ঢাকা, বুধবার 21 March 2018, ৭ চৈত্র ১৪২৪, ২ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

বিপাকে আলু চাষিরা

সরকারের ভুল নীতি ও উদ্যোগহীনতা এবং কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের অসহযোগিতার কারণে দেশের আলু চাষিরা কঠিন বিপাকে পড়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। ফলে আলু চাষিদের বিপদ ও ক্ষয়ক্ষতিও বেড়ে চলেছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, এবার প্রতিমণ আলু উৎপাদন করতে যেখানে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ পড়েছে সেখানে চাষিরা ২০০ থেকে ২২০ টাকার বেশি দরে বিক্রি করতে পারছে না। ফলে প্রতিমণ আলুতে কৃষকের ক্ষতি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
খবর শুধু এটুকুই নয়। আলুর জন্য গত বছরও বিপুল পরিমাণ লোকসান গুণতে হয়েছে। প্রকাশিত রিপোর্টে জানা গেছে, গত বছর দেশের বিভিন্ন স্থানের ৩৯০টি হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজে ৫৩ লাখ টন আলু সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছিল। কিন্তু সরকারের উদ্যোগহীনতার কারণে বছর শেষে ১৫ লাখ টন আলু অবিক্রীত থেকে যায়। এর ফলে প্রতি বস্তায় ৬০০ টাকা হিসাবে চাষিদের লোকসান হয়েছে ১২ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এমন অবস্থার প্রতিক্রিয়ায় চলতি বছরে আলু চাষের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল চাষিরা। তা সত্ত্বেও যারা চাষ করেছে তারাও লোকসানের কবলে পড়েছে। সরকারের কাছ থেকে তারা যেমন কোনো সাহায্য পাচ্ছে না, তেমনি পাচ্ছে না কোল্ড স্টোরেজের মালিকদের কাছ থেকেও। অথচ নিয়ম হলো, বিরাট অংকের টাকা ভাড়া দিয়ে আলু রাখার বিনিময়ে কোল্ড স্টোরেজের মালিকরা পরবর্তী বছরের চাষাবাদের জন্য চাষিদের ঋণ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এ বছর সে নিয়মও মানা হচ্ছে না। ফলে কোনো ঋণ পায়নি আলু চাষিরা। একই কারণে প্রতি মণ আলুতে ৮০ থেকে ১০০ টাকা করে লোকসান দিয়ে প্রতি কেজি আলু এমনকি পাঁচ থেকে সাত টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে তারা। তা সত্ত্বেও হাটবাজারে ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না।
ওদিকে এমন অবস্থার প্রভাব পড়েছে কোল্ড স্টোরেজগুলোর ওপরও। বাজারে লাভজনক মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না বলে গত বছর যারা কোল্ড স্টোরেজে আলু রেখেছিল এ বছর তারা আলু উঠিয়ে আনছে না। এর ফলে কোল্ড স্টোরেজের মালিকরা লোকসান গুণতে বাধ্য হচ্ছেন। তারা সেই সাথে ব্যাংক থেকে নতুন ঋণও পাচ্ছেন না। এভাবে কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের ক্ষতি হচ্ছে কয়েকটি খাতে। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেছেন, আলুর সঙ্গে শুধু পাঁচ কোটি প্রান্তিক চাষী নয়, কয়েক লাখ আলু ব্যবসায়ী, হাজার খানেক কোল্ড স্টোরেজ মালিক এবং অর্ধ শতাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভাগ্যও জড়িত রয়েছে। সুতরাং এ বছর আলুর দাম পড়ে যাওয়ায় চাষীদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অন্য সকলেরও বিপুল ক্ষতি হচ্ছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, আলুকেন্দ্রিক পরিস্থিতি এরই মধ্যে অত্যন্ত আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের অবশ্যই দ্রুত চিন্তা করা এবং জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া দরকার। কারণ, আলু শুধু একটি সাধারণ সবজি নয়, এর মাধ্যমে চালের সংকটও অনেকাংশেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, দেশের চাষযোগ্য সমস্ত জমিতে যেখানে তিনবার চাষাবাদ করে তিন মওসুমে চাল পাওয়া যায় তিন কোটি টনের মতো, সেখানে মাত্র ১০ শতাংশ জমিতে একবার চাষ করেই আলু পাওয়া যায় এক কোটি টন। এই হিসাবে চালের তুলনায় আলুর চাষাবাদ অনেক বেশি লাভজনক এবং আলুকে সহজেই চালের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। বর্তমান বাংলাদেশে তেমন উদ্যোগই নেয়া দরকার। অন্যদিকে অবস্থা এমন হয়েছে যখন মাত্র এক কেজি চাল কেনার জন্য একজন চাষিকে অন্তত আট কেজি আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। 
আমরা মনে করি, এমন অবস্থা চলতে দেয়া হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে চাষিরা আলুর চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। সত্যি তেমনটি ঘটলে আলু চাষিদের পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজের মালিক থেকে বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ী এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবে। বিপর্যয়ের কবলে পড়বে জাতীয় অর্থনীতিও। এজন্যই সরকারের উচিত আলু চাষি এবং কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের যথেষ্ট পরিমাণে ঋণ দেয়া, যাতে তারা ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারে এবং নতুন পর্যায়ে আলুর চাষাবাদ করতে উৎসাহিত হয়। চাষিদের কাছ থেকেও সরকারের সরাসরি আলু কেনার পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ