ঢাকা, শনিবার 24 March 2018, ১০ চৈত্র ১৪২৪, ৫ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

অভিমত

[এক]
প্রসঙ্গ: দুর্নীতিবাজদের অর্থ-সম্পদ বিচার বিভাগ ও দেশবাসী
মো. জাহাঙ্গীর হোসাইন : বিচার বিভাগ নিয়ে কোন কথা বলা যাবে না, বললে অপরাধী হতে হবে। আইন বিভাগ বা আইন বিভাগের সংশ্লিষ্টরা যদি কোন ভুল করে বা কোন ভুল সিদ্ধান্ত নেয় এবং সে সব ভুল যদি জনগণের চোখে ধরা পড়ে তাও বলা যাবে না বা মন্তব্য পর্যন্তও করা যাবে না! অথচ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭/১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ...!?” দেশবাসী লক্ষ্য করেছেন, আইন বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট বিচারকরা মাঝে মাঝে ভুল করেন বা ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে বাস্তবায়ন করেন। এখানে একটা উদাহরণ দিলে তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। বেশ কয়েক বছর পূর্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল মুনির-খুকির মামলা এবং এটা নিয়ে দেশের পত্র-পত্রিকায় বেশ লেখালেখি হয়। মুনির-খুকির মামলা নিয়ে যত তোলপাড় হয়েছিল, অতীতে অন্য কোন মামলা নিয়ে এতো তোলপাড় হয়নি। এর কারণ ছিল, ওই মামলার সাথে একজন বিখ্যাত সাংবাদিকের কন্যা জড়িত ছিলেন। লম্পট মুনির তার মায়ের বয়সী খুকির প্রেমে পড়ে স্ত্রী রীমাকে হত্যা করে। পরবর্তীতে পুলিশের তদন্তে আসল ঘটনা বের হয়ে আসে। ওই মামলায় মুনির ও খুকির উভয়ের ফাঁসির আদেশ দেয় বিচার বিভাগ। পরবর্তীতে তারা উচ্চ আদালতে মামলা নিয়ে গেলে, ওই আদালত মুনিরের প্রেমিকা খুকিকে বেকসুর খালাস দেয় এবং মুনিরের ফাঁসি বহাল রাখে। উল্লেখ্য, মুনিরের পরিবার ধনী ছিল বলেই মামলা উচ্চ আদালতে নিতে সক্ষম হয়েছিল। এখানে প্রশ্ন হল- যদি মুনিরের পরিবার গরীব হতো, তাহলে তো এ মামলা উচ্চ আদালতে ওঠাতে পারতো না বা সম্ভব হতো না। তাহলে মুনির-খুকির মামলার ফল কি হতো? উভয়রেই ফাঁসির রায় কার্যকর হতো। উচ্চ আদালতে মামলা নিয়েছিল বলেই একজনের ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয় এবং অন্যজন বেকসুর খালাস পেয়ে যায়।   
এ বিচারের মধ্য দিয়ে দেশবাসী বুঝতে সক্ষম হলো, বিচারকরা ভুল করে এবং তাদের ভুলের জন্য হয়তো অনেকের অকালে জীবন দিতে হয়েছে বা আজীবন কারাগারের অভ্যন্তরে ধুঁকে-ধুঁকে জীবন কাটাচ্ছেন, অথবা অনেক অপরাধী খোলা বাতাসে সুন্দরভাবে জীবন কাটাচ্ছেন। প্রশ্ন হল- দেশের মালিক প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ভুলের ব্যাপারে কথা বলতে বা মন্তব্য করতে পারবেন না। কথা বললেই কোর্ট অবমাননার প্রশ্ন আসবে কেন? এ ব্যাপারে দেশবাসীকে ভাবতে হবে এবং জোরালো দাবি নিয়ে মাঠে নামতে হবে। যাদেরকে দেশবাসী তাদের কষ্টার্জিত করের টাকায় বেতন-ভাতা দেয়া হয়, তাদের ব্যাপারে জনগণ বা দেশবাসী যে কোন কথা বলা বা মন্তব্য করার অধিকার রাখেন। বিচার বিভাগে ব্রিটিশের কালো আইনগুলো বহাল রেখে আমাদের মতো দেশের মানুষ সুবিচার পাবেন না বা পেতেও পারেন না।       
এইতো বেশী দিন হয়নি, রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলের পূর্বপাশের প্রায় শতাধিক আবাসিক বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে ওই সব বাড়িওয়ালাদের বিতাড়িত করা হলো। বলা হয়েছিল তারা অবৈধভাবে বসবাস করছে। তারা ওই সময় অনেক কান্নাকাটি করেছিলেন, সাংবাদিকদের কাছে এসেছিলেন, সুশীল সমাজের কাছে এসেছিলেন। এমনকি বিচার বিভাগের কাছেও পর্যন্ত দ্বারস্থ হয়েছিলেন কিন্তু তারা কারও সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। তাদের স্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের নিয়ে কে কোথায় গেছেন, তার খবরও কেউ রাখেননি!! অথচ যারা সম্পূর্ণভাবে বা অবৈধভাবে বিশাল এক ভবন নির্মাণ করে বাণিজ্য করছে, তাদেরকে কেউ বাঁধা দিলো না। আজ পর্যন্ত ওই বিজিএমই ভবনটি বহাল তবিয়তে স্বমহীমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রযেছে। রাষ্ট্রের পক্ষে মামলা করা হলেও, কোর্ট তাদেরকে সময় দিয়েছে। প্রশ্ন হল- যখন সাধারণ মানুষের ঘর-দুয়ার বা স্থাপনা ভেঙ্গেচুরে মাটির সাথে মিশিয়ে দিলো, তখনতো বিচার বিভাগ বা সুশীল সমাজ তাদের পাশে দাঁড়ালো না বা দাঁড়াবার চেষ্টাও করলো না। তাহলে বিচার বিভাগের ওপর দেশবাসীর আস্থা থাকবে কেন? হায়রে দুনিয়ার মানুষ! সকলেই তেলা মাথায় তেল দেয়...!      
দেশবাসী অতি ক্ষোভের সাথে বা দুঃখের সাথে লক্ষ্য করছে রাষ্ট্রের বা দেশবাসীর শত শত বা হাজার হাজার কোটি টাকা আতœসাৎ বা চুরি করে, গাড়িতে আগুন দিয়ে, নিরীহ মানুষ হত্যা করে, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করে বা আতœসাৎ করে কোর্টে দাঁড়িয়ে জামিন চাইলেই, অহরহ জামিন পেয়ে যাচ্ছে এবং কিছু দিন পরে আবার তাদেরকে ওই মামলা হতে খালাস দিয়ে দিচ্ছে। শত-শত বা হাজার-হাজার কোটি টাকা চুরি করলে কারাগারে যেতে হয় না, অথচ হাজার টাকা চুরি করে অনেকে বছরের পর  বছর জেলের অভ্যন্তরে মৃত্যুর প্রহর গুণছেন। হায়রে বিচার ব্যবস্থা আর সমাজ ব্যবস্থা....!!!
স্বৈরাচারী এরশাদ রাষ্ট্রের অর্থ সম্পদ চুরি করে রাজধানীর কাওরান বাজারে সুউচ্চ এক ভবন নির্মাণ করলো, এ ছাড়া তার দুর্নীতি ও অনিয়মেরও অভাব নেই। কই এরশাদেরতো কোন শাস্তি হলো না! আজতো এরশাদ স্বমহীমায় রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে দেশ চরে বেড়াচ্ছে। যে স্বৈরাচারকে হটাবার জন্য সেলিম, তাজুন, দেলোয়ার, ময়জুদ্দিন, রাউফুন বসুনিয়া, নূর হোসেন ও ডা. মিলনসহ অগণিত তাজা প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছিল। আজ সে ব্যক্তি পবিত্র পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সরকার গঠনের স্বপ্ন দেখছে! সব অসম্ভবের সম্ভবের দেশ এ বাংলাদেশ। এ দেশে অনেক অসম্ভব কর্ম সম্ভব হয়ে যায় এবং তা দেশবাসীকে নীরবে মেনে নিতে হয় বা মানতে বাধ্য করা হয়। 
স্বৈরাচারের অন্যতম দোসর এবং আজকের বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া’র নেতৃত্বের বিএনপি’র বড় নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ অন্যের বাড়ি মিথ্যা বা ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে দখলে নিয়ে বেদখল করে বসবাস করতে থাকে। একজন আইনজীবী হয়ে কিভাবে তিনি অন্যের বাড়ি অবৈধভাবে দখলে নিয়ে বছরের পর বছর বসবাস করেন এবং যার কারণে পুলিশ তার বাসার আসবাবপত্র রাস্তায় ফেলে দেয়। ছি! এরা আবার আইনজীবী বা দলের বড় নেতা! বিচার বিভাগ ওই বেআইনী দখলদার ব্যারিস্টারকে কি করলো!!? এ ব্যক্তির লাজ-লজ্জা বা শরম বলতে যেন কিছুই নেই। এ সব ব্যক্তিরা লোক সমাজে বের হয় কিভাবে, এটা বোধগম্য হয় না। বলতেও লজ্জা হয়, এক ধরনের মিডিয়া এখনও এদের মত ব্যক্তিদের প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছে....!!!
অন্যদিকে বেগম খালেদা জিয়া এতিমের হক আত্মসাৎ করার অপরাধে তাঁর নামে বিচার বিভাগে মামলা চলছে। তার বিরুদ্ধে আরো অনেক মামলা রয়েছে। তার জন্য রাষ্ট্রের টাকা খরচ করে স্পেশাল কোর্টও বসানো হল। অথচ আমাদের সংবিধানের ২৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” প্রশ্ন হল- এক ব্যক্তির জন্য একটি কোর্ট বসানো হল, সেখানে বিচারককে নিয়ে যাওয়া হল এবং তাঁর সাথে প্রজাতন্ত্রের অনেক কর্মচারীকেও দায়িত্বে অর্পণ করা হল। কেন একজন ব্যক্তির জন্য রাষ্ট্রের অতিরিক্ত অর্থ খরচ করা হচ্ছে? তাহলে এটা কি সংবিধানের চরম লঙ্ঘন নয়? যখন কোন ব্যক্তির জন্য স্পেশালভাবে বিচার বিভাগকে নিয়ে যাওয়া হয়  তখনই বোঝা যায়, সেখানে কি ধরণের বিচার হবে। এখানে আমার প্রশ্ন হল- খালেদা জিয়া’র মামলা নিয়ে এ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কত টাকা খরচ হয়েছে এবং কত বার তাঁর তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে? যদি এক ব্যক্তির জন্য এতো খরচ, এতো সময়ক্ষেপন এবং এতো জনবলের ব্যবস্থা রাখা হয়, তবে অন্যের জন্য কি করা হবে?        
এখন আসা যাক, ঝালকাঠির কাঠালিয়া রাজাপুর নির্বাচনী এলাকার এমপি বিএইচ হারুনের দুর্নীতির প্রসঙ্গ। ক্ষমতার অপব্যবহার, তথ্য গোপন, অনৈতিক কার্যকলাপের সাথে সংশ্লিষ্টতা, কর ফাঁকিসহ তার নামে অনেক অভিযোগ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হল। তার মালিকানাধীন হোটেল ‘রেইন ট্রি’ -তে অনৈতিক কর্মকান্ড সংগঠিত হলে পুলিশ প্রশাসন তার প্রমাণও পেল। এখানে প্রশ্ন হল- তার ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষ কি ব্যবস্থা নিলো? নির্বাচনের পূর্বে তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের কি পরিমান অর্থ-সম্পদ ছিলো এবং কি করে মাত্র ৪ বছরের মধ্যে তাদের অর্থ-বিত্তের পরিমাণ কি করে এতটা বৃদ্ধি পেল!!!? তার স্ত্রীর পেশাটা কি, তিনি কি করে দ্রুত এত টাকার মালিক হয়ে গেলেন? তারা ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি করে যে এতো টাকা-পয়সার মালিক হয়ে গেলো রাষ্ট্র বা প্রশাসন কেন তা খতিয়ে দেখছেন না? আবার দুর্নীতি দমন (দুদক) নামে একটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, অথচ তারা এ ব্যাপারে কিছুই করছে না....!!! যদি দুদক পত্র-পত্রিকা ফলো আপ না করবে, তাহলে পত্র-পত্রিকার প্রয়োজনই বা কেন?   
অনেক সংসদ সদস্য, অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা মাদকদ্রব্য ব্যবসার সাথে জড়িত। এতো মাদক কি করে প্রবেশ করছে দেশের মধ্যে? কি করছে আইন বিভাগ, কি করছে প্রশাসন? আজকের মহাজোট সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। মহাজোট ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচনী ওয়াদা করেছিলেন যে, তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এলে এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও বিশেষ-বিশেষ ব্যক্তিসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের অর্থ-সম্পদের হিসেব জনসম্মুখে দেবেন। তবে কেন তারা আজ পর্যন্ত তাদের অর্থ-সম্পদের হিসেব দিচ্ছেন না ? এখানে কি করছে আইন বিভাগ ? তাহলে আইন কি কেবল গরীব মানুষের জন্য..!?
হায়রে সাধের স্বাধীনতা! ওই পাকিস্তান আমলেও দেশবাসী, ছাত্র সমাজ, যুব সমাজ ও শ্রমিক সমাজ আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, সংগ্রাম করেছে। আজ স্বাধীন দেশে যেন তার চেয়ে বেশী আমলাদের প্রাধান্যতা! আমলাতন্ত্রের কারণে সর্বশ্রেণীর মানুষ আজ দিশেহারা! এ আমলাতন্ত্রের হাত থেকে বাঁচার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে ৩০ লাখ মানুষের রক্ত, ২ লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জত ও ১ কোটি মানুষ পাশের দেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীন দেশে আমলারা আজ স্বাধীন জাতির ওপর চেপে বসে আছে। সরকার প্রধান সংসদে দাঁড়িয়ে যখন বলেন, “আমি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ১২৩% বেতন বৃদ্ধি  করেছি, তার পরে এতো অসন্তোষ কেন....?” তাঁর কথায় সে দিন দেশের মানুষের হৃদয়ে যে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে, তা অদ্যাবদি শেষ হয়নি। জনগণের দুঃখ-কষ্ট ও ব্যাথা দেখার যে কেউ নেই! দুনিয়ার কোন দেশে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা একই সময়ে ১২৩% ভাগ বৃদ্ধি পায়নি। সেলুকাস কি বিচিত্র এ দেশ! এ দেশ অসম্ভবের দেশ। এ দেশে সবই হয় বা হয়ে যায়। কেবল গরীবের পক্ষে কিছুই হয় না। সব হয় শুধু আমলা-কামলা আর যারা রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত তাদের জন্য! এখানে প্রশ্ন হল- এমপি, মন্ত্রী, উপদেষ্টা, মেয়র ও চেয়ারম্যানসহ জনপ্রতিনিধিরা আর দেশের মানুষের শতকরা হার কত? অল্পসংখ্যক মানুষের জন্য সুযোগ-সুবিধা ১২৩% ভাগ বৃদ্ধি করে দেশের সিংহভাগ মানুষের ওপর করের বোঝা বৃদ্ধি করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত হল, এ প্রশ্নের জবাব সরকার প্রধানকেই দিতে হবে। 
jahangirhossain8431@gmail.com

[দুই]
ঢাকা সিটির মশা থেকে আত্মরক্ষার উপায় কি?
আসাদুজ্জামান আসাদ : আমাদের দেশ ক্ষুদ্র একটি দেশ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে অনেক বেশী। সে হিসাবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন লোকসংখ্যা বেশী। স্বল্প পরিসরে অনেক লোক বাস করতে হচ্ছে। চাকরি, ব্যবসা- বাণিজ্য, শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ বসবাস করে। সারা দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিবা শেষে, রাতে বিশ্রামের প্রয়োজন। প্রয়োজন প্রশান্তির মহাঘুম। কিন্তু নগরবাসীর জীবনে কি মহাঘুম বা শান্তিময় ঘুম এসেছে? মশার আক্রমণে সেই ঘুম কোথায় যেন ছুটে যায়। মশার প্রকোপের কথা পেপার, পত্রিকা, কিংবা বিভিন্ন সম্পদাকয়ী, উপ-সম্পাদকীয় শিরোনামে প্রকাশ পেলে সবার দৃষ্টি সেখানে পরে। ঢাকা দু’সিটি শহরে মশার অত্যাচারে সবাই অতিষ্ট। তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে চাই। মশা যেন রাজধানী মহারাজত্ব কায়েম করেছে। মশা থেকে বাঁচার প্রয়োজনে সব প্রচেষ্টা অব্যাহত। নগরবাসীর ঘরে কয়েল, মশারী, স্প্রে, ক্রাশ প্রোগ্রাম, ফগার এবং ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র ইত্যাদি ব্যবহার করি। কিন্তু মশার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাচ্ছি কি? মশা নিধন বা দমন না হওয়ায় প্রতি বছর কোটি কোটি ক্ষতি হচ্ছে।
আমাদের জানতে হবে, মশার জন্ম ও বাসস্থান কোথায়? মশা দেখতে একটি ক্ষুদ্র আকৃতির প্রাণী। কিন্তু এর আক্রমণ মারাত্মক। এই ভয়ংকর কিটটি বাসা বা বাড়ির আশেপাশে নোংড়া, আর্বজনা, নর্দমা, ড্রেনে এবং ময়লা জায়গায় জন্ম গ্রহণ ও বসবাস করে। বাসা ও বাড়ির মালিকরা সচেতনতার অভাবে শান্তিভাবে বসবাস করতে পারে না। ক্ষুদ্র মশাটি দীর্ঘজীবী প্রাণী নয়। তার বয়স প্রায় ২৪ ঘণ্টা। তার হুলে তেজক্রিয়তা বড়ই ভয়ংকর। ঢাকা সিটির অধিবাসীরা মশার কাছে জিম্মী। মশা ভয়ংকর শত্রু। আল্লাহ তাআলা ফেরাউনকে ধ্বংসের তাগিদে মশা বাহিনী প্রেরণ করে ছিলেন। মশা বাহিনীকে নিধন বা দমনের প্রয়োজনে বর্তমানে ঢাকা সিটিতে রাজনীতির প্লাট ফরম তৈরী হয়েছে। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা মিটিংয়ে, সভা-সমাবেশে জনসর্মথন পাবার নিমিত্তে মশা নিধন ও দমনের কথা বলে যাচ্ছে। তবে অন্য অন্য বছরের তুলনায় এ বছর রাজধানেিত মশার উৎপাত বৃদ্ধি পেয়েছে। নগরবাসী এ জন্য ঢাকার দু’ মেয়রকে দায়ী করছে।
ঢাকা মহানগরে পরিবেশের অভাবে পরিবেশ বান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠে নি। বসবাসের উপযোগি পরিবেশ কেউ পাচ্ছে না। পরিবেশের অভাবে তারা ভারসাম্য জীবন যাপন করছে। ঢাকা ঘন জনবসতি হওয়ায় নানা রকম রোগ জীবানুর আক্রমনে আক্রান্ত হচ্ছে। ডিঙ্গু মশার আক্রমনে ডেঙ্গু জ¦র, টাইফয়েটসহ নানা রকম রোগ জীবাণু ছড়াছে। এখানে বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। ছোট একটি রোমে পরিবারের সব সদস্য নিয়ে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। মানুষ যদি শত্রু হয়,তার আক্রমনের ধরন ও অস্ত্রের ব্যবহার অপর মানুষের জানা থাকে। তার মোকাবিলা করা তখন সম্ভব হয়। কিন্তু মশা তো কোন মানুষ নয়। তার আক্রমণ ভয়ংকর। যে কোন সময যে কোন দিক দিয়ে মারাত্মকভাবে আক্রমণ করে থাকে। তার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া বড়ই কঠিন ব্যাপার। মশা নিধনের জন্য বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সচেতন ব্যক্তিবর্গ এবং সিটি শহরের কর্তা ব্যক্তিরাসহ, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দায়ীত্বশীল ব্যক্তিরা বিরতিহীন ভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশা নিধনের কাজে, প্রায় এক হাজার কর্মী নিয়োগ প্রাপ্ত রয়েছে। বিভিন্ন পরি সংখ্যানে জানা যায়,প্রতি ওয়ার্ডে ৬/৭ জন কর্মী মশা নিধনের কাজ করে থাকে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। বিপুল জনবল ও কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরও রাজধানীতে মশার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।বিপুল অর্থ ও জনবলের সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় রাজধানীর নগরবাসী মশার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। মশা নিধন একটা মারাতœক বিষয় হয়ে দাড়িছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা মশা নিধনের উপর জোড়ারো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা সিটিতে মশা নিধন বর্তমানে রাজনৈতিক প্লাট ফরম তৈরী হয়েছে। মশা নিধনে ভোট বৃদ্ধি এবং হ্রাস পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা দু’সিটি ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মশা নিধনের রাজনীতি শুরু হয়েছে। যে দল বা প্রার্থী মশা নিধনের সু ব্যবস্থা বা ইজতেহার দিবে, নগর বাসী তাকেই মুল্যবান দিয়ে নির্বাচিত করবে। জন বল ও ঔষধ দু’টিই আছে। তা সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য কোন মনিটরিং হচ্ছে না। যদি লোকবল ও কোটি টাকার যথাযথ ব্যবহার হতো,তাহলে রাজধানীতে মশা জন্ম হবার প্রশ্নেই উঠত না। মশার জন্ম ও বাস স্থানে কি যথা নিয়মে ঔষধ স্প্রে করা হচ্ছে? এ সব খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান আমাদের দেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ। অফিস, আদালত, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা এমন কি সব খানে ডিজিটাল পদ্ধতি কাজ কর্ম পরিচালিত হচ্ছে। অত্যাধুনিক যুগে ইলেকট্রনিশের মাধ্যমে সব কিছুর সমাধান হচ্ছে। সাবক্ষনিক পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশনে খবর হচ্ছে। যখন মশার প্রকোপ বৃদ্ধির খবর পত্রিকায় ছাপানো বা টিভিতে দেখানো হচ্ছে, তখন দায়ীত্বশীল ব্যক্তিদের দৌড় ঝাপ শুরু করে। অথচ মশা বাবাঝি আরামে সবার গায়ে হুল ফুটিয়ে চলছে। মশা নিধনে র্ব্যথতা কোথায়? কেন মশা নিধন করা সম্ভব হচ্ছে না। জনবল নিয়োগে ব্যর্থ, বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার না হওয়া, আন্তরিকতার অভাব, মনিটরিং না করা, ক্রাশ প্রোগ্রামের ব্যবস্থা না করা, ঢাকনা খোলে ঔষধ স্প্রে না করাসহ নানা বিদ কারন রযেছে। তবে মহা নগরে মশা নিধনের জন্য যদি নিয়োগকৃত জনবলকে সঠিক ভাবে কাজে ব্যবহার করা, বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক মুল্যায়ন করা, আন্তরিকতার সহিত কাজ করা, মনিটরিং এর সু-ব্যবস্থা করা, ক্রাশ প্রোগ্রাম ব্যবহার করা,ঢাকনা ওয়ালা ড্রেনে দশ ফুট পর পর ঢাকনা খোলে ঔষধ স্প্রে করা, নগরবাসীর সাথে মত বিনিময় করা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন বৃদ্ধি করা। তবে মশা নিধনে শুধু সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে একাই কাজ করা সহজ হবে না,যদি নগর বাসী যথাযথভাবে সহযোগিতা না করে থাকি। নগর বাসীর উচিত নগর বাসযোগ্য,পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্য সম্মত রাখা। পাশা পাশি নগরবাসী সচেতন হলেই মশা নিধন করা সম্ভব হবে।ঢাকা ডিসিসি কিছু নির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও ক্রাশ প্রোগ্রামের বাস্তবায়ন করেন না। যা অত্যান্ত বেদনা ও দুঃখ জনক বটে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিরাট এলাকা। এখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সবার জন্য সমান। কিছু নাগরিক সুযোগ সুবিধা পাবে আর কিছু নাগরিক সুযোগ সুবিধা পাবে না, তাতো হতে পারে না। নগর বাসী সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর দিবাশেষে একটু সুখের প্রত্যাশ করাটা স্বাভাবিক। দালান কোটার সুখ আর বস্তির সুখ কখনো এক হতে পারে না। ঢাকা মহানগরীতে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ বস্তিতে জীবন যাপন করে থাকে। সামর্থহীন বস্তিবাসী সংসার জীবনে অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। তারপর পরিবারের সদস্যেদের দায়ভার বহন করা তাদের জন্য বড়ই কষ্টকর বটে। তারা একটু প্রশান্তির জন্য মশার প্রকোপ থেকে বাচতে চায়। অথচ নগরে রাজনীতিবিদ ও মহা নগরীর রক্ষাকারী কর্তা ব্যক্তিরা নাগরিকের কথা কি কখনো ভেবেছেন?
দু’সিটি কর্পোরেশনে প্রায় তিন হাজার বিঘা ময়লার স্তুপ ও তিন হাজার বিঘা জলাশয় রয়েছে। ময়লার স্তপ ও জলাশয়সমূহ মশা প্রজন্মের উৎকৃষ্টতম স্থান। খোলা নর্দমাগুলো যথা সময়ে পরিষ্কার করে মশা নিধনের ঔষধ স্প্রে করতে হবে। মশার প্রজন্ম স্থান সমুহ অবারিত ও উন্মুক্ত রেখে মশা দমন ও নিধন করা কোনভাবেই সম্ভব না। মশা নিধনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও চিন্তা ভাবনার যথেষ্ট অভাব ও জবাবদিহিতা রয়েছে। আমরা কি কখনো পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার তোয়াক্কা করি? মনিটরিংয়ের জনবল নিয়োগ করে কি, কোটি টাকার ঔষধ ছিটিয়ে, ফগার মেশিন ব্যবহারে কি যথাযথ ভাবে পরিচর্চা করেত পেরেছি? না, আমরা তা করতে পারছি না। এটা বড় বেদনা দায়ক বটে। আমরা সফলতার ভাগ নিতে চাই। ব্যর্থতার ভাগ নিতে চাই না। মশা নিধন ও দমনে মশার প্রজন্ম ক্ষেত্রে, সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে। মশা নিধনে সবার সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। সবার প্রচেষ্টায় ঘরে ও বাইরে মশার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া। দিবা রাতে,বাসা বাড়ি, চায়ের দোকানে, কিংবা ছাদে মশা আপন গতিতে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা নির্যাতিত হচ্ছি। এদিকে বাসা বাড়ির মালিকরা আঙিনা প্রতি নিয়ত পরিষ্কার করে না। অথচ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ইমানের অঙ্গ। ঢাকার মশারা দিনের বেলা আন্ডার গ্রউন্ডে আতœ গোপন থাকে। আবার রাতের বেলা বেড়িয়ে আক্রমন চালায়। দিনের বেলা মশারী ছাড়া দিবা নিদ্রায় মশা হুল ফুটিযে দেয়। তার নরম বিষাত্ব হুল দিয়ে রক্ত চুষিযে খায়। আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। মশার প্রজন্ম ও উৎস স্থলে মশার ধ্বংস করতে হবে। মশার প্রজন্ম স্থানে যথাযথ ভাবে ওষধ ব্যবহার করলেই মশা নিধন করা সম্ভব হবে।
মশার প্রকোপ থেকে রক্ষার জন্য প্রফেসর, সাংবাদিক, বুদ্দিজীবী, রাজনীতিবিদ, শ্রমিক, অফিসার কর্মচারী, কুলি মজুর, নারী, পুরুষ, ছাত্র, জনতা সবাইকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নসহ সচেতন হতে হবে। সিটি কর্পোরেশনের দায়ীত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিসহ নগরের সবাই মশা দমন ও নিধনে আন্তরিকতা থাকতে হবে। সর্বক্ষেত্রে যৌথ অভিযান চালালে ঢাকাকে মশা মুক্ত করা সম্ভব হবে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে মশা মুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে মশা নিধনের সংগ্রামকে সফলে আনা সম্ভব হবে। তাই আসুন আমি, আপনারা এবং ঢাকাবাসী সবাই মিলে মশা নিধনের সংগ্রামে ঝাঁপিযে পড়ি।
লেখক : পরিচিতি  গ্রন্থকার ও সাংবাদিক
Endasaduzzaman@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ