ঢাকা, বুধবার 28 March 2018, ১৪ চৈত্র ১৪২৪, ৯ রজব ১৪৩৯ হিজরী
Online Edition

স্বৈরাচারী তকমা যে কারণে

জিবলু রহমান : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা মেরুকরণ শুরু হয়েছে। এই নির্বাচনে বিএনপিসহ ২০ দলের অংশগ্রহণ করা না-করার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছু। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার নানাভাবে বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপি এতে বাধার সৃষ্টি করতে না পারায় তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে অনেক অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ড করছে। নির্বাচন হলে পরাজয় অবধারিত এটা নিশ্চিত হয়ে আবারো ৫ জানুয়ারির মতো একটি নির্বাচন করে ‘বোনাস হিসেবে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে’ আওয়ামী লীগ এখন কঠোর অবস্থান নিয়েছে।  দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না; অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা চরম। বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। বিদেশীরাও জনগণের ভোটের অধিকার এবং গণতন্ত্র না থাকায় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। দলীয়করণের কারণে প্রশাসনে অস্থিরতা। বিদেশী বিনিয়োগ কমে গেছে। প্রায় ১৫ হাজার শিল্প-কারাখানা কয়েক বছরে বন্ধ হয়ে গেছে।
বাংলাদেশে যে দুর্নীতি হচ্ছে, সংবাদমাধ্যমে চোখ রাখলে অথবা কান পাতলেই তা স্পষ্ট হয়। প্রায় প্রতিদিনই দুর্নীতির কোনো না কোনো খবর প্রকাশিত হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে। দুর্নীতির এসব খবরের কিছু আবার বড় আকারের অভিযোগ। ব্যাংক সেক্টরের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির খবরও জেনেছে দেশবাসী। নিয়োগ-বাণিজ্যও এখন ওপেন সিক্রেট দুর্নীতি বলা যায়। তবে সাম্প্রতিককালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুর্নীতির ব্যাপারে বেশ তৎপর হয়েছে বলা যায়। বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে সংস্থাটি। আমরা মনে করি, এককভাবে দুদকের পক্ষে দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করা যাবে না, কিছুটা প্রতিরোধ করা যাবে হয়তো। বস্তুত বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত সমাজে পরিণত করতে হলে সর্বদিক বিস্তৃত পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। রাজনীতিতে নৈতিকতা ফিরিয়ে আনা সেসব পদক্ষেপের একটি। রাজনীতিই যেহেতু পরিচালনা করে দেশের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড, সেহেতু রাজনীতিতে ন্যায়নীতি, আদর্শ না থাকলে সাধারণ মানুষও আদর্শহীন হয়ে পড়তে পারে। একটা বিষয় লক্ষ করা যায়, ক্ষমতাসীন অথবা তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাই দুর্নীতিতে জড়ায় বেশি, কারণ দুর্নীতি করার সুযোগ বেশি থাকে তাদের। সুতরাং ক্ষমতাসীন দলকেই দুর্নীতি না করার পরাকাষ্ঠা দেখাতে হবে প্রথমত। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির ব্যাপারে থাকতে হবে জিরো টলারেন্স। দুর্নীতি, তা ছোট অথবা বড়-অভিযোগ ওঠামাত্রই তার তদন্ত করে সংঘটিত অপরাধের বিচার করতে হবে।
বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতি পর্যবেক্ষণ সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) ২০১৭ সালের বিশ্বময় সংঘটিত দুর্নীতির ধারণাপত্র প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের এবারের অবস্থান ১৭তম। ২০১৬ সালে এ অবস্থান ছিল ১৫তম, অর্থাৎ দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ এক বছরে দুই ধাপ এগিয়েছে। তবে টিআই বলছে, গড় স্কোর বিবেচনায় বাংলাদেশের স্কোর ২৮ হওয়ায় দুর্নীতির ব্যাপকতা এখানে এখনও উদ্বেগজনক বলে প্রতীয়মান হয়। টিআইর ধারণা সূচক থেকে আরও পাওয়া গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আফগানিস্তানের পর দ্বিতীয় নিম্ন এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন থেকে চতুর্থ। টিআইবির দুর্নীতি সূচকে এক বছরে বাংলাদেশের দুই ধাপ এগোনোর খবরটি ইতিবাচক বটে। তবে সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১৮০টি দেশের মধ্যে নিচের দিক থেকে ১৭তম অবস্থান কোনোভাবেই সুসংবাদ নয়। তাছাড়া সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ নিউজিল্যান্ডের স্কোর যেখানে ১০০-তে ৮৯, সেখানে বাংলাদেশের স্কোর মাত্র ২৮। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র আফগানিস্তানই যে আমাদের নিচে অবস্থান করছে, এটাও মন খারাপ করার মতো খবর। অর্থাৎ দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশ দুই ধাপ এগিয়ে, এ খবরে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। (সূত্র : দৈনিক যুগান্তর ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮)
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এখন থেকেই একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ২০১৬ সালের সালের অক্টোবরের প্রথম সাপ্তাহ থেকেই মূলত এ প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকতা লাভ করে। এর গতি পায় যখন দলটির পুননির্বাচিত সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের কাউন্সিলে এবং এর পরবর্তীতে প্রান্তিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে এই প্রস্তুতি নেয়ার কথা ঘোষণা করেন। আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও ২৭ অক্টোবর ২০১৬ সাংবাদিকদের বলেছেন ‘কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা অলরেডি নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছি।’ (সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক ২৮ অক্টোবর ২০১৬)
১৭ মার্চ ২০১৮ সকালে ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে দলের ত্রাণ উপকমিটির রিকশা-ভ্যান বিতরণ অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, শেখ হাসিনার উন্নয়নে-অর্জনে জনগণ খুশি, নির্বাচনে বিজয় একটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
আওয়ামী লীগ ও সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি কথা বললেও তা নিয়ে আওয়ামী লীগের কোনো মাথাব্যথা নেই বলে জানান ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, বিএনপি এত চেষ্টা করেছে একটা আন্দোলন করার জন্য, মানুষ কিন্তু সাড়া দেয়নি। তার কারণ হচ্ছে, এ দেশের জনগণ বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতিকে পছন্দ করে না। প্রত্যাখ্যান করেছে।
সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা জানি, আমরা বিশ্বাস করি, এ দেশের জনগণ বিএনপি নামক বিষফোড়ার দলটিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিএনপির আন্দোলনের ডাকে জনগণ সাড়া দিচ্ছে না, কাজেই বিএনপির কোন নেতা কী বলল, সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করল, এ নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের মাথাব্যথা, কীভাবে আমাদের চলমান উন্নয়নের কাজগুলো সমাপ্ত করব।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করছে। আর বিএনপি নির্বাচন ভন্ডুল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘নির্বাচনে জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য আমরা তরুণ ভোটার, মহিলা ভোটারদের মন জয় করার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছি। বিএনপি এখন ষড়যন্ত্রের পথে এগোচ্ছে। দেশি-বিদেশি নানা মহলের সঙ্গে ওঠবস করছে, কীভাবে দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে নির্বাচনকে ভন্ডুল করা যায়, এ ব্যাপারে গোপন বৈঠক করছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, তবে এবার আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সেই দিন আর ফিরে আসবে না। পেট্রলবোমার রাজনীতি এই দেশের মানুষ চায় না। যারা বোমা মেরে মানুষ হত্যা করে, এই দেশের মানুষ তাদের কোনো দিন গ্রহণ করবে না।
বিএনপির হাজার হাজার নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার অপেক্ষায়, জানিয়ে কাদের বলেন, বিএনপির রাজনীতি এখন তাদের নিজেদের মধ্যে, তাদের গোড়া সমর্থকদের মধ্যে। সাধারণ মানুষ তাদের চায় না। এমনকি আগে যারা বিএনপি সমর্থন করত, কর্মী-সমর্থকেরাও আজকে বিএনপি ছেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো সম্মতি দিচ্ছি না। সারা বাংলায় আমাদের নেতারা, জনপ্রতিনিধিরা জানাচ্ছেন যে, ওমুক জায়গায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা যোগ দিতে চায়। আজকে বিএনপির হাজার হাজার কর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার অপেক্ষায় আছে। নেত্রীর কাছে থেকে আমরা গ্রিন সিগন্যাল পাইনি, সে কারণে আমরা সেই যোগদানে এখনো সম্মত হতে পারছি না। বিএনপির জোয়ারের দিন শেষ, এখন ভাটার টান।’ (সূত্র : দৈনিক প্রথম আলো ১৮ মার্চ ২০১৮)
সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের এমন বক্তব্যের আগেই নির্বাচন সামনে রেখে যুক্তরাজ্যের এমপিদের সমর্থন চেয়ে চিঠি দিয়েছে যুক্তরাজ্য শাখা আওয়ামী লীগ। চলতি বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে বিএনপি ও জামায়াত সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে এবং দেশকে অশান্ত করে তুলবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয় চিঠিতে। এই চ্যালেঞ্জিং সময় পাড়ি দেয়ার পথে ব্রিটিশ এমপিদের সমর্থনের অনুরোধ করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবিযুক্ত প্যাডে লেখা চিঠি দলমত-নির্বিশেষে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ৬৫০ এমপির কাছে পাঠানো হয়েছে। ১৩ মার্চ ২০১৮ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সের ডাক বিভাগের কর্মকর্তার হাতে চিঠিগুলো তুলে দেয়া হয়। যুক্তরাজ্য শাখা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরীফ ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুকের নেতৃত্বে চিঠি পৌঁছে দেয়া হয়।
চিঠির সূচনাতেই বলা হয়, ‘চলতি বছরের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমান সরকারের সময়ে আমাদের কিছু অর্জন, বিশেষ করে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সন্ত্রাস দমন প্রচেষ্টার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ এবং সামনের চ্যালেঞ্জিং সময়ে আপনাদের সমর্থনের জন্য আমরা এ চিঠি লিখছি।’ চিঠিতে গত নয় বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অর্জনের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি দাবি করা হয়, বর্তমান সরকারের সময়ে দেশের বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়েছে।
দুর্নীতি দমনে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলে দাবি করে চিঠিতে বলা হয়, দলীয় পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে বড় রাজনীতিকদেরও বিচার করা হয়েছে। তবে উদাহরণ হিসেবে কেবল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এবং তাঁর ছেলে তারেক রহমানের বিচারের কথাই এতে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
সন্ত্রাস দমন প্রসঙ্গে বলা হয়, বর্তমান সরকার ইসলামিক উগ্রবাদ ও আক্রমণ থেকে দেশের মানুষকে রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করছে। বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক দল উগ্রবাদে মদদ দেয়ার কারণে কাজটি ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য। এ প্রসঙ্গে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের সময়কার সহিংসতার কথা উল্লেখ করা হয় সবিস্তারে। বলা হয়, ২০১৫ সালের প্রথম চার মাসে দল দুটির সন্ত্রাসী কর্মকা-ের কারণে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়। প্রতিদিন দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হয় ২৮৪ মিলিয়ন ডলার। ওই সময়ে দেশের অর্থনীতি মোট ২৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির শিকার হয়।
সবশেষে বলা হয়, পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করা যায়, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে টানা সহিংসতার বিপদ রয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত যেকোনো মূল্যে নির্বাচনপ্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এই চ্যালেঞ্জিং সময় মোকাবিলায় ব্রিটিশ এমপিদের সমর্থন চান তাঁরা। [চলবে]

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ