ঢাকা, শনিবার 24 March 2018, ১০ চৈত্র ১৪২৪, ৫ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মশা নিধনে কার্যকর উদ্যোগ নেই

মশা নিধন ইংরেজি Mosquito Destruction. মশা Diptera বর্গের Culicidae গোত্রের পতঙ্গ। এই গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ গণ Anopheles, Mansonia,Culex, Aedes, psorophora এবং Haemagogus. মশা ম্যালেরিয়া, গোদ, পীতজ্বর, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকাভাইরাস ঘটিত এনসেফালিটিস ও কতিপয় চর্মরোগসহ বহু রোগজীবাণুর বাহক। স্ত্রী মশা সুইয়ের মতো ছেদন ও চোষন উপযোগী মুখোপাঙ্গ দিয়ে মেরুদন্ডী পোষক প্রাণীর রক্ত চুষে থাকে। ডিমপাড়ার আগে রক্তপান স্ত্রী মশার জন্য আত্যাবশক। পুরুষ মশা ফুল-ফলের নির্যাস খায়। গোটা পৃথিবীতে বিদ্যমান তিন সহস্রাধিক মশা প্রজাতির মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১১৩ প্রজাতির মশা শনাক্ত করা হয়েছে।
১৯৬০ এর দশকে ম্যালেরিয়া উচ্ছেদ কার্যক্রম Malaria Eradication Programme (MEP) শুরু হলে যে সব স্থানে বাহক প্রজাতি মশা সাধারণত রক্ত খাওয়ার আগে বা পরে ঘরে আশ্রয় নেয়,সেসব জায়গায় এমনকি বেড রুমেও উউঞ ছিটানো হতে থাকে যা আমরা ছোট বেলায় স্বাধীনতা পূর্বকালে স্বচক্ষে দেখেছি। এই কার্যক্রম ১৯৭০ সাল পর্যন্ত চলে এবং সুফলও পাওয়া যায়; কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ম্যালেরিয়া উচ্ছেদ কার্যক্রম অর্থাৎ DDT ছিটানো বসতবাড়ির ভেতরের জায়গা নেয়া মশা নিধন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং পরবর্তী কালেও আর তা চালু হয়নি। দেশ স্বাধীন হলে মশা তাড়ানোর জন্য গ্রাম গঞ্জে খড়ের বা পাট শলাকার আটি জ্বালিয়ে ধোঁয়ার ব্যবস্থা করা হত। এর পর আসে মশার কয়েলের ব্যবহার। গড়ে উঠে ইন্ডাস্ট্রি এবং কয়েল ফ্যাক্টরী থেকে সরকার পাচ্ছে প্রচুর রাজস্ব ও ভ্যাট অথচ সরকারি উদ্যোগে মশা নিধনের কোন পদক্ষেপ নেই। শুধু বলা হচ্ছে জন সচেতনতাই পারে মশা নিধন করতে। রোগ নিয়ন্ত্রকরা বলেছেন, ‘যতদিন না এই মশা নিয়ন্ত্রন করা যাবে ততদিন ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া টিকে থাকবে।’ বর্তমানে মশা বাহিত রোগ উচ্ছেদের কর্মকৌশল হলো দ্রুত আক্রান্ত রোগীকে শনাক্তি ও চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা প্রদান। বাহকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে এবং DDT ছিটানোও পরিত্যাক্ত হয়েছে। MEP এর অধীনে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে কালাজ্বর ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছিলো, এমন কি প্রায় নির্মূল হয়েছিল, কেননা বাহক স্যান্ডফ্লাই কীটনাশকের প্রতি সংবেদনশীল। বিশ শতকের সত্তরের দশকের শেষের দিকে পুনরায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়।
শীত যেতে না যেতেই মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। মশার উপদ্রব বৃদ্ধির মানেই জনমনে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের ভয়াবহতা ও আতঙ্ক কাজ করছে। কেননা গত বছর মশা বাহিত রোগ চিকুনগুনিয়া আমাদের দেশে যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে তা আসলে ভোলার নয়। গত বছর রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রন ও গবেষনা ইনস্টিটিউিট (IEDCR) এর তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালের ৯ এপ্রিল থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে প্রতিষ্ঠানটিতে রক্ত পরীক্ষায় ১ হাজার ৩ জন আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। শুধু ১ হাজার ৩ জনই পর্যাপ্ত নয়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী ২০১৭ সালের ১২ মে থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৪ হাজার ৮৬৪ জন। শহীদ সোহরাওয়াদী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকুনগুনিয়া রোগী পাওয়া যায় ২ হাজার ৫৫৮ জন।
অন্যান্য সরকারি বেসরকারি হাসপাতাল চিকিৎসকের তথ্য মতে মোট ১৩ হাজার ৮১৪ জন চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। মশাদের আতঙ্কের কাহিনী চিকুনগুনিয়া আর ডেঙ্গুতেই থেমে নেই। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ রোজ বৃহস্পতিবার রাতে ঘটে এক মজার ঘটনা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে মালয়েশিয়ান এয়ার লাইন্সের একটি ফ্লাইট প্রায় দুই ঘন্টা বিলম্বের শিকার হয়, যা কিনা মশার কারণে। হঠাৎ করেই মাঝরাতে ওই ফ্লাইটে অসংখ্য মশা ঢুকে পড়ায় যাত্রীরা চেঁচামেচি ও হট্টগোল শুরু করে দেন। মশার উৎপাতে রাত দেড়টার দিকে চলন্ত ফ্লাইটটিকে রানওয়ের মুখে থামিয়ে দিতে বাধ্য হন পাইলট। পরে বিমান বন্দর কর্তৃপক্ষের সহায়তায় প্রায় এক ঘন্টা চলে মশা নিধন। বিমানে মশার আক্রমন হওয়ার একমাত্র কারণ হলো, বিমান বন্দরের দুই পাশের জঙ্গল ও জলাশয়, যা মশার নিরাপদ প্রজনন ক্ষেত্র বা হ্যাচারি।
সুলেখক নাসির হেলাল প্রণীত ‘নবী রাসূলদের জীবন কথা’ বইয়ের ১৪৭ নং পৃষ্ঠা থেকে ১৫১ নং পৃষ্ঠা পর্যন্ত মহাশক্তিধর আল্লাহর তায়ালা মশক বাহিনী দিয়ে নমরূদের সেনা বাহিনীকে এবং নমরূদকে কিভাবে ধ্বংস করেছিলেন তা সবিস্তারে উল্লেখ রয়েছে। উক্ত বইয়ের ১৪৯ নং পৃষ্ঠায় রয়েছে যে, নমরূদের অতিশয় বাড়াবাড়ি দেখে হযরত ইবরাহীম (আঃ) আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করলেন, ‘হে মাবুদ! নমরূদের পথে আসার আর আশা নেই, এখন তার বিষয়ে তুমিই ফায়সালা করো।’ হযরত ইবরাহীম (আঃ) এর মুনাজাত শেষ হতে না হতেই দেখা গেলো আকাশ কালো করে বিশাল এক মেঘ খন্ড নমরূদের সেনাবাহিনী (প্রায় ষাট লক্ষ সৈন্য) দিকে ধেয়ে আসছে এবং এক গুনগুন আওয়াজ হচ্ছে, যা ক্রমেই বাড়ছে। এ মেঘ আর কিছু নয়, এ ছিলো আল্লাহর পাঠানো লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মশা। এ দৃশ্য দেখে হযরত ইবরাহীম (আঃ) বললেন,‘ আমার আল্লাহর ফৌজ এসে পড়েছে, এবার তুমি তোমার বাহিনী সামলাও।’ মুহূর্তের মধ্যেই নমরূদ দেখতে পেলো সেই মেঘরূপী মশক বাহিনী তার সৈন্য বাহিনীর কাছে এসে ছড়িয়ে পড়লো এবং সৈন্যদেরকে উপর্যুপরি দংশন করতে লাগলো। একজন সৈন্যের গায়ে অসংখ্য মশা বসলো। কিছু কিছু নাকের মধ্যে দিয়েও প্রবেশ করলো। মশার কামড়ের যন্ত্রণায় সৈন্যরা অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করতে লাগলো।
পুরো ময়দানে এক অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হলো। এ অবস্থা বেশী সময় বহাল থাকলো না, নমরূদের সামনেই তার সেনাবাহিনী খুব কম সময়ের মধ্যে কঙ্কালে পরিণত হলো অর্থাৎ সৈন্যদের রক্ত মাংস সবই মশক বাহিনী নিঃশেষ করে ফেলায় ময়দানে শুধু লক্ষ লক্ষ সৈন্যের মৃত নির্জীব কঙ্কাল পড়ে রইল। নমরূদ অবস্থা দেখে অন্দর মহলে পালিয়েও বাঁচতে পারেনি। একটি ছোট্ট মশা এসে তার গায়ে দংশন করলে সে উহু বলে মশাটিকে মারতে চাইলে ঠেং ভাঙ্গা মশাটি সোজা নমরূদের নাক দিয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছে থেমে থেমে দংশন করতে লাগলো। দংশনের জ্বালা এত তীব্র ছিলো যে, কর্মচারী রেখে মাথায় জুতা পেটা করতে করতে সজোরে জুতা পেটার আঘাতে মাথা ফেটে চৌচির হয়ে মগজ গলে বেরিয়ে গেলো এবং সে মারা গেলো।
-আবু মুনীর

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ