ঢাকা, সোমবার 26 March 2018, ১২ চৈত্র ১৪২৪, ৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় লেখা কবিতা

মোহাম্মদ অংকন : ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের ভয়াল কালরাতে বাংলাদেশ দাউ দাউ করে জ্বলেছিল। সমগ্র দেশ যখন হানাদার বাহিনীর বর্বরোচিত অত্যাচারের দুঃস্বপ্নে নিমজ্জিত, বাংলাদেশের কবিদের কবিতায় এর স্বরূপ ফুটে ওঠে তখন সত্য হিসেবে। দেশ ও সমাজের অঙ্গীকারে সোচ্চার হয়ে ওঠে কবিতাগুলো। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নবচেতনার উন্মেষ ঘটেছিল প্রবলভাবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে তাই সিকান্দার আবু জাফর লিখেছিলেন-
তুমি আমার বাতাস থেকে নাও তোমার ধুলো
তুমি বাংলা ছাড়ো।
মুক্তিযুদ্ধের কবিতায় কবিরা বিচ্ছিন্নভাবে হলেও নয় মাসের ঘটনাপ্রবাহ স্বার্থকভাবে ধারণ করতে পেরেছিলেন। ফলে কবিতাগুলোতে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের পরিচয় ফুটে ওঠেছিল। প্রতিটি কবিতায় মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান জাতিসত্তার প্রতিষ্ঠার প্রবল প্রচেষ্টা ছিল। ফলে মানবাধিকার অন্বেষণ ও মানবতা প্রতিষ্ঠাই ছিল কবিতার মূল লক্ষ্য। তাই কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন-
তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা
তোমাকে পাওয়ার জন্য
আর কত ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?
আর কত দেখতে হবে খা-ব দাহন?

অবরুদ্ধ দেশে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে যুদ্ধজয়ের স্বপ্ন তখন সবাই দেখতেন। কিন্তু আবেগ ধরে রাখা যেন কষ্টকর ছিল। তাই উচ্চারিত হয়েছিল কবির হৃদয়বিদারক আকুতি। হুমায়ুন কবির ‘কারবালা’ কবিতায় গণমানুষের মানসিকতা ও মুক্তিচেতনার উপস্থাপনা একান্তভাবে এনেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন-
কারবালা হয়ে যায় সমস্ত বাংলাদেশ,
যায় কারবালা হয়ে যায়।
আমরা মনে করি, বাংলা কবিতার চিরায়ত ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রচিত কবিতাগুলো সময়ের  দলিল হিসেবে থেকে যাবে। আধুনিক বাংলা কবিতায় কালক্রমিক অর্থবহতায় এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় রয়েছে বাংলাদেশের সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। কবি রফিক আজাদের ‘একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মসমর্পণ’ কবিতায় সেই মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছিল। তিনি লিখেছিলেন-
তোমার মুখে হাসি ফোটাতে দামি অলঙ্কারে সাজাতে
ভীরু কাপুরুষ তোমার প্রেমিক এই আমাকে
ধরতে হল শক্ত হাতে মর্টার, মেশিনগান
শত্রুর বাংকারে, ছাউনিতে ছুড়তে হল গ্রেনেড
আমার লোভ আমাকে কাপুরুষ হতে দেয়নি।
মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা, রক্তস্রোত, স্বজন হারানোর কথায় ব্যথিত চিত্রগুলোয় কবিদের বিক্ষুব্ধ চিত্তের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অবলীলায়। যেখানে কবিরা হাজারো প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দেশপ্রেমে আত্মত্যাগের মহিমাকে মানুষের কাছে তুলে ধরেছিলেন। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে যুদ্ধজয়ের অপার স্বপ্নকে লালন করেছিলেন। তেমনি আল মাহমুদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্বহারা মানুষের করুণ কান্না ও এশিয়ার মানুষের মধ্যে আন্তরিক সহানুভূতির প্রতিফলনের চিত্র ফুটে ওঠেছিল। তিনি লিখেছিলেন-
বাঁচাও বাঁচাও বলে এশিয়ার মানচিত্র কাতর
তোমার চিৎকার শুনে দোলে বৃক্ষ নিসর্গ নিয়ন।
মুক্তিযুদ্ধকালে এ দেশের মানুষের জীবনের নিশ্চয়তা ছিল না। জীবন ছিল বিভীষিকাময়, সময় ছিল অবরুদ্ধ। পাক হানাদারের অমানবিক বর্বরতার দৃশ্যাবলি, জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা ও দমননীতির রক্তচক্ষুর দৃষ্টির বিপক্ষে বাঙালির দামাল ছেলেরা অকুতোভয় হয়ে পাক হানাদারদের পরাস্ত করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে অসংখ্য মানুষ শহীদ হয়েছিল। স্বজন হারিয়েছিল স্বজন। মা হারিয়েছিল সন্তান, ভাই হারিয়েছিল বোন। এসব দুঃখ-পরিতাপগুলো আবুল হাসান কবিতায় রুপ দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন-
তবে কি আমার ভাই আজ ওই স্বাধীন পতাকা?
তবে কি আমার বোন তিমিরের বেদিতে উৎসব?

এ দেশের মুক্তিসংগ্রামে ও দেশকে শত্রুমুক্ত করার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধারাই ছিল একমাত্র ভরসা ও আশার আলো। হুমায়ুন আজাদ ‘মুক্তিবাহিনীর জন্য’ কবিতায় মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রতি অগাধ আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন-
তোমার পায়ের শব্দে বাংলাদেশে ঘনায় ফাল্গুন
আর ৫৪ হাজার বর্গমাইলের এই বিধ্বস্ত বাগানে
এক সুরে গান গেয়ে ওঠে সাত কোটি বিপন্ন কোকিল।
বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের কবিতাগুলো বাঙালির জীবন ও রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্যে আলোকিত চিরন্তন শিখা হয়ে নতুন উজ্জীবনের সন্ধান দিচ্ছে। প্রেরণা জাগাচ্ছে মননে মেধায়। মুক্তিযুদ্ধ এ দেশের প্রতিটি বাঙালির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেদিক থেকে বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বীরত্বগাঁথা কবিতাগুলো আমাদের সঞ্জিবনী শক্তি। যুদ্ধবিধ্বস্ত দুঃস্বপ্ন, সাহস ও বিক্রমের নতুন মাত্রার শিল্পিত বিবরণ, গৌরব ও আত্মদানের ফলাফল, যুদ্ধবিজয়ের বহুমুখী বর্ণনা প্রকাশিত হয়েছে এসব কবিতায়। মুক্তিযুদ্ধের কবিতা এ দেশের কাব্যধারায় স্বতন্ত্র নিদর্শন। কবিতাগুলোয় মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ, অনুষঙ্গ, ঐতিহাসিক ভিত্তিতে স্বকীয় সত্তায় গৌরবময় ইতিহাস হয়ে থাকবে। বাঙালীদের জীবন ও মৃত্যুর সার্বক্ষণিকে কবিতাগুলো দেখা দিবে দেশ প্রেমের প্রতিচ্ছবি হয়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ