ঢাকা, বৃহস্পতিবার 22 March 2018, ৮ চৈত্র ১৪২৪, ৩ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

খুলনার শেখ আবু নাসের হাসপাতালের অধিকাংশ ডায়ালাইসিস মেশিনই অকেজো!

খুলনা অফিস: খুলনার শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস মেশিন ৩২টির মধ্যে ১৬টি অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে নতুন সাতটি ডায়ালাইসিস মেশিন দিলেও তার মধ্যে পাঁচটি পুরনো মেশিন, তাও অকেজো। নেই পর্যাপ্ত বেড সংখ্যা। নেই পর্যাপ্ত জনবল ও চিকিৎসক। চিকিৎসার ব্যয়বহুল হওয়ায় হতদরিদ্র পরিবারের জন্য হাসপাতালটি আর্শিবাদ স্বরূপ। কিন্তু দিনকে দিন কিডনি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় ডায়ালাইসিস ও বেড সংখ্যা কম হওয়ায় রোগীরা কাঙ্খিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের কিডনি (নেফ্রোলজী) বিভাগে ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত চলতি বছরের ৭ মার্চ পর্যন্ত আন্তঃবিভাগে মোট রোগীর সংখ্যা ৮৬৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫০৫ জন এবং মহিলা ৩৬৩ জন। এ সময়ের মধ্যে মারা গেছে ৪৬ জন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে জানুয়ারি মাসে মারা গেছে তিনজন, ফেব্রুয়ারিতে পাঁচজন, মার্চে একজন, এপ্রিলে তিনজন, মে মাসে ১০ জন, জুনে চারজন, জুলাইতে তিনজন, আগস্ট মাসে চারজন, সেপ্টেম্বররে তিনজন, এবং অক্টোবার মাসে দুইজন। এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুইজন ও ফেব্রুয়ারি মাসে ছয়জন রয়েছে। এই বিভাগে বর্তমানে ছয়টি কেবিন, সাধারন বেড ১০টি ও পেইং বেড রয়েছে নয়টি। এর মধ্যে কেবিনে ভাড়া নেয়া হয় ৪৫০ টাকা এবং পেইং বেডে ভাড়া নেয়া হচ্ছে ২০০ টাকা।
জানা গেছে, কিডনি সম্পূর্ণভাবে অকেজো হওয়ার পর শরীরের ভেতরে জমে থাকা বর্জ্য (ইউরিয়া, ক্রিয়েটিমিন, পটাশিয়াম) পরিশোধিত করার নাম ডায়ালাইসিস। ডায়ালাইসিস সাধারণত দুই প্রকারের হয়। পেটের বা পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস এবং হেমোডায়ালাইসিস বা মেশিনের সাহায্যে রক্তকে পরিশোধিত করা। বর্তমানে দেশে হেমোডায়ালাইসিসের প্রচলন বেশি। খুলনায় ২০৫ শয্যা বিশিষ্ট শহীদ শেখ আবু নাসের হাসপাতালে কিডনি রোগীদের জন্য হেমোডায়ালাইসিস করানো হয়। কিডনি রোগের এ চিকিৎসা খরচ আকাশচুম্বী। যে কারণে সবার পক্ষে এই রোগের পুরোপুরি চিকিৎসা নেয়া সম্ভব হয় না বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। কিডনি রোগীদের একটি বড় অংশ কিছুদিন চিকিৎসা নেয়ার পরই অত্যধিক খরচের কারণে আর চিকিৎসা নিতে পারেন না। স্বজনদের সামনে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুমুখে পতিত হন।
আফসানা মিমি (১৩)। ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী। সে নগরীর শিরোমনি মাধ্যমিক বিদ্যালয় পড়া লেখা করে। মিমির মা জেবুন্নাহার বলেন, মেয়েটি ঘুম থেকেই উঠলেই গা, হাত-পা ফুলে যায়। অনেক সময় হাটতে গেলে যন্ত্রণা হচ্ছে। ৬দিন আগে এখানে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়েছেন। ওই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসকরা পরবর্তিতে জানাবেন।
ইয়াসিন আলীর দুইটি কিডনিই নষ্ট। ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর এলাকার বাসিন্দা। ২০০৪ সালের তার কিডনি সমস্যা দেখা দেয়। কিডনি সচল রাখতে ২০১০ সাল থেকেই তিনি ডায়ালাইসিস শুরু করেন। হাসপাতালে ডায়ালাইসিস চলাকালীন তিনি বলেন, ২০ হাজার টাকা জমা দিয়ে ৬ মাসে প্রতি সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস করার সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি রোববার ও বুধবার এসে ডায়ালাইসিস করান।
ডায়ালাইসিস বিভাগের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স রহিমা খাতুন বলেন, ২০১০ সাল থেকেই প্রাথমিকভাবে ৪-৬টি মেশিন দিয়ে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস দেয়া হচ্ছে। এই পর্যন্ত ৬৬০ জন কিডনি রোগী সিরিয়ালের মধ্যে ৫৫৩ জনকে ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে। বাকী ১০৭ জনকে এখনো কল করা হয়নি। ডায়ালাইসিস ও বেড সংখ্যা কম থাকায় বাকিরা এ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একজন রোগী ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে ছয় মাসের এই ডায়ালাইসিস দেয়া হচ্ছে রোগীদের। তাকে প্রতি সপ্তাহ দুই বার ডায়ালাইসিস প্রদান করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কিডনি রোগীদের সকাল, দুপুর ও রাতে এই তিন শিফটে ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে। একজন রোগীকে ডায়ালাইসিসে ৪-৬ ঘন্টা সময় প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, এই পর্যন্ত হাসপাতালে মোট ডায়ালাইসিস মেশিনের সংখ্যা ৩২টি। এর মধ্যে ১৬টি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। কিডনি ডায়ালাইসিস এর মধ্যে হেমোডায়ালাইসিস নামে একটি ইউনিট রয়েছে। ওই ইউনিটে শুধুমাত্র সি ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিদের ডায়ালাইসিস করানো হয়। বেড সংখ্যা মাত্র চারটি।
নেফ্রোলজী বিভাগের প্রধান সহকারি অধ্যাপক ডা. এনামুল কবির বলেন, রোগীর তুলনায় এই হাসপাতালে ডায়ালাইসিস মেশিন ও বেড সংখ্যাক খুবই নগন্য। সাতটি ডায়ালাইসিস এর মধ্যে ঢাকা সিএমএইচ থেকে নতুন দুইটি ডায়ালাইসিস মেশিন প্রদান করেছেন। এছাড়া অন্য জায়গা থেকেআরও পাঁচটি ডায়ালাইসিস মেশিন দিছে, তা’ পুরনো, সেটআপ করার পর দেখা গেছে ওটা অকেজো; কোন কাজ হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা যে ১১টি ডায়ালাইসিস মেশিন বাছাই করে আসছিলাম। তার একটিও পায়নি। তার বদলে পুরনো পাঁচটি মেশিন ধরায় দিছে। তিনি বলেন, বর্তমানে পুরুষদের চেয়ে মহিলারা কিডনি জনিত রোগে আক্রান্ত সংখ্যা বেশি। অবহেলা, অসচেতনতা, রোগ লুকিয়ে রাখার প্রবণতাসহ নানা কারণে চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে কিডনি রোগে আক্রান্ত অধিকাংশ নারীরা। তিনি বলেন, একটু সচেতনতা হলেই এই রোগ থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তিনি এই হাসপাতালে ডায়ালাইসিস মেশিন ও বেড সংখ্যা বৃদ্ধি দাবি জানিয়েছেন।
হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বিধান চন্দ্র গোস্বামী বলেন, ২০টি ডায়ালাইসিস মেশিনের চাহিদাপত্র দেয়া হয়। সেই অনুযায়ী মাত্র সাতটি ডায়ালাইসিস মেশিন এই হাসপাতালে প্রদান করা হয়। এর মধ্যেই পাঁচটি পুরানো ডায়ালাইসিস মেশিন। শুক্রবার বাদে তিন শিফট মিলে প্রতিদিন ৬০ জন রোগীকে ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে। প্রতিদিনই কিডনি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেই তুলনায় এই হাসপাতালে বেড ও ডায়ালাইসিস সংখ্যা খুবই কম। বেড সংখ্যা ও ডায়ালাইসিস মেশিনের বৃদ্ধি দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এই রোগের চিকিৎসার ব্যয়বহুল হওয়ায় সরকারি এ হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ