ঢাকা, বুধবার 28 March 2018, ১৪ চৈত্র ১৪২৪, ৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

সৌদি আরবে জনশক্তি রফতানি

সরকারের পক্ষ থেকে জনশক্তি রফতানি ও প্রবাসীদের আয় বেড়ে যাওয়াসহ জাতীয় অর্থনীতির সব খাতে উন্নয়ন-অগ্রগতির সুখবর শোনানো হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি মোটেও উৎসাহিত হওয়ার মতো নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় শ্রম বাজার সৌদি আরবে জনশক্তি রফতানি কমেছে আশংকাজনক পরিমাণে। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত বছর ২০১৭ সালে বিভিন্ন দেশ থেকে যে ৫০ হাজার ১৪৮ জন শ্রমিক ফিরে এসেছে তাদের মধ্যে শুধু সৌদি আরব থেকে ফিরে আসাদের সংখ্যাই ৪০ হাজারের বেশি। একযোগে কমেছে নতুন চাকরি নিয়ে যাওয়া শ্রমিকদের সংখ্যাও। জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত বছরের প্রথম দুই মাসে যেখানে ৯৪ হাজার ৫২৮ জন নতুন চাকরি নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিল সেখানে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে গেছে ৬৬ হাজার ৬৮০ জন। এই নি¤œমুখী ধারায় এখনো উন্নতি ঘটার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, জনশক্তি রফতানির সঙ্গে জড়িত মধ্যস্বত্বভোগী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কারসাজি ও ভিসা নিয়ে প্রতারণা, স্থায়ী চাকরির আয়োজনে ব্যর্থতাসহ আইনসম্মত কাগজপত্রের অভাবের মতো বিভিন্ন কারণে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। সেই সাথে একদিকে বেড়েছে অভিবাসন ব্যয় এবং অন্যদিকে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের নতুন নতুন আইন। এভাবে সব মিলিয়েই কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশিদের জন্য দেশটির চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে গেছে।
সচেতন দেশপ্রেমিক মহলের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ক্রমাগত তাগিদ দেয়া হলেও সরকার উদ্যোগী হয়েছে মাত্র কিছুদিন আগে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব নমিতা হালদারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সৌদি আরবের শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন গত ১৪ ও ১৫ মার্চ। এসব বৈঠকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার জন্য একটি যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই কমিটি বাংলাদেশিদের সকল সমস্যা দূর করে সুষ্ঠু কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করার এবং ভিসা ও নিযুক্তিপত্র জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আইনগত রূপরেখা তৈরি করবে। চাকরিচ্যুতির ক্ষেত্রে পাওনা পরিশোধের ব্যাপারেও কমিটি ভূমিকা রাখবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়দায়িত্বের ব্যাপারেও যৌথ কমিটি কঠোর ভূমিকা পালন করবে, যাতে কোনো শ্রমিককে প্রতারণা ও জালিয়াতির শিকার না হতে হয়।   
আমরা মনে করি, অনেক বিলম্বে হলেও সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া উদ্যোগ যথেষ্ট সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। কারণ, বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে চিহ্নিত সৌদি আরবের চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে পড়লে জাতীয় অর্থনীতিতে তার প্রভাব অশুভ না হয়ে পারে না। অন্যদিকে নেতিবাচক এ অবস্থা চলছে বেশ কয়েক বছর ধরেই। এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই বলে এসেছেন, সরকারের একদেশকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আরও কিছু কারণে বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছে। সে কারণে ওই দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেয়া হয় বন্ধ করেছে নয়তো অনেক কমিয়ে দিয়েছে। উদাহরণ দিলে দেখা যাবে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৩৫ শতাংশই এসেছে সৌদি আরব থেকে। সবচেয়ে বড় সে চাকরির বাজারেই একদিকে বাংলাদেশিদের জন্য দরোজা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, অন্যদিকে কমে এসেছে শ্রমিকদের সংখ্যা। অনেক টানাপোড়েন ও দরকষাকষির পর সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে নারী গৃহকর্মীদের নেয়ার ব্যাপারে সম্মত হলেও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অসততার কারণে নতুন পর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছে সংকটের।
বলা দরকার, সৌদি আরবে চাকরির বাজার সংকুচিত হয়ে পড়ার খবর অত্যন্ত আশংকাজনক। কারণ, রফতানি আয়ের প্রধান খাত গার্মেন্ট কয়েক বছর ধরেই সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছে। এমন অবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দ্বিতীয় প্রধান খাত হিসেবে রেমিট্যান্স বড় অবদান রাখতে পারে। কিন্তু সে রেমিট্যান্স আয়ের প্রধান উৎস রাষ্ট্র সৌদি আরবেও যখন দরজা বন্ধ হওয়ার খবর শুনতে হয় তখন উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। অমরা মনে করি, এমন অবস্থায় কেবলই কল্পিত সাফল্যের কথা শোনানোর পরিবর্তে সরকারের উচিত সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেয়া, বিশেষ করে জনশক্তি রফতানি এবং রেমিট্যান্স বাড়ানোর ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠা। এজন্য সবচেয়ে বেশি দরকার সৌদি আরবসহ মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। এ উদ্দেশ্যে সরকারকে রিয়াদে অনুষ্ঠিত দু’ দেশের প্রতিনিধিদের বৈঠকে যৌথ কমিটি গঠনসহ যে সকল ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে সেগুলোর প্রতিটি বিষয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে উদ্যোগী হতে হবে।
অসৎ কোনো ব্যক্তি বা এজেন্সির জালিয়াতি ও প্রতারণার কারণে কোনো বাংলাদেশিকে যাতে চাকরি হারাতে বা ক্ষতিগ্রস্ত না হতে হয় সে ব্যাপারেও সরকারকে দৃষ্টি রাখতে হবে। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে নারী শ্রমিকদের নিপীড়নের বিষয়টিকে। আমাদের বিশ্বাস, কোনো অশুভ ঘটনা ঘটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি সৌদি সরকারকে অবহিত করা হয় তাহলে প্রতিকারও অবিলম্বেই পাওয়া যাবে। এভাবে আন্তরিক উদ্যোগ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সৌদি আরবের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব এবং সেটা করাই এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ