভাব সংজ্ঞার আতওা ছাড়িয়েও অনেক দূর বিস্তৃত ও গভীর। জলবায়ু পরিবর্তনের পরিবর্তন ঘটে। পরিবর্তন ঘটে শস্যচক্রের, আবির্ভাব ঘটে নতুন নতুন রোগ-বালাইয়ের। এই পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে ভূ-ভাগবেষ্টিত অঞ্চলগুলোর প্রায পুরোটাই মরুভূমিতে রূপান্তরিত হতে পারে। একটা বিরাট অংশ তলিয়ে যেতে পারে সমুদ্রের তলে। সুপেয় পানির অভাব হয়ে উঠতে পারে প্রকটতর, সৃষ্টি হতে পারে দখল উপনিবেশিকীকরণের নতুন পর্ব, এমনকি ধ্বংস হতে পারে গোটা দুনিয়ার এত দিনের সভ্যতা। এ যেন হরর ফিল্মের প্রতিটি কাল্পনিক সম্ভাবনার বাস্তব হুমকি হিসেবে সামনে আসা। আসলেই তাই, জলবায়ু পরিবর্তন তথা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মোকাবিলা করতে না পারলে আমাদের জন্য এক ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। প্রতিটি আশঙ্কারই বাস্তব এবং বর্তমান গতিতে উষ্ণায়ন, পরিবেশের ধ্বংসযজ্ঞ চলতে থাকলে ভয়াবহতম পরিণতিটা আর কোনো আশঙ্কা নয়, হয়ে দাঁড়াবে বাস্তব ঘটনা। সেই পরিণতি হবে কি না তা অনেকটাই নির্ভর করে বর্তমানে আমরা কী পদক্ষেপ নিচ্ছি তার ওপর। আর এই পদক্ষেপও নির্ভর করে বিষয়টা আমরা কিভাবে দেখছি, এর মোকাবিলায় আমরা কত দূর যেতে প্রস্তুত আছি এবং বিদ্যমান ক্ষমতা বিন্যাসের কী বদল ঘটছে- সেগুলোর ওপর।
জলবায়ু পরিবর্তন প্রাকৃতিক, নাকি সামাজিক ঘটনা?
জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের কাজকর্মের ফল, নাকি প্রকৃতির সাধারণ রূপান্তরের অংশ- এই প্রশ্নে বহুদিন ধরে তর্ক চলেছে বিজ্ঞানীদের ভেতর। বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল রাজনীতির পক্ষ থেকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনাটিকে প্রকৃতির সাধারণ পরিবর্তনের ফল হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল লক্ষণীয়। দুনিয়ার বহু পরিবেশবিজ্ঞানী আন্দোলনকর্মীদের অক্লান্ত চেষ্টার পর আইপিসিসি ২০০৭ সালে বর্তমান জলবায়ুর যে পরিবর্তন বর্তমানে ঘটছে তা স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবর্তনের অংশ নয় বরং একধরনের বিকৃত পরিবর্তন। এই বিকৃতি একটা আর্থসামাজিক রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ব্যবস্থাজাত। মানুষে মানুষে এবং মানুষে প্রকৃতিতে যে সম্পর্ক জারি আছে দুনিয়াজুড়ে তারই অনিবার্য ফল এই পরিবর্তন।
জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে প্রতিনিয়তই। পরিবর্তনই প্রকৃতির নিয়ম, অপরিবর্তন নয়। কিন্তু সেই পরিবর্তনের দিক ও গতি এমনভাবে প্রভাবিত করা হচ্ছে, যাতে তা এক মারাত্মক বিপদের মুখোমুখি করছে আমাদের। আগে যে পরিবর্তন হতে সময় লাগত হাজার বছর, এখন তা হচ্ছে হয়তো ১০ বছরে। আগে ১০০ বছরে যে পরিবর্তন হতো তার জন্য হয়তো এখন লাগছে এক বছর। প্রকৃতির এই দ্রুতগতির পরিবর্তনের ফলে পুরো প্রাণিজগতই পড়ছে ধ্বংসের মুখে।
জলবায়ুর এই ধারার পরিবর্তনের পেছনে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের উপস্থিতি আজকাল কম-বেশি সবাই স্বীকার করছেন। ২০০৭ সালে আইপিসিপি যেসব সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সেগুলোকে সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়-
সন্দেহাতীতভাবেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটছে।
বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রার যে বৃদ্ধি ঘটছে তা মানুষের কার্যকলাপের ফলাফল এবং এর জন্য প্রধানত দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের উদগীর বৃদ্ধি।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি একটি চলমান ঘটনা এবং শত শত বছর ধরে চলতেই থাকবে, এমনকি গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ একটা মাত্রার ভেতরে রাখা গেলেও। তবে এর পরিমাণ কী হবে তা নির্ভর করে মানুষ পরবর্তী সময়ে কী পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করছে তার ওপর।
একুশ শতকে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.১ থেকে ৬.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এই সময়ে বাড়বে ১৮ থেকে ৫৯ সেন্টিমিটার।
প্রচণ্ড গরম, দাবদাহ এবং প্রবল বৃষ্টিপাত চলতেই থাকবে।
খরা, ক্রান্তীর সাইক্লোন ও প্রচণ্ড জোয়ার দেখা দেবে।
পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন এবং নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে ১৭৫০ সাল থেকে।
শিল্প বিপ্লবের পরবর্তীকালে গ্যাসের পরিমাণ আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আগের ছয় লাখ ৫০ হাজার বছরে এই গ্যাসের পরিমাণ ছিল প্রায় স্থির।
আইপিসিসির এই ঘোষণার পর সাধারণভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন অস্বীকারের রাজনীতি অনেকখানি পেছনে পড়ে গেছে। বরং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিজেই যেমন অনেক নতুন সমীকরণের জন্ম দিচ্ছে, তেমনি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়েও তৈরি হচ্ছে অনেক নতুন সমীকরণ। সেসব প্রশ্নের আলোচনায় যাওয়া আগে এটুকু অন্তত বলা যায় যে জলবায়ু পরিবর্তন একটা সামাজিক ঘটনা এবং এর পেছনে আছে পুঁজিবাদের জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক মুনাফাকেন্দ্রিক উৎপাদনব্যবস্থা। এই উৎপাদন সম্পর্ক যে যান্ত্রিকীকরণ, জ্বালানিব্যবস্থা ও ভোগের আয়োজনে সৃষ্টি করে তার সঙ্গেই সম্পর্কিত অধিকমাত্রায় গ্রিনহাউস গ্যাসের উদগীরণ এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।
গ্রিনহাউস গ্যাস কিভাবে পৃথিবীতে উষ্ণ করছে?
গ্রিনহাউস শব্দটি এসেছে শীতের দেশে ফসল উৎপাদনের জন্য যে কাচের ঘর ব্যবহৃত হয় তা থেকে ফসলের অঙ্কুরোদগম বৃদ্ধি ও ফল আসার জন্য যে তাপমাত্রা প্রয়োজন হয় তা প্রায়ই শীতপ্রধান দেশে পাওয়া যায় না। বিশেষত দিনের দৈর্ঘ্য সেখানে অত্যন্ত কম হওয়ায় এ ঘটনা ঘটে। এ জন্য তাপ ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে উদ্ভিদের জীবনচক্র সম্পন্ন হতে পারে। তাপ ধরে রেখে সবুজ উৎপাদনের এই রীতিকেই গ্রিনহাউস হিসেবে অভিহিত করা হয়। এই গ্রিনহাউসের মতোই তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা আছে কিছু গ্যাসের। কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ক্লোরফ্লোর কার্বন ইত্যাদি গ্যাস তাপ ধারণে সক্ষম। গোটা দুনিয়াই সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়, উত্তপ্ত হয় প্রতিদিন। এই উত্তাপ আবার ভূ-পৃষ্ঠ থেকে বিকীর্ণ হয়। কিন্তু এই বিকীর্ণ রশ্মির তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় তার ভেদ্যতা অনেক কম। ফলে এর বেশির ভাগ অংশই বায়ুম-লের চাদর ভেদ করতে পারে না। গ্রিনহাউস গ্যাসগুলো এই তরঙ্গকে আটকে দিয়ে পৃথিবীকে গরম রাখে, যা পৃথিবীর প্রাণের জন্যও প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই যখন এই গ্যাস পরিমাণে বেড়ে যায় এবংে পৃথিবী প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় উষ্ণতার চেয়ে উষ্ণতর হতে থাকে। প্রাণদায়ী উষ্ণতা তখন প্রাণসংহারী রূপে আবির্ভূত হয়। পৃথিবীতে এই গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে বনভূমি ধ্বংস আর জীবাশ্ম জ্বালানির অধিক ব্যবহারের কারণে। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে শিল্পোৎপাদন ও কৃষির উৎপাদনে, যোগাযোগ, ভোগে। এমনকি পুঁজির ফাটকা বাজারিও আখেরে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় ও পৃথিবীকে উষ্ণ করে তোলে।
জীবাশ্ম জ্বালানি: পুঁজির প্রাণভোমরা, প্রাণের হন্তারক!
আজ আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যখন পুরনো কালের সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে ওঠা, আর সন্ধ্যা নেমে এলেই ঘুমাতে যাওয়া প্রায় রূপকথার গল্পের মতো শোনায়। অথচ মানবজাতি তার ইতিহাসের অধিকাংশই পার করেছে এভাবে। শিকার কিংবা আহরণের স্তরে তো বটেই, কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের কালেও। সেই তুলনায় শিল্পভিত্তিক যুগ অনেকটাই নবীন। কিন্তু এই শিল্পভিত্তিক স্তর মূলত যা জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর তা অনেক বেশি নাটকীয়। এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে পুঁজির। পুঁজি এমন এক অস্তিত্ব নিজের সংবর্ধনই যার শর্ত। নিজের স্ফীতি ছাড়া পুঁজি, পুঁজি হিসেবে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। পুঁজিকে প্রতিনিয়ত উদ্বৃত্ত উৎপাদন করতে হয় এবং সেই উদ্বৃত্তকে আবার বিনিয়োগ করতে হয়,যা আবার শেষ পর্যন্ত আরো উদ্বৃত্ত নিয়ে আসবে। এরপর আরো বিনিয়োগ, আরো উদ্বৃত্ত, আবার বিনিয়োগ, আবার উদ্বৃত্ত-এভাবে চক্রাকার প্রক্রিয়া চলতে থাকে, যাতে উদ্বৃত্ত উৎপাদন ও তার বৃদ্ধি দাঁড়ায় একটা বাধ্যবাধকতায়। এই বাধ্যবাধকতা তার ওপর যে চাপ সৃষ্টি করে, তা একদিকে শ্রমের কার্যকারিতাকে বৃদ্ধির প্রয়োজন সৃষ্টি করে, যাতে আপেক্ষিকভাবে কম মূল্যে অধিক শ্রম ব্যবহার করা যায়। ফলে শ্রম সময়ের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি ও তার ঘনীভবন অতিশয় প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে তাগিদ সৃষ্টি করে উৎপাদন এলাকাকে, বাজারকে ছড়িয়ে দেওয়ার। স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রাকৃতিক শর্ত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত সৌরশক্তির বদলে কম রূপান্তর ব্যয় ও কম পরিমাণ ব্যবহারের অধিক শক্তি পাওয়ার উৎস হিসেবে সামনে আসে জীবাশ্ম জ্বালানি। জীবাশ্ম জ্বালানির আবির্ভাবের ফলে- প্রথমত, শক্তির উৎসের সঙ্গে উৎপাদন এলাকার সরাসরি সম্পর্ক গেল ঘুঁচে। ফলে প্রকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়াই উৎপাদকে বিশেষ অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত করা সম্ভব হলো। গড়ে উঠল নতুন শহর, এমনকি দুনিয়ার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার যে প্রয়োজন পুঁজির রয়েছে তাও সম্ভব হলো।
দ্বিতীয়ত, জীবাশ্ম জ্বালানি যেহেতু ধরে রেখে যেকোনো সময় ব্যবহার করা যায়, ফলে দিন-রাত, শীত-গ্রীষ্ম ইত্যাদি প্রাকৃতিক বাধা থেকে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হলো। ফলে শ্রম সময় ও পরিসর উভয়কে ঘনীভূত করে শ্রম শোষণের মাত্রা বাড়িতে দেওয়ার সুযোগ হলো অবারিত।
তৃতীয়ত, জীবাশ্ম জ্বালানিকে সহজেই অন্য রূপে রূপান্তরের সুযোগ থাকায় বিশেসত গ্যাসোলিন বা বিদ্যুতে রূপান্তরিত করতে পারার কারণে জ্বালানির পরিমাণ সম্পর্কে রক্ষণশীল হিসাব-নিকাশের আর কোনো প্রয়োজন রইল না। নগরকে সারা রাত আলোকোজ্জ্বল করে রাখা, পেট্রল, ডিজেরচালিত গাড়ির ক্রমাগত বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক কর্মকা-ে ক্রমাগত গতি সঞ্চার, আর সমাজজীবনে অদৃষ্টপূর্ব ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা প্রতিষ্ঠার মধ্যে উৎপাদন ও ভোগের যে অলঙ্ঘনীয় চক্র তৈরি হলো, তা সম্ভব হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির কারণেই।
আর এই পুরো প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই এর শিকারে পরিণত হলো প্রাণ-প্রকৃতি। উৎপাদন এলাকা ও শক্তির উৎসের বিচ্ছিন্নতা যে নগরায়ণ সম্ভব করে তুলল তার ফলে নগর ও গ্রামের ভেতর তৈরি হলো অনতিক্রম্য ব্যবধান। নগরকে খাওয়ানোর দায়িত্ব হলো অনতিক্রম্য ব্যবধান। নগরকে খাওয়ানোর দায়িত্ব পড়ল গ্রামের ওপর। এর ফলে গ্রামের কৃষিকাজের ফলে মাটির যে পুষ্টি শহরে আসে তা আর কখনোই মাটিতে ফিরে যায় না। ফলে মাটি ধীরে ধীরে উর্বরতা হারায়। এর সঙ্গে বর্তমানে কৃষির যে রূপান্তর হয়েছে তাকে যোগ করলে দেখা যাবে, তা শুধু মাটির উর্বরতাই ধ্বংস করছে না, দূষিত করছে, নি:শেস করছে সুপেয় পানি, অসম্ভব করে তুলছে জলজ প্রাণের বেঁচে থাকা। কৃষিতে বাড়ছে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ও কার্বন নি:সরণ।
শিল্পোৎপাদনের প্রতিটি স্তরেই ব্যবহৃত হচ্ছে জীবাশ্ম জ্বালানি এবং পুঁজির আত্মস্ফীতির প্রয়োজনে বা মুনাফা অপরিহার্যতার প্রয়োজনে। এতে যে দূষণ হয় যত দূর সম্ভব সে বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ারই চেষ্টা করে পুঁজিপতিরা, যা গোটা দুনিয়াকেই ভয়াবহ দূষণের মুখোমুখি করছে। অন্যদিকে পুঁজিবাদ যে জীবনযাপন পদ্ধতিকে বিশ্বায়িত করছে, তা দাঁড়িয়ে আছে উচ্চমাত্রার গতিশীলতার ওপর। যে গতিশীলতা বজায় রাখতে প্রতিদিন পোড়ানো হচ্ছে টনকে টন জ্বালানি। ক্রমাগত প্রাকৃতিক পরিবেশকে প্রতিস্থাপিত করা হচ্ছে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা পরিবেশ দিয়ে। পুঁজির পরিবর্ধন যেমন প্রায় পুরোটাই নির্ভরশীল জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বিপরীতে প্রাণের অস্তিত্বের প্রায় পুরোটাই নির্ভরশীল সৌরশক্তির ওপর। চক্রাকারে ঘরে ঘরে আসাই যেমন পুঁজির প্রক্রিয়া, প্রকৃতির তেমনটি নয়। বস্তু ও শক্তির প্রাকৃতিক রূপান্তর এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যে জীবন্ত জিনিসের প্রাকৃতিক বিকাশের প্রক্রিয়া মোটেই পুনরাবৃত্তিমূলক নয়। যেসব বস্তু ও শক্তিকে সে ব্যবহার করে সেগুলো ক্ষয় পেতে থাকে এবং গুণগতভাবে নতুন কিছুর জন্ম দেয়। পুঁজিবাদীব্যবস্থা জীবাশ্ম জ্বালানির সীমিত মজুদের ওপরই নির্ভরশীল। প্রথমত, তা ফুরিয়ে যাবে; দ্বিতীয়, তার ব্যবহার এত বিপুল পরিমাণে ক্ষতিকর নি:সরণ ঘটাচ্ছে, যাতে পৃথিবীতে বেঁচে থাকার পরিস্থিতি দিনে দিনে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া, ওজোন স্তর ক্ষয়, প্রাণবৈচিত্র্যের ধ্বংস, মরুকরণ, বনের উড়ার হওয়া, সুপেয় পানি মহার্ষ হয়ে ওঠার মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে আমাদের।
জ্বালানি সাম্রাজ্যবাদ
প্রকৃতির ওপরও সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ
বিশ্ববাজারে জ্বালানির চাহিদা ও দাম যেমন বেড়েই চলেছে, তেমনি কমে আসছে এর মজুদ। বিশ্বের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর বেশির ভাগই তার উৎপাদনের চূড়া ছুঁয়ে ফেলেছে দেশগুলোর বেশির ভাগই তার উৎপাদনের চূড়া ছুঁয়ে ফেলেছে এবং এখন মজুদ যেমন কমে আসছে তেমনি তা আর্থিক ও পরিবেশগত দিক থেকেও হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল। আর জ্বালানির পরিমাণ যতই কমে আসছে এর ওপর দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইও হচ্ছে তীব্র। দুনিয়ার জ্বালানি সম্পদের প্রায় পুরোটাই এখন বৃহত্তর বহুজাতিক কম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে। তারা শুধু জ্বালানি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণই প্রতিষ্ঠা করে না, অনেকাংশই রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী বিষয়েও তাদের হাত প্রসারিত করে। ঠিক করে দেয় কারা ক্ষমতায় থাকবে না থাকবে না। প্রান্তের নানা দেশে তো বটেই, এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও। নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা ও দুনিয়ার জ্বালানি সম্পদের ওপর আধিপত্য তথা সার্বিক আর্থ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রই মার্কি যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, যা তেল কম্পানিগুলো দ্বারা সমর্থিত ও নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়ন্ত্রণের অর্থ- ১. জ্বালানি ক্ষেত্রগুলোর ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ, ২. সরবরাহ কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ, ৩. চাহিদা ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে দাম নিয়ন্ত্রণ ও ৪. কোন মুদ্রায় তার করে বন্ধুত্বমূলক উপায়ে করা হয়, তেমনি অন্তর্ঘাত, ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ-বিগ্রহ-কোনো কিছুই বাদ যায় না। কেননা বাজারে অদৃশ্য হাত মার্কিন সেনাবাহিনীর শক্ত থাপ্পড়ের মাধ্যমেই পূর্ণতা পায়।
আদতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর এই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সারা দুিনয়ার উৎপাদন ও ভোগের সমগ্র আয়োজনের ওপরই প্রতিষ্ঠা করা হয় আধিপত্য। আর তাকরা হয় একটা অসম প্রক্রিয়ায়, যাতে পুরো দুনিয়ার সম্পদ ভোগ করে কেন্দ্র রাষ্ট্রগুলোর কিছুসংখ্যক লোক। ঐতিহাসিকভাবেই কেন্দ্র রাষ্ট্রগুলোর প্রতিবেশগত পদচিহ্ন বেড়ে চলে; কারণ তারা শুধু নিজেদের সম্পদই ভোগ করে না নিঃশেষ করে অন্যদের সম্পদও। সামরিক বলপ্রয়োগ, ঋণের ফাঁদ হয়ে আজকের যুগের লুণ্ঠনমূলক বিদেশি বিনিয়োগ পর্যন্ত তা প্রসারিত। এর মাধ্যমে প্রান্তের রাষ্ট্রগুলো সম্পদ কেন্দ্রের চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হয় আর বাড়ায় বৈষম্য। পুঁজিবাদী দুনিয়ার কেন্দ্রের বাসিন্দারা, যারা দুনিয়ার জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ, তাদের চাহিদা মেটাতে বর্তমানে দুনিয়ার ৭৫ শতাংশ সম্পদ ব্যবহার হয়।
সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো দুনিয়ার ওপর এমন সামাজিক প্রকৃতিগত বিধান চাপিয়ে দেয়, যাতে গ্রাম-শহরের, কেন্দ্র প্রান্তের বৈষম্য তৈরি হয়। কৃষিব্যবস্থায় এমন রূপান্তর ঘটানো হয়, যাতে তা একচেটিয়া, পুঁজির সংবর্ধনের হাতিয়ার হয়। পুঁজিবাদী কেন্দ্র রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থে সারা দুনিয়ার মানুষের সাধারণ সম্পদ, যেমন- বায়ুমন্ডল, সাগর, বায়ুম-লের কার্বন, শোষণক্ষমতা ইত্যাদিকে ব্যবহার করা হয়েছে। গ্লোবাল নর্থ অধিক তাদের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের সৃষ্ট পরিবেশগত আবর্জনা, যার আজ চরম পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠেছে, তাকে বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে দিয়েই ধনী ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। তাদের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি পৃথিবীর ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি বর্জ্য নি:সরণ করছে। এই নিঃধরনের পরিমাণে এখন পর্যন্ত বৈষম্য প্রকট। ১৯৯৬ সালে সাত বিলিয়ন টনেরও বেশি কার্বন নি:সরণ হয়েছে দুনিয়ায়, যার ৫০ শতাংশেরও বেশি করেছে মার্কিণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। ২০০৬ সালে উন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ করেছে দুই লাক ২৮  হাজার ৮০০ মিলিয়ন টন আর উন্নয়নশীল দেশগুলো (ভারত ও চীন বাদে) সবাই মিলে করেছে ৩৬ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন টন। কিন্তু অনেক কম কার্বন নির্গমন করেও এর বিষফল ভোগ করতে হচ্ছে বেশি বেশি করে প্রান্তের রাষ্ট্রগুলোরই। খরা ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস তো আছেই, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সম্পূর্ণ তলিয়েও যেতে পারে বাংলাদেশের মতো দেশ। (চলবে)

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ