ঢাকা, সোমবার 26 March 2018, ১২ চৈত্র ১৪২৪, ৭ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

কবিতা

আণবিক অনিশ্চয়তা
আল মুজাহিদী

এখন শিশুও শান্তি চায় না, অমৃত চায় না
অমৃতে অরুচি হয়েছে বড়ো
তার পিতা ও মাতার-গুরুজনদের
এখন শিশুও শান্তি চায় না
অমৃতেও নাস্তি।
খোলাপার্ক, ছায়াহ্রদ, ময়দানে
বারুদের বিকট গন্ধ এখন
পৃথিবীর অন্দরে কন্দরে অগ্নিময় সেলেখানা
পা বাড়ালে চোখ খুললেই
কেমন ঝলসে যায় সব।
দেহ, নাড়ী, অন্ত্রনালী, বিপুল করোটি।
আমিও আমার শিশুটির সাথে
হাসির হররা বন্ধ ক’রে দিয়েছি সেই কবে থেকে।
এ সময়ে পৃথিবীতে
সভ্যতার দোরগোড়ায় আমার দায় নেই দু’দন্ড হাসির।
সভ্যতার ক্রীতদাস
এইসব মানব শিশুর দুনিয়া কাঁপানো ঠা ঠা হাসি নেই-
এক ভয়াবহ আণবিক অনিশ্চয়তা শুধু। আণবিক অনিশ্চয়তা
ক্ষুধার্ত শতাব্দী।
ক্ষুধার্ত সভ্যতা। যুদ্ধই একমাত্র আহার তোমার। শান্তি নয় যুদ্ধ।


দিনলিপির প্রশ্নবানে
জয়নুল আবেদীন আজাদ

একটি পাখি গান গেয়ে যায়
ডালে বসে আনমনে
ডাক দিয়ে যায় উচ্চস্বরে,
কেনো ডাকে জানে না সে।

একটি মানুষ বিপ্লবী সে
ওঙ্কারে তার কেঁপে ওঠে
আকাশ-বাতাস ফুলেল বাগান।
হঠাৎ আবার সেই মানুষই
হাঁটতে গিয়ে হোঁচট যে খায়
ভরদুপুরে।

ঘামে ভেজা জামাটা অবশেষে
আঙ্গিনাতে সঙ্গোপনে শুকাতে দেয়
কান্ড দেখে গায়ক পাখি কাছে এসে
প্রশ্ন করে-
এতো কেনো ঘাম ঝরালে মিছেমিছি?

দিনের শেষে সেই পাখিটি নীড়ে ফেরে
ফিরে আসে বিপ্লবীও আপন ঘরে,
পাখির তো নেই দিনলিপি নেই
যায় বেঁচে যায় ফলে,
বিপ্লবীদের দায় মেলা দায়-
দিনলিপির প্রশ্নবানে জর্জরিত
আপন ভুবনে।


কবিদের ব্যর্থ হতে নেই
শাহীন রেজা

তুমি চলে যাবে কিন্তু প্লাটফর্মে আমি থাকবো না, পৃথিবীর সকল শিউলি ঝরে পড়বে
অথচ তাতে অঘ্রাণ- শিশিরের ছোঁয়া থাকবে না, তাকি হয়? মোহন -কুহক ডাকবে আর
রাত্রি ঘন এবং গভীর হবে না এতো অসম্ভব? উর্মির আহ্বানে সমুদ্রের  আকাঙ্খা  যদি জাগ্রত না হয় তাহলে জলজন্মই তো বৃথা। শ্রাবণের ঘনকেশে আকাশ স্পর্শের স্পর্ধার নাম যদি ভালোবাসা হয় তাহলে আমি ভালবাসি, ডাহুক হৃদয়ে জেগে থাকি অনুক্ষণ।

তুমি চলে যাচ্ছো, হুইসেল বাজিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে ভোরের ট্রেন, শরতের সব মেঘ নেমে এসেছে কাশবনে আর আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি সেই পাখিটার দিকে, যে একটু আগে শীষ দিয়ে গাইছিল কোন আনন্দগীত; পাখিটা এখন স্তব্ধ, বিমর্ষ-হয়তো একাকীত্মের যন্ত্রণায় সেও বিধূর, মূহ্যমান।

আচ্ছা, কতোদূর রাজশাহী, কতোটা পথ? দেহের দূরত্ব যতোটা মনের কি ততোটাই! কে জানে। ছেড়ে যাচ্ছে ট্রেন, চলে যাচ্ছো তুমি অথচ প্লাটফর্মে বোধন নেই, আমি নেই; এ যেন অনন্তের ব্যর্থতা-

কবিদের ব্যর্থ হতে নেই।


মগের মুল্লুকে
ফজলুল হক তুহিন
 
বহমান ইতিহাসে
অতীতের পৃথিবীতে
যাপিত জীবনে
মানুষের এই বিপন্নতা বর্ণনা করার
মানবিক কোনো ভাষার অস্তিত্ব আমার অজানা
এইসব জীবনবিনাশী বর্বরতা প্রকাশের কোনো বর্ণমালা আবিষ্কার হয়নি এখনো
হতে পারে না, সম্ভব নয়
মানুষের হাতে মানুষের পরাজয়!

বনপোড়া হরিণের মতো প্রতিটি মানুষ
সাতপুরুষের বাস্তুভিটা রক্তের আগুনে দাবানল
স্বপ্নসাধ বাঁচার আশ্রয় লড়াকু প্রাণের গুঞ্জরণ
নিমেষেই নিঃশেষ হওয়ার দৃশ্যাবলী
ধারণের কোনো লিপিমালা কারো কাছে জানা আছে?

মগের মুল্লুকে রক্তের দরিয়া ঢেউ খেলে
রাক্ষসের নখেমুখে ঝরে কান্নামাখা প্রাণ
    মাথাকাটা মানুষের দেহের কাঁপন
হিংসা ঘৃণা হত্যার উল্লাস
পীড়ন নিধন উচ্ছেদ উৎসব!

দৌলত কাজী, আলাওল, মাগন ঠাকুর-
আপনাদের কলমে এই রক্তধারা অশ্রুঝরা চলচ্ছবি
প্রকাশের শব্দাবলী থাকলে লিখুন-
লক্ষ লক্ষ পলাতক শরণার্থী স্রোতের ক্রন্দন
বুভুক্ষু উদ্বাস্তু শিবিরের হাহাকার
ভয়ার্ত বিক্ষত নারী শিশু প্রসূতির আর্তস্বর!

জানি কবি, পারবেন না কিছুতেই
কারণ মানব ইতিহাস থেমে গেছে এখানেই।

দানবের ইতিবৃত্ত সূচিত হয়েছে নাফ নদীর প্রতিটি বাঁকে
রোসাঙ্গ রাজসভায় আজ শেয়ালেরা হুক্কাহুয়া ডাকে।


একাত্তর: উত্থানের ইতিহাস
হাসান হাফিজ
                                                                  
রক্ত ছাড়া যুদ্ধ হয় না
যুদ্ধ ছাড়া জয়ের অস্তিত্ব নেই
এ দুর্লভ অভিজ্ঞতা কে দিয়েছে?     
                একাত্তর, দগ্ধ একাত্তর।
আগুন ক্রোধের তীব্র আঁচে
হানাদার বাহিনী পরাস্ত
জনযুদ্ধ তৃণমূলে ব্যাপ্ত প্রসারিত
সাধারণ মানুষও সম্পৃক্ত এই
অস্তিত্ব রক্ষার মর্মে দুর্ধর্ষ লড়াইয়ে
এই শিক্ষা কখন পেয়েছি
             একাত্তরে, পরম আরাধ্য প্রিয়
                     অগ্নিক্ষরা একাত্তরে;
জ্বলন্ত জাগর সেই ইতিহাস
                       রক্তভেজা মুক্তি-মাঙ্গলিক
একাত্তর, বিস্মৃতির ধুলোময়লা কোনোদিনই
                তোমার নৈকট্যে যেতে
                 উত্থানের ইতিহাস ঢেকে দিতে
পারেনি ও পারবে না কোনোদিনই, সেই সত্য জেনো...


একটা স্লিপিং পিল দাও
আবদুল হালীম খাঁ

একটা স্লিপিং পিল দাও, ডাক্তার
কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিই।
সংসার আমাকে ঘুমাতে দেয়নি চল্লিশ বছর
অবিরাম জেগে আছি
ঘুমানোর অবসর পাইনি খুঁজে।
আজকাল চাল ডাল নূন মরিচ পেঁয়াজ
অমৃতের মত দুর্লভ
পুরোনো কাপড়ের দোকানে কেঁচোর মত
লোকের ভিড়।
হায়! বেঁচে থাকা
বেঁচে থাকা মানে ঘুমহীন রাত জেগে জেগে
অসহ্য যন্ত্রণার আগুন পোহানো।
কালের কূটি হাওয়ায়
আমার সব স্বপ্নের শহরে লেগেছে আগুন
এ আগুন আর কোনোদিন নিভবে না
কভু নিভবে না
হায়! স্বপ্নের শহর।

এখন বড়ই দুঃসহ এই বন্ধুর পথ
ঠেলে ঠেলে চলা
ভীষণ ক্লান্ত আজ, ডাক্তার
একটা স্লিপিং পিল দাও হাতে
চট করে খেয়ে ঘুমিয়ে নিই।


কার কাছে যাবে
মুহাম্মদ রেজাউল করিম

ম্লান চোখ স্থিরবদ্ধ মাটির ওপর
ফুরিয়েছে রক্তের নীল সুবাস
তুমি কার কাছে যাবে অন্ধকারে?
ঝাঁক ঝাঁক পাখি আসে, আসবেই
সমুদ্র জেগে ওঠে, উঠবেই
তুমি কার কাছে যাবে অন্ধকারে?


অবুঝ ভালোবাসা
মুহাম্মাদ ওবায়দুল্লাহ

দীর্ঘ বছর- সুদীর্ঘ সড়ক পথে হোঁচট খেয়ে খেয়ে চলছি,
করছি ঘোরফেরা সঙ্গী হারা যেন মরছি ঘর হারা,
মাঝে মাঝে ক্ষুধার জ্বালায় শুধুই জ্বলছি
অচেনা মানুষ নগরে নীরবে নিজের কান দু’টো মলছি।

আমি ছাই মাটির ভাংগা কুলো
যতনে রেখেছি চেপে আমার চিৎকারগুলো।
বিশাল ব্যক্তিত্ব সুবিশাল সুন্দর আকাশ আমার
আমি অমলিন অন্তরে গ্রাম শহরে সুবিজ্ঞ দ্বার।

দেখিনি কোথাও মনুষ্য মকূলের চাষ
হায় আমি হতাশÑআমি হতাশ !
সুধীজনেরাও দেখছে চেয়ে চেয়ে
জল ঝরছে আমার দু’চোখ বেয়ে-বেয়ে।

দেখলো হঠাৎ হাটে হাঁড়িভাঙ্গার মতো
মনুষত্বের মুক্তা আমার যতো।
তবুও তারা লজ্জা হারা লোভী স্বেচ্ছাচার
অথচ তাদের জন্য ভালবাসা আমার ভরা পুর্ণিমার।


ফসিল কথা বলে
জাফর পাঠান

সীমান্ত স্বাধীনতা, মৌলিক স্বাধীনতা
কোন্ স্বাধীনতার কথা- বলবো ভাই,
একটির দেখা পেলেও  প্রকাশ্য দৃষ্টে
আরেকটির দেখা যে খুঁজে নাহি পাই।

ঘারিয়েছে যেন সে- বসুধার ওপারে
বিজ্ঞানেরও সাধ্যের গন্ডির বাহিরে,
বায়ুতরঙ্গ- অঙ্গ- যায় যেথা হারিয়ে
রাডার টেলিস্কোপের ক্ষমতা ছাড়িয়ে।

স্বাধিকার, অধিকারের- জড় ফসিল
কাঁদে চরাচরের বুকে- স্তব্ধ প্রান্তরে,
আর দুখের ঐ তীক্ষœ গিরি গিরিন্দ্ররা
ডবঁধে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষদের অন্তরে।

গগন- আর বক্ষ বিদীর্ণ আর্তনাদ
ডাকে দুয়ারে দুয়ারে নাবুদের নাদ।


স্বাদেশীকতা
মোহাম্মদ ইসমাইল

চলোনা, জনতার কাতারে গিয়ে সবাই একসাথে
কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে শিখি এই আপনাতে!
সব দ্বিধা বিভেদ ভুলে আজ আমরা শুধু
আমরা ‘মানুষ’ হবার মন্ত্রে যেন শুধু উচ্চকিত হই;
মানুষ ছাড়া যেন কেউ আর অন্য কিছু নই;
আর এটাই হোক আমাদের সেই স্বদেশপ্রেমের স্বাদেশীকতা
গণতন্ত্রকামী একটি স্বাধীন জীবন আর বাংলাদেশে কথা!


আমার সবুজ বাংলা
মোশাররফ হোসেন খান

এসো, এইখানে ঘন হয়ে বসি-
ছায়া তরু হিজল তমালের নিচে
অনেক সূর্য আর সন্ধার রঙ মিলেমিশে গড়েছে যেখানে
                          বহু বর্ণিল এক চিত্রল প্রাণবন্ত ছবি। যে ছবি
                          আঁকতে পারে না কেউ।

এসো, এই খানে বসি
যেখানে আকাশ নুয়ে পড়ে কখনো
                          সাতরঙা রঙধনুর টানে
যেখান থেকে বয়ে গেছে আলপথ দিগন্তবিদারী মাঠের দিকে
সবুজাভ প্রান্তরে।

যেখানে নদীগুলো বয়ে যায় কুলুকুলু অবিরত
যেখান থেকে ছড়িযে পড়ে মায়ের স্নেহের মত জোসনার দ্যুতি
পাখির কলরবে কখনো বা সরব হয়ে ওঠে
                         ঘন পল্লবিত আম কিংবাবটের শাখা।

এসো এইখানে বসি-
ঝির ঝির নিটোল বাতাস যেখানে উপশিত তালপাতার হাতপাখা
কৃষকের ভারী পা যেখানে এঁকে যায় নন্দিত  শিল্পকর্ম
যেখানে হালের বলদ দিনভর স্বপ্ন এঁকে যায়
                        রুক্ষ মৃত্তিকায় সুকঠিন বুক চিরে ,

এসো, এইখানে বসি -
এ আমার শান্ত দিঘির মত হৃদয় জুড়ানো মায়াবী দেশ-
শিশির ধোয়া মায়ের কোমল আঁচল
অগণিত স্বপ্ন আর প্রগাঢ় প্রশান্তির প্রস্রবণ
                         মুহূর্তের চাতকী শিহরণ

এ আমার দেশ-
বৈশাখের প্রথম বৃষ্টির মতো প্রতীক্ষিত সঘন দৃষ্টির কাঁপন
শত স্মৃতি বিস্মৃতির ইতিহাসে মোড়ানো এক বর্ণিল আকাশ
সবুজ ঘাসের গালিচাসমৃদ্ধ এদেশ যেন আমার
                           পবিত্র জায়নামাজ।

এসো এইখানে বসি -
সরল মানুষের মায়া মমতা আর ফুলের সৌরভ
মায়ের শীতল চাহনি, পিতার স্নেহ আর বোনের আদর
নির্মল বাতাস , সবুজ সোনালী ধানের ক্ষেত
অজস্র পুকুর , দিঘি হাওড় বিল খাল নদী-
                           সব মিলে আমার এদেশ-


স্বাধীনতার গল্প
মাহফুজুর রহমান আখন্দ

স্বাধীনতার গল্পটা ভীষণ রঙ বদলায় ইদানিং
ফসলের মাঠের মতো সবুজ দেখতে দেখতে
রক্তিম হয়ে ওঠে শিমুল পলাশ কিংবা রক্তচূড়ার মতো
শাপলা পদ্মের সুঘ্রাণ নিতে গিয়ে দেখি
গোবরে পোকারা কিলবিল করছে মহানন্দে
মিঠে পানির সুস্বাদু ঘ্রাণের বদলে নাকের ছিদ্রে ধাক্কা লাগে
শহুরে ড্রেনের, পঁচা নর্দমার উৎকট দুর্গন্ধ
দোয়েল শিসের আমেজে কান পেতে শুনি
বখাটের শিস, নাবালিকার আত্মহত্যা, উধাও ষোড়শী
লজ্জায় মুখ লুকায় আইনের বই, চিহ্নিত পোষাক
অজানা শংকায় আব্বা-মার কালক্ষেপণ
কোকিলের গান ভেবে মনরশি ফেলতেই
বুকফাটা কান্নায় কেঁপে ওঠে খোদার আরশ
পাকুর পাতার তালে বেজে ওঠে অশনির ঘণ্টাধ্বনি
মায়ের শাড়ির আঁচলে শ্বাস নিয়ে দেখি
ঝাঁঝালো বারুদ আর রক্তের ঘ্রাণ
জিহ্বার আগায় ঠেকতেই নোনা অশ্রুর স্বাদ
কণ্ঠনালীকে করে তোলে হতবিহ্বল
চোখের দিকে তাকাতেই জিজ্ঞাসার রক্তচক্ষু
‘আর কত খুন ঝরলে আসবে গণতন্ত্র, জীবনের স্বাধীনতা!’
তবু স্বাধীনতা এগিয়ে যাচ্ছে
এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের স্বপ্নকল্পনা
তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের মুক্তিনিশান, আমাদের স্বাধীনতা।


শেষ লেখা
আরিফ মুহাম্মদ

নূপুরের শব্দে ভেঙে  যায় নির্জলা ঘুম
অন্ধকারে জেগে থাকে কুয়াশাময় রাত
প্রণয়ের ডগায় রোদেলা ভোর
পাখির হৃদয়ে রেখে গেলাম একশিশি আদর।
প্রশ্নবোধক চিহ্নটাকে সরিয়ে নিলাম অভিধানে
লাটাইহীন ইচ্ছে ঘুড়ি ছড়িয়ে দিলাম কাব্যিক আকাশে।
কবিতা তোমায় দিলাম-
এক চিলতে রোদ, চলন্ত সময়ে আগামী শরৎ
জীবন থেকে কুড়ে আনা মখমলে দিন
শব্দের শেষ চাদরে লিখে দিও সময় অর্থহীন।
আবিরের ঠোটে রক্তের দাগ
কী লাভ আর শালিকের ডানায় স্বপ্ন একে?
তার চেয়ে সেই ভালো
প্রজাপতি হয়ে উড়ে যাও মেঘমুক্ত অন্যকোন আকাশে।


সবুজ
হাসান নাজমুল

অই অবারিত মাঠের সবুজে সংগ্রাম নেই
সবুজের বুকে বেড়ে উঠবার প্রয়াসও নেই;
বর্ষার মৌসুমে শান্তির ফোয়ারা বয়ে চলে পথে
রোদেলা দিনেও ছায়ার মুকুট পরে বসে থাকে,
গহীন রাতেও ঘূর্ণিঝড় এসে নোয়ানো মাথায়
প্রশংসা করে চির সবুজের; সবুজের বুকে-
শুধু বিদ্যমান থাকে ভালোবাসা, বুক ভরা আশা,
যে-আশা এবং চির ভালোবাসা কখনো মরে না
কখনো ঝরে না এক বিন্দু প্রেম; শুধু মমতার
বসত বানিয়ে বিরাজ করতে থাকে দুনিয়ায়;
হে মানুষ, এসো আমরা সবুজ হয়ে যাই আজ,
সংঘাত ভুলে হৃদয়-গহীনে সমঝোতা নিয়ে
পৃথিবীর প্রতি প্রান্তে মিশে যাই সবুজের মতো
এসো ভুলে যাই সমস্ত বিদ্বেষ, নিষ্ঠুর বিগ্রহ।


বৃক্ষপত্র
নাবিল তুরাব

কোনো কোনো বৃক্ষপত্র ঝরে যায় অকালে,
গভীর সম্ভাবনাময় এবং বহুদূর এগুনোর কথা যার।
যেহেতু শীতের রাতগুলো কষ্টের, নিয়তি বড়ো নির্দয়;
এবং বৃষ্টিফোটাগুলো ঝরে পড়ে কম্বলে।
ফলত, একএকটি মানুষ একএকটি বৃক্ষপত্র।

কালনামা
সায়ীদ আবুবকর

কালের অতলে, হায়, তলিয়ে গেছে যে কত মুখ;
ডুবে গেছে চিরতরে বিস্মৃতির অথই অর্ণবে
কত দেশ, কত জাতি; কত বীর কত যে মুলুক
জবরদখল করে মেতেছিল বিজয়উৎসবে,
নেই তার নামধাম; মুছে গেছে কালের পৃষ্ঠার
কত যে হরফ, যেন খড়ি দিয়ে লেখা কথামালা;
কত দুঃখ, কত সুখ আঁধারে হয়েছে একাকার;
সব ফুল ডাস্টবিনে, পড়ে আছে ঘরে খালি-ডালা!

কাঁপছে গাছের পাতা (কখন পড়বে ঝরে) ভয়ে;
হৃদয় উপুড় করে গেলাম যে কাব্য লিখে, হায়,
থাকবে কি থাকবে না অনাগত অজস্র হৃদয়ে,
কোটা কৈ মাছের মতো সেই টেনশানে তড়পায়!
যে পঙক্তি হলো লেখা প্রাণের অক্ষরে সূর্যোদয়ে,
করবে কি সিক্ত চোখে পাঠ কেউ রক্তিম সন্ধ্যায়?


থাকো
নয়ন আহমেদ

থাকো, থাকো একসাথে ; আলিঙ্গনে থাকো।
ফুলের পাপড়ি থাকে-
চাক চাক মাটি থাকে-
নদী ও জল থাকে;
একটু একটু করে লেগে লেগে থাকো।
জীবনকে এখনই বুঝাও-
তুমি তার সাথে লবণের মতো থাকতে রাজি আছো।

থাকো, থাকো একসাথে ; কাছে থাকো।
চাকা ও গতি থাকে-
পথ ও দূরত্ব থাকে-
চোখ ও দৃষ্টি থাকে-
সূর্য ও রোদ থাকে ;
তুমি ইকোলজি হয়ে থাকো।

গাছের পাতারা থাকে ;
আলিঙ্গনে থাকো।


দুটি রুবাইয়াত
শাহীন সৈকত

কেউবা হবে কাননবালা কেউবা হবে সাকী
কবিতা দিয়ে কেমনে বল তোমায় বেঁধে রাখি
সব কবিরাই সাকী খোঁজে কিংবা কাননবালা
আমি জানি সব সাকীরাই কবিকে দেয় ফাঁকি।
দুই.
কবির পাশে কাননবালা নাইবা যদি থাকে
কিংবা সাকী সেও যদি যায় দূরে কিংবা ফাঁকে
ভালবাসা জমবে বল আর কি কোনো দিন
ভালবাসতে পার তুমি যখন খুশি যাকে।


আমাদের মা
রিয়াজ উদ্দিন

পৃথিবীর চারদিকে অগণিত নারীর আর্তচিৎকার
আমাকে কখনো বিচলিত করতে পারেনা।
আমার কাছে আমার মায়ের প্রতিচ্ছবি
যে কোনো নারীর হিমালয়সম আর্তচিৎকার কে
মিনিটেই থমকে দিতে পারে।
পৃথিবীর এমন কোনো বরফখ- নেই
যেখানে আমার মায়ের কষ্টের ছাপ
তার পদচিহ্ন অঙ্কন করেনি,
পৃথিবীর এমন কোনো নদী নেই
যেখানে আমার মায়ের চিৎকার
পালতোলা নৌকায় বাতাসের ঢেউ তুলেনি,
পৃথিবীর এমন কোনো পাহাড় নেই
যেখানে পশুপাখি এমন কি বৃক্ষরাজি
আমার মায়ের পথচলা দেখে নীরবে অশ্রু ফেলেনি।
পৃথিবীর সব কষ্টকে মুহূর্তে ভুলে গিয়ে
আমাদের দিকে তাকিয়ে
যে একফালি হাসির চাষ করতে পারে
সে কেবল আমাদের মা
আমাদের মা, আমাদের মা!
জীবনের উত্থান-পতনে বহুবার যাকে হোচট খেতে দেখলেও
কখনো কাঁদতে দেখিনি,
কিন্তু আমাদের একটু কষ্টে হু-হু করে কেঁদে উঠতেন যিনি,
আমাদের সুস্থতার জন্য কতদিন রাতজেগে
জায়নামাজে কাঁদতে দেখেছি যাকে-
তিনি কেবল আমাদের মা
আমাদের মা, আমাদের মা!!


করছে শকুন ভোজ
আবদুল হাই ইদ্রিছী

মাগো তুমি রক্তে কেন লাল
তোমার বুকে দেখছি কেন ধর্ষকের পাল
ডাইনোসরে করছে কেন
                     তোমার এমন হাল?

তোমায় গোস্তে সারাবেলা
করছে শকুন ভোজ
তোমায় দিকে রাখছে না কেউ
একটুখানি খোঁজ!
সাগর সাগর রক্ত দিয়ে তোমায় কিনে আনা
আজকে তোমার হালটা দেখে
                         কেমনে মানি মানা?
আমার বুকের জমিন তোমায়
                            করে দিলাম দান
তোমার জন্য দিতে পারি এক মুহূর্তে প্রাণ।


৭১ ’এ
এমএ ওহাব মন্ডল

অন্ধকার রাতের ঘোর আঁধারে
পাকহানাদার বাহিনীরা-আমাদের ওপর;
নির্দ্বিধায় দিয়েছিলো হানা।
এভাবে ওদের আক্রমণের শিকার হবো
ছিলো না কারো জানা।

সম্ভ্রম হনন আর লাশের খেলায়
স্বৈরাচার গোষ্ঠী ওঠেছিলো মেতে।
এমন ঘৃণ্য আক্রমণ অকুতোভয় বাঙালি
পারেনি মাথা পেতে নিতে।

তাই তো-প্রদীপ্ত শ্লোগানে
হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলো-
মুক্তিকামী  বীর বাঙালি সম্প্রদায়।
বিরতিহীন ন’মাস যুদ্ধের পর
নিকৃষ্ট হানাদার বাহিনীদের-
বিদায়ের অন্তিম ঘন্টা বেজে ওঠে।
পূর্ব বাংলার বিজয়াকাশে হেসে হেসে উদয় হয়
একটি অর্জিত সূর্যের মুখচ্ছবি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ