ঢাকা, সোমবার 26 March 2018, ১২ চৈত্র ১৪২৪, ৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ

আখতার হামিদ খান : বহুল উদ্ধৃত একটি আরবী প্রবাদ ‘হুব্বুল ওয়াতানি মিনাল ঈমান’জ্জদেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। মুসলিম সমাজ যুগে যুগে দেশও জাতির প্রতি গভীর ভালবাসা ও অকৃত্রিম প্রীতির যে অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, উপরিউক্ত প্রবাদটি হচ্ছে তার বাস্তব প্রতিফলন। এই গুরুত্ববহ প্রবাদটি ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়মন জুড়ে এত প্রভাব বিস্তার করেছেন। এটি যে রাসুলুল্লাহ (স) বা কোন সাহাবীর উক্তি নয় তা সন্দেহাতীতভাবে বিপরীতও। আধুনিক কালের বিশ্ববিখ্যাত হাদীসবিশারদ শায়খ নাসীর উদ্দীন আলবানী যেমনি তাঁর ‘কিতাবুদুআফা’র মন্তব্য করেছেন যে, উপরিউক্ত প্রবাদটি হাদীস তো নয়ই, উপরন্তু কুরআনেও বিপরীত। তিনি তাঁর কথার প্রমাণ হিসাবে কুরআনের যে আয়াত উল্লেখ করেছেন তা হচ্ছে: যারা ঈমান এনেছে, হিজরত করেছে, জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে এবং যারা (তাদেরকে) আশ্রয় দান করেছে ও সাহায্য করেছে তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। আর যারা ঈমান এনেছে কিন্তু হিজরত করে নাই তাদের দায়দায়িত্ব তোমাদের নেইজ্জযতক্ষণ না তারা হিজরত করে। (সূরা আনফাল: ৭২ আয়াত) এই আয়াতের শেষাংশে দেখা যায়, আল্লাহ তা’আলা মু’মিনদের কাছে শুধু তাদের ঈমানই চান নিজ্জআর একটি জিনিস চেয়েছেন আর তা হচ্ছে তাদের হিজরত বা দেশ ত্যাগ, যেহেতু ঈমান ও দেশত্যাগ আল্লাহর কাম্য সেহেতু দেশপ্রেম ঈমানের অংগ হতে পারে না বলে শায়খ আলবানী অভিমত রেখেছেন।
মূলত এই আয়াতটির প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে দেখা যায়, একটি জাতির পারস্পরিক ঐক্য ও সংহতি এবং আমাদের মহৎ দেশপ্রেমের উজ্জ্বল হিদায়াত নিহিত রয়েছে পূর্ণ আয়াতটি জুড়ে। একটি দেশের মু’মিন মুসলিমের জন্য হিজরতের আবশ্যকতা তখনই দেখা দেয়, যখন তার দেশে তার ঈমান নিয়ে টিকে থাকা সম্ভব হয় না। যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) র মক্কী জীবনে তাঁর ও তাঁর অনুসারী মু’মিনদের ঈমান নিয়ে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না বলেই তাঁদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ আসে মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনা মুনাাওয়ারায় আশ্রয় নেয়ার। মু’মিন জীবনে এই হিজরত বা দেশত্যাগের বিধান হচ্ছে একটি মৌলিক ভিত্তি যা তাকে দেশপ্রেমে উৎসাহিত করে। একজন মু’মিন সহজেই ভাবতে পারে তার ঈমান নিযে তাকে তার দেশে, তার সমাজে বেঁচে থাকতে হবেজ্জতার ঈমানহারা হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। আর এ জন্যই তার ঈমানের দাবির বদৌলতে তিনি তার দেশ ও জাতিকে ঈমানের দাওয়াত দেন। তার ঈমান নিয়ে স্বদেশে বেঁচে থাকার জন্যই তিনি দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হিফাজতে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করেন। তিনি বিশ্বাস করেন, তাঁর দেশ বহিশশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত না হলে তিনিও আক্রান্ত হবেন না, আক্রান্ত হবে না তাঁর ঈমানও। সুতরাং তাঁর ঈমান ইসলামকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থেই তাঁকে তাঁর স্বদেশকেও টিকিয়ে রাখতে হবে স্বাধীনভাবে।
একজন মু’মিনের জন্য হিজরত বা দেশত্যাগের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় তার ঈমান ত্যাগের পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে। এতে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামে দেশপ্রেমের এতই গুরুত্ব যে, ঈমানহারা হয়ে যাওয়ার পূর্বমূহূর্ত পর্যন্ত স্বদেশকে আঁকড়ে ধরা চাই; স্বদেশের মানুষের মধ্যে ঈমানের দাওয়াত দেওয়া চাই; স্বদেশবাসীকে নিয়ে একটি মু’মিন সমাজ গড়ে তোলা চাই। ঈমানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য শেষ মুহুর্তে আল্লাহ দেশত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে হয়ত এই ইঙ্গিত প্রদান করেছেনৃ যে, ঈমানপ্রেমের মত দেশপ্রেমও মু’মিনের অস্তিত্বের অংশ, তবে দেশে টিকতে না পারলে তার ঈমানের ডাকে সাড়া দিতে হবে দেশত্যাগ করে হলেও। এটা প্রমাণ করেজ্জদেশ ও জাতির প্রতি ভালোবাসা ঈমান ও আদর্শভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। ঈমান ও আদর্শ বিমুখ উগ্র ভালবাসা দেশ ও জাতির কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। আল্লাহর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হচ্ছে ‘তিনি মু’মিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও সম্পদ ক্রয় করে নিয়েছেন জান্নাতের বিনিময়ে’। এতে এ কথা প্রমাণিত হয় না যে মু’মিনদের প্রাণ ও সম্পদের কোনই মূল্য নেই বরং বিপরীত দিকে প্রমাণিত হয় যে, মু’মিনদের প্রাণ ও সম্পদের এতই মূল্য যে, তা জান্নাতের বিনিময় হতে পারে। এরূপভাবে ঈমানের জন্য দেশত্যাগের কথা বলার দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, দেশপ্রীতির কোনই মূল্য নেই বরং প্রমাণিত হয় দেশের এত অধিক গুরুত্ব যে, তা কেবল ঈমানের স্বার্থেই ত্যাগ করা যায়।
দেশ ও জাতির প্রতি ভালবাসা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষ মাত্রই তার পরিবার, তার সমাজ, তার দেশ জন্মগতভাবে ভালবাসে। একজন মানুষ মু’মিন ও মুসলিম হওয়ার পরে তার এই স্বভাবজাত ভালবাসা নিষ্প্রভ হয়ে যায় নাজ্জদুমড়ে-মুচড়ে নিশ্চিহ্নও হয়ে যায় না। বরং তা দিন দিন বিন্দু থেকে সিন্ধুতে পরিণত হয়। যেমনটি ঘটেছিল স্বয়ং রসূলুল্লাহ (সা) র পবিত্র জীবনে। তাঁর প্রতি সূরা আলাকে প্রথম পাঁচ আয়াত অবতীর্ণ হলে তিনি এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। হযরত জিবরীল (আ) পরপর তিনবার তাঁকে সজোরে আলিঙ্গন করলে এবং তাঁর সম্মুখে ভীতিপ্রদ মূর্তি ধারণ করলে তিনি ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে হযরত খাদীজা (রা) র কাছে এসে বলেন, ‘খাশীতুন আলা নাফসী’জ্জআমি আমার জীবনের প্রতি আশংকা বোধ করছি। হযরত খাদীজা (রা) সান্ত¦না দিয়ে বললেন, না, ভয় নেই। আল্লাহর কসম, তিনি কখনই আপনাকে অপমানিত করবেন না। কারণ “আপনি আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করেন, অভাবীদের বোঝা বহন করেন। নি:স্ব-বঞ্চিতদের জন্য রোজগার করে দান করেন, অতিথি আপ্যায়ন করেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করেন।” মহানবী (সা) র চালচলন সম্পর্কে হযরত খাদীজা (রা) র উক্তি কাঁটায় কাঁটায় সত্য। এক যুগেরও অধিক কাল ধরে মহানবী (সা) র সঙ্গে বৈবাহিক জীবন যাপন করে তাঁর যে পরিচয় তিনি পেয়েছেন তা-ই অতি সংক্ষেপে তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি নিকট থেকে দেখেছেন কিভাবে রাসূলুল্লাহ (সা) ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সর্বশ্রেণীর মানুষের উন্নতি ও কল্যাণের জন্য আত্মনিয়োগ করেছেন অহির্নিশি। কোনদিন তিনি নিজের দিকে, নিজের স্বার্থের দিকে তাকান নি। বরং সমাজের মানুষ কিভাবে সুখে-শান্তিতে থাকতে পারেন সেই চেষ্টা করেছেন তিনি। তাঁর একটিই চিন্তা, একটিই সাধনা ছিল; আর তা হল মানব কল্যান। হযরত খাদীজা (রা) র মুখে মহানবী (সা) র যে পরিচয় আমরা পেয়েছি সে পরিচয়ই হল একজন দেশপ্রেমিক মানুষের পরিচয়। যে দেশের মানুষ রাসুলুল্লাহ (সা) র উপরিউক্ত গুণে ও গুণান্বিত হয় সে দেশে সামগ্রিক কল্যাণ ও উন্নয়নের ফল্লুধারা প্রবাহিত হয় অবিরাম।
হযরত খাদীজা (রা) রাসূলুল্লাহ (স) কে নিয়ে চাচাত ভাই ওরাকা ইবন নওফলের কাছে গেলেন। ওরাকা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে হযরত মূসা (আ) র নিকট প্রেরণ করেছিলেন। হায়! আমি যদি এই মুহূর্তে শক্তিমান যুবক থাকতাম। হায়! আমি যদি সে সময় জীবিত থাকতাম যখন তোমার জাতি তোমাকে মক্কা থেকে বের করে দিবে! এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ বিস্ময়াভিভূত হয়ে ওরাকাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তারা কি সত্যিই আমাকে বের করে দিবে? ওরাকা বললেন, হ্যাঁ তোমাকে তারা বের করে দিবে। তুমি যে রিসালাত নিয়ে দুনিয়ায় এসেছো, এরূপ কিছু নিয়ে যে ব্যক্তিই এসেছে তার সঙ্গে কেবল শত্রুতাই করা হয়েছে। তোমার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সময় আমি বেঁচে থাকলে আমি তোমাকে যথাসাধ্য সাহায্য সহযোগিতা করব। এখানে লক্ষণীয়, মহানবী (স) দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী শুনে হতচকিত হয়ে পড়েন। তিনি প্রথমে ভাবতেই পারছিলেন না, যে ভূখ-ে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন, দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে জীবন যাপন করেছেন, সেই ভূখ- ছেড়ে বাধ্য হয়ে তাঁকে চলে যেতে হবে। যেই ভূখ-ের মানুষের জন্যে জীবন বাজি রেখে তিনি এত কিছু করেছেন সেই অনুগ্রহপ্রাপ্ত উপকারভোগী মানুষগুলোই কি তাঁকে দেশছাড়া করবে? মাকে ভালবাসার ব্যাপারে যেমন উপদেশ দিয়ে বোঝাতে হয় না তেমনি মাতৃভূমি প্রেমের প্রসঙ্গও বাইরের চাপ প্রয়োগ করে জাগিয়ে দিতে হয় না। স্বতস্ফূর্তভাবেই হৃদয়-মন জুড়ে যা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রেম অবাধে দানা বেঁধে ওঠে। রাসূলুল্লাহ (সা) র ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
এক যুগেরও অধিক কাল ধরে রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মভূমি মক্কায় অতিবাহিত করেন। তিনি দেশবাসীকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তারা তাঁর বিরুদ্ধে চড়াও হয়। ফলে রাসূলুল্লাহ (সা) র জন্য মাতৃভূমিতে অবস্থান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবুও তাঁর স্বদেশপ্রীতি যেন তাঁকে বার বার বাধা দেয়, তাঁর প্রাকৃতিক মন তাঁকে নিজ আবাসভূমি আঁকড়ে ধরতে চায়। এই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাঁকে হিজরতের প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন এই বলে: বলুন হে আমার রব! আমাকে কল্যাণের সঙ্গে প্রবেশ করান, আমাকে কল্যাণের সঙ্গে নিষ্ক্রান্ত হবার জন্যে কুরআন আর আপনার নিকট থেকে আমাকে দান করুন সাহায্যকারী শক্তি। দেশবাসীকে ছেড়ে যাওয়া বড় কষ্টের কাজ। দেশবাসী যতই অত্যাচার-অবিচার করুক তাদের থেকে দূরে অবস্থান করা তো বড় কঠিন। তাই আল্লাহ রসূল (সা) কে শিখিয়ে দিচ্ছেন: লোকে যা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ কর এবং সৌজন্য সহকারে ওদেরকে পরিহার করে চল।
ধীরে ধীরে প্রস্তুতি গ্রহন করে এক সময় রাসূলুল্লাহ (সা) জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে আসতে বাধ্য হন। মাতৃভূমি ছেড় আসতে তাঁর মন চাচ্ছিল না বলে তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন:
হায়রে আমার জন্মভূমি মক্কা! দুনিয়ার জনপদগুলোর মধ্যে তুমিই আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বেশী প্রিয়। আমি তোমাকে অন্যান্য স্থানের তুলনায় বেশী ভালবাসি। তোমার লোকজন তোমাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য যদি আমাকে বাধ্য না করত তাহলে আমি কখনই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।
অশ্রুসজল নয়নে এ কথা বলে রাসূলুল্লাহ (স) মদীনা মুনাওয়ারার দিকে পাড়ি জমালেন। মদীনাবাসী শিশু-কিশোর আবার বৃদ্ধ বনিতা সবাই তাঁকে সাদর সম্ভাষণের ব্যাপক আয়োজন করেন। তবুও জন্মভূমির প্রীতি যেন তাঁকে বিচলিত করে তুলে বার বার। আল্লাহ তা’আলা তাঁর মনের বেদনাহত অবস্থার কথা জানতে পেরে তাঁকে সান্ত¦না দিয়ে বলেন:
নিশ্চয়ই তোমার প্রতি যিনি কুরআনকে বিধান করেছেন তিনি তোমাকে প্রত্যাবর্তন স্থলে ফিরিয়ে আনবেন।
প্রিয় নবী (স) জন্মভূমি মক্কা থেকে হিজরত করে ইয়াসরিবে বসবাস করা শুরু করেন। তাঁর শুভাগমনে ইয়াসরিবের নামকরণ করা হয় মাদীনাতুন্নবী বা নবী করীম (সা) এর মদীনা (নগর)। কালের পরিক্রমায় এই মদীনা মুনাওয়ারাই হয়ে ওঠে রাসূলুল্লাহ (সা) এর আবাসভূমি। এই মদীনাকে কেন্দ্র করেই তিনি গড়ে তোলেন বিরাট এক ইসলামী সমাজ। মদীনাকে ভিত্তি করেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন সুবৃহৎ রাষ্ট্র ব্যবস্থা। সুদীর্ঘ তিপ্পান্ন বছর যাবত যেই মক্কার কল্যাণ ও উন্নয়নের জন্য তাঁর অক্লান্ত সাধনা অব্যাহত ছিল। সেই মক্কার সংযোগ স্থাপন হওয়া দরকার এই নতুন আবাসভূমি মদীনার সঙ্গে। আর মদীনারও সংযোগ হওয়া প্রয়োজন মক্কার সঙ্গে। শুধু মক্কা আর মদীনাই নয় তাঁর অবস্থানের চতুষ্পার্শ্বের সকল এলাকাই হবে তাঁর দাওয়াতের ক্ষেত্র, তাঁর রাষ্ট্র ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন বিশ্বের প্রথম লিখিত সংবিধান ‘মদীনা সনদ’ এর ভিত্তিতে। তাঁর প্রবর্তিত ‘মদীনা সনদে’ ইয়াসরিব বা মদীনা রাষ্ট্রের অখ-তা, সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি চিরদেদীপ্যমান। সীরাতে ইবন হিশামে বিবৃত মদীনা সনদের কয়েকটি ধারা উপরিউক্ত কথার জ্বলন্ত সাক্ষ্য বহন করে। ধারাগুলো এরূপ:
১. তারা সবাই মিলে অন্যদের মুকাবিলায় এক উম্মতজ্জএক জাতি।
২. ইয়াসরিব উপত্যকা এই চুক্তিনামার সকল পক্ষের লোকদের কাছে পবিত্র ভূমি বলে গণ্য হবে।
৩. এই চুক্তির সকল পক্ষের লোক ইয়াসরিব আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে পরস্পর সাহায্য-সহযোগিতা করবে।
৪. এই চুিক্তনামা গ্রহণকারী পক্ষসমূহের মধ্যে যদি এমন কোন নতুন সমস্যা বা বিরোধের সৃষ্টি হয়, যা থেকে দাঙ্গা বেঁধে যাওয়ার আশংকা দেখা দেয়, তাহলে তা আল্লাহ ও মুহাম্মদ (সা) এর নিকট মিমাংসার্থে উত্থাপন করতে হবে। এই চুক্তিনামায় যা কিছু রয়েছে তার প্রতি সর্বাধিক নিষ্ঠা ও বিশ্বস্ততা আল্লাহর কাছে অধিকতর পছন্দনীয়।
উপরিউক্ত ধারাগুলোতে ইয়াসরিবের মত একটি দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখার মৌলিক নীতিমালা বর্ণিত হয়েছে দ্ব্যর্থহীনভাবে।
নতুন আবাসভূমি মদীনা মুনাওয়ারায় আশ্রয় নিয়ে অনেক সাহাবা কিরামই-মদীনার আবহাওয়া ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছিলেন না। নতুন জায়গায় এলে অনেকেরই প্রথম অবস্থায় কিছুটা অস্বস্তিভাবের সৃষ্টি হয়। হযরত আশিয়া (রা) থেকে বর্ণিত আছে, ‘যখন রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় এলেন তখন হযরত আবূ বকর (রা) ও হযরত বিলাল (রা) জ্বরাক্রান্ত হয়ে পড়েন। হযরত আয়িশা (রা) বলেন, আমি তাঁদের দু’ জনের কাছে গেলাম। আমি আমার পিতা হযরত আবু বকর (রা) এর কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আব্বাজান! কেমন আছেন! উত্তরে হযরত আবূ বকর (রা) বললেন:
কুল্লুমরিয়িন মুসাব্বাহুন ফী আহলিহী
ওয়াল মাওতু আদনা মিন শিরাকি না’লিহী
“প্রত্যেক মানুষই চায় তার প্রভাত যেন হয় তার পরিবারে, তার আপনজনদের মাঝে; আর মৃত্যু তো জুতার ফিতার চেয়েও অধিক নিকটবর্তী।”
দেশপ্রেম বলতে যদি দেশের মানুষের প্রতি অর্থবহ প্রেম বোঝায়, দেশের আপামর জনসাধারণের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি বোঝায় তাহলে রাসূলুল্লাহ (সা) র মক্কা বিজয়ের ঘটনায় দেশপ্রেমের মৌলিক রূপ লক্ষ্য করা যায়। মাতৃভূমি মক্কার যেসব লোক তাঁকে নিপীড়ন করেছে, নির্যাতন করেছে, দেশ থেকে উৎখাত করেছে সেই ঘোর শত্রুদের প্রতি তাঁর আবেগাপ্লুত সচেতন ঘোষণা: ‘লা তাহরীবা আলায়কুমুল ইওয়াম আনতুমুত তুলাকা’ ‘ওহে মক্কাবাসী! তোমাদের প্রতি আজ আমার কোন অভিযোগ নেইজ্জ নেই কোন প্রতিশোধ ভাবজ্জতোমরা মুক্ত মানুষ। মানবতার প্রতি এই মহান প্রেম জগতে আর কে ই বা দেখাতে পেরেছে। দেশপ্রেম বলতে যদি দেশের ভবিষ্যত ও সামগ্রিক উন্নতি ও কল্যাণ বোঝায় তাহলে হুদায়বিয়ার সন্ধির ঘটনার চেয়ে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নিদর্শন আর কি ই হতে পারে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ