ঢাকা, শনিবার 24 March 2018, ১০ চৈত্র ১৪২৪, ৫ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

প্রথমবার শর্ত পূরণ করলো বাংলাদেশ ২০২৪ সালে চূড়ান্ত স্বীকৃতি

* প্রথমবার শর্ত পূরণ করেছে মিয়ানমার এবং লাওসও
* নেপাল এবং তিমুর শর্ত পূরণ করলেও সুপারিশ করা হয়নি
* ভুটানসহ ৪টি দেশ চূড়ান্ত যোগ্যতা অর্জন করার সুপারিশ
* মালদ্বীপসহ ৫টি দেশ চূড়ান্ত যোগ্যতা অর্জন করেছে
সামছুল আরেফীন : বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার জন্য প্রথমবারের মতো শর্ত পূরণ (গ্রাজুয়েট) করেছে। ২০২১ সালে শর্তপূরণের চূড়ান্ত সুপারিশ এবং ২০২৪ সালে চূড়ান্ত স্বীকৃতি অর্জন করবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের মত এ বছরই প্রথমবারের মতো এই শর্ত পূরণ করেছে মিয়ানমার এবং লাওস। নেপাল এবং তিমুর শর্ত পূরণ করলেও তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের কারণে সুপারিশ করা হয়নি। ৪৭টি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) এর মধ্যে ৫টি দেশ চূড়ান্ত যোগ্যতা অর্জন করেছে। এ দেশগুলো হলো বোতসোয়ানা (১৯৯৪), কাবো ভিরডি (২০০৭), ইকোটরিয়াল গিনি (২০১৭), মালদ্বীপ (২০১১) এবং সামোয়া (২০১৪)। এ ছাড়া দু’টি দেশ এ্যাঙ্গুলা ২০২১ ও ভানুটু ২০২০ সালে শর্ত পূরণের যোগ্যতা অর্জন করবে।
জাতিসংঘের ইউএন নিউজ এর ওয়েবসাইট থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। চলতি মাসে কমিটি ফর ডেভেলপম্যান্ট পলিসি (সিডিপি) আরো ৪টি দেশকে যোগ্যতা অর্জনের সুপারিশ করেছে। দেশগুলো হলো, ভূটান, কিরবিটি, সিওটমি এন্ড প্রিন্সিপি এবং সলোমন আইল্যান্ড। এ সুপারিশ জাতিসংঘের ইকোনমিক ও সোসাল কাউন্সিল কর্তৃক চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
বাংলাদেশ এখনই কেন অর্জনের উদযাপন করছে? গত বৃহস্পতিবারে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করায় তা উদযাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০২৪ সাল পর্যন্ত। তাহলে এখনই কেন এই উদযাপন?
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব কাজী শফিকুল আযম বিবিসিকে জানিয়েছেন, সরকার মনে করে, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গৌরবজনক অর্জন। কারণ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হবার সবগুলো শর্ত প্রথমবারের মত বাংলাদেশ পূরণ করতে পেরেছে।
এর আগে ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক সালিশ আদালতের রায়ে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ মীমাংসায় বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা পাবার বিষয়টি উদযাপন করেছিল সরকার। একইভাবে ২০১২ সালে, মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে (ইটলস) করা মামলায় বাংলাদেশ জেতার পরেও একই রকমভাবে উদযাপন করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যাপ্তি এবং ব্যাপকতার দিক থেকে এবারের উদযাপনটি বেশ বড়। এর পেছনে রাজনৈতিক কোন হিসেব-নিকেশ আছে কিনা সে প্রশ্নের জবাব দিতে চাননি মিঃ আযম।
তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়, মানব সম্পদ সূচক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি সূচক---এই তিনটি শর্ত পূরণ করে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে যাচ্ছে। তিনি দাবি করেছেন, বিশ্বের কোন দেশই একসঙ্গে এই তিনটি সূচকে অগ্রগতি করতে পারেনি। বাংলাদেশ এখানে ব্যতিক্রম। তিনি জানিয়েছেন, এখন উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাবার জন্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে হবে।
কারণ জাতিসংঘ ২০২১ সালে একটি পর্যালোচনা করবে। এরপর ২০২৪ সালে আরেকটি মূল্যায়ন হবে বাংলাদেশের। সব কিছু ঠিক থাকলে ঐ বছরই আসবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি।
এজন্য সপ্তাহব্যাপী উদযাপন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার, যার সমন্বয় করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। ২০শে মার্চ থেকে ২৬শে মার্চ পর্যন্ত নানারকম কর্মসূচী রয়েছে এই পরিকল্পনায়।
চ্যালেঞ্জ অনেক: বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, ২০২১ সালে দ্বিতীয় পর্যালোচনা করবে সিডিপি। ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ উত্তরণকে অনুমোদন দেবে। বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন যেভাবে আছে, তার কোনো বড় ধরনের ব্যত্যয় না ঘটলে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছাবে।
উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ কি হবে, জানতে চাইলে জাহিদ হোসেন বলেন, উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি একটা মর্যাদার বিষয়। বাংলাদেশকে সবাই তখন আলাদাভাবে বিচার করবে। এর আগে বহু দেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের যোগ্য বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এ তিনটি সূচকেই যোগ্যতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ, যা এর আগে অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে ঘটেনি। তবে উন্নয়নশীল দেশ হলে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে বাণিজ্যে যে অগ্রাধিকার পায় তার সবটুকু পাবে না। আবার বৈদেশিক অনুদান, কম সুদের ঋণও কমে আসবে।
তিনি বলেন, এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বা দ্বিপাকি চুক্তির অধীনে বিভিন্ন দেশে জিএসপি বা শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানি সুবিধা পায়। এর সঙ্গে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) আওতায় নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে অনেক দেশ আমাদের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। আবার এলডিসি হিসেবে ওষুধ রফতানির ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধান থেকে আমাদের অব্যাহতি রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশকে কম সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে। এলডিসি না থাকলে তখন সুবিধাগুলো পাওয়া যাবে কি সেটা একটা প্রশ্ন। যেমন- ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন যে জিএসপি দেয়, তা ২০২৭ সাল পর্যন্ত থাকবে। এরপর জিএসপি প্লাস পাওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) গত ১২ থেকে ১৬ মার্চ এলডিসি দেশগুলোর ওপর ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনা বৈঠকে বসে। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা- এ তিনটি সূচকের দু’টিতে উত্তীর্ণ হলে কোনো দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। তবে শুধু মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতেও কোনো দেশ যোগ্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মাথাপিছু আয়ের যে মানদ- রয়েছে ওই দেশের মাথাপিছু আয় তার দ্বিগুণ হতে হবে।
২০১৮ সালের পর্যালোচনায় এলডিসি থেকে উত্তরণের যোগ্যতা হিসেবে মাথাপিছু আয়ের মানদণ্ড হতে হয় ১২৩০ মার্কিন ডলার। বিশ্বব্যাংক প্রণীত অ্যাটলাস পদ্ধতির হিসাবে গত তিন বছরের গড় মাথাপিছু আয় ওই পরিমাণ হতে হবে। ওই পদ্ধতিতে গত তিন বছরে বাংলাদেশের গড় মাথাপিছু আয় দাঁড়িয়েছে ১২৭৪ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে মাথাপিছু আয় আরও বেশি, তাদের হিসাবে গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৬০৫ ডলার।
পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, উত্তরণের সব পর্যায়েই কিছু চ্যালেঞ্জ থাকে। এগুলো মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটার তিন বছর পর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বর্তমান জিএসপি সুবিধা থাকবে না। উন্নয়নশীল দেশগুলো ইইউতে জিএসপি প্লাস সুবিধা পায়। বাংলাদেশকে তার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এলডিসি না থাকলে বাংলাদেশ অন্যান্য দেশেও অনেক ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে না। এজন্য বিমসটেক, বিবিআইএনের মতো আঞ্চলিক উদ্যোগের সুবিধা কীভাবে কার্যকরভাবে নেওয়া যায় তার প্রস্তুতি থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রতিযোগিতা সমতা আরও বাড়াতে হবে। কেননা শুল্কমুক্ত সুবিধা না থাকলে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাবে। পাশাপাশি আমাদের যেসব ইনস্টিটিউশন এখনো দুর্বল, সেগুলোকে আরো উন্নত করতে হবে। সেটা অর্থনৈতিক ইনস্টিটিউশনই হোক আর রাজনৈতিক ইনস্টিটিউশনই হোক।
বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এলডিসি থেকে বেরিয়ে গেলে ২০২৭ সাল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘এভরিথিং বাট আর্মস’ উদ্যোগের আওতায় পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বাংলাদেশ মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার, পরিবেশ ও সুশাসন বিষয়ে ইইউর নিয়ম-কানুনের শর্ত পূরণ করলে জিএসপি প্লাস নামে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা পাবে বলে জানান ড. আহসান এইচ মনসুর।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ