ঢাকা, বৃহস্পতিবার 22 March 2018, ৮ চৈত্র ১৪২৪, ৩ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কারাগারে মাদক

বাংলাদেশের সমাজ জীবনের অন্য সকল ক্ষেত্রের মতো কারাগারগুলোতেও মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু তা-ই নয়, কারা কর্তৃপক্ষের হিসাবে ৩৫ শতাংশের বেশি কারাবন্দী মাদককেন্দ্রিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত। গতকাল দৈনিক সংগ্রামে প্রকাশিত এক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, কারাগারে মাদক অত্যন্ত মারাত্মক সংকটের রূপ নিয়েছে। কারা মহাপরিদর্শক জানিয়েছেন, দেশের ৬৮টি কারাগারে আটক ৭৭ হাজার ১২৪ জন বন্দীর মধ্যে ৩৫ শতাংশই কোনো না কোনোভাবে মাদককেন্দ্রিক অপরাধে জড়িত। কেউ নিজে মাদকে আসক্ত, কেউ আবার পাচার ও বিক্রিসহ মাদকের ব্যবসা করছে। বাইরের বিভিন্ন ব্যক্তি ও চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ করে তারা কারাগারের ভেতরে মাদক সামগ্রী নিয়ে আসে এবং আগে থেকে সম্পন্ন আয়োজন অনুযায়ী টাকার বিনিময়ে মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছে দেয়। এরা দামও বাইরের তুলনায় অনেক বেশি আদায় করে।
গাঁজা ও হেরোইন থেকে ফেন্সিডিল ও ইয়াবা পর্যন্ত এমন কোনো মাদকের নাম বলা যাবে না, যা কারাগারের ভেতরে আনা এবং বিক্রি করা না হচ্ছে। গোপনীয়তার কথা বলা হলেও বাস্তবে সবই কারা কর্তৃপক্ষের জানা রয়েছে। মাদক সামগ্রী নিয়ে আসার এবং বিক্রি ও পৌঁছে দেয়ার কাজে জড়িত চক্রটি কারাগারেরই এক শ্রেণীর কর্মচারীর সহযোগিতা পেয়ে থাকে। বিশেষ অভিযানে তাদের অনেকে মাঝেমধ্যে ধরা পড়ে, প্রমাণ পাওয়া গেলে কারো কারো শাস্তিও হয়। অনেক কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন কারা মহাপরিদর্শক। কিন্তু তা সত্ত্বেও কারাগারে মাদকের ব্যবসা বন্ধ বা প্রতিহত করা সম্ভব হচ্ছে না। লাগেজ স্ক্যানার ও বডি স্ক্যানার বসানোসহ অনেক ব্যবস্থাই নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু একটি পথ বন্ধ করা হলে অপরাধীরা নাকি অন্য কোনো পথ বের করে নেয়, যার ফলে কারাগারের ভেতরে মাদকের ব্যবসা বন্ধই করা যাচ্ছে না।
ওদিকে কড়াকড়ি যতো বাড়ছে বন্দীদের মধ্যে ততোই নাকি মাদকাসক্তি বেড়ে চলেছে। সব মিলিয়ে অবস্থা এতটাই মারাত্মক হয়ে পড়েছে যে, শুধু মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্যই কারা কর্তৃপক্ষকে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। হাসপাতালটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নির্মাণ করা হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, কারাগারে মাদকের ব্যবসা ও ব্যবহার এবং মাদককেন্দ্রিক অপরাধ সম্পর্কিত এই খবর যে কোনো মূল্যায়নে অত্যন্ত আশংকাজনক। রিপোর্টটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে যখন ‘সংশোধন ও প্রশিক্ষণ, বন্দীর হবে পুনর্বাসন’- এই স্লোগানকে সামনে রেখে সারাদেশে কারা সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে। আমরা বেশি উদ্বিগ্ন এজন্য যে, দেশে বহুদিন ধরেই বিভিন্ন মাদক সামগ্রীর ছড়াছড়ি চলছে। এসব কিনতে পাওয়া যাচ্ছে পানের দোকানেও। রাজধানীতে তো বটেই, প্রতিটি জেলা ও উপজেলা শহর থেকে গ্রামের হাট-বাজারে পর্যন্ত প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন মাদক সামগ্রী। একযোগে বাজারে এসেছে  নতুন নতুন নামের মাদক।
এসবের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ব্যবসায়ী নামের অনেক রাঘব বোয়াল। চিহ্নিত ও অভিযুক্তদের মাঝেমধ্যে যে গ্রেফতার করা হয় না তা নয়। তাদের অনেকে কখনো কারাগারে থাকেন, কখনো আবার বেরিয়ে এসে মুক্ত হাওয়া সেবন করেন। সরকার, পুলিশ এবং প্রশাসনের সঙ্গে তাদের যোগসাজশ সম্পর্কেও শোনা যায় মাঝেমধ্যেই। সে কারণেই সাধারণভাবে তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকেন। গ্রেফতারের নামে নাটকও নাকি তাদের উদ্যোগেই সাজানো হয়। এজন্যই কারো কখনো শাস্তি হয়েছে বলে শোনা যায় না।
একই কারণে সারাদেশের মতো কারাগারের ভেতরেও মাদকের আগ্রাসন সম্ভব হয়েছে। আমরা মনে করি, কারা কর্তৃপক্ষের উচিত সম্ভাব্য সকল পন্থায় মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। যতো উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীই হোক না কেন, কারো পক্ষেই যাতে কারাগারের ভেতরে মাদক নিয়ে আসা বা নিয়ে আসার কাজে সহযোগিতা করা সম্ভব না হয় সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারাগারের ভেতরে তো বটেই, মাদক সামগ্রীর বিরুদ্ধে সারাদেশেও অবিলম্বে দরকার সর্বাত্মক অভিযান চালানো। চাল-ডাল ধরনের পণ্যের মতো যেখানে-সেখানে মাদক সামগ্রী যাতে বিক্রি করা সম্ভব না হয় এবং ছাত্রছাত্রীসহ নেশাখোররারা যাতে সহজে কিনতে না পারে তার ব্যবস্থা নিতে হবে সুচিন্তিতভাবে। নেশার ক্ষতি সম্পর্কে শিক্ষামূলক প্রচারণা চালাতে হবে গণমাধ্যমে।
এভাবেই কারাগারের পাশাপাশি দেশের সকল স্থানেও মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব এবং সেটাই এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। বলা বাহুল্য, এখনই ব্যবস্থা না নেয়া হলে বাংলাদেশের পুরো সমাজই পচনের অসহায় শিকারে পরিণত হবে, যার দায়িত্ব এড়ানো সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ