ঢাকা, শনিবার 24 March 2018, ১০ চৈত্র ১৪২৪, ৫ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মশার অত্যাচার॥ আত্মরক্ষার উপায় কি?

আসাদুজ্জামান আসাদ : আমাদের দেশ, ক্ষুদ্র একটি দেশ। জনসংখ্যার দিক দিয়ে অনেক বেশী। সে হিসাবে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন লোক সংখ্যা বেশী। স্বল্প পরিসরে অনেক লোক বাস করতে হচ্ছে। চাকুরী,ব্যবসা- বাণিজ্য, শ্রমিকসহ  বিভিন্ন পেশার মানুষ বসবাস করে। সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে দিবা শেষে, রাতে বিশ্রামের প্রয়োজন।  প্রয়োজন প্রশান্তির  মহা ঘুম। কিন্তু নগরবাসীর জীবনে কি মহা ঘুম বা শান্তিময় ঘুম এসেছে?  মশার আক্রমণে  সেই ঘুম কোথায় যেন ছুটে যায়। মশার প্রকোপের কথা  পেপার, পত্রিকা, কিংবা বিভিন্ন সম্পাদকীয়,উপসম্পাদকীয় শিরোনামে প্রকাশ পেলে সবার দৃষ্টিতে সেখানে পরে। ঢাকা দু,সিটি শহরে মশার অত্যাচারে সবাই অতিষ্ট। তাদের  হাত থেকে রক্ষা পেতে চাই। মশা যেন রাজধানী মহা রাজত্ব কায়েম করেছে। মশা থেকে বাঁচার প্রয়োজনে সব প্রচেষ্টা অব্যাহত। নগরবাসীর ঘরে কয়েল, মশারী,স্প্রে,ক্রাশ প্রোগ্রাম,ফগার এবং ইলেকট্রনিক যন্ত্র ইত্যাদি ব্যবহার করি।  কিন্তু মশার আক্রমণ থেকে রক্ষা পারছি কি? মশা নিধন বা দমন না হওয়ায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
আমাদের জানতে হবে, মশার জন্ম ও বাসস্থান কোথায়? মশা দেখতে  একটি ক্ষুদ্র আকৃতির প্রাণী। কিন্তু এর আক্রমণ মারাত্মক। এই ভয়ংকর কিটটি বাসা বা বাড়ির আশে পাশে নোংরা, আবর্জনা, নর্দমা, ড্রেনে এবং ময়লা জায়গায় জন্ম গ্রহন ও বসবাস করে। বাসা ও বাড়ির মালিকরা সচেতনার অভাবে শান্তি ভাবে বসবাস করতে পারে না। ক্ষুদ্র মশাটি দীর্ঘজীবী প্রাণী নয়। তার বয়স প্রায় ২৪ ঘন্টা। তার হুলে তেজস্ক্রিয়তা বড়ই ভয়ংকর। ঢাকা সিটির অধিবাসীরা মশার কাছে জিম্মী। মশা ভয়ংকর শত্রু। আল্লাহ তাআলা ফেরাউনকে ধ্বংসের তাগিদে  মশা বাহিনী প্রেরণ করে ছিলেন।
মশা বাহিনীকে নিধন বা দমনের প্রয়োজনে  বর্তমানে ঢাকা সিটিতে রাজনীতির প্লাট ফরম তৈরী হয়েছে। বিভিন্ন দলের নেতা কর্মীরা মিটিংয়ে, সভা-সমাবেশে জনসমর্থন পাবার নিমিত্তে মশা নিধন ও দমনের কথা বলে যাচ্ছে। তবে অন্য অন্য বছরের তুলনায় এ বছর রাজধানীতে মশার উৎপাত বৃদ্ধি পেয়েছে। নগর বাসী এ জন্য ঢাকার দু মেয়রকে দায়ী করছে।
ঢাকা মহা নগরে পরিবেশের অভাবে পরিবেশ বান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠে নি। বসবাসের উপযোগি পরিবেশ কেউ পাচ্ছে না। পরিবেশের অভাবে তারা ভারসাম্য জীবন যাপন করছে।  ঢাকা ঘন জনবসতি হওয়ায় নানা রকম রোগ জীবানুর আক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে। ডেঙ্গু মশার আক্রমণে ডেঙ্গু জ¦র,টাইফয়েডসহ নানা রকম রোগ জীবানু ছড়াছে। এখানে বিদ্যুৎ,গ্যাস এবং বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে। ছোট একটি রোমে পরিবারের সব সদস্য নিয়ে জীবন যাপন করতে হচ্ছে। মানুষ যদি শত্রু হয়,তার আক্রমণের ধরন ও অস্ত্রের ব্যবহার অপর মানুষের জানা থাকে।  তার মোকাবিলা করা তখন সম্ভব হয়। কিন্তু মশা তো কোন মানুষ নয়। তার আক্রমন ভয়ংকর। যে কোন সময যে কোন দিক দিয়ে মারাত্মক ভাবে আক্রমণ করে থাকে। তার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া বড়ই কঠিন ব্যাপার। মশা নিধনের জন্য বুদ্ধিজীবী,সাংবাদিক,সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সচেতন ব্যক্তিবর্গ এবং সিটি শহরের কর্তা ব্যক্তিরাসহ, ঢাকা সিটি কর্পোরেশন দায়ীত্বশীল ব্যক্তিরা বিরতিহীন ভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশা নিধনের কাজে, প্রায় এক হাজার কর্মী নিয়োগপ্রাপ্ত রয়েছে। বিভিন্ন পরি সংখ্যানে জানা যায়,প্রতি ওয়ার্ডে ৬/৭ জন কর্মী মশা নিধনের কাজ করে থাকে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে। বিপুল জনবল ও কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরও রাজধানীতে মশার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে।বিপুল অর্থ ও জনবলের সঠিক ব্যবহার না হওয়ায় রাজধানীর নগর বাসী মশার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। মশা নিধন একটা মারাত্মক বিষয় হয়ে দাড়িছে। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা মশা নিধনের উপর জোরালো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা সিটিতে মশা নিধন বর্তমানে রাজনৈতিক প্লাটফরম তৈরী হয়েছে। মশা নিধনে ভোট বৃদ্ধি এবং হ্রাস পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। ঢাকা দু,সিটি ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মশা নিধনের রাজনীতি শুরু হয়েছে। যে দল বা প্রাথীর্  মশা নিধনের সু ব্যবস্থা বা ইশতেহার দিবে, নগরবাসী তাকেই মুল্যবান দিয়ে নির্বাচিত করবে। জনবল ও ঔষধ দু,টিই আছে।  তা সঠিক ভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য  কোন মনিটরিং হচ্ছে না। যদি লোকবল ও কোটি টাকার যথাযথ ব্যবহার হতো,তাহলে রাজধানীতে মশা জন্ম হবার প্রশ্নেই উঠত না। মশার জন্ম ও বাসস্থানে কি যথানিয়মে ঔষধ স্প্রে করা হচ্ছে? এ সব খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান আমাদের দেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ। অফিস, আদালত,স্কুল, কলেজ,মাদ্রাসা এমন কি সব খানে ডিজিটাল পদ্ধতি কাজ কর্ম পরিচালিত হচ্ছে। অত্যাধুনিক যুগে ইলেকট্রনিক্সের মাধ্যমে সব কিছুর সমাধান হচ্ছে। সাবক্ষণিক পত্র-পত্রিকা,টেলিভিশনে খবর হচ্ছে। যখন মশার প্রকোপ বৃদ্ধির খবর পত্রিকায় ছাপানো বা টিভিতে দেখানো হচ্ছে,তখন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দৌড় ঝাঁপ শুরু করে। অথচ মশা বাবাঝি আরামে সবার গায়ে হুল ফুটিয়ে চলছে। মশা নিধনে ব্যর্থতা কোথায়? কেন মশা নিধন করা সম্ভব হচ্ছে না। জনবল নিয়োগে ব্যর্থ,বরাদ্ধকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার না হওয়া,আন্তরিকতার অভাব,মনিটরিং না করা,ক্রাশ প্রোগ্রামের ব্যবস্থা না করা,ঢাকনা খোলে ঔষধ স্প্রে না করাসহ নানাবিধ কারণ রয়েছে। তবে মহানগরে মশা নিধনের জন্য যদি নিয়োগ কৃত জনবলকে সঠিক ভাবে কাজে ব্যবহার করা, বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক  মুল্যায়ন করা,আন্তরিকতার সহিত কাজ করা,মনিটরিং এর সু-ব্যবস্থা করা,ক্রাশ প্রোগ্রাম ব্যবহার করা,ঢাকনা ওয়ালা ড্রেনে দশ ফুট পর পর ঢাকনা খোলে ঔষধ স্প্রে করা,নগরবাসীর সাথে মত বিনিময় করা,পরিস্কার পরিচ্ছন্ন বৃদ্ধি করা। তবে মশা নিধনে শুধু সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে একাই কাজ করা সহজ হবে না,যদি নগর বাসী যথাযথ ভাবে সহযোগিতা না করে থাকি। নগরবাসীর উচিৎ নগর বাসযোগ্য,পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং স্বাস্থ্য সম্মত রাখা। পাশাপাশি নগরবাসী সচেতন হলেই মশা নিধন করা সম্ভব হবে।ঢাকা ডিসিসি কিছু ুনির্দিষ্ট এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও ক্রাশ প্রোগ্রামের বাস্তবায়ন করেন না। যা অত্যন্ত বেদনা ও দুঃখজনক বটে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন বিরাট এলাকা। এখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সবার জন্য সমান। কিছু নাগরিক সুযোগ সুবিধা পাবে আর কিছু নাগরিক সুযোগ সুবিধা পাবে না,তাতো হতে পারে না। নগর বাসী সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর দিবাশেষে একটু সুখের প্রত্যাশা করাটা স্বাভাবিক। দালান কোঠার সুখ আর বস্তির সুখ কখনো এক হতে পারে না।  ঢাকা মহা নগরীতে প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ বস্তিতে জীবন যাপন করে থাকে। সামর্থহীন বস্তি বাসী সংসার  জীবনে অনেক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। তারপর পরিবারের সদস্যেদের দায়ভার বহন করা তাদের জন্য বড়ই কষ্টকর বটে। তারা একটু প্রশান্তির জন্য মশার প্রকোপ থেকে বাঁচতে চায়। অথচ নগরে রাজনীতিবিদ ও  মহা নগরীর রক্ষাকারী কর্তা ব্যক্তিরা নাগরিকের কথা কি কখনো ভেবেছেন ?
দু,সিটি কর্পোরেশনে প্রায় তিন হাজার বিঘা ময়লার স্তুপ ও  তিন হাজার বিঘা জলাশয় রয়েছে। ময়লার স্তপ ও জলাশয় সমুহ মশা প্রজন্মের উৎকৃষ্টতম স্থান। খোলা নর্দমা গুলো যথা সময়ে পরিষ্কার করে মশা নিধনের  ঔষধ স্প্রে  করতে হবে। মশার প্রজন্ম স্থান সমুহ অবারিত ও উম্মুক্ত রেখে মশা দমন ও নিধন করা কোন ভাবেই সম্ভব না। মশা নিধনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও চিন্তা ভাবনার যথেষ্ট অভাব ও জবাবদিহিতা রয়েছে।
আমরা কি কখনো পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার তোয়াক্কা করি? মনিটরিংয়ের জনবল নিয়োগ করে কি, কোটি টাকার ঔষধ ছিটিয়ে,ফগার মেশিন ব্যবহারে কি যথাযথ ভাবে পরিচর্চা করেত পেরেছি ?  না, আমরা তা করতে পারছি না। এটা বড় বেদনা দায়ক বটে। আমরা সফলতার ভাগ নিতে চাই। ব্যর্থতার ভাগ নিতে চাই না। মশা নিধন ও দমনে মশার প্রজন্ম ক্ষেত্রে,সর্বাগ্রে নজর দিতে হবে। মশা নিধনে সবার সচেতনা বৃদ্ধি করতে হবে। সবার প্রচেষ্টায়  ঘরে ও বাইরে মশার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়া। দিবা রাতে,বাসা বাড়ি, চায়ের দোকানে,কিংবা ছাদে মশা আপন গতিতে আক্রমন চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা নির্যাতিত হচ্ছি। এদিকে বাসা বাড়ির মালিকরা আঙিনা প্রতি নিয়ত পরিস্কার করে না। অথচ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ইমানের অঙ্গ। ঢাকার মশারা দিনের বেলা আন্ডার গ্রাউন্ডে আত্মগোপন থাকে।
আবার রাতের বেলা বেড়িয়ে আক্রমন চালায়। দিনের বেলা মশারী ছাড়া দিবা নিদ্রায় মশা হুল ফুটিযে দেয়। তার নরম বিষাক্ত হুল দিয়ে রক্ত চুষিযে খায়। আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে।  মশার প্রজন্ম ও উৎস স্থলে মশার ধ্বংস করতে হবে। মশার প্রজন্ম স্থানে যথাযথ ভাবে ওষধ ব্যবহার করলেই  মশা নিধন করা সম্ভব হবে।
মশার প্রকোপ থেকে রক্ষার জন্য প্রফেসর, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, শ্রমিক, অফিসার কর্মচারী, কুলি মজুর,নারী ,পুরুষ, ছাত্র, জনতা সবাইকে পরিস্কার পরিচ্ছন্নসহ সচেতন হতে হবে। সিটি কর্পোরেশনের দায়ীত্ব প্রাপ্ত ব্যক্তিসহ নগরের সবাই মশা দমন ও নিধনে আন্তরিকতা থাকতে হবে। সর্ব ক্ষেত্রে যৌথ অভিযান চালালে ঢাকাকে মশা মুক্ত করা সম্ভব হবে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে মশা মুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ  করে মশা নিধনের সংগ্রামকে সাফলে আনা সম্ভব হবে। তাই আসুন আমি, আপনারা এবং ঢাকাবাসী সবাই মিলে মশা নিধনের সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ি।
-গ্রন্থকার ও সাংবাদিক

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ