ঢাকা, শুক্রবার 23 March 2018, ৯ চৈত্র ১৪২৪, ৪ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

শেফাউল মুল্ক হাকীম হাবিবুর রহমানের কর্ম ও জীবন

২৩শে মার্চ উপমহাদেশের প্রথিতযশা ইউনানী চিকিৎসাবিজ্ঞানী শেফাউল মুল্ক হাকীম হাবিবুর রহমানের ১৩৭তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৮১ সালের এই দিনে ঢাকার ছোট কাটরায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন মাওলানা মোহাম্মদ শাহ আখুনজাদা। পারিবারিক পরিবেশে প্রাথমিক ও ঢাকায় মাধ্যমিক শিক্ষা শেষে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি ধর্মশাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণে ভারতের কানপুরে গমন করেন। এরপর তিনি ইউনানী চিকিৎসার প্রতি আগ্রহী হয়ে প্রথমে লক্ষ্মৌ ও পরে দিল্লীতে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ইউনানী চিকিৎসা শিক্ষায় অধ্যয়ন করেন। অতঃপর ১৮৯৯ সালে তিনি আগ্রায় অবস্থান করে প্রখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী হাকীম আগা-হাসান-এর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। হাকীম সাহেব ১৯০৪ সালে ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করে একজন চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। চিকিৎসা শাস্ত্রের পাশাপাশি ধর্মতত্ত্ব, সাহিত্য, ইতিহাস ইত্যাদি ক্ষেত্রে তার গভীর জ্ঞান ও পা-িত্যের বিষয় অল্প দিনের মধ্যেই স্থানীয় সুধী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজেসেবা, রাজনীতিসহ বিভিন্ন কর্মকা-ে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের দ্বারা অবারিত হয়। ঢাকায় তখন নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহর একচ্ছত্র প্রভাব ও আধিপত্য। তিনি ছিলেন মানুষর চেনার জহুরি। নিজের অতুলনীয় মেধা ও বহুমুখী প্রতিভারগুণে হাকীম সাহেব নওয়াব বাহাদুরের সুনজরে আসতে দেরী হয়নি। ফলে তরুণ হাকীম হাবিবুর রহমান অচিরেই নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহর প্রথমে ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং পরে তার রাজনৈতিক সচিব নিযুক্ত হন। নওয়াব বাহাদুরের সাথে হাকীম সাহেবের এই বিশেষ ঘনিষ্ঠতার কারণে ঢাকার নওয়াব পরিবারের সকল সদস্যই জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাকীম সাহেবের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করতেন। হাকীম সাহেব বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গদের ফলে ঢাকা নবগঠিত পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে এবং এই অঞ্চলের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার এক নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠান কালে ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। হাকীম সাহেব এসব কর্মকা-ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং নবগঠিত মুসলিম লীগের যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হাকীম হাবিবুর রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তাদের মধ্যেও তিনি ছিলেন অন্যতম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ভালো শিক্ষক ও ছাত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে তার বিশেষ অবদান ছিল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটের সদস্যও ছিলেন।

জাতীয় জাদুঘর ও হাকীম হাবিবুর রহমান

ঢাকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় তার দান অপরিসীম। জাদুঘর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যেও তিনি ছিলেন অন্যতম সদস্য। হাকীম সাহেবের ছিল বিভিন্ন ধাতুর তৈরি মুদ্রা ও অন্যান্য ঐতিহাসিক দ্রব্যের সমৃদ্ধ ভা-ার, যা তিনি জাদুঘরকে দান করেন।

এদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও হাকীম হাবিবুর রহমান

ইতিহাস ও টপোগ্রাফির ওপরও হাকীম হাবিবুর রহমানের দখল ছিল। ১৯৩৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর স্যার এএফ রহমানের নেতৃত্বে নয় সদস্যবিশিষ্ট যে হিস্ট্রি অব বেঙ্গল পাবলিকেশনস্ কমিটি গঠিত হয় তিনি তার সদস্য ছিলেন। এই কমিটির কাজে উৎসাহ দেয়ার জন্য তিনি তার ব্যক্তিগত অর্থ অনুদান হিসেবে প্রদান করেন।

বাংলা সাহিত্য ও হাকীম হাবিবুর রহমান

চল্লিশের দশকে তিনি তিব্বিয়া হাবিবিয়া কলেজ, ঢাকা থেকে বাংলা ভাষায় ‘শেফা’ নামে ইউনানী চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রথম মাসিক পত্রিকা বের করেছিলেন।

এদেশে ইউনানী চিকিৎসা শিক্ষা ও হাকীম হাবিবুর রহমান

হাকীম সাহেবের প্রচেষ্টায় ১৯২১ সালে তদানীন্তন সরকার বাংলায় ইউনানী চিকিৎসা সম্পর্কে পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। উক্ত কমিটি কলকাতা ও ঢাকায় সরকারি পর্যায়ে দু’টি ইউনানী কলেজ প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেন। সরকার কমিটির সুপারিশ নীতিগতভাবে মেনে নিলেও অর্থাভাবের অজুহাতে ইউনানী কলেজ প্রতিষ্ঠায় অপারগতা প্রকাশ করেন। হাকীম সাহেব এতে হতোদ্যম না হয়ে অবশেষে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা তিব্বিয়া হাবিবিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও সগৌরবে চালু রয়েছে।

ইউনানী চিকিৎসকদের অধিকার আদায় ও হাকীম হাবিবুর রহমান

হাকীম সাহেব বাংলা আসামের ইউনানী চিকিৎসকগণকে সংগঠিত করার জন্য ১৯৪০ সালে “আঞ্জুমানে আতিব্বায়ে বাঙ্গাল ও আসাম” প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

স্থানীয় ওষুধি উদ্ভিদ-জ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং হাকীম হাবিবুর রহমান

কুর্মিটোলা এলাকায় দুশ’ একরের বেশি জায়গা নিয়ে হাকীম হাবিবুর রহমান একটি ভেষজ বাগান গড়ে তুলেছিলেন। পরে ব্রিটিশ সরকার সেই বাগানটি সেনানিবাসের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।

 বেতার-সংস্কৃতি ও হাকীম হাবিবুর রহমান

১৯৪৩-৪৪ সালের দিকে তৎকালীন অলইউনিয়া রেডিওর ঢাকা কেন্দ্র থেকে হাকীম হাবিবুর রহমান ঊনিশ শতকের শেষদিকের ঢাকা নগরীর সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে কথিকা প্রচার করতেন। এসব কথিকার বিষয়বস্তু ছিল শিল্প, টুগি, রমজান, রুটি, পোলাও, খাদ্য, মিষ্টি, কুস্তি-ব্যায়াম, খেলাধুলা, সঙ্গীত, মেলা-পার্বন, তবলা, গান, হুক্কা, পান ও চা ইত্যাদি।

সাহিত্য চর্চা ও হাকীম হাবিবুর রহমান

তিনি চিকিৎসা ও রাজনীতির ক্ষেত্রেই শুধু নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাননি। জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার দৃপ্ত পদচারণা ছিল। তিনি নিজের সম্পাদনায় ‘আল-মাশরিক’ নামে ঢাকার প্রথম উর্দু মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন ১৯০৬ সালে। ‘যাদু’ নামে আরেকটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন ১৯২৩ সালে। উর্দু ভাষায় রচিত তার বেশ কয়েকখানা গ্রন্থ রয়েছে। তার মধ্যে আসুদেগানে ঢাকা (ঢাকার বুকে সমাহিত যারা), শোআরায়ে ঢাকা (ঢাকার কবিমহল), মসজিদে ঢাকা (ঢাকার মসজিদসমূহ), ঢাকা কা তারিখে ইমারাত (ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ইমারতসমূহ) এবং পঁঢাস বরস পহেলে ঢাকা (পঞ্চাশ বছর পূর্বের ঢাকা)। তিনি ছাত্রাবস্থায় ‘আল-ফাবিক’ ও ‘হারাতে সুকরাত’ নামে দু’টি পুস্তক রচনা করেন। জীবনের শেষভাগে বাংলা ও আসামের বাংলা, আরবি, ফার্সি ও উর্দু লেখকদের পরিচিতি ও গ্রন্থের বিবরণসহ ‘ছালাছায়ে গাসসালা’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

দেশপ্রেম ও হাকীম হাবিবুর রহমান

স্থানীয় ওষুধি উদ্ভিদ-জ্ঞান ও প্রযুক্তি দ্বারা আর্তপীড়িতদের ইউনানী চিকিৎসা সেবা এবং চিকিৎসা শিক্ষার ব্যাপক প্রচারে হাকীম সাহেবের অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৯ সালে তাকে ‘শেফাউল-মুল্ক’ (দেশের রাগ নিরাময়ক) উপাধি প্রদান করে সম্মানিত করেন। কিন্তু ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের দেশপ্রেমিক হাকীম সাহেব উপাধি বর্জন করেন। উল্লেখ্য, ঢাকায় সফররত নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর সাথে হাকীম সাহেবের একটি দীর্ঘস্থায়ী একান্ত সাক্ষাৎকার পরবর্তী মুসলিম লীগের আহ্বানে তাকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনুপ্রাণিত করে।

চির নিদ্রায় হাকীম হাবিবুর রহমান

হাকীম হাবিবুর রহমান ১৯৪৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ৪৩ নং হাকীম হাবিবুর রহমান রোডস্থ তার নিজ বাসভবনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ইন্তিকাল করেন। এবং ঢাকার আজিমপুর দায়রা শরিফে সমাহিত হন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ